একদিন যার স্কুলে যাওয়ার পথ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, কয়েক বছর পর সে মেয়েই হয়ে উঠলেন অধ্যাপক, লেখক, নারী অধিকারকর্মী, আন্তর্জাতিক নারী সংগঠনের প্রতিনিধি এবং জাতীয় পরিষদের সদস্য। জীবনের শুরুতে যে সমাজ তার শিক্ষার পথ আটকে দিয়েছিল, পরবর্তী জীবনে সে সমাজেরই মেয়েদের শিক্ষার অধিকার, ভোটাধিকার ও আত্মমর্যাদার জন্য লড়াই করেছিলেন যিনি তিনি হলেন শামসুন নাহার মাহমুদ।
১৯০৮ সালে বৃহত্তর নোয়াখালীর ফেনী জেলার গুথুমা গ্রামে জন্ম। মাত্র ছয় মাস বয়সে পিতাকে হারিয়ে নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে বড় হতে হয়েছে তাকে। চট্টগ্রামের খাস্তগীর গার্লস হাই স্কুলে ভর্তি হয়েছিলেন শামসুন নাহার। সামাজিক অনুশাসনের ফলে বেশি দিন স্কুলে যাওয়া হয়নি তার। তখন সমাজে এমন ধারণা প্রচলিত ছিল, মেয়েদের বেশি পড়াশোনা করালে বিয়ের ক্ষেত্রে অসুবিধা হয়। সাধারণত এখানেই অনেক মেয়ের গল্পের সমাপ্তি ঘটে। কিন্তু শামসুন নাহারের গল্পের আসল শুরু এখান থেকেই। পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার জন্য অনশন করে বাড়ির লোকদের রাজি করান। নিজের এ প্রচেষ্টার ফলে ১৯২৬ সালে ম্যাট্রিক পাস করেন। ১৯২৭ সালে ডাক্তার ওয়াহিদউদ্দীন মাহমুদের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। বিয়ের পর তার উচ্চশিক্ষার সুযোগ আরো বিস্তৃত হয়। স্বামীর সহযোগিতায় কলকাতায় গিয়ে কলেজে ভর্তি হন এবং আইএ পাস করেন। সেখানে তিনি নারীদের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করেন। পরে প্রাইভেটে ডিস্টিংশনসহ বিএ এবং ১৯৪২ সালে এমএ পাস করেন। মুসলিম বিবাহিত নারীদের মধ্যে তিনিই প্রথম বিএ ও এমএ পাস করেন।
বেগম রোকেয়ার প্রথম উত্তরসূরি
বাংলার মুসলিম নারীর মুক্তির ইতিহাসে বেগম রোকেয়া যে দরজাটি খুলে দিয়েছিলেন, শামসুন নাহার মাহমুদ সে দরজা দিয়ে শুধু প্রবেশ করেননি সেটিকে আরো প্রশস্ত করার চেষ্টা করেছিলেন। বেগম রোকেয়া একবার শামসুন নাহার মাহমুদকে একটি চিঠি লিখেছিলেন। তখনো তাদের দেখা হয়নি। চিঠিতে রোকেয়া লিখেছিলেন—
তোমার সাথে তো আমার দেখা হয় নাই। কিন্তু আমি বিহার অঞ্চলে নদীপথে একদিন সন্ধ্যায় যাচ্ছিলাম। আস্তে আস্তে অন্ধকার হয়ে গেল। বনপথ একেবারে নির্জন, অন্ধকার নদীর পথে আমরা যাচ্ছি। তার মধ্যে মৃদু কেয়া ফুলের সৌরভ পেলাম। আমার মনে হলো, যেন তোমার সৌরভ—ওই রকম মৃদু কেয়া ফুলের মতো।
বিএ পাস করার পর বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস হাই স্কুল শামসুন নাহার মাহমুদের জন্য সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। অনুষ্ঠানে বেগম রোকেয়া যে বক্তৃতা দিয়েছিলেন সেখানে তিনি বলেছিলেন, তার ‘পদ্মরাগ’ উপন্যাসে তিনি কল্পনা করেছিলেন—একদিন মেয়েদের মধ্য থেকেই ব্যারিস্টার, ম্যাজিস্ট্রেট বেরিয়ে আসবে। শামসুন নাহার মাহমুদের অর্জন যেন সে কল্পনারই একটি বাস্তব রূপ। অর্থাৎ বেগম রোকেয়া যে মশাল জ্বেলেছিলেন, তা যেন শামসুন নাহার মাহমুদের মতো মেয়েদেরই মুক্তির জন্য। এ থেকে দেখা যায়, এক নারীর স্বপ্ন অন্য নারীর জীবন পেরিয়ে হয়ে উঠেছিল প্রজন্মের উত্তরাধিকার।
