বীরত্ব, সাহসিকতা ও উদারতায় নবাব ছিলেন অদ্বিতীয়

আরাম-আয়েশ প্রিয় হওয়ায় নিজামতের কার্যাদি সম্পাদনের জন্য হাজী আহমদ, রায় আলমচাঁদ দেওয়ান ও জগৎশেঠ ফতেহ চাঁদ এ তিনজনের সমন্বয়ে একটি কাউন্সিল গঠন করে তাদের উপর সব দায়িত্ব অর্পণ করেন এবং নওয়াব নিজে ভোগবিলাসে রত হন।

শুজা-উদ-দীন মুহম্মদ খান তার কালে বীরত্ব ও সাহসিকতায় অতুলনীয় ছিলেন; দানে এবং উদারতায়ও তিনি ছিলেন অদ্বিতীয়। তাঁর জন্ম হয়েছিল বুরহানপুরে। যেহেতু তিনি বৃদ্ধ বয়সে বাংলার নিজামতের মসনদে আরোহণ করেছিলেন, সেহেতু বাংলার যেসব জমিদার নওয়াব জাফর খান কর্তৃক কারারুদ্ধ হয়েছিলেন ও যাদের জীবনে কখনো স্ত্রী-পুত্রের মুখ দর্শনের আশা ছিল না, তাদের মুক্তি দেন এবং নওয়াব জাফর খান নির্ধারিত রাজস্বের উপর নজর আদায় করে গৃহে ফেরার অনুমতি দেন। এ কৌশলে তিনি জায়গিরের মুনাফা ও গুদাম প্রভৃতির উপর ধার্য কর ছাড়াও সহজেই এক কোটি পঞ্চাশ লক্ষ টাকা আদায় করেন এবং জগৎশেঠ ফতেহচাঁদের মহাজনী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাদশাহী তোষাখানায় প্রেরণ করেন। এতদ্ব্যতীত নওয়াব জাফর খানের ব্যক্তিগত সম্পত্তির অন্তর্গত রোগা ঘোড়াগুলো, পশুপাল, ক্ষয়প্রাপ্ত গালিচা ও পর্দাগুলো চড়া দামে বিক্রি করে আরো চল্লিশ লক্ষ টাকা সংগ্রহ করেন। এ অর্থ ও হাতিগুলো বাদশাহ মুহম্মদ শাহের নিকট প্রেরণ করেন। হিসাবনিকাশ তৈরি হওয়ার পর তিনি নির্ধারিত নিজামতি রাজস্ব প্রথামত বাদশাহী রাজধানীতে প্রেরণ করেন। মওসুমমাফিক বাদশাহের নিকট হাতি, তংগন ঘোড়া, বিশেষ ধরনের সুতি কাপড়, কুশখানা ও অন্যান্য প্রস্তুত দ্রব্যাদি প্রেরণ করে বাদশাহের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করায় তাকে মৌতামন-উল-মুল্ক, শুজা-উদ-দৌলা—শুজা-উদ-দীন মুহম্মদ খানবাহাদুর আসাদ জং উপাধি দ্বারা ভূষিত করা হয়। তাছাড়া ব্যক্তিগত সাত-হাজারী মসনব, সাত হাজার ব্যক্তিগত সৈন্য রাখার অধিকার, একটি ঝালরদার পালকি, ‘মাহী’ পর্যায়ের নিদর্শন, ছয়টি পোশাক, মূল্যবান প্রস্তর, মুক্তাখচিত একটি তরবারি, একটি রাজকীয় হাতি ও ঘোড়া প্রাপ্ত হন। এতদ্ব্যতীত তাকে বাংলার নাজিম পদে পাকা করা হয়। সমারোহ ও অস্ত্রশস্ত্রের ক্ষেত্রে তিনি পূর্বসূরিদের অতিক্রম করে যান। জীবন মধ্যাহ্ন অতিক্রান্ত হওয়া সত্ত্বেও জীবনের আনন্দ উপভোগকে তিনি উপেক্ষা করতেন না। নওয়াব জাফর খান নির্মিত সরকারি অট্টালিকাগুলো নিজের দরাজ মতের তুলনায় ক্ষুদ্র গণ্য করে তিনি সেগুলো ভেঙ্গে তৎপরিবর্তে একটি বৃহৎ জাঁকজমকপূর্ণ প্রাসাদ, একটি অস্ত্রাগার, একটি সুউচ্চ সিংহদ্বার, একটি দেওয়ানখানা, একটি আমদরবার, একটি খিলওয়াতখানা, মহিলাদের খাসকামরা, একটি খালিসা কাছারি ও একটি ফরমান বাড়ি, একটি জলুসখানা তৈরি করান। তিনি মহাসমারোহে জীবনযাপন করতেন ও রাজকীয় জাঁকজমকের সঙ্গে বাইরে বেরুতেন। তিনি সর্বদা সামরিক বাহিনীর কল্যাণ ও প্রজাদের সুখ স্বাচ্ছন্দ্যের প্রতি দৃষ্টি রাখতেন। কর্মচারীদের পুরস্কার দেয়ার সময় তিনি এক হাজার থেকে পাঁচশ টাকার কম কাউকে দিতেন না। সুবিচারের প্রতি সদা সতর্ক দৃষ্টি রাখার জন্য উদ্বুদ্ধ হয়ে ও আল্লাহ তাআলার ভয়ে তিনি তাঁর রাজ্য থেকে পীড়ন ও অত্যাচার সমূলে উৎখাত করেছিলেন। নওয়াব জাফর খানের অধীনস্থ কর্মচারী নাজির আহমদ ও মুর্দাফরাস নির্মমতার জন্য কুখ্যাত ছিল। শুজা-উদ-দীন তাদের প্রাণদণ্ড দেন এবং তাদের সব সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেন। নাজির আহমদ ভাগিরথী নদীর তীরে দেহ্পাড়ায় একটি মসজিদ ও উদ্যান নির্মাণের উদ্দেশে ভিত্তি স্থাপন করেছিল। শুজা-উদ-দীন তাদের (নাজির ও মুর্দারের) প্রাণদণ্ড দিয়ে উক্ত মসজিদ ও উদ্যান নির্মাণ সম্পূর্ণ করেন এবং নিজের নামে নাম রাখেন। তিনি উদ্যানে হাউজসহ কতকগুলো জাঁকালো প্রাসাদ, খাল ও অসংখ্য ফোয়ারা তৈরি করে অত্যন্ত সুসজ্জিত করেছিলেন। এ জমকালো উদ্যানের তুলনায় কাশ্মীরের বসন্তকালীন কুঞ্জগুলো ম্লান বোধ হতো। বরঞ্চ ইরামের উদ্যানও সৌন্দর্যে ও মাধুর্যে এখান থেকেই প্রেরণা লাভ করত। এ স্বর্গতুল্য উদ্যানে শুজা-উদ-দৌলা প্রায়ই প্রমোদ ভ্রমণ, আনন্দভোজন (চড়ুইভাতি) এবং আনন্দানুষ্ঠান ও ভোগবিলাসের জন্য সেখানে যেতেন।৷ এ উদ্যানে প্রত্যেক বৎসর তিনি কর্মচারীদের মধ্যে বিদ্বান ব্যক্তিদের একটি রাজকীয় ভোজ দিতেন। কথিত হয় যে উদ্যানের চমৎকার সৌন্দর্যের জন্য পরীরা এখানে এসে চড়ুইভাতি, ভ্রমণ ও পুকুরে গোসল করত। প্রহরীরা এ আভাস পেয়ে শুজা-উদ-দৌলাকে সংবাদ দেয়,৷তখন জীনপরীদের নিকট ক্ষতির আশংকা করে তিনি মাটি দিয়ে পুকুর বন্ধ করে দেন এবং সেখানে আনন্দভোজনও বন্ধ করে দেন।

আরাম-আয়েশ প্রিয় হওয়ায় নিজামতের কার্যাদি সম্পাদনের জন্য হাজী আহমদ, রায় আলমচাঁদ দেওয়ান ও জগৎশেঠ ফতেহ চাঁদ এ তিনজনের সমন্বয়ে একটি কাউন্সিল গঠন করে তাদের উপর সব দায়িত্ব অর্পণ করেন এবং নওয়াব নিজে ভোগবিলাসে রত হন। যখন শুজা-উদ-দৌলা উড়িষ্যার নাজিম ছিলেন, তখন রায় আলমচাঁদ মোখতার তাঁর বাড়ির একজন মুহুরী ছিলেন। এ সময় তাকে সুবা বাংলার ডেপুটি দেওয়ান পদে নিয়োগ করা হয়।

...

