অবরোধবাসিনী থেকে সাহিত্য মঞ্চের অভিযাত্রী

নাহার জন্মেছিলেন নোয়াখালীতে। ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে। তবে বেড়ে উঠেছেন চট্টগ্রামে, নানার বাড়িতে। তার পিতার মৃত্যুর পর ভাই হবীবুল্লাহ্ বাহার ও তাকে নিয়ে তাদের মা সেখানেই ফিরে যান। পাঁচ বছর বয়সে নোয়াখালীর পল্লী জীবনের ইতি টেনে নাহারের বসবাস শুরু হয় চট্টগ্রামে।

অবরোধবাসিনী শব্দটি রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের (১৮৮০-১৯৩২) সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটা স্বাভাবিকও বটে। কেবল একই নামে বাংলা সাহিত্যের একটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের লেখিকা হিসেবে নয়, বরং নারী জাগরণের পথিকৃত হিসেবে। তিনি নিজে সমাজের আরোপিত নিয়মের শিকল ভেঙেছেন, যে নিয়ম তাকে ঘরবন্দি করে রাখতে চেয়েছিল। ৫৩ বছরের জীবৎকালে রোকেয়া রক্ষণশীল সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়াই করে গেছেন, হয়ে উঠেছেন নারী মুক্তি আন্দোলনের পুরোধা, নারী শিক্ষার অগ্রদূত। তার প্রচেষ্টাকে পরবর্তী সময়ে অনেকেই এগিয়ে নিয়েছেন। তাদেরই একজন শামসুন নাহার মাহমুদ (১৯০৮-৬৪)। জীবনের নানা মোড়ে শামসুন নাহার নিজেই বারবার স্মরণ করেছেন বেগম রোকেয়াকে। তবে রোকেয়ার দেখিয়ে যাওয়া পথে হাঁটতে গিয়ে শামসুন নাহার কীভাবে স্বতন্ত্র হয়ে উঠেছিলেন সেটিও‌ কম আশ্চর্যের নয়। বিশেষত সেই সময়ের সামাজিক কঠোরতার মধ্যে, যেখানে নারীদের ঘর থেকে বের হওয়াও কঠিন ছিল, সেসব উতরে তিনি কীভাবে নিজেকে নিয়ে গিয়েছিলেন সাহিত্য মঞ্চে, জনতার দরবারে, সে গল্প রোমাঞ্চকর। কবি নজরুলের মতো বলা যায়, ‘নাহার এলে রাত্রি চিরে- জ্যোতির অভিযান!’ তিনি এও বলেছিলেন, ‘নাহারের মতো “‍নাহার” আপনাদের চট্টলের মুসলমানদের ঘরে কয়টি আছে আমার জানা নেই।’ নজরুলের এ কথার মর্মার্থ বুঝতে হলে আমাদের যেতে হবে নাহারের শিশুবেলায় এবং শিশু নাহারের হাত ধরে পৌঁছা যাবে বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সম্মেলনের মঞ্চে।

নাহার জন্মেছিলেন নোয়াখালীতে। ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে। তবে বেড়ে উঠেছেন চট্টগ্রামে, নানার বাড়িতে। তার পিতার মৃত্যুর পর ভাই হবীবুল্লাহ্ বাহার ও তাকে নিয়ে তাদের মা সেখানেই ফিরে যান। পাঁচ বছর বয়সে নোয়াখালীর পল্লী জীবনের ইতি টেনে নাহারের বসবাস শুরু হয় চট্টগ্রামে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষারও হাতেখড়ি সেখানে। ডা. খাস্তগীর বালিকা বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণীতে ভর্তি করা হয় নাহারকে। তখন ১৯১৪ সাল। সে সময় একটা বয়সের পর নারীদের পর্দা প্রথার পালন অনিবার্য ছিল। নিষেধ ছিল বিদ্যালয়ের চৌকাঠ মাড়ানো। নাহারের ওপর এসব নিয়ম ধার্য হয়েছিল নয় বছর বয়সেই, তা তার জীবনী পড়ে জানা যায় (বেগম শামসুন নাহার মাহমুদ: একটি প্রামাণ্য জীবনী, লিখেছেন মোশফেকা মাহমুদ)। যদিও নয় বছর বয়সী একজনকে নারী বলার চেয়ে শিশু বলাই অধিক সংগত। কিন্তু তৎকালীন সমাজ-সংস্কৃতিতে সে বয়সই হয়ে উঠেছিল বিভাজন রেখা টানার বিন্দু। নয় বছর বয়সে ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়াকালীন নাহারের ওপর পর্দা করার তাগাদা শুরু হয়ে যায়। সপ্তম শ্রেণীর পর তার বিদ্যালয়ে যাওয়াও বন্ধ হয়ে যায়। এ প্রসঙ্গে তাকে শিক্ষকরা জিজ্ঞেস করেছিলেন। উত্তরে নাহার বলেছিলেন, ‘বড় হয়ে গেছি তাই।’ যদিও কারোরই জানা ছিল না সপ্তম শ্রেণী পড়ুয়া একটি মেয়ে বড় হয়ে যায় কীভাবে।