সাংবাদিকতায় শামসুন নাহার মাহমুদ
শামসুন নাহার মাহমুদের কলমের যাত্রা শুরু হয়েছিল বেশ অল্প বয়সেই। কিশোর পত্রিকা ‘আঙ্গুর’-এ প্রকাশ হয় তার প্রথম কবিতা। আইএ পড়ার সময়ই ‘নওরোজ’ ও ‘আত্মশক্তি’ পত্রিকার মহিলা বিভাগ সম্পাদনার দায়িত্ব নেন তিনি। পরে ১৯৩৩ সালে ভাই হবীবুল্লাহ বাহার চৌধুরীর সঙ্গে কলকাতা থেকে সম্পাদনা করেন ‘বুলবুল’। তৎকালীন মুসলিম সমাজে উচ্চমানের সাহিত্য ও সংস্কৃতিচর্চার এক গুরুত্বপূর্ণ সাময়িকী ছিল এটি। বুলবুলের পাতায় সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সমাজচিন্তার যে সম্মিলন ঘটেছিল, তা তৎকালীন মুসলিম বাঙালি মধ্যবিত্তের মানসজগতে নতুন আলোড়ন তৈরি করেছিল। এ পত্রিকায় নিয়মিত লিখতেন কবি কাজী নজরুল ইসলাম। রবীন্দ্রনাথও মুগ্ধ হয়ে লিখেছিলেন—
বুলবুল পত্রিকাখানা পড়ে আশান্বিত হলুম। সর্বনাশের উন্মত্ততার আত্মবিস্মৃত দেশের উন্মত্ত কোলাহলের মাঝখানে তোমরা শুভবুদ্ধির আহ্বান নির্ভয়ে ঘোষণা করো। ঈশ্বরের প্রসন্নতা তোমাদের উদ্যোগকে গৌরবান্বিত করবে।
বিখ্যাত সাহিত্যিক ও সমালোচক অন্নদাশঙ্কর রায়ের মন্তব্যও উল্লেখযোগ্য। তিনি বলেছিলেন, ‘বিদগ্ধ মুসলমানের চিত্ত কোথাও এমন ক’রে স্ফূর্ত হতে দেখিনি। দেশের এই বেদনার্ত ক্ষণে এর আবির্ভাব ইতিহাসে স্থান লাভ করবে।’
শিক্ষকতা ও সাহিত্যচর্চা
শামসুন নাহারের কর্মজীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল শিক্ষকতা। লেডি ব্রাবোর্ন কলেজে বাংলা বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে তার অধ্যাপনা জীবনের শুরু। পরবর্তী সময়ে ইডেন গার্লস কলেজেও শিক্ষকতা করেন। নিজের শিক্ষাজীবনের পথে যে বাধাগুলো তাকে অতিক্রম করতে হয়েছিল, শিক্ষক হিসেবে তিনি যেন সে বাধার বিপরীতে দাঁড়িয়ে নতুন প্রজন্মের মেয়েদের সামনে শিক্ষার আরো বিস্তৃত দিগন্ত খুলে দিতে চেয়েছিলেন।
তার লেখালেখির পরিসর ছিল বিস্তৃত। ‘পুণ্যময়ী’, ‘ফুলবাগিচা’, ‘বেগম মহল’, ‘রোকেয়া জীবনী’, ‘শিশুর শিক্ষা’, ‘আমার দেখা তুরষ্ক’, ‘নজরুলকে যেমন দেখেছি’—বইগুলোর মধ্য দিয়ে কখনো সাহিত্য, কখনো নারীজীবন, কখনো শিশু, কখনো ভ্রমণ, আবার কখনো ব্যক্তিত্বের স্মৃতিচিত্র উঠে এসেছে।
সমাজসংস্কারে শামসুন নাহার মাহমুদ