হুগলীর নতুন ফৌজদার অন্যায় অর্থ আদায় ও উৎপীড়ন আরম্ভ করেন। তাঁর অর্থগৃধ্নু তাঁর জন্য হুগলী বন্দরের দ্রুত পতন হতে থাকে। তিনিই ইউরোপীয় বণিকদের সঙ্গে বিবাদ আরম্ভ করেন। শুল্ক ও বাদশাহী শুল্ককর আদায়ের অজুহাতে তিনি বাদশাহের নিকট থেকে সৈন্যদল আনয়ন করেন এবং ইংরেজ, ডাচ ও ফরাসিদের সঙ্গে বিরোধিতা আরম্ভ করে নজর এবং কর আদায় করতে থাকেন। কথিত হয়, একবার ইংরেজদের জাহাজ থেকে রেশমী ও সুতি বস্ত্রের পাট নামিয়ে দুর্গের নিচে জমায়েত করে সেগুলো তিনি বাজেয়াফত করেন। ইংরেজ সৈন্যদল কলকাতা থেকে অগ্রসর হয়ে দুর্গের সন্নিকটে উপস্থিত হয়। তখন শুজাকুলী খান তাদের মোকাবেলা করার শক্তি নেই বিবেচনা করে নরম হয়ে যান এবং ইংরেজরা তাদের পণ্যদ্রব্য সেখান থেকে নিয়ে যায়। উক্ত খান তখন ইংরেজদের আক্রমণ করার জন্য নওয়াব শুজা-উদ-দৌলার নিকট সৈন্য প্রেরণের আবেদন করেন এবং কাশিমবাজার ও কলকাতায় জিনিসপত্র সরবরাহ বন্ধ করে ইংরেজদের বিপর্যস্ত করে তোলেন। কাশিম বাজারের ইংরেজ কুঠির প্রধান তখন বাধ্য হয়ে সন্ধির আবেদন করেন ও শুজা-উদ-দৌলাকে তিন লক্ষ টাকা নজর দিতে স্বীকার করেন। কলকাতা-কুঠির প্রধান তথাকার মহাজনদের নিকট থেকে উক্ত নজরানার অর্থ ঋণ গ্রহণ করেন ও শুজা-উদ-দৌলার নিকট পাঠান।

খানদৌরান খানের মাধ্যমে শুজা-উদ-দৌলার উত্তম কার্যকলাপের সংবাদ বাদশাহের নজরে আসায় তিনি এর পুরস্কারস্বরূপ রওশন-উদ-দৌলা তুরাব্বাজ খানের ভ্রাতা ফখর-উদ-দৌলার বদলির পর বিহার সুবার দায়িত্বও নওয়াব শুজা-উদ-দৌলার উপর অর্পণ করেন। মুহম্মদ আলীবর্দী খানকে দক্ষ ও কুশলী ব্যক্তি গণ্য করে উক্ত নওয়াব তাকে বিহারের ডেপুটি গবর্নর পদে নিয়োগ করেন এবং তাকে ৫ হাজার অশ্বারোহী ও পদাতিক সৈন্যসহ আজিমাবাদ (পাটনা) প্রেরণ করেন। আলীবর্দী খান সুবা বিহারে উপস্থিত হয়ে দারভাঙ্গার আফগানদের প্রধান সেনাপতি আবদুল করিম খানকেও শাসনকার্যে সংশ্লিষ্ট করেন ও একদল সুদক্ষ সৈন্য সংগ্রহ করেন। প্রশাসনিক ও রাজস্বের ক্ষেত্রে আবদুল করিম খানকে কর্তৃত্ব দিয়ে আলীবর্দী তাকে বান্জারা উপজাতির বিরুদ্ধে অভিযানে প্রেরণ করেন। বান্‌জারা গোষ্ঠীর লোকেরা লুঠতরাজ ও নরহত্যা করত এবং বণিক ও ভ্রমণকারীর ছদ্মবেশে বাদশাহী এলাকায় প্রবেশ করে লুঠপাট করত। বান্‌জারা গোষ্ঠীকে দমন করে আবদুল করিম খান বহু মালমাত্তা সংগ্রহ করেন। বান্‌জারা গোষ্ঠীকে দমন করায় আলীবর্দী বিশেষ খ্যাতি লাভ করেন। আফগানদের সহায়তা লাভ করে আলীবর্দী বিঠিয়া ও ভাওয়ারার বিদ্রোহী ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী রাজাদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেন। পূর্বের নাজিমদের সৈন্যরা কখনো তাদের এলাকায় পদক্ষেপ করেনি, অথবা কোনো সুবাদারের নিকট তাদের গর্বোন্নত শির নত হয়নি।