নর্সম্যানদের লঙশিপ

সমুদ্রের বুকে ভাইকিংদের আধিপত্যর মূল শক্তি ছিল তাদের জাহাজ। স্ক্যান্ডিনেভিয়ার জাহাজ ও নৌকাগুলো ছিল মানব ইতিহাসের অন্যতম জটিল ও বিস্ময়কর কাঠামো।

নরওয়ে ছিল পাথুরে ও দুর্গম। তাই তাদের জন্য সমুদ্র জয় করাই ছিল টিকে থাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। যোগাযোগ, বাণিজ্য ও যুদ্ধ থেকে শুরু করে ধর্মীয় সংস্কৃতি সবেতেই জড়িয়ে ছিল নৌযান। লৌহ যুগে (৫৫০-১০৫০ খ্রিস্টাব্দ) ক্ষমতার ভিত্তি মজবুত করতে এবং ভাইকিংদের পশ্চিমমুখী সাম্রাজ্য বিস্তারে এ জাহাজগুলোই ছিল প্রধান হাতিয়ার।

ভাইকিংরা তাদের জাহাজগুলো তৈরি করত ‘নর্ডিক ক্লিংকার’ পদ্ধতিতে। দীর্ঘ এই জাহাজগুলো ‘লংশিপ’ নামেই বেশি পরিচিত। এ পদ্ধতির প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল তক্তা দিয়ে জাহাজের বাহিরাবরণ বা শেল তৈরি করা। এটি তৈরির সময় একটি তক্তার প্রান্ত অন্যটির ওপর আংশিক চেপে থাকত। এরপর সেগুলোকে লোহার পেরেক দিয়ে জোড়া দেয়া হতো। নির্মাতারা কাঙ্ক্ষিত অবয়ব না আসা পর্যন্ত জাহাজের প্রতিটি অংশ পরীক্ষা ও পরিবর্তন করতেন।

ভাইকিংদের জাহাজ নির্মাণের ক্ষেত্রে মূল কাঠামো বা ফ্রেম নয়, বরং তক্তার খোলসটিই ছিল নকশা ও চূড়ান্ত অবয়বের মূল ভিত্তি। তৎকালীন জাহাজ নির্মাতারা কোনো নকশাপত্র বা ছাঁচ ব্যবহার করতেন না। এর পরিবর্তে জাহাজের তলা বা ‘কিল’ স্থাপনের আগেই তারা প্রতিটি তক্তার পরিমাপ ও তার বাঁক কেমন হবে, সেই সামগ্রিক ধারণাটি মনে মনেই চূড়ান্ত করে নিতেন। এটি সম্ভব ছিল তাদের নিজস্ব কিছু অভিজ্ঞতাপ্রসূত নিয়ম বা ‘রুলস অব থাম্ব’-এর কারণে।

গাছের গুঁড়িগুলো সাধারণত শীতকালে কাটা হতো। কারণ এ সময়ে কাঠে রসের পরিমাণ কম থাকায় শুকানোর সময় কাঠ ফেটে যাওয়ার ঝুঁকি কমে যায়। ভাইকিং যুগে কাঠ শুকিয়ে নেয়ার বদলে কাঁচা বা ভেজা (গ্রিন উড) অবস্থায় কাজ করা হতো। কাঠ নরম রাখার জন্য সেগুলোকে পানিতে ডুবিয়ে রাখা হতো।

স্থায়িত্বের কারণে জাহাজ নির্মাতাদের প্রথম পছন্দ ছিল ওক কাঠ। তবে পশ্চিম নরওয়ের মতো অঞ্চলে ওক পর্যাপ্ত না থাকায় পাইন কাঠও ব্যবহার করা হতো। ওক ও পাইনের পাশাপাশি অ্যাশ, ম্যাপল, বিচ ও লাইম গাছের কাঠও ব্যবহার হতো।

যেকোনো জাহাজ বা নৌকা তৈরির কাজ শুরু হতো কিল (তলার প্রধান কাঠ) এবং স্টেম (সামনে ও পেছনের খাড়া গলুই) বসানোর মাধ্যমে। এ গলুইয়ের ওপরই জাহাজের পুরো আকৃতি ও গুণাগুণ নির্ভর করত। তাই ভাইকিংদের প্রাচীন গল্পগুলোয় প্রধান জাহাজ নির্মাতাদের সম্মান করে ‘স্টেম-স্মিথ’ বা গলুই-কারিগর বলা হতো।

গলুই বসানোর পর একটি তক্তার ওপর আরেকটি তক্তা কিছুটা চাপিয়ে জাহাজের বাইরের দেয়াল বা খোলস তৈরি করা হতো। তক্তাগুলোর জোড়ামুখ দিয়ে যেন পানি ঢুকে না যায়, সে কারণে আলকাতরা বা পাইন গাছের আঠার সঙ্গে পশুর লোম মিশিয়ে একটি ঘন মিশ্রণ তৈরি করে তক্তা দুটির মাঝখানে চেপে বসিয়ে দেয়া হতো। পশুর লোম আঠার সঙ্গে মিলে একটি শক্ত বাঁধন তৈরি করত। এরপর ছিদ্র করে লোহার পেরেক ঢুকিয়ে, ভেতরে চারকোনা পাতের সঙ্গে পিটিয়ে তক্তাগুলো আটকে দেয়া হতো।

নিচের খোলস তৈরি হলে প্রাকৃতিকভাবে বাঁকা কাঠ দিয়ে ভেতরের তলার কাঠামো (ফ্লোর টিম্বার) জোড়া দেয়া হতো। এরপর ওপরের দিকে তক্তা বসানোর সঙ্গে সঙ্গে বিম, স্ট্রিংগার ও মাস্তুলের ভিত্তি তৈরি করা হতো। সবশেষে হাল, মাস্তুল, চারকোনা পাল ও প্রয়োজনীয় রশি লাগিয়ে জাহাজটি পুরোপুরি প্রস্তুত করা হতো।

সমুদ্রে ভাসানোর আগে নোনা পানি থেকে বাঁচাতে জাহাজের খোলসের গায়ে আলকাতরা, হলুদ গিরিমাটি এবং তিসির তেল বা চর্বির প্রলেপ দেয়া হতো। জাহাজ চালানো ও নোঙরের রশি তৈরি হতো ওক বা উইলো গাছের ভেতরের আঁশযুক্ত ছাল কিংবা তিমি, সিল ও ঘোড়ার চামড়া এবং পশম দিয়ে। পাল তৈরি হতো ভেড়ার পশম (উল) দিয়ে। স্থায়িত্ব বাড়াতে এতে চর্বি, আলকাতরা ও গিরিমাটি মেখে নেয়া হতো।

[ম্যাসিমিলিয়ানো দিত্তার লেখা শিপ বিল্ডিং ইন দ্য ভাইকিং এইজ অবলম্বনে]

ইসরাত জাহান স্বর্না: সহসম্পাদক, বণিক বার্তা

আরও