ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য যেন আজ তিতাস পাড়ের ‘পরস্তাব’

ব্রাহ্মণবাড়িয়া সিনেমা হলেই আমি প্রথম সুচিত্রা-উত্তমের সাগরিকা, সবার ওপরে ইত্যাদি ছবি দেখি। ছবি দেখা ছাড়াও ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে আমরা কৃষি শিল্প প্রদর্শনী দেখতে যেতাম। —পুরানো সেই দিনের কথা, আকবর আলি খান

আজকের দিনে ব্রাহ্মণবাড়িয়া নামটি শুনলেই কিছু দৃশ্য চোখের সামনে ভাসে। কিছু বিষয়, খবরের শিরোনাম মনে পড়ে যায়। এর মধ্যে থাকে দুই গ্রামের মধ্যে মারামারি, সিনেমার শো বন্ধের খবর। অবশ্য বাংলাদেশ কেন, সারা বিশ্বেই এই রকম আঞ্চলিক দ্বন্দ্বের চর্চা আছে। তবে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যেন ক’দিন পর পরই এসব ঘটে। অথচ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ইতিহাসে চোখ বোলালে দেখা যায়, এ জেলাই জন্ম দিয়েছে বাংলাদেশের বহু সংগীতজ্ঞ, শিল্পী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। এমনকি জেলাটি ছিল সংস্কৃতির পীঠস্থান।

তিতাস নদের পলিতে গড়া ব্রাহ্মণবাড়িয়া। এই জেলারই সন্তান অদ্বৈত মল্লবর্মণ লিখেছিলেন ‘তিতাস একটি নদীর নাম’। সে উপন্যাসে আছে তিতাস পাড়ের মানুষের জীবনের গল্প। পড়তে গিয়ে সেখানে পাওয়া যায় নানা লোকাচার, উৎসব আর পরস্তাব (দীর্ঘ সময় ধরে প্রচলিত আখ্যানকেন্দ্রিক লোকগল্প, যা হয়ত এখন রূপকথা মনে হয়) কথা। আছে যাত্রা, পালাগান, পুথি পাঠ, নৌকা বাইচের দীর্ঘ ঐতিহ্য। এ জেলারই সন্তান ভুবনবিখ্যাত সংগীতকার ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ, আলী আকবর খাঁ, বিপ্লবী উল্লাসকর দত্ত, লোকসংগীতশিল্পী অমর পাল, শিল্পী সৈয়দ আবদুল হাদী, অভিনেত্রী ডলি জহুর থেকে একালের অভিনেতা শরিফুল রাজ, অভিনেত্রী জাকিয়া বারী মম, সাবরিনা পড়শী প্রমুখ।

পূর্ব বাংলার সংস্কৃতির অন্যতম কেন্দ্র ছিল ব্রাহ্মণবাড়িয়া। উত্তরে হাওর, পূর্বে ত্রিপুরা, পশ্চিমে ঢাকা ও বিক্রমপুর নিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অবস্থান। ১৭৯০ খ্রিস্টাব্দে ত্রিপুরা জেলা গঠিত হলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া এ জেলার অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দের ১ অক্টোবর ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা ও চাঁদপুর মহকুমা নিয়ে গঠিত হয় কুমিল্লা জেলা। ১৯৮৪ সালে মহকুমা থেকে জেলায় উন্নীত হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়া।

কিন্তু ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ইতিহাস তো আরো পুরনো। বলা হয় শান জাতির বংশ থেকে আসা উত্তরপুরুষ প্রথমে এ অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে। হিন্দু পুরাণ অনুসরণ করলে চন্দ্রবংশীয় রাজাদের সংযুক্তি পাওয়া যায়। এ অঞ্চলে মাটির নিচে পাওয়া গেছে নারায়ণ মূর্তি। আছে বেশকিছু মন্দির। সুলতানি আমলে সারা বদ্বীপের মতোই ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়ও মুসলিমদের সংখ্যা বেড়েছিল। মোগল আমলে বাংলায় প্রতিরোধ গড়ে তোলা বারোভূঁইয়াদের প্রধান ঈশা খাঁর জন্ম ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে বলে অনেক ইতিহাসবিদের মত। অর্থাৎ, বিভিন্ন কালপর্বে ব্রাহ্মণবাড়িয়া নানাভাবে পরিবর্তিত হয়েছিল। সেই সঙ্গে বদলে গেছে অঞ্চলটির সংস্কৃতি ও তার চর্চা।