৷প্রকৃতপক্ষে তারা কখনো বাদশাহী রাজস্ব অথবা কর প্রদান করেনি। তাদের বিরুদ্ধে অবিরাম সংগ্রাম করে আলীবর্দী বিজয়ী হন। তাদের এলাকা লুণ্ঠন ও ধ্বংস করে আলীবর্দী কয়েক লক্ষ টাকার মালমাত্তা পান। রাজাদের সঙ্গে কর, রাজস্ব ও বাদশাহী রাজস্বের পরিমাণ নির্ধারণ করে তিনি বিপুল পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করেন। সৈন্যরাও লুণ্ঠিত দ্রব্যাদির অংশ পেয়ে লাভবান হয়েছিল এবং এতে আলীবর্দীর শাসন ব্যবস্থা দৃঢ়তর হয়। ব্যাপক লুঠতরাজের দরুন কুখ্যাত চাকওয়ার গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করে আলীবর্দী তাদেরও নির্মূল করেন। ভোজপুরের জমিদার ও টিকারির রাজা সুন্দর সিং এবং নামদার খান মুইন বিদ্রোহী ও দুর্দান্ত ছিলেন। গভীর অরণ্য ও পাহাড়ের মধ্যে এদের অধীনস্থ অঞ্চলগুলো থাকায় তারা আনুগত্য প্রদর্শনে উপেক্ষা করতেন এবং দমনমূলক ব্যবস্থা অবলম্বন ব্যতীত কখনো বাদশাহী রাজস্ব দিতেন না। আলীবর্দী তাদের সম্পূর্ণরূপে দমন করেন এবং সমস্ত রাজস্ব আদায় করেন। এভাবে অন্য উদ্ধত বিদ্রোহীদের শাস্তি দিয়ে তিনি তাদের দমন করেন। অল্পকালের মধ্যে বিপুল সম্পদ ও বৃহৎ সৈন্যবাহিনীর অধিকারী হওয়ায় আলীবর্দীর ক্ষমতা ও মর্যাদা প্রভূত পরিমাণে বর্ধিত হয়। রাজ্যের শাসনকার্য আবদুল করিম খানের নিয়ন্ত্রণে থাকায় সমস্ত ক্ষমতা তাঁর হস্তগত ছিল এবং তিনি আলীবর্দী খানকে উপেক্ষা করে চলতেন। সে কারণে তাঁর উপর আলীবর্দীর সন্দেহ হয়। মিষ্টি কথায় ভুলিয়ে কৌশলে তিনি আবদুল করিমকে নিজ বাড়িতে আনিয়ে হত্যা করেন। বাদশাহী খালিসার দেওয়ান মুহম্মদ ইসহাক খানের মাধ্যমে আলীবর্দী বাদশাহের প্রধান উজির কমর-উদ-দীন খানের: ও বাদশাহের অন্য উজীরদের সঙ্গে বন্দোবস্ত করে শুজা-উদ-দৌলার অনুমোদন ছাড়াই বাদশাহের নিকট থেকে সরাসরি মহবত জং উপাধি লাভ করেন। হাজী আহমদ ও আলীবর্দীর উপর শুজা-উদ-দৌলার পূর্ণ বিশ্বাস থাকায় শুজা-উদ-দৌলা এজন্য কোনো সন্দেহ পোষণ করেন নাই। কিন্তু তাঁর পুত্র সরফরাজ খানের মনে আশংকা হয়েছিল। এ মতদ্বৈধের জন্য পিতা ও পুত্রের মধ্যে মনোমালিন্য দেখা দেয়। মুহম্মদ তকি খান ছিলেন শুজা-উদ-দৌলার অন্য এক তকি খান উড়িষ্যার ডেপুটি নাজিম ছিলেন। তিনি অত্যন্ত বীর, সাহসী ও সৈন্যবাহিনীর প্রিয় ছিলেন। হাজী আহমদ ও আলীবর্দী খান তখন সরফরাজ ও তকি খানের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মনোভাব সৃষ্টি করে নিজেদের সুবিধা অর্জন করার ষড়যন্ত্র আরম্ভ করেন। ষড়যন্ত্রের পরিকল্পনা যখন পাকাপাকি হয়, হাজী আহমদ তখন রায় রায়ান আলমচাঁদ ও জগৎশেঠ ফতেহচাঁদের সহযোগিতা লাভ করেন এবং তৎপর এ ত্রয়ী ঘড়যন্ত্রের পরিণতির অপেক্ষা করেন। সরফরাজ খানকে রাজ্যের কোনো কাজের দায়িত্ব না দেয়ার জন্য উক্ত ত্রয়ী শুজা-উদ-দৌলাকে প্রবুদ্ধ করেন। পিতা ও পুত্র এবং ভ্রাতৃদ্বয়ের মনে অবিশ্বাসের বীজ রোপিত ও অঙ্কুরিত হতে থাকে। তকি খান এ ভুল বোঝাবুঝির উৎস নির্ধারণ করার পর পিতা ও ভ্রাতার সঙ্গে স্বয়ং সাক্ষাতের জন্য উড়িষ্যা থেকে বাংলা অভিমুখে অগ্রসর হন। শুজা-উদ-দৌলার পরামর্শদাতারা তখন অবস্থা বুঝে ভ্রাতৃদ্বয়ের মধ্যে ঈর্ষার আগুন এমনভাবে বৃদ্ধি করতে থাকেন যে শেষ পর্যন্ত তারা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হন। মুহম্মদ তকি খান সসৈন্যে মুর্শিদাবাদ দুর্গের বিপরীত দিকে ভাগিরথীর অপর তীরে অগ্রসর হন এবং এক বালুময় প্রান্তরে সৈন্য সজ্জিত করেন। তারপর তিনি পিতার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসেন, কিন্তু নগর লুণ্ঠন করেন নাই। সরফরাজ খানের সৈন্যদল নক্‌তাখালী থেকে শাহনগর পর্যন্ত যুদ্ধসাজে সজ্জিত হয়েছিল। মুহম্মদ তকি খানের সেনাপতি ও সৈন্যাধ্যক্ষদের গোপনে ঘুসের লোভ দেখিয়ে সরফরাজ খান তাদের নিজ দলভুক্ত করেন এবং তকি খানকে বন্দি করার জন্য সংবাদ দিয়ে তিনি অপেক্ষা করতে থাকেন। সরফরাজ আশা করেছিলেন, যুদ্ধ আরম্ভ হলে তকি খানের সৈন্যাধ্যক্ষরাই তাকে বন্দি করে হাজির করবে। মুহম্মদ তকি খান তৎকালে রুস্তমের তুল্য বীর ছিলেন এবং তিনি শত্রুর পরোয়া করতেন না। ভ্রাতৃদ্বয়ের মধ্যে শাস্তি আলোচনা চলতে থাকে। ব্যাপার গুরুতর দেখে নওয়াব শুজা-উদ-দৌলা এতে হস্তক্ষেপ করেন এবং উভয় ভ্রাতার মধ্যে আপস করে যুদ্ধ বন্ধ করেন। সরফরাজ খান ও বেগমদের মনোভাবের প্রতি শ্রদ্ধাবশত শুজা-উদ-দৌলা মুহম্মদ তকি খানকে কয়েকবার তিরস্কার করেন ও তাকে সামনে এসে অভিবাদন জানাতে নিষেধ করেন। পরিশেষে সরফরাজ খানের মাতার অনুরোধে তিনি তকি খানকে ক্ষমা করেন ও উড়িষ্যায় ফিরে যাওয়ার অনুমতি দেন। কিন্তু উড়িষ্যায় প্রত্যাবর্তনের পর জাদুর ফলে ১১৪৭ হিজরীতে তাঁর মৃত্যু হয়। ফলে শুজা-উদ-দৌলার অন্যতম জামাতা মুরশিদ কুলী খান ওরফে মজবুর ও উড়িষ্যা সুবার ডেপুটি নাজিম পদে নিয়োজিত হন। মুরশিদ কুলী ইতিপূর্বে জাহাঙ্গীর নগরের (ঢাকার) ডেপুটি নাজিম ছিলেন। তিনি সুরাট বন্দরের এক বণিকের পুত্র ছিলেন। লেখায়, রচনায়, কবিতা রচনায় ও হস্তলিপিতে তিনি অত্যন্ত পারদর্শী ছিলেন।