১০ বছর বয়স। শাসসুন নাহারকে বিদ্যালয় ছেড়ে পর্দানশিন হতে হয়েছিল। অবরোধবাসিনী। তবু তিনি মঞ্চে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, ‘অবরোধ প্রথায় দোষ-গুণ নিয়া এখানে আলোচনা করিব না। মুসলিম নারী প্রগতি বর্তমানে যে পথে চলিয়াছে, তাহারও পক্ষে বা বিপক্ষে কিছু বলা আমার উদ্দেশ্য নয়। মোটকথা হইতেছে এই, পাষাণ কারা ভাঙ্গিয়াছে। অবরোধের প্রাচীর মুসলমান মেয়েদের আর আবদ্ধ করিয়া রাখিতে পারিতেছে না। যুগ-যুগান্তের পুঞ্জীভূত অন্ধকার ভেদ করিয়া মুসলিম নারী আলোকের রাজ্যে প্রবেশ করিয়াছেন। এই আলোকের অভিযানে যাঁহারা মাতিয়াছেন, একটা বিশিষ্ট ভঙ্গী তাঁহাদের প্রত্যেকেরই আছে বলিয়া আমি মনে করি। দীর্ঘদিনের অন্ধকারের পর আলোকের চোখ ঝলসানো রশ্মিকে তাঁহারা কে কীভাবে বরণ করিলেন সে ইতিহাস অভিনব কিছু নিশ্চয়।’

বেগম নাহারের বক্তব্যের এ সূচনাংশ নানাভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। বিষয়টি স্পষ্ট করার জন্য নূর মোহাম্মদ রচিত বঙ্গীয় মুসলমান সমাজ ঔপনিবেশিক শিক্ষা ব্যবস্থা ও সাম্প্রদায়িকতার আশ্রয় নেব। বইটির একটি অধ্যায়ে (‘আবুল হুসেন: তৎকালীন বঙ্গীয় মুসলমান সমাজ) তিনি ১৯২৬ সালে প্রতিষ্ঠিত মুসলিম সাহিত্য সমাজের মুখ্যজনদের ভাবনাগত কিছু দোষত্রুটির ওপর আলোকপাতের চেষ্টা করেন, ফলে বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন সময়ের পরিক্রমায় ম্রিয়মাণ হয়ে পড়ে। সে ভাবনা ছিল বারবার মুসলিমদের ইংরেজি শিক্ষাকে গ্রহণ না করাকে তৎকালীন মুসলিম সমাজের দুর্দশার বড় দায় হিসেবে উপস্থাপন করা। কিন্তু মুসলিম সাহিত্য সমাজ গঠনের সময় থেকে ক্রমেই ভারতবর্ষের পরিস্থিতি বদলাতে থাকে। ফলে কালক্রমে কেবল শিক্ষার ওপর দোষ চাপানো এবং শিক্ষার মাধ্যমে অবস্থার উন্নতি করার বিষয়টি অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে। এ নিবন্ধের আলাপ যেহেতু মুসলিম সাহিত্য সমাজ না, তাই এর বেশি গভীরে যাওয়া সমীচীন হবে না। তবে উল্লেখ করা এ কারণে যে, শামসুন নাহার নিজের ভাবনা তথা তৎকালীন নারীদের অবস্থানকে কেবল পর্দাপ্রথা বা অবরোধ প্রথার আলোকে দেখতে চাননি। যখন অনেকেই শিক্ষা ও সাধনা মুসলমান নারী সমাজে দুর্লভের কারণ হিসেবে ‘অবরোধ রুদ্ধ মুসলিম অন্তঃপুরের’ কথা উল্লেখ করেছেন, তিনি দৃঢ়ভাবে বলেছেন, ‘কথাটা কিছু পরিমাণ সত্য। কিন্তু এ যুগ পরিবর্তনের সময় এ কৈফিয়ৎ দিন দিন ক্রমেই ভিত্তিহীন হইয়া পড়িতেছে, এ কথা স্বীকার করিতেই হইবে।’ ফলে তিনি নানা মতের মানুষের কাছে বিভিন্নভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠতে পেরেছিলেন বলেই ধারণা করা যায়। যদিও সে পথ কখনই খুব বেশি মসৃণ ছিল না। তবে মসৃণ করতে বেগম রোকেয়ার প্রভাব যেমন ছিলেন, তেমনি ছিল কবি নজরুল ইসলামের সান্নিধ্য।