শামসুন নাহার মাহমুদের সমাজসংস্কারের ভাবনা কেবল নারীশিক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, নারীকে সমাজের সক্রিয় ও অধিকারসম্পন্ন সদস্য হিসেবে প্রতিষ্ঠাই ছিল তার বৃহত্তর লক্ষ্য। অর্থাৎ নারীকে শুধু শিক্ষিত করলেই হবে না, রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায়ও তার কণ্ঠ থাকতে হবে। এ উদ্দেশ্যে তিনি নিখিল বঙ্গ মুসলিম মহিলা সমিতি ও নিখিল ভারত মহিলা সম্মেলনের মতো সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নারীশিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাল্যবিবাহ, ভোটাধিকার ও সামাজিক মর্যাদার মতো নানা প্রশ্নে কাজ করেন। ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন সংস্কার আইনের পর নারীদের ভোটাধিকারের প্রশ্নটি সামনে আসে। নারীদের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে তার অংশগ্রহণ ছিল অত্যন্ত সক্রিয়। ১৯৩৬ সালে বাংলার নারীদের প্রতিনিধি হিসেবে কলকাতা কাউন্সিল হাউজে ডেলিমিটেশন কমিটির সামনে তিনি সাক্ষ্য দেন এবং নারীদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের পক্ষে জোরালো বক্তব্য রাখেন।
বিশ্বমঞ্চে শামসুন নাহার মাহমুদ
১৯৫২ সালে পাকিস্তান শুভেচ্ছা মিশনের ডেপুটি লিডার হিসেবে তুরস্কে রওনা হন শামসুন নাহার মাহমুদ। তুরস্কের স্বাধীনতা সংগ্রাম, বিশেষত নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও পরবর্তী সময়ে শিক্ষা-কর্মক্ষেত্রে তাদের প্রতিষ্ঠা তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। একই সফরে মধ্যপ্রাচ্যের শাতিল আরব, দজলা-ফোরাত, ইরান ও বাগদাদ তাকে মুসলিম ইতিহাস ও সভ্যতার অতীত গৌরবের মুখোমুখি করে। এ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিয়েই রচনা করেন ‘আমার দেখা তুরস্ক’ গ্রন্থটি।
১৯৫৫ সালে কলম্বোয় আন্তর্জাতিক মহিলা মৈত্রী সংঘের সুবর্ণজয়ন্তী সম্মেলনে তিনি পাকিস্তানি প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন এবং এশিয়ার প্রতিনিধি হিসেবে নারীশিক্ষা নিয়ে বক্তব্য রাখেন। বিভিন্ন দেশের নারীদের সঙ্গে মতবিনিময়ের মাধ্যমে তিনি নারীশিক্ষা ও নারীর সামাজিক অবস্থান সম্পর্কে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা অর্জন করেন।
১৯৫৬ সালে বেগম শামসুন নাহার চার মাস কাল আমেরিকা ও ইউরোপ সফর করেন। যুক্তরাষ্ট্র সরকারের আমন্ত্রণে আমেরিকার পূর্ব থেকে পশ্চিম প্রান্ত পর্যন্ত প্রায় বিশটি শহর ও গ্রাম সফরকালে তিনি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, স্কুল, হাসপাতাল, নার্স সমিতি, আন্তর্জাতিক মহিলা সমিতি, রেডক্রস সোসাইটি, গার্ল গাইডস অ্যাসোসিয়েশন, সংবাদপত্রের অফিস, ছাপাখানা, কারাগার, কিশোর অপরাধীদের বিচারালয়, ফলের চাষ প্রভৃতি ছাড়াও আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ও নির্বাচনী প্রচারণা প্রত্যক্ষ করার সুযোগ লাভ করেন। তিনি জাতিসংঘের বিভিন্ন শাখার কার্যপদ্ধতি পর্যবেক্ষণ করেন। সুয়েজ সংকটের সময় তিনি নিউইয়র্কে জাতিসংঘের বিশেষ অধিবেশনে এবং লন্ডনে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের অধিবেশনে দর্শক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। হয়। আমেরিকা থেকে ফেরার পথে তিনি লন্ডন, প্যারিস ও রোম সফর করেন।