নওয়াব জাফর খানের সুবাদারি আমলে উপরোক্ত মুরশিদ কুলি খান যখন মুর্শিদাবাদে থাকতেন তখন শিরাজের আদি বাশিন্দা মীর হবিব নামক এক ব্যক্তি অনর্গল ফার্সী বলতে পারত। যদিও সে এ ভাষা পড়ে নাই। দৈবক্রমে মীর হাবিব হুগলী এসে মুঘল বণিকদের কাছে জিনিসপত্র খুচরা বিক্রি করত। একই ধরনের ব্যবসায়ে লিপ্ত থাকায় ও কথোপকথনে পারদর্শী হওয়ায় মীর হবিব অল্পদিনের মধ্যেই মুরশিদ কুলী খানের সুনজরে পড়ে ও তাঁর অধীনে চাকরি গ্রহণ করে। নওয়াব জাফর খান যখন মুরশিদ কুলী খানকে জাহাঙ্গীর নগরের (ঢাকার) গবর্নর পদে নিযুক্ত করেন, তখন মীর হবিবও তাঁর ডেপুটি হিসেবে সঙ্গে যান। হিসাব নিকাশ পুংখানুপুংখরূপে পরীক্ষা করে ও ব্যয়সংকোচের নীতি গ্রহণ করে মীর হাবিব যুদ্ধ-নৌবহর, গোলন্দাজ বাহিনী ও সৈন্যবাহিনীর ব্যয় হ্রাস করেন এবং তদ্বারা তিনি রাজ্যের উপকার করেন,৷ফলে অল্পকালের মধ্যেই তাঁর সরকারি মর্যাদা উন্নীত হয়। জাহাঙ্গীর নগর (ঢাকা) অঞ্চল উর্বর, লাভজনক ও ব্যবসায়ের উপযোগী দেখে তিনি শাহজাদা আজিম-উশ-শানের আমলে প্রচলিত সওদায়ে খাস প্রথা পুনঃপ্রচলন করেন। তাছাড়া অন্যান্য পন্থায় আদায় করে তিনি নিজে ও তাঁর প্রধান উভয়েই সম্পদ সঞ্চয় করেন। বাদশাহী রাজস্ব আদায়ের অজুহাতে তিনি পরগণা জালালপুরের জমিদার নূরউল্লাহ (ইনি উক্ত অঞ্চলের নেতৃস্থানীয় জমিদার ছিলেন) ও অন্যান্য জমিদারদের তাঁর কাছারিতে উপস্থিত হতে প্রলুব্ধ করেন। কৌশলে অন্য জমিদারদের একে একে বিদায় করে মীর হাবিব নূবউল্লাহকে আটকে রাখেন। দ্বিপ্রহর রাত্রে তিনি তাকে বাড়ি ফিরে যাওয়ার অনুমতি দেন; পাহারা দেয়ার জন্য জনকতক আফগানকে সঙ্গে দেন। কিন্তু এরা মীর হাবিবের প্ররোচণায় এক অন্ধকার সংকীর্ণ গলিতে নূরউল্লাহকে হত্যা করে। পরদিন সকালে মীর হবিব ঘোষণা করেন যে নূরউল্লাহ পলায়ন করেছে। অতঃপর একদল সৈন্য তাঁর বাড়িতে পাঠিয়ে কয়েক লক্ষ টাকা মূল্যের টাকাকড়ি, জহরতাদি, রেশমের বস্ত্রাদি ও নূরউল্লাহর হাবসী নারীপুরুষ দাসদাসীদের বাজেয়াফত করেন। মীর হাবিব নিজে এদের দখল করে আমিরানা জাঁকজমকের অধিকারী হয়।

অতঃপর পাট পসারের জমিদার আকা সাদেকের যোগসাজশে মীর হবিব তাকে টিপরা রাজ্যের বিরুদ্ধে অভিযানে প্রেরণ করেন। আকা সাদেক কৌশল ও চাতুর্যে মীর হাবিবের তুল্য ছিলেন। দৈবক্রমে টিপরার রাজার ভ্রাতুষ্পুত্রের সঙ্গে আকা সাদেকের সাক্ষাৎ হয়। এ ব্যক্তি তাঁর খুল্লতাতের কবল থেকে পালিয়ে নিজের দেশ ত্যাগ করে ঘুরছিল এবং এ সময় সে বাদশাহী এলাকায় ছিল। তাকে হাতে পেয়ে আকা অত্যন্ত সৌভাগ্যের বিষয় মনে করেন ও তাকে জমিদারিতে পুনরায় অধিষ্ঠিত করার প্রতিশ্রুতি দেন। রাজার ভ্রাতুষ্পুত্র গিরিপথ ও নদী অতিক্রম করে আকাকে টিপরা রাজ্যের পথ দেখিয়ে নিয়ে যায়। 

