স্বামী ও পুত্রের দ্বন্দ্বে মধ্যস্থতা করে যুদ্ধ থামিয়েছিলেন জিনাত-উন-নিসা

ইতিহাসবিদরা জানান, প্রশাসক হিসেবে সুজাউদ্দিন ছিলেন কর্মঠ ও ন্যায়পরায়ণ। তার একটিই দোষ ছিল। নারীদের প্রতি সুজার টান ছিল প্রবল। মুর্শিদকুলী খান নবাব হয়েও এক স্ত্রী গ্রহণ করেছিলেন।

বাংলার নবাব তখন মুর্শিদকুলী খান। তার আমলে বাংলায় সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু প্রতিটি রাজ্য, নবাবি ও সিংহাসনেরই থাকে উত্তরাধিকার সংকট। মুর্শিদাবাদের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছিল। উত্তরাধিকারের সংকট তৈরি হয়েছিল মুর্শিদকুলী খানের নাতি ও জামাতার মধ্যে। একটা যুদ্ধাবস্থাও তৈরি হতে পারত। কিন্তু সেখানে মধ্যস্থতা করেন মুর্শিদকুলী খানের কন্যা জিনাত-উন-নিসা বেগম।

মুর্শিদকুলী খানের কোনো পুত্র ছিল না। তিনি তার একমাত্র কন্যা জিনাত-উন-নিসা বেগমকে প্রচণ্ড ভালোবাসতেন। বুরহানপুরে থাকাকালীন মুর্শিদকুলী খানের অধীনে কাজ করতেন সুজাউদ্দিন মোহাম্মদ খান। সম্ভ্রান্ত ও কর্মঠ হওয়ায় মুর্শিদকুলী খান তাকে পছন্দ করতেন। বুরহানপুরে থাকাকালীনই সুজার সঙ্গে জিনাত-উন-নিসার বিয়ে দেন মুর্শিদকুলী খান। পরবর্তী সময়ে মুর্শিদকুলী খান বাংলার দেওয়ানি ও সুবাদারি লাভ করলে তিনি সুজাকে উড়িষ্যার দেওয়ান ও নায়েব নাজিম পদে বহাল করেন।

ইতিহাসবিদরা জানান, প্রশাসক হিসেবে সুজাউদ্দিন ছিলেন কর্মঠ ও ন্যায়পরায়ণ। তার একটিই দোষ ছিল। নারীদের প্রতি সুজার টান ছিল প্রবল। মুর্শিদকুলী খান নবাব হয়েও এক স্ত্রী গ্রহণ করেছিলেন। তার কোনো হারেম ছিল না। জিনাতও ছিলেন ধর্মভীরু। ফলে সুজার সঙ্গে জিনাতের দাম্পত্য সম্পর্ক খুব জোরালো ছিল না। অন্যদিকে মুর্শিদকুলী খানও জামাতার প্রতি অপ্রসন্ন হয়েছিলেন। এ অবস্থায় সুজা নিজ থেকেই মুর্শিদাবাদ ছেড়ে উড়িষ্যায় থিতু হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

এদিকে মুর্শিদকুলী খানের বয়স হচ্ছিল। তিনি জানতেন, পুত্র না থাকার কারণে জামাতার হাতেই ক্ষমতা যাবে। কিন্তু তার দৌহিত্র সরফরাজ খানকে উত্তরাধিকারী করা যেতে পারে। এ চিন্তা থেকে তিনি সরফরাজের জন্য তদবির শুরু করেন। বস্তুত তখন মুর্শিদকুলী খানকে ‘বাংলার নবাব’ বলা হলেও তিনি ছিলেন মোগল বাদশাহর নিযুক্ত কর্মী। তার মৃত্যুর পর বাংলার দায়িত্ব কে পাবেন তাও দিল্লি থেকেই নির্ধারিত হতো। তাই মৃত্যুর আগেই মুর্শিদকুলী খান তার নাতি সরফরাজের জন্য দিল্লিতে তদবির শুরু করেন। কিন্তু তার ফল আসার আগেই মুর্শিদকুলী খান মারা যান।

নিখিলনাথ রায় তার ‘মুর্শিদাবাদের ইতিহাস’-এ জানাচ্ছেন, ‘মৃত্যুর কিছু পূর্ব্বে তিনি সরফরাজের হস্তে আপনার সমস্ত সম্পত্তি প্রদান করিয়া, তাঁহার অধীনস্থ কর্ম্মচারিবর্গকে ন্যায় ও করুণা-চক্ষে নিরীক্ষণ করিতে আদেশ প্রদান করেন।’ অর্থাৎ তিনি নিজ কর্মচারীদের সামনে সরফরাজকেই উত্তরাধিকারী মনোনীত করেন।

