কর জোড়ে বন্দি নাথ জগত ঈশ্বর। দাতা ও দয়াল প্রভু করুনা সাগর*
এমন দয়াল দাতা দাতা বলি তারে। সর্ব্বদা করিলে পাপ তবু কৃপা করে*
বঙ্গ দেশে পড়িয়াছি আমি দুরাচার। লইবে দয়াল প্রভু উদ্দেশ আমার*
দেখিয়া অধিক পাপ ঘৃণা কর যদি। কলঙ্ক তোমার নামে রবে নিরবধি*
যদি নাথ মোরে নাহি করিবা তারন। ধরিয়াছ কেন নাম পতিত পাবন*
তোমার নামেতে ভরসা আমার। করিবা২ নাথ আমাকে উদ্ধার।
প্রত্নতত্ত্ব ও ইতিহাসের নিরিখে বাংলাদেশে ভূমিকম্প (প্রাক-আধুনিক পর্ব) শিরোনামে লেখার শুরুতেই পুঁথিপাঠের বা কবির কল্পনায় ভাসার ইচ্ছা নিশ্চয় পাঠকের নাই। কিন্তু গত চার/পাঁচদিন ঢাকার সন্নিকটে উৎপাদন হওয়া ভূমিকম্পন আমাদের পাষাণ হৃদয়কে নাড়া না দিতে পারলেও জনপরিসরে আতঙ্কের কমতি ঘটায় নাই। এরই প্রভাবে লেখার শুরুতে পরম স্রষ্টার বন্দনা ও ক্ষমা চেয়ে নিলাম কবির কাব্য অনুসারে। উপরের ভণিতাটি কবি আবদুর রহিম লিখিত ১৩০৪ সালের ভূমিকম্পের পুথি ও দুর্ভিক্ষের বিবরণ থেকে নেয়া। পুঁথিটির প্রচ্ছদ থেকে জানা যায় কবির নিবাস গলাচিপা, পোস্ট অফিস হুসেন পুর। জেলা ময়মনসিংহ। এটি কলিকাতার মুন্সী মনিরদ্দিন আহাহ্মদ সাহেবের ‘ছোলেমানী প্রেস’ থেকে ছাপানো। শিরোনাম থেকে এটি সহজ অনুমেয়, কাব্যটি ১৮৯৭ সালে সংঘটিত ভয়াবহ ভূমিকম্পের ওপর লেখা একটি দোভাষী পুঁথি। বাংলাপিডিয়ায় দেয়া এ ভূমিকম্পের সংক্ষিপ্ত বিবরণটি হলো
১২ জুন বিকেল ৫.১৫ মিনিটে সংঘটিত এই ভূমিকম্প ৩,৭৫, ৫৫০ বর্গ কিমি এলাকায় পাকা দালান কোঠার ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে। শুধু সিলেট জেলাতেই এই প্রাকৃতিক তান্ডবে মৃতের সংখ্যা ৫৪৫-এ দাঁড়ায়। এদের অধিকাংশই বাড়িঘর চাপা পড়ে মারা যায়। পূর্বে দক্ষিণ লুসাই পাহাড় থেকে পশ্চিমে শাহবাদ-বাংলার সর্বত্র এই ভূকম্পন অনুভূত হয়। ময়মনসিংহ সদরে আদালত ভবনসহ বহু সরকারি ভবন বিধ্বস্ত হয় এবং জমিদারদের ব্যবহৃত দ্বিতল ভবনের খুব কমই অক্ষত থাকে। যোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয় এবং ঢাকা-ময়মনসিংহ রেল যোগাযোগ ও অন্যান্য যানবাহন প্রায় এক পক্ষকাল বন্ধ থাকে। .... ব্যাপকভাবে প্রাণহানি না ঘটলেও সহায়-সম্পত্তির ক্ষতির হিসাব তখনকার হিসাবে পঞ্চাশ লাখ টাকা ছাড়িয়ে যায়। ... বিশেষ করে ঢাকা শহরে খুব বেশি ছিল। ত্রিপুরায় পাকা দালান, পুরানো মন্দির ইত্যাদি ভেঙে পড়ে। এখানে মোট ক্ষতির পরিমাণ তখনকার হিসাবে আনুমানিক ৯,০০০ টাকা।