টিপরার রাজা অসতর্ক ছিলেন এবং বাদশাহী সৈন্যবাহিনীর আক্রমণ সম্বন্ধেও অনবহিত ছিলেন। বাদশাহী বাহিনীর এ আকস্মিক আক্রমণে রাজা সম্পূর্ণ হতভম্ব হয়ে পাহাড়ের চূড়ার দিকে পলায়ন করেন। সহজেই টিপরা অঞ্চল মীর হাবিবের অধীন হয় এবং যুদ্ধ করে রাজার বাসস্থান চণ্ডিগড় অধিকার করেন। বিপুল মালমাত্তা লুঠ করে মীর হবিব টিপরা অঞ্চল বাদশাহী এলাকায় অন্তর্ভুক্ত করেন। উক্ত অঞ্চলের সুব্যবস্থা করার পর মীর হাবিব আকা সাদেককে টিপরার ফৌজদার পদে নিযুক্ত করেন এবং রাজার ভ্রাতুষ্পুত্রকে রাজপদে অধিষ্ঠিত করে মালমাত্তা, মূল্যবান দ্রব্যাদি ও বহু হাতিসহ জাহাঙ্গীর নগরে (ঢাকায়) ফিরে আসেন। মুরশিদ কুলী খান টিপরা জয়ের বিবরণী নওয়াব শুজা-উদ-দৌলার নিকট প্রেরণ করেন এবং সেই সঙ্গে উক্ত অঞ্চল থেকে প্রাপ্ত শ্রেষ্ঠ দ্রব্যাদি ও রেশমের বস্ত্রাদি প্রেরণ করেন। নওয়াব উক্ত অঞ্চলের (টিপরার) নাম দেন রওশনাবাদ এবং মুরশিদ কুলিকে ‘বাহাদুর’ ও মীর হাবিবকে ‘খান’ উপাধি দেন।

যখন মুরশিদ কুলী খানকে উড়িষ্যা সুবার ডেপুটি নাজিম পদে নিয়োগ করা হয়, তখন নওয়াব শুজা-উদ-দৌলার সুপারিশে বাদশাহ তাকে (মুরশিদ কুলীকে) ‘রুস্তম জং’ উপাধি দেন। পিতার বৃদ্ধ বয়স দেখে ও তাঁর মৃত্যুর পর রুস্তম জংয়ের বিরোধিতার আশংকা করে সরফরাজ খান ইয়াহিয়া খান নামে রুস্তম জংয়ের পুত্র ও তার স্ত্রী দুর্দানা বেগমকে জামিনস্বরূপ মুর্শিদাবাদে আটকে রাখেন। এজন্য মুরশিদ কুলী খান ক্ষুব্ধ হওয়া সত্ত্বেও গত্যন্তরবিহীন হয়ে তাকে এ অবস্থা নীরবে সহ্য করতে হয়েছিল। মুরশিদ কুলী খান সৈন্যবাহিনীসহ উড়িষ্যায় উপস্থিত হয়ে জাহাঙ্গীর নগরে যেমন, তেমনি এখানেও মীর হাবিবউল্লা খানকে ডেপুটি পদে নিয়োগ করেন। কুটকৌশল, রাজনৈতিক বিজ্ঞতা উদ্যম সহকারে মীর হাবিব উড়িষ্যার সকল বিদ্রোহী জমিদারকে বক্তৃতা স্বীকার করতে বাধ্য করেন। উড়িষ্যার শাসন ব্যবস্থার উন্নতি সাধন করে মীর হাবিব উক্ত সুবাকে উদ্বৃত্ত অঞ্চলে পরিণত করেন। মুহম্মদ তকি খানের আমলের গোলমালের সময় পুরুষোত্তমের রাজা হিন্দুদের দেবতা জগন্নাথকে উড়িষ্যা সুবার প্রত্যন্তে চিকা হ্রদের ওপারে এক পাহাড়ের চূড়ায় অপসারিত করেছিলেন। এ প্রতিমা অপসারণের ফলে বাদশাহী রাজস্বের পরিমাণ ন’লক্ষ টাকা হ্রাস হয়ে গিয়েছিল। এ রাজস্ব তীর্থযাত্রীদের নিকট থেকে আদায় করা হতো। মীর হাবিবউল্লার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করে ও তৎকালীন নাজিমকে নজর দিয়ে রাজা দণ্ড দেও হিন্দুদের দেবতা জগন্নাথকে পুরুষোত্তম (পুরী) আনয়ন করেন ও তথায় পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। জগন্নাথের পূজার বিবরণ এ ইতিহাসে অন্যত্র বিধৃত হয়েছে। 