নিকট অতীতে তাকানো যাক। নিকট বলতে তাও দেড়শ বছর আগের কথা। ১৯৭২ সালে বাংলার আদমশুমারি অনুসারে নবীনগর থানায় মোট জনসংখ্যার ৭১ দশমিক ৩ শতাংশ ছিল মুসলিম এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া মহকুমার মোট জনসংখ্যার ৫৩ দশমিক ৩৭ শতাংশ ছিল মুসলিম। নবীনগরের রসুল্লাবাদ গ্রামের ছেলে বাংলাদেশের বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ ড. আকবর আলি খান। আত্মজীবনী ‘পুরানো সেই দিনের কথা’য় তিনি এ প্রসঙ্গে লিখেছেন, ‘১৯৪৭ সাল পর্যন্ত এখানে প্রায় ২০ শতাংশ লোক হিন্দু ছিল। এই হিন্দুদের মধ্যে কিছু অভিজাত পরিবার যথা (পাল, আচার্য) ইত্যাদি উচ্চবর্ণের পরিবার ছিল, বাকি সবাই ছিল নিম্নবর্ণের হিন্দু।’

নবীনগরে একটা সময় হিন্দুদের সংখ্যা বেশি ছিল এ কথা বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদও বলেছেন। তিনি আরো জানাচ্ছেন যে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শিক্ষা বিস্তারেও তাদের অবদান আছে। ‘গভর্নরের স্মৃতিকথা’য় তিনি লেখেন, ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলায় হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনের সংখ্যা ছিল অনেক। তাদের মধ্যে বেশকিছু অভিজাত পরিবার ছিল। তারা ওই অঞ্চলে কিছু ভালো বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তার মধ্যে নবীনগর উচ্চবিদ্যালয় অন্যতম। এলাকায় নিম্নবর্ণের হিন্দুর সংখ্যাও নেহাত কম ছিল না। আর তাদের বেশির ভাগই ছিল জেলে, কুমার ও তাঁতি সম্প্রদায়ভুক্ত।’

অঞ্চলটির একাধিক ব্যক্তি নবাব উপাধি পাওয়া মুসলিমও ছিলেন। সালেহউদ্দিন লেখেন, ‘নবীনগর অবশ্য একটি বিশেষ কারণে বিখ্যাত। তা হলো এখানে বেশ কয়েকজন ‘নবাব’ উপাধিপ্রাপ্ত মুসলমান ছিলেন। যেমন নবাব মোশাররফ হোসেন, নবাব স্যার কেজিএম ফারুকী প্রমুখ। সংগীতজগতের অনন্যসাধারণ প্রতিভা ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর জন্মও নবীনগর উপজেলার শিবপুর গ্রামে। ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর পরিবারের সবাই সংগীতজগতের এক একজন দিকপাল।’

তাহলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শিক্ষার কী অবস্থা ছিল? ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠা হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়া উচ্চ বিদ্যালয়। ১৮৭৫ খ্রিস্টাব্দে অন্নদা উচ্চ বিদ্যালয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কলেজ প্রতিষ্ঠা হয় ১৯৪৮ সালে। লক্ষ করার মতো একটি বিষয় হলো, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বিখ্যাত কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও নেই। বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ার আগে রংপুরে কারমাইকেল, বগুড়ায় আজিজুল হক, বরিশালে বিএম, খুলনায় বিএল, সিলেটে এমসি কলেজ ছিল উচ্চ শিক্ষার কেন্দ্র। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সে রকম কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখনো নেই। ওই অঞ্চল থেকে যারাই উচ্চ শিক্ষিত হয়েছেন তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন বা পরবর্তীতে অন্যত্র গিয়ে শিক্ষা লাভ করেছেন।

উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান না থাকলেও নিজস্ব সংস্কৃতি ছিল ব্রাহ্মণবাড়িয়ার। এ জেলায় নিয়মিত কবিগানের আসর বসত একসময়। এছাড়া কবিতা, লোককবিতা, ভাটকবিতা জনপ্রিয় ছিল। একটা সময় পুথি সাহিত্য ও পুথি পাঠেও নিয়মিত ছিল ব্রাহ্মণবাড়িয়া।

নবীনগরে পুথি পাঠের পারিবারিক রীতি ছিল বলে ধারণা করা হয়। পরিবারের এক সদস্য থেকে অন্য সদস্যের কাছে পুথি পাঠের উত্তরাধিকার যেত। বাংলা একাডেমি প্রকাশিত ‘লোকজ সাহিত্য গ্রন্থমালা’র ব্রাহ্মণবাড়িয়া বইটিতে বলা হয়েছে ১৯৮৮ খ্রিস্টাব্দে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পুথি পাঠের প্রতিযোগিতার ইতিহাস আছে। নবীনগড় পূর্ব পাড়ে হজরত করিম শাহর (র.) মাঠে ওই বছর পুথি পাঠের প্রতিযোগিতা আয়োজিত হয়েছিল। অনুষ্ঠানে আটটি দল অংশ নিয়েছিল। পুথি পাঠের বিষয় ছিল ‘সয়ফুল মূলক বদিউজ্জামান’।

আটের দশকে নবীনগরে পুথি পাঠের প্রতিযোগিতা বসায় মনে হতে পারে ব্রাহ্মণবাড়িয়া অনাধুনিক ছিল। কিন্তু বিষয়টা মোটেও তেমন না। মজার ব্যাপার, পঞ্চাশের দশকেও ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে ছিল সিনেমা হল এবং সেখানে নিয়মিত সিনেমা দেখতেন শহরের মানুষ। পাশাপাশি শহরের বাইরে থেকেও অনেকে সিনেমা দেখতেন। আকবর আলি খান পঞ্চাশের দশকের কথাই বলেছেন।

সে কথার প্রতিধ্বনি পাওয়া যায় সংগীতশিল্পী সৈয়দ আব্দুল হাদীর বয়ানেও। স্মৃতিকথা ‘জীবনের গান’-এ তিনি লিখেছেন, ‘টাউন হল এলাকাটা ছিল শহরের কেন্দ্রস্থলে। সেখানেই একটি ছোট্ট পার্কমতো ছিল। বন্ধুকে নিয়ে প্রায় বিকালেই সেখানে আড্ডা দিতে আসতাম। পার্কের উল্টো দিকে একটি সিনেমা হল, সেখানে প্রায়ই সিনেমা দেখতাম। এখানেই অগ্নিপরীক্ষা সিনেমাটি দেখেছিলাম।’

সৈয়দ আব্দুল হাদীর স্মৃতিকথায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আরো অন্তরঙ্গ চিত্র পাওয়া যায়। তিনি জানাচ্ছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সে সময় বাদ্যযন্ত্রের দোকানও ছিল। দোকানটি ছিল বাদ্যযন্ত্র নির্মাতা ও সংগীত শিক্ষক ওস্তাদ ইসরাইল খাঁর। এছাড়া সংগীত সংসদ নামে একটি ক্লাব ছিল। সৈয়দ আব্দুল হাদী লিখেছেন, ‘সে সময় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শিল্পী, সাহিত্যিক, সংস্কৃতিপ্রেমীদের মিলন কেন্দ্র ছিল ‘সংগীত সংসদ’ নামে একটি ক্লাব। সন্ধ্যার পর সেখানে শহরের নামকরা সব সংগীতশিল্পী, সমঝদারেরা আসর বসাতেন।’

এদিকে ড. আকবর আলি খান জানাচ্ছেন নবীনগরে পঞ্চাশের দশকে থিয়েটারও হতো। ছিল হিন্দু-মুসলিম সহাবস্থানও। আমীর আলী খাঁ সম্পর্কে লিখতে গিয়ে প্রাসঙ্গিক এসব কথা উল্লেখ করেছেন তিনি। আকবর আলি খান লিখেছেন, ‘মুসলিম লীগের নেতা হওয়া সত্ত্বেও নবীনগরের হিন্দুদের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত সম্পর্ক খুবই ভালো ছিল। তাদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তিনি যোগ দিতেন। হিন্দুদের উদ্যোগে সে সময়ে নবীনগরে নাটক মঞ্চস্থ হতো। কোনো কোনো থিয়েটারে তিনি অংশগ্রহণ করেছেন।’

থিয়েটার আসলে একদিনে আসেনি। এককালে নবীনগর ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হিন্দু জমিদাররা ঢাকা থকে বাঈজি নিয়ে নাচাতেন বলে উল্লেখ করেছেন ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। বিষয়টি তিনি নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখেছেন। কিন্তু যাত্রাতে এই জমিদারদের অবদান আছে এবং বিষয়টি তিনি ইতিবাচকভাবে প্রকাশ করে লেখেন, ‘অপরপক্ষে নবীনগরে যাত্রাগান শুনিয়াছি। ‘প্রহ্লাদ চরিত্র’, ‘ধ্রুব’ ও ‘প্রবীর-পতন’—যাত্রাগান শুনিয়া আমি মুগ্ধ হইয়াছিলাম।...কবিগানের প্রচলন ছিল, হরি আচার্যের কবির দল বিখ্যাত ছিল। তাহারা যদিও শিক্ষিত ছিল না, তাহারা ছিল স্বভাবকবি কিন্তু দুঃখের বিষয় আজকাল এই কবিগানের প্রচলন কমিয়া আসিয়াছে।’

পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে নবীনগরে যাত্রা ও থিয়েটার দুটিই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। পূজার সময়ে প্রতি বছর পেশাদার ব্যক্তিরা থিয়েটার করতেন। পেশাদার থিয়েটারে নবীনগরের দেওয়ানি আদালতের উকিলরা অংশ নিতেন। এছাড়া স্কুলের শিক্ষক এবং হিন্দু ভদ্রলোকেরাও অংশ নিতেন বলে জানান আকবর আলি খান। অর্থাৎ শিক্ষিত মধ্যবিত্তের অংশগ্রহণ ছিল সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে।

অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে সত্তরের দশক পর্যন্ত ব্রাহ্মণবাড়িয়া সাংস্কৃতিক চর্চায় বেশ আধুনিক ছিল। তাহলে কি স্বাধীনতার পর থেকে ধীরে ধীরে তা কমে গেল?

এখানে কয়েকটি বিষয় লক্ষ করার মতো। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বরাবরই দুই ধরনের মানুষ ছিল। একটা অংশ সাংস্কৃতিক, উদার। আরেকটি অংশ অনুদার এবং সেটা বেশ আগে থেকেই। এর প্রমাণ মেলে সৈয়দ আব্দুল হাদীর স্মৃতিচারণে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় একটি স্কুলের আয়োজনে গান গাইতে পাঠানো হয়েছিল তাকে। সেখানে তারা মঞ্চে অপেক্ষা করছিলেন। হাদী লেখেন, ‘রাত প্রায় ৯টার দিকে হারিকেন বাতি হাতে মানুষজন এসে জড়ো হতে লাগল। স্কুলঘরের ভেতরেই চৌকি দিয়ে মঞ্চ তৈরি করা হয়েছে। একজন গান ধরেছেন মাত্র এমন সময় দেখতে পেলাম দরজার বাইরে আয়োজকেরা দ্রুত আমাদের নেমে আসার জন্য ইশারা করছেন। আমরা ব্যাপারটি ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না। কিছুক্ষণের মধ্যে দূর থেকে একটি হইচই এগিয়ে আসছে মনে হলো। আয়োজকদের একজন মঞ্চে উঠে এসে আমাদের প্রায় টেনেহিঁচড়ে এনে বললেন, “‍দৌড়ান”। ওদের পেছন পেছন মাইলখানেক খেতখামার পার হয়ে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে এসে থামলাম। হাঁপাতে হাঁপাতে জিজ্ঞেস করলাম—“‍কী ব্যাপার?” তারা বললেন, “‍আর একটু দেরি হলেই প্রাণ নিয়ে আর ফিরতে হতো না।” গানবাজনা নামক “‍বেশরিয়তি” কাজ করার দায়ে প্রাণ যেত।’

সৈয়দ আব্দুল হাদীও ষাটের দশকের কথাই বলছেন। অর্থাৎ সে সময়ও অনুদার জনগোষ্ঠী ছিল এবং তারা সাংস্কৃতিক আয়োজনে বাধা দিত। কালের পরিক্রমায় এ বিষয়গুলো বেড়েছে। এর কারণ বহুমুখী।

ইতিহাস ও পরিবর্তনের গতিপথ পর্যালোচনা করে দেখা যায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যে সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল ছিল, পরবর্তীতে তার বিকাশ ঘটেনি। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে জেলাটিতে কোনো বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নেই। ওই অঞ্চলের কৃতী ব্যক্তিরাও আদতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে সমৃদ্ধ হননি। তারা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সন্তান তবে খ্যাতি পেয়েছেন অন্যত্র গিয়ে। তারা কেউই বলতে গেলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ফিরে যাননি। সেখানে ব্যক্তি বা সরকারি উদ্যোগে তৈরি হয়নি কোনো সাংস্কৃতিক সংগঠন। ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর স্মৃতিতে তৈরি ‘দি আলাউদ্দিন সংগীতাঙ্গন’-এর জীর্ণ দশা বহুকাল ধরে। তিতাস লতিতকলা একাডেমি ও শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ স্মৃতি পাঠাগারেরও তথৈবচ অবস্থা। এগুলো নিয়ে কেউ মাথা ঘামায়নি। ফলে জেলাটি দিনে দিনে সাংস্কৃতিকভাবে শূন্যতায় পড়েছে। সেই জায়গা দখল করেছে অনুদার মনোভাব।

আকবর আলি খান, সৈয়দ আব্দুল হাদীরা পঞ্চাশের দশকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে সিনেমা দেখলেও এখন সেখানে কোনো সিনেমা হল নেই। ২০০০-পরবর্তী সময়ে বাংলা সিনেমায় অশ্লীলতার কারণে স্থানীয় জনতা সিনেমা হল বিমুখ হয়। ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায় সিনেমা হল। এর আগে থেকেই কমে গিয়েছিল নাটক, সিনেমা, গানের চর্চা। যাত্রা তো প্রযুক্তির কাছে আগেই মার খেয়েছিল। তিতাসের বুকে নৌকাবাইচেরও আগ্রহ নেই তরুণদের। আয়োজন করতে গেলে আসে বাধা। ষাঁড়ের লড়াই আয়োজন করতেন এলাকার জমিদার শ্রেণীর মানুষ। তারাও নেই।

ষাঁড়, মোরগের লড়াই ছোট পরিসরে হয়ে ওঠে জুয়ার আখড়া। পুথি, ভাটকবিতা শোনা বা পুতুলনাচ দেখার মানুষ নেই। এছাড়া বড় ও প্রভাবশালী উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান না থাকায়ও মানুষের মধ্যে বড় পরিসরে কোনো কিছু দেখা বা চিন্তা করার মানসিকতা তৈরি হয়নি। পুরনো ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখা বা তা নতুন ধারায় নতুন প্রজন্মের কাছে উপস্থাপন করারও কোনো উদ্যোগ নেই। ব্রাহ্মণবাড়িয়া তাই নিজের সংস্কৃতিই হারিয়েছে, হারাচ্ছে।

মাহমুদুর রহমান: লেখক ওসাংবাদিক

আরও