আমেরিকা সফরে তার দৃষ্টিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে নারীর কর্মজীবন ও সামাজিক অংশগ্রহণ। এসব অভিজ্ঞতা তাকে উপলব্ধি করতে সাহায্য করে, নারীর শিক্ষা ও কর্মক্ষমতাকে সমাজের বৃহত্তর কাজে যুক্ত করা গেলে নারী কেবল নিজের জীবনই বদলায় না, সমাজ ও রাষ্ট্রের অগ্রগতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশগ্রহণ
‘আমার একটা কাজ বাকি রইল, তোকে ম্যাট্রিক পাস করানো’—কথাটি বলেছিলেন শামসুন নাহার মাহমুদের নানা। সেদিন হয়তো তিনি ভাবতেই পারেননি, তার এ আদরের নাতনি শুধু ম্যাট্রিক পাস করেই তৃপ্ত হবেন না, অদূরভবিষ্যতে রাষ্ট্র পরিচালনায়ও অংশগ্রহণ করবেন। বেগম মাহমুদ ১৯৬২ সালের ২৯ মে জাতীয় পরিষদের ৭৭ নং সংরক্ষিত আসন থেকে নির্বাচনে জয়লাভ করে জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। পরিষদের প্রথম বৈঠকে যোগদানের জন্য রাওয়ালপিন্ডি পৌঁছলে সাংবাদিকের প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘বাস্তব কর্মে আমি বিশ্বাসী, বক্তৃতায় আমি বিশ্বাস করি না। আমি সবসময় আমার দেশের উন্নতির জন্য আমার যথাসাধ্য করে যাব।’ সংসদে নারী সদস্যদের কথা বলার সুযোগ নিশ্চিত করা, নারীশিক্ষার প্রসার, পরিবার ও বিবাহ আইনের সঠিক বাস্তবায়ন এবং প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় তিনি ছিলেন অত্যন্ত সোচ্চার। ১৯৬২ সালের বন্যায় ঢাকা শহরের বিভিন্ন রিলিফ ক্যাম্প সরজমিনে পরিদর্শন করে দুর্গতদের পর্যাপ্ত খাদ্য ও রেশন নিশ্চিত করতে তিনি প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেন। সার্বিকভাবে, সমাজকল্যাণ, নারী জাগরণ ও মানবসেবায় তাঁর নিষ্ঠাপূর্ণ কাজ রাজনীতিকে দেশের সেবায় প্রয়োগের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।
শিক্ষার আলো জ্বালানো থেকে নারীর অধিকার ও রাষ্ট্র পরিচালনার পরিসরে পৌঁছানো শামসুন নাহার মাহমুদের জীবন এক দীর্ঘ সামাজিক জাগরণের আখ্যান। নারী জাগরণে তার অবদানের প্রতি শ্রদ্ধার স্মারক হিসেবে তার নামে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে দুটি ছাত্রী হল। সমাজসেবায় তার অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ স্বাধীন বাংলাদেশে তাকে ১৯৮১ সালে মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করা হয় এবং ১৯৯৫ সালে মরণোত্তর বেগম রোকেয়া পদকে সম্মানিত করা হয়। তার জীবনের শুরুটা ছিল একটি বন্ধ দরজা দিয়ে, শেষ পর্যন্ত তার নিজের জীবনই হয়ে উঠেছিল অসংখ্য নারীর জন্য দরজা খুলে দেয়ার গল্প।
ডেইজি আক্তার: সহসম্পাদক, বণিক বার্তা