যখন ওডিসার (উড়িষ্যার) ডেপুটি নিজামত মুরশিদ কুলী খান রুস্তম জংকে দেয়া হয়, তখন চাকলা জাহাঙ্গীর নগরের (ঢাকার) ডেপুটি নিজামত সরফরাজ খানকে দেয়া হয়। সরফরাজ খান পারস্য রাজবংশোদ্ভূত গালিব আলী খানকে ডেপুটি গবর্নররূপে ঢাকায় প্রেরণ করেন। নওয়াব জাফর খানের পূর্বতন সেক্রেটারি ও নিজ গৃহশিক্ষক জসুনত রায়কে সরফরাজ খান দেওয়ান ও মন্ত্রীপদে নিয়োগ করে গালিব আলী খানের সঙ্গে ঢাকায় প্রেরণ করেন। সরফরাজ খান তাঁর ভগ্নী নফিসা বেগমের প্রতি শ্রদ্ধাবশত সৈয়দ রাজি খানের পুত্র মুরাদ আলী খানকে ঢাকাস্থ নৌবহরের তত্ত্বাবধায়করূপে নিযুক্ত করেন। রাজস্ব ও আভ্যন্তরীণ বিষয়াদি, খাস জমি ব্যবস্থা, জায়গীর, নৌবহর ও গোলন্দাজ বাহিনী, হিসাব নিকাশ ও শুল্ক বিভাগীয় সমস্ত কাজের ভার মুনশী জসুনত রায়ের উপর অর্পণ করা হয়। উক্ত মুনশী নওয়াব জাফর খানের অধীনে শিক্ষালাভ করায় সততা, আন্তরিকতা ও বিজ্ঞতার প্রতিটি খুঁটিনাটি বিষয়ে মনোনিবেশ করে কেবল যে রাজ্যের রাজস্বের পরিমাণ বৃদ্ধি করেছিলেন তাই নয়, পরন্তু প্রজাদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যও বৃদ্ধি করেছিলেন। তিনি সওদায়ে খাস সম্পূর্ণ বাতিল করে দেন এবং মুরশিদ কুলী খানের আমলে মীর হাবিব প্রবর্তিত পীড়নমূলক নতুন সমস্ত ব্যবস্থা বিলোপ করেন। খাদ্যশস্যের বিক্রয়মূল্য সস্তা রাখার চেষ্টা করে তিনি জাহাঙ্গীর নগরের (ঢাকার) দুর্গের পশ্চিম দিকের যে দরওয়াজা নওয়াব আমির-উল-ওমারা শায়েস্তা খান বন্ধ করেছিলেন তা উন্মুক্ত করে দেন। সেই সময় থেকে একাল পর্যন্ত খাদ্যশস্যের মূল্য এত সস্তা আর কেউ করতে পারেন নাই। উদারতা, সমদর্শিতা ও সুবিচার দ্বারা তিনি জাহাঙ্গীর নগরকে (ঢাকাকে) ইরামের উদ্যানের মতো উর্বর করেছিলেন এবং তজ্জন্য সরফরাজ খানের সুনাম সকল শ্রেণীর প্রজাদের মধ্যে ব্যপ্ত হয়েছিল। নফিসা বেগমের অনুরোধে সরফরাজ খানের এক কন্যার মুরাদ আলী খানের বিবাহ দিয়ে তাকে গালিব আলী খানের স্থানে জাহাঙ্গীর নগরের ডেপুটি গবর্নর পদে নিযুক্ত করা হয়। মুরাদ আলী খান নৌ-বিভাগের অন্যতম কেরানী রাজবল্লভকে পেশকার পদে উন্নীত করেন ও প্রজাদের উপর অত্যাচার করতে আরম্ভ করেন। মুনশী জসুনত রায় পূর্বে প্রজাদের নিকট সুনাম অর্জন করেছিলেন এবং এখন সেই সুনাম নষ্ট হওয়ার আশংকায় দেওয়ানের পদ ত্যাগ করেন ফলে, নতুন ডেপুটি নাজিমের অত্যাচারে জাহাঙ্গীর নগর বা ঢাকা প্রদেশ বিবান হয়ে যায়।

[আকবরউদ্দীন কৃত রিয়াজ-উস-সালাতীনের বঙ্গানুবাদ বাংলার ইতিহাস থেকে সংক্ষিপ্ত আকারে সংকলিত। শিরোনাম সিল্করুট-এর দেয়া]

আরও