কিন্তু সুজাউদ্দিনেরও তো কিছু হলেও প্রত্যাশা আছে ক্ষমতার। তিনি উড়িষ্যা থেকেই দিল্লির সঙ্গে যোগাযোগ করছিলেন। আলিবর্দী খান ও হাজি আহমদের পরামর্শে তিনি এ কাজ করেন। শ্বশুরের মৃত্যুর সংবাদ পেতেই আলিবর্দীকে সঙ্গে নিয়ে তিনি মুর্শিদাবাদ যাত্রা করেন। পথেই লাভ করেন বাদশাহি ফরমান। বাদশাহ তাকেই বাংলার দেওয়ানি ও সুবাদারি প্রদান করে ফরমান জারি করেছেন। ফলে তিনি চেহেল সেতুনে গিয়ে নিজেকে সুবাদার দাবি করেন। সে কথা শুনে পিতার বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা দেয় সরফরাজ।

এ পর্যায়ে সংকট উত্তরণে এগিয়ে আসেন জিনাত-উন-নিসা। তিনি সরফরাজকে ডেকে বলেন, ‘তোমার বাবা বৃদ্ধ হয়েছেন। তার পরে সুবাদারি, এ দেশ ও দেশের সম্পদ তোমার কাছেই যাবে। কেউ তার নিজের বাবার বিরুদ্ধে যুদ্ধে গেলে তা তার নিজের ও সবার জন্যই ক্ষতিকর। তোমার বাবার প্রস্থানের আগ পর্যন্ত বাংলার দেওয়ানি নিয়ে সন্তুষ্ট থাকাই তোমার ও সবার জন্য মঙ্গল হবে।’

‘তারিখ-ই-বাঙ্গালা’ এ ঘটনার উল্লেখ করে। অন্যদিকে নিখিলনাথ রায়ের মতে, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সরফরাজের সমর্থকরা তাকে বোঝান যে তার পিতার হাতে একদিকে আছে দিল্লির ফরমান, অন্যদিকে তিনি দখল করেছেন চেহেল সেতুন। ফলে এ মুহূর্তে তার সঙ্গে বিবাদে না গিয়ে তার বশ্যতা স্বীকার করাই ভালো।

তবে লক্ষ করার মতো বিষয় হলো মুর্শিদকুলী খানের মৃত্যুর সময় তার স্ত্রী ও কন্যা জিনাত তার সঙ্গে ছিল এ কথা সব ইতিহাসবিদই উল্লেখ করেছেন। তিনি সরফরাজকে উত্তরাধিকারী মনোনীত করতে চেয়েছেন তাও ঐতিহাসিক। সুতরাং জিনাত সরফরাজকে নিষেধ করবেন এতে সন্দেহ হতে পারে। কিন্তু জিনাতের পরবর্তী সময়ের কাজে মনে হয় তিনি বুঝেশুনেই সরফরাজকে নিষেধ করেছিলেন। প্রথমত, তিনি ছিলেন ঠাণ্ডা মাথার মানুষ। তিনি বুঝেছিলেন সুজা বেশিদিন বাঁচবেন না। দ্বিতীয়ত, সরফরাজকে দূরে যেতে দিতে চাননি জিনাত। এর প্রমাণ তার পরবর্তী একটি পদক্ষেপে পাওয়া যায়।

সুজা বাংলার সুবাদারি শুরু করলে বিহারের দেওয়ানি দিতে চাইলেন সরফরাজকে। কিন্তু জিনাত এতে বাধা দেন। তিনি সরফরাজকে চেহেল সেতুনের কাছেই রাখতে চেয়েছিলেন। আলিবর্দীকে তিনি দূরে সরাতে চেয়েছিলেন।

সুজা উড়িষ্যা থেকে ফিরে দায়িত্ব গ্রহণ করার পর জিনাতের কাছে তার পূর্ব জীবনের কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন।

জিনাতও এ নিয়ে উচ্চবাচ্য করেননি। এর পরই সুজা জানান তিনি পুত্রকে বিহারের দেওয়ানি দিতে চান। কিন্তু জিনাত তাকে বোঝান এ কাজের জন্য আলিবর্দী খান উপযুক্ত। আলিবর্দীকে ডেকে জিনাতই তাকে পাটনা যেতে বলেন।

সুশীল চৌধুরী লিখেছেন, ‘জিনাত-উন-নিসা আলিবর্দী খানকে তলব করেন এবং তাকে বিহারের সুবাদারি দেয়ার কথা জানান। তিনি (জিনাত) তাকে একটি বহুমূল্য খিলাত দেয়ার সঙ্গেই বিহারের দেওয়ানির কথা জানান যেন জিনাতই সেই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।’

আলিবর্দী খানকে মুর্শিদাবাদ ও চেহেল সেতুন থেকে দূরে সরিয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু শেষ রক্ষা করতে পারেননি জিনাত-উন-নিসা। সুজাউদ্দিনের মৃত্যু হলে মুর্শিদাবাদ আক্রমণ করেন আলিবর্দী খান। গিরিয়ার যুদ্ধে তিনি সরফরাজকে পরাজিত ও নিহত করেন। নিখিলনাথ ও সুশীল চৌধুরী জানাচ্ছেন, যুদ্ধের পর জিনাত-উন-নিসার কাছে ক্ষমা চেয়েছিলেন আলিবর্দী এবং বলেছিলেন, সর্বদা তার খিদমতে নিযুক্ত থাকবেন।

মাহমুদুর রহমান: লেখক ও সাংবাদিক

আরও