স্কুলের চৌকাঠ পেরিয়ে পর্দার অন্তরালে চলে যাওয়া নাহারের কাছে বেগম রোকেয়া এসেছিলেন আলোর দূত হয়ে। ‘নবনূর’ ও ‘সওগাত’-এর পাতায় রোকেয়ার লেখার সঙ্গে পরিচয় ঘটে তার। কিশোরী নাহারের ভাবজগৎকে প্রভাবিত করেছিল বেগম রোকেয়ার লেখনী। বিনা পরিচয়ে চিঠি লিখে রোকেয়া তাকে জানিয়েছিলেন, বাংলার কোনো নিভৃত পল্লীর কোনো অবরোধবাসিনী বালিকার শিক্ষার প্রতি সামান্যতম আগ্রহও তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি নাহারকে উপদেশ দিয়েছিলেন—গায়ের চামড়া এমন পুরু করে নিতে হবে যেন নিন্দা-অপমান আঘাত করতে না পারে, ধৈর্য-সহিষ্ণুতা-ক্ষমাই হোক সমাজকর্মীর পাথেয়। সে বাণী পরবর্তী জীবনে নাহার অনুসরণ করে গেছেন। নারীমুক্তির পাশাপাশি সমাজসেবায় ব্রতী হয়েছেন। তাই প্রাতিষ্ঠানিক ছাত্রী না হয়েও নিজেকে সগর্বে ‘রোকেয়ার ছাত্রী’ বলতে দ্বিধা করেননি তিনি। ১৯৩২ সালে কলকাতায় বঙ্গীয় মুসলিম মহিলা সমিতির ঐতিহাসিক অধিবেশনে রোকেয়া যখন সভানেত্রী, নাহার তখন সমিতির সেক্রেটারি ছিলেন। রোকেয়ার জীবদ্দশায় ও পরবর্তী সময়ে নাহার তার উত্তরাধিকার হয়ে নারী ও মানবমুক্তির সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন।

অন্যদিকে নজরুল তাকে অনুপ্রাণিত করেছেন নিয়মিত লিখতে। এক চিঠিতে তিনি নাহারকে লিখেছিলেন, ‘ছেলেমানুষ তুমি, পড়তে না পেয়ে তুমি এখনো কাঁদো। তোমায় লিখতে বলেছি, আজও বলছি লিখতে। বললেই যে লেখা আসে তা নয়। কারুর বলা যদি মনে আনন্দ দেয়, তবে সে আনন্দের বেগে সৃষ্টি হয়তো সম্ভব হয়ে ওঠে।’

ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহর সম্পাদিত তৎকালীন ‘আঙুর’ পত্রিকায় প্রথম প্রকাশ পেয়েছিল নাহারের কবিতা। কবিতা প্রকাশের পর সমাজের নানা মহলে আপত্তি উঠেছিল। একজন পর্দানশিন, অবিবাহিত নারীর লেখা পত্রিকায় প্রকাশ পাওয়াটাও তখন ছিল ঘোর সমালোচনার বিষয়। এসব আপত্তি তাকে দমাতে পারেনি। বরং তার লক্ষ্যকে আরো দৃঢ়তা দিয়েছিল বলেই বোধ করি। তিনি একদিন বঙ্গীয় মুসলম সাহিত্য সম্মিলনে শিশু সাহিত্য শাখার সভানেত্রীর আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। সভানেত্রীরূপে দেয়া ভাষণে শামসুন নাহার শিশু সাহিত্যের গুরুত্ব নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা করেন—‘‌সন্দেশ’, ‘‌মৌচাক’, ‘‌শিশু সাথী’, ‘‌শিশু সওগাত’ প্রভৃতি পত্রিকা এবং কাজী এমদাদুল হক চৌধুরী, এয়াকুব আলী, মুহম্মদ হবীবুল্লাহ প্রমুখ মুসলিম শিশু সাহিত্যিকের অবদান স্মরণ করেন তিনি, আর ভাষণের শেষে রবীন্দ্রনাথের একটি উক্তি উদ্ধৃত করে সাহিত্যে শিশুর রসবোধ জাগিয়ে তোলার গুরুত্ব তুলে ধরেন। ১৯৪৪ সালে কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে অনুষ্ঠিত মুকুল সম্মেলনেও সভানেত্রীর ভাষণে তিনি মহাযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বলেন, ‘যুদ্ধের হানাহানির ভেতর দিয়েই ইতিহাসে নতুন যুগের সূচনা ঘটে, ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকেই জন্ম নেয় নতুনের।’ এভাবে একাধিক সম্মেলনে তিনি নিয়মিত যোগ দিতেন এমন সময়ে, যখন নারীদের জীবন ছিল একটা বৃত্তে আবদ্ধ।

তার যোগ দেয়া সম্মেলনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ একটি ছিল বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সম্মেলনের ষষ্ঠ অধিবেশন (বৈশাখ ১৩৪৬/১৯৩৯), যেখানে মুসলিম মহিলা সাহিত্য শাখার সভানেত্রী হিসেবে শামসুন নাহার প্রদান করেন ‘নারী ও সাহিত্য’ নিয়ে এক দীর্ঘ বক্তৃতা। এ ভাষণেই তিনি বলেন, ‘মুসলমান পুরুষেরাই এখনো বাংলা সাহিত্যের আসরে যথাযোগ্য স্থান অধিকার করতে পারেননি, মেয়েদের তো কথাই নেই।’ এখানেই তিনি সবচেয়ে গভীরভাবে স্মরণ করেন বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনকে। রোকেয়ার সাহিত্যকীর্তির পাশাপাশি তিনি সেদিন উল্লেখ করেন আরো অনেক মুসলিম নারী সাহিত্যিকের নাম—মিসেস সারা তৈফুর, মিসেস এম ফাতেমা খানম, মিসেস এম রহমান, সাজেদা খাতুন, মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকা, হোসনে আরা, জামশেদুন্নেসা, সৈয়দা জাহানারা, আনোয়ারা চৌধুরী এবং বিশেষভাবে কবি সুফিয়া এন হোসেনের (‘‌সাঁঝের মায়া’, ‘‌কেয়ার কাঁটা’) কথা। ভাষণের শেষদিকে তিনি মন্তব্য করেন, ২০ বছর আগেকার হেরেমের বন্দিনীরাই আজ শিক্ষায় ও সামাজিক ক্ষেত্রে প্রতিবেশী সমাজের জাগ্রত নারীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছেন, যদিও সাহিত্যে তাদের অবদান তখনো অপ্রতুল ছিল। এর মূল কারণ হিসেবে তিনি চিহ্নিত করেন শিক্ষার অভাবকেই। সে অভাব দূর করতেই তিনি নারী শিক্ষার ব্যাপারে ছিলেন সদা সতর্ক ও অগ্রণী।

প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থার বৃত্তের বাইরে গিয়ে জীবন ও সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে এগিয়ে নেয়ার কাজ কোনোকালেই সহজ নয়। নিষেধের পাহাড় কেটে কেটে তবু বেগম রোকেয়া, শামসুন নাহাররা আজকের নারীদের জন্য মৃসণ তল গড়েছেন। সেই সংগ্রামের অনন্য এক নারীর নাম হয়ে আজীবন স্মরণীয় হয়ে থাকবেন বেগম শামসুন নাহার মাহমুদ: বৃত্ত ভাঙার জীবন।

সাবরিনা স্বর্ণা: সহসম্পাদক, বণিক বার্তা

আরও