কবি আবদুর রহিম নিজ অভিজ্ঞতা থেকে এ ভূমিকম্পের চিত্রায়ন তিনি করেছেন :
তের শত চারি সন ত্রিশা জৈষ্ট মাসে। সনিবার দিন বেলা অবশেষে*
গরুকে করিল আজ্ঞা নাথ নিরন্জন। যাহার শিঙ্গেতে আছে এ সাত ভূবন*
না পারে পাপের ভার সহিবারে ধরা। একবার তুমি কিছু দেহ মাথা নাড়া*
তখনি গর্জ্জিয়া এক সিঙ্গ নাড়া দিল। থর থর করি ভুমি কাঁপিয়া উঠিল*
স্থির নাহি হয় ভুমী কাঁপে বার বার। কচ্ছব কাঁপিয়া উঠে মৎস্য কাঁপে আর*
কাঁপিল বাসুকি নাগ পাতাল নগরে। গগণ মন্ডল খান টলমল করে*
স্থল কাঁপে জল কাঁপে কাঁপে বৃক্ষ বন। জলচন বনচর আর উড়ু গণ*
দেও দানব ভুত প্রেত লাগিল কাঁপিতে। কাপেন মনুস্যগণ পড়িয়া ভুমেতে*
কাঁপিয়া কাঁপিয়া কেহ এই কথা কয়। হায়রে সংসার গেল হইয়া প্রলয়* (পৃষ্ঠা ৩)
বাংলাদেশের ইতিহাস চর্চায় ইনভায়রনমেন্টাল হিস্ট্রি অন্যান্য অনেক বিষয়ের মতো উপেক্ষিত। বিগত ৬০ বছর রাজনৈতিক ইতিহাসের নানা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর দেয়ার দায়িত্ব পালনে ব্যস্ত দেশের ইতিহাস সচেতন লেখকমহল। এর প্রভাবেই হয়তো বাংলাদেশের অবস্থান পৃথিবীর অন্যতম ভূমিকম্প প্রবণ এলাকায় হওয়া সত্ত্বেও ভূমিকম্প, বন্যা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের ইতিহাস সংক্রান্ত গবেষণা গ্রন্থ আমার জানা নেই। আমার অজ্ঞতা ক্ষমা করবেন। এক্ষেত্রে ভূগোলবিদ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিষয়ক সমাজ ও অর্থনৈতিক গবেষণা প্রবন্ধ, গ্রন্থ অধ্যায় এবং গবেষণা গ্রন্থ তালিকাটি বিস্তর ও আকর্ষণীয়। তবে আধুনিক যুগের প্রতি তাদের দৃষ্টি প্রখর। এবং প্রাক-আধুনিক পর্বের ইতিহাসে ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা গবেষণা খুবই সীমিত। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জিওগ্রাফি অ্যান্ড ইনভায়রনমেন্টাল স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ইদ্রিস আলমের লেখায় প্রাক-আধুনিক পর্বে বাংলাদেশ সমগ্র ভারত উপমহাদেশের ভূমিকম্প, বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের চমকপ্রদ তথ্যাদি পাওয়া যায়। ইদ্রিস আলম এবং সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক ডেল ডোমিনি হোসের গবেষণায় (২০১৬, পৃ. ২০৩১-২১০২)। বাংলাদেশে ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরা রাজ্যসংলগ্ন এলাকায় সংগঠিত প্রাক-আধুনিক পর্বের (অতিপ্রাচীন কাল থেকে অষ্টাদশ শতাব্দী) ১৭টি ভূমিকম্পের তথ্য পাওয়া যায়:
বিগত তিন দশকে বাংলাদেশের প্রত্নতাত্ত্বিকরা বরেন্দ্র আঞ্চলের নানা প্রত্নস্থানে উৎখনন কালে প্রাক-আধুনিক পর্বের বাংলাদেশের ভূমিকম্প ও তার প্রতিঘাত সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উদ্ঘাটন করেছেন। পাঠকের সামনে সেটি তুলে ধরাই আমার পরবর্তী অংশের উদ্দেশ্য।
বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রাচীন নাগরিক বসতি হলো বগুড়া জেলার মহাস্থানগড় দুর্গনগরীটি। প্লাইস্টোসেন ভূভাগ বরেন্দ্র অঞ্চলের প্রমত্তা নদী করতোয়ার তীরে তৃতীয় শতাব্দীতে এ নগরীর গোড়াপত্তন ঘটে। উল্লেখ্য, কলিকাতাস্থ ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল মিউজিয়ামে রাখা মহাস্থান ব্রাহ্মী লিপি (যা ১৯৩১ সালে বাড়ু ফকির কর্তৃক মহাস্থানগড় থেকেই সংগৃহীত) বঙ্গীয় বদ্বীপে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও তৎপরিপ্রেক্ষিতে রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপের সংবাদ দেয়। লিপিটির পাঠোদ্ধার ও ইতিহাস রচনায় ব্যবহারকারীদের মতে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ হয়েছিল মহাস্থানগড় বা উত্তরবঙ্গের কোনো স্থানে। সম্প্রতি সুস্মিতা বসু মজুমদার লিপিটির পুনর্পাঠ করেছেন। তার মতে, মৌর্য্য শাসন কাঠামো বাংলায় কেবল উত্তর অঞ্চলেই ছিল না বরং তা মধ্যবর্তী ভূভাগ তথা বঙ্গেও সম্প্রসারণ হয়েছিল। মহাস্থান ব্রাহ্মী লিপিতে উল্লেখকৃত প্রাকৃতিক দুর্যোগটি সংঘঠিত হয়েছিল মধ্য বাংলায় বা বঙ্গ জনপদে খুব সম্ভবত উয়ারি-বটেশ্বর। নরসিংদী জেলার এ দুটি গ্রামে মহাস্থানগড়ের সমসাময়িক নাগরিক বসতির প্রমাণ পেয়েছেন প্রত্নতত্ত্ববিদ সুফি মোস্তাফিজুর রহমান ও তার দল। তাদের মতে, এলাকাটি সুপ্রাচীন বন্দর-নগর এবং একটি সমৃদ্ধশালী বাণিজ্য কেন্দ্র। এর প্রধান উৎপাদন পণ্য ছিল গুটিকা (beads)। ভূমধ্যসাগরীয় বাণিজ্য বলয়ের পাশাপাশি উত্তর ভারতীয় বাণিজ্য সম্পর্ক জালের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল উয়ারি-বটেশ্বর। এখানে প্রাপ্ত ছাপাঙ্কিত মুদ্রা, দুর্গনগরী, নানা ধরনের স্থাপনা এবং অসংখ্য মূল্যবান পাথরের গুটিকা এ স্থানকে প্রাক সা. অব্দের একটি সমৃদ্ধ বসতি হিসেবে প্রমাণিত। কিন্তু মহাস্থান ব্রাহ্মী লিপিতে উল্লেখিত দুর্যোগ কোন ধরনের? সেটি কি উয়ারী-বটেশ্বর জনপদের কোনো দুর্যোগের কথা বলছে? এসব প্রশ্নের উত্তরের জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। কেননা সুফি মোস্তাফিজুর রহমান ও তার দলের দুই দশকের উৎখনন কাজের প্রতিবেদনটি প্রকাশের প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
১৯৯২ সালে বাংলাদেশ ও ফরাসি সরকারের মধ্যে একটি সাংস্কৃতিক বিনিময় চুক্তি সম্পাদিত হয়। এ চুক্তির আওতায় ১৯৯৩ সাল থেকে বগুড়ার মহাস্থানগড়ে প্রত্নতাত্ত্বিক খনন শুরু হয়। প্রথম পর্যায়ে দুর্গনগরীর পূর্বাংশের ও তৎসংলগ্ন এলাকায় খনন হয়। দ্বিতীয় পর্যায়ে ২০০৪ সাল থেকে মহাস্থানগড়ের অবস্থিত শাহ সুলতান মাহীসাওয়ারের মাজারসংলগ্ন মাঠে উৎখনন পরিচালিত হয়। এ খননের প্রতিবেদন সারাংশ হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে অধ্যাপক আবদুল মমিন চৌধুরী সম্পাদিত, বাংলাদেশের ইতিহাস: আঞ্চলিক পরিপ্রেক্ষিতে আদি বাংলা, প্রথম খণ্ড, প্রত্নতত্ত্ব রাজনৈতিক ইতিহাস রাষ্ট্রগঠন, (ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি, ২০১৯) গ্রন্থে। ফরাসি প্রত্নতাত্ত্বিক দলের নেতা জ্যঁ ফ্রাসোঁয়া সাল ‘মহাস্থান’ প্রত্নস্থলটি লিখেছেন। ২০০৯-১০ সালে মহাস্থানগড়ের মাজার এলাকায় প্রত্নতাত্ত্বিক খননে ভূমিকম্পের আলামত দেখা যায়। অন্যান্য প্রত্নস্থলের তুলনায় মাজারসংলগ্ন এলাকা তুলনামূলকভাবে উঁচু। এখানে খননে প্রাপ্ত নিদর্শনাদির মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো দুই সারি স্তম্ভসহ একটি বৃহদাকার স্থাপনার ধ্বংসাবশেষ (আনু. ২১ মি. X ১৭ মি.)। এ স্থাপনার কেবল পিলারগুলোর আয়তাকার ভিত্তিই টিকে রয়েছে। ধ্বংসপ্রাপ্ত দেয়ালের সামান্য অংশই পাওয়া গেছে। সালের ভাষ্যানুসারে: খুব অল্প বস্তুগত প্রমাণই পাওয়া গেছে যার ভিত্তিতে এ ‘স্তম্ভবিশিষ্ট স্থাপনা’ ধ্বংসাবশেষের প্রকৃতি ও ব্যবহার বোঝা যেতে পারে। স্থাপনাটি নিঃসন্দেহে তৎকালীন নগরীর একটি প্রধান স্থাপত্য ছিল। কিন্তু স্থাপনাটির প্রকৃতি সামরিক বা বেসামরিক ছিল কিনা তা শনাক্ত করা সম্ভব নয়। ধর্মীয় স্থাপত্য হিসেবে চিহ্নিত করার মতো কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। (পৃষ্ঠা ৪৩৯-৪০) এ প্রত্নস্থলে প্রাপ্ত আলামত অনুযায়ী তিনি প্রস্তাব করেন: ‘বর্তমান মহাস্থান বা প্রাচীন পুণ্ড্রনগরের ধ্বংস হয়েছিল মানুষের হস্তক্ষেপে নয়, বরং প্রাকৃতিক ঘটনায়’ (পৃষ্ঠা ৪৪০)। তার মতে, প্রাকৃতিক দুর্যোগটি ছিল ভূমিকম্প। এর আঘাতে সবচেয়ে ওপরের দিকের তথা পরবর্তীকালের মানববসতি আক্রান্ত হয়েছিল। বাংলাদেশের ইতিহাস গ্রন্থের ‘মহাস্থান’ অধ্যায় থেকে চুম্বকাংশ পাঠকের জন্য হুবহু উদ্ধৃত করছি:
ভূমিকম্পের আঘাতে সবচেয়ে উপরের দিকের স্তরগুলি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও, ভয়াবহ প্রকৃতির ধ্বংসের ফলে এই এলাকার উঁচু ভূমি দীর্ঘ সময়ের–সম্ভবত কয়েক শতাব্দীর- জন্য পরিত্যক্ত হয়েছিল। ভূমিকম্পের আলামত অন্তিম পর্যায়ের বসতবাটিগুলির তুলনামূলকভাবে সরু দেয়ালসমূহের আকৃতির বিকৃতি, নগর প্রাচীরের সবচেয়ে শেষের পুনর্নির্মাণ এবং ‘স্তম্ভবিশিষ্ট স্থাপত্যের’ ধ্বংসাবশেষে চিহ্নিত করা যায়। কয়েকটি স্তম্ভের ভিত্তি ‘মুচড়ে’ গিয়েছিল আর ইটের সারিগুলির মধ্যে ফাঁটল ধরেছিল সম্ভবত ছাদ ধ্বসে পড়ার কারণে (প্রাপ্ত কড়িবড়গা ও টালির আলামত)। পশ্চিম পাশের দেয়াল পশ্চিম দিকাভিমুখে ভূকম্পনের আঘাতের অভিমুখের উল্টোদিকে দেয়ালের উপরে চাপের কারণে ধ্বসে পড়েছিল। এই দেয়াল আগেকার ইট পুনর্ব্যবহার করে ভিত্তি প্রদান ছাড়াই পুনর্নির্মিত হয়েছিল। ... যে ধরনের ধ্বংস ...পর্যবেক্ষণ করেছি তার ভিত্তিতে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে যে, ভূমিকম্পের মাত্রা রিখটার স্কেলে বেশি হলে ৬-৭ এর উপরে ছিল। ভূমিকম্পের উৎস হয় নিকটবর্তী সক্রিয় ভূঅভ্যন্তরস্থ চ্যুতি না হয়ে, দূরবর্তী কোথাও হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। ধ্বসে পড়ার সাধারণ অভিমুখ উত্তরপশ্চিম থেকে দক্ষিণপূর্ব বরাবর (৯০°-১১০°পূর্ব)। এই অভিমুখ নির্দেশ করে যে, ভূমিকম্পের উৎস মেঘালয়, আসাম বা বাংলাদেশের উত্তরপূর্বাংশের সিলেট অঞ্চলে (যেখানে ডাউকি ফল্ট/ভূগর্ভস্থ চ্যুতি অবস্থিত) ছিল না। বরং এই উৎস উত্তর পশ্চিম হিমালয় অঞ্চলের মধ্যভাগ বা পূর্বভাগে অবস্থিত ছিল। নথিভুক্ত উপাত্ত অনুসারে ১২৫৫ সা. অব্দের দিকে কাঠমুন্ডুতে সংঘটিত একটি ভূমিকম্পকে আমরা সম্ভাব্য গ্রহণযোগ্য অনুকল্প হিসেবে প্রস্তুাব করতে পারি। ১২৫৫ সা. অব্দে এই ভূমিকম্পের মাত্রা ও ব্যাপ্তি অজ্ঞাত। তবে সূত্র মোতাবেক মন্দির ও বসতবাড়ি ধ্বংস করার মতো ও কাঠমুন্ডু উপত্যকার জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশ থেকে এক-তৃতীয়াংশ নিহত করার মতো শক্তিশালী ছিল এই ভূমিকম্প। (পৃষ্ঠা ৪৪১-৪২)
১৩০৭ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত আবদুর রহিম রচিত ‘ভুমি কম্পের পুথি’
কোন সময়ে এ ভূমিকম্প হয়েছিল? এটি কি কেবল মাজার এলাকার এ স্থাপনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল? এখানকার নিকটবর্তী অন্যান্য বৌদ্ধবিহারগুলোয় এ ভূকম্পনের ফলে কি ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি? এসব সাওয়াল আমার মতো পাঠকের মনেও নিশ্চয়ই উঠছে? সাল তার প্রস্তাব না গ্রহণ করার ক্ষেত্রে কিছুটা চ্যালেঞ্জ স্বীকার করে লেখেন:
... ১২৫৫ সালের কাঠমুন্ডুর ভূমিকম্পে মহাস্থান ধ্বংসযজ্ঞ পরিচালিত হওয়ার প্রস্তাবনাটি একটি আকর্ষণীয় অনুকল্প হলেও তা এখনো প্রমাণিত নয়। বিবেচনায় রাখতে হবে, এই সময়ের আগে বা পরে আরো ভূমিকম্প সংঘটিত হয়েছিল। প্রত্নতাত্ত্বিক আলামত একটি তুলনামূলকভাবে কম নির্ভরযোগ্য ও অনিশ্চিত তথ্য সরবরাহ হবে পারে। উপরের স্তরগুলি (ধ্বসে পড়া?) থেকে সংগৃহীত একটি নমুনার রেডিওকার্বন সা. অব্দ ত্রয়োদশ শতকের একটি তারিখকে নির্দেশ করে।
...ভূমিকম্পের ফলে পুরো প্রত্নস্থানটি কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল তা মূল্যায়ন করাও অসম্ভব। আঘাতের পরে পুরো নগর জনমানবহীন না হয়ে পড়লেও অনুমান করা যায় এ আঘাতের ধ্বংসযজ্ঞ থেকে ‘পুনরুজ্জীবিত’ হতে বেশ সময় লেগেছিল। মাজার এলাকায় আরো নিবিড় ও পদ্ধতিগতভাবে কার্যকর আরো একটি প্রত্নতাত্ত্বিক খনন ভূমিকম্প পরবর্তী অবস্থা সম্পর্কে আরো তথ্য সরবরাহ করতে পারে। (পৃষ্ঠা ৪৪৩)
বরেন্দ্র ভূভাগের আরেকটি জেলা দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলার জয়ানন্দ বাজারের নিকটবর্তী মাধবগাঁও বুরুজে উৎখনন করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক স্বাধীন সেন। তাদের খননে সেখানে একটি নবরথ ব্রাহ্মণ্য মন্দির পাওয়া যায়। উৎখনকদের মতে, মন্দিরটি ছিল কলিঙ্গ শিল্পরীতি অনুসারে নির্মিত দেউল মন্দিরের নবরথ রূপ। খনন প্রতিবেদন অনুযায়ী মন্দিরটি এক বা একাধিক ভূমিকম্পের শিকার হয়েছে:
মন্দিরটির বিভিন্ন অংশ থেকে চিহ্নিত আলামতের ভিত্তিতে একটি প্রত্নভূমিকম্পের আলামত নথিভুক্ত করা হয়েছে। এ ভূমিকম্পে সম্ভবত গৃহের উপরের রেখা দেয়াল ও মণ্ডপের ঘটনাকে শনাক্ত করা গেছে। দেয়াল ও স্তম্ভে ফাটল, হেলে যাওয়া, বেঁকে যাওয়াসহ বিভিন্ন উপরের পীড়াদেউল ধরনের শিখর বিধ্বস্ত হয়েছিল। ...
সমাপ্তি টানার আগে ১৭৮৭ সালের ভূমিকম্পে চট্টগ্রামের একটি কলোনিয়াল রেকর্ডের আলোচনা তুলতে চাই। এডওয়ার্ড গুলস্টোন স্থানীয় একটি ফারসি ভাষায় লেখনি থেকে ইংরেজি অনুবাদ করে এটিকে কলকাতায় রেভারেন্ড হিরস্টের কাছে পাঠিয়ে ছিলেন। এডওয়ার্ড গুলস্টোনের ইংরেজি অনুবাদের কিছু অংশ নিচে