অদ্বৈত মল্লবর্মণের ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ উপন্যাসে তিতাস যেন নিছক একটি নদী নয়; সে এক জীবন্ত সত্তা, যার স্রোতের সঙ্গে মিশে আছে মানুষের জীবন, স্বপ্ন, বেদনা আর অস্তিত্বের গল্প। সে তিতাস যখন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মাটি ছুঁয়ে এগিয়ে যায়, তখন তার স্রোত শুধু পলি আর জল বহন করে না, বয়ে নিয়ে চলে একটি জনপদের বহু শতকের স্মৃতি।
মানচিত্রে ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে দেখলে প্রথমেই চোখে পড়ে নদী ও জলাভূমিতে গড়ে ওঠা এক ভূখণ্ড। পশ্চিমে মেঘনা, বুকের ভেতর দিয়ে তিতাসের প্রবাহ, পূর্ব দিগন্তে ত্রিপুরার পাহাড়ি প্রান্তর—এ বৈচিত্র্যময় ভূগোল যুগের পর যুগ এখানকার মানুষের জীবন, জীবিকা, যোগাযোগ ও বসতির ধরনকে প্রভাবিত করেছে। আজকের প্রশাসনিক মানচিত্রে ১৯৮৪ সালে স্বতন্ত্র জেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা এ ভূখণ্ডের ইতিহাস তার চেয়ে বহু পুরনো। প্রাচীন সমতটের সাংস্কৃতিক পরিসর থেকে মধ্যযুগের সরাইল, ঈসা খাঁর রাজনৈতিক উত্থান, ঔপনিবেশিক শাসনের প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ—সময়ের প্রতিটি বাঁক এ জনপদের মাটিতে কোনো না কোনো চিহ্ন রেখে গেছে। নদীর গতিপথের মতোই যার পরিচয়ও সময়ের সঙ্গে বদলেছে, কিন্তু অতীতের কোনো স্তর পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। তিতাসের স্রোতের মতো সে ইতিহাসও বয়ে চলেছে এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে, এক জনপদ থেকে আরেক সময়ের দিকে।
স্থানীয় জনগণের মুখে ‘বাউনবাইরা’ অথবা সংক্ষেপে ‘বি-বাড়িয়া’ নামে পরিচিত হয়ে উঠলেও ব্রাহ্মণবাড়িয়া নামটির উৎপত্তি নিয়ে একাধিক মত প্রচলিত। একটি মত অনুসারে, সেন রাজাদের শাসনামলে এ অঞ্চলে অভিজাত ব্রাহ্মণ প্রায় ছিল না বললেই চলে। ফলে পূজা-অর্চনা করতে সমস্যার মুখোমুখি হতে হতো। এ সংকট নিরসনের লক্ষ্যে রাজা লক্ষ্মণ সেন কনৌজের কান্যকুব্জ থেকে কয়েকটি ব্রাহ্মণ পরিবারকে এনে এ অঞ্চলে বসতি স্থাপন করান। শহরের বর্তমান মৌলভীপাড়ার আশপাশে গড়ে ওঠে তাদের বসতবাড়ি। সেই ‘ব্রাহ্মণদের বাড়ি’ থেকেই ধীরে ধীরে এ অঞ্চলের নাম হয়ে ওঠে ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া’।
ত্রিপুরা পাহাড়ের ছায়া আর মেঘনার উত্তাল জলরাশির মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা প্রাচীন ও সমৃদ্ধ জনপদ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ইতিহাসের প্রথম অধ্যায় খুঁজতে গেলে বর্তমান জেলার নামের কাছে থামলে চলবে না। যেতে হবে আরো পেছনে, হাঁটতে হবে প্রাচীন জনপদগুলোর পথ ধরে। বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকা প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের মাধ্যমে প্রমাণ হয় যে প্রাচীন বাংলার ভূগোলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ছিল সমতট জনপদের অন্তর্ভুক্ত। কুমিল্লার ময়নামতির প্রাচীন বৌদ্ধ সভ্যতার সীমানা বর্তমান ব্রাহ্মণবাড়িয়া পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।
বিশ শতকের প্রথম দিকে নবীনগরের বাজাউড়া গ্রামের একটি প্রাচীন জলাশয় খননের সময় আবিষ্কার হয়েছিল একটি বিষ্ণুমূর্তি। মূর্তির পাদদেশের লিপি থেকে জানা যায়, নৃপতি মহীপাল দেবের রাজত্বের তৃতীয় বছরে সমতট রাজ্যের অন্তর্গত বিলকেন্দুয়াই গ্রামের লোকনাথ নামের এক বৈষ্ণব বণিক তার মা-বাবা ও নিজের পুণ্যফল বাড়ানোর জন্য মূর্তিটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। চম্পকনগর, হরষপুরের মতো স্থানের নাম ও নিদর্শনও সে বহুস্তরীয় অতীতের স্মৃতি বহন করে। এ ইতিহাসের কেন্দ্রে এক আলোকবর্তিকা হয়ে বরাবরই উজ্জ্বল ভূমিকা পালন করেছে ঐতিহাসিক ‘সরাইল’।
সরাইলের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয় ষোলো শতকে। তখনই এ ভূখণ্ড হয়ে উঠেছিল আঞ্চলিক ক্ষমতা, জমিদারি ও সামরিক প্রতিরোধের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। সে ইতিহাসের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যার নাম জড়িয়ে আছে, তিনি হলেন বারোভূঁইয়াদের প্রধান ও সবচেয়ে প্রভাবশালী ঈসা খাঁ।
১৫২৯ সালে ঈসা খাঁ জন্মগ্রহণ করেন সরাইল পরগনায়। তার পিতামহ রাজপুত বংশোদ্ভূত হয়ে ভাগীরথ অযোধ্যা থেকে বাংলায় আসেন এবং বাংলার সুলতান গিয়াসউদ্দিন মাহমুদ শাহের অধীনে দেওয়ানের দায়িত্ব লাভ করেন। তার পুত্র কালিদাস গজদানী পরবর্তী সময়ে ধর্মান্তরিত হয়ে সোলায়মান খাঁ নাম গ্রহণ করেন এবং সুলতান গিয়াসউদ্দিন মাহমুদ শাহর কন্যা সায়েদা মোমেনা খাতুনকে বিয়ে করেন। এ বিয়ের ফলে সুলতানের কাছ থেকে তিনি সরাইল পরগনা ও পূর্ব মোমেনশাহির জমিদারি লাভ করেন। নিজের জমিদারিকে স্বাধীনভাবে পরিচালনার পাশাপাশি সরাইলকে তিনি গড়ে তোলেন প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে। কিন্তু তার স্বাধীন অবস্থান বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। পাঠানদের সঙ্গে যুদ্ধে সোলায়মান খাঁ পরাজিত ও নিহত হন। তার দুই পুত্র ঈসা ও ইসমাইল বন্দি হন এবং ইরানি বণিকদের কাছে বিক্রি হয়ে যান। কিছুকাল অতিবাহিত হওয়ার পর চাচা কুতুব খানের উদ্যোগে ঈসা খাঁ ও তার ভাই মুক্তি পান এবং চাচার সহায়তায় ঈসা খাঁ সরাইলের জমিদারি পুনরুদ্ধার করেন।
এ প্রত্যাবর্তনই সরাইলের ইতিহাসকে নতুন মোড় দেয়। ষোলো শতকের দ্বিতীয়ার্ধে বাংলায় আফগান ও মোগল শক্তির দ্বন্দ্ব যখন তীব্র হয়ে উঠছে, তখন ঈসা খাঁ সরাইলকে ভিত্তি করে নিজের ক্ষমতা সুসংহত করেন। তাজ খান কররানীর মৃত্যুর পর তিনি আফগান শাসকদের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে মোগল আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। সরাইল তখন আর শুধু একটি পরগনা নয়, এটি হয়ে ওঠে ভাটি বাংলার রাজনৈতিক প্রতিরোধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূখণ্ড।
রাজনীতি ও সামরিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি এ অঞ্চলে গড়ে উঠেছিল নিজস্ব অর্থনৈতিক ও কারুশিল্পের ঐতিহ্য। বিশেষ করে মসলিন বস্ত্র উৎপাদনের সঙ্গে সরাইলের যে সম্পর্কের উল্লেখ পাওয়া যায়, তা এ জনপদের ইতিহাসকে আরো বিস্তৃত করে। উনিশ শতকের শেষভাগে প্রকাশিত ডব্লিউ ডব্লিউ হান্টারের A Statis tical Account of Bengal গ্রন্থে সরাইলে ‘তানজেব’ নামে এক ধরনের অত্যন্ত সূক্ষ্ম মসলিন তৈরির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সরাইলের রাজনৈতিক পরিচয় বদলেছে, বদলেছে তার প্রশাসনিক সীমানাও। সেই সঙ্গে বদলে গেছে প্রতিরোধের প্রয়োজন ও ধরনও।
বাঙালির অধিকার আদায় থেকে শুরু করে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ অর্জনের প্রতিটি ঐতিহাসিক অধ্যায়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শুরুতেই রাজপথে থেকে সক্রিয় ও আপসহীন ভূমিকা পালন করেছে। ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলনে ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন, কাচারি ভবনের ওপর থেকে পাকিস্তানি পতাকা নামিয়ে ফেলা কিংবা ছাত্রীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ—সব মিলিয়ে ভাষা সংগ্রামের রক্তঝরা ইতিহাসে এ অঞ্চলের অবদান ছিল অনন্য। পরবর্তী সময়ে ৬ দফা ও ১১ দফা আন্দোলনের জোয়ার ছড়িয়ে পড়া এবং আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার প্রতিবাদে রাজপথ উত্তাল রাখার মাধ্যমে ব্রাহ্মণবাড়িয়া অকুতোভয় রাজনৈতিক চেতনার পরিচয় দেয়।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে এ জেলার ভৌগোলিক অবস্থান অত্যন্ত কৌশলগত ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। ভারতের সীমান্তবর্তী প্রায় ৬৫ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে কসবা, আখাউড়া, নবীনগর, আশুগঞ্জসহ প্রতিটি থানা এবং গ্রামে মুক্তিবাহিনী ও গেরিলা যোদ্ধারা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ২ ও ৩নং সেক্টরের অধীনে ১০ হাজারের বেশি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং প্রায় ১০ লাখ সাধারণ মানুষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সমর্থনে এ সংগ্রাম সাধারণ গণযুদ্ধে রূপ নেয়। এভাবে ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম পর্যন্ত প্রতিটি রক্তাঙ্কিত প্রহরে অসীম সাহসিকতা, অসামান্য ত্যাগ ও বীরত্বের স্বাক্ষর রেখে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা জাতীয় ইতিহাসের পাতায় এক গৌরবোজ্জ্বল ও চিরভাস্বর অধ্যায় রচনা করেছে।
সরাইলের প্রতিরোধের ইতিহাস, তাঁতির আঙুলে বোনা তানজেবের সূক্ষ্মতা, মুক্তিযোদ্ধার রক্তে লেখা স্বাধীনতার কাহিনী আর আলাউদ্দিন খাঁর সরোদের কালজয়ী সুর—সব মিলিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া যেন ইতিহাসের এক বহুস্বরের ভূখণ্ড।
ডেইজি আক্তার: সহসম্পাদক, বণিক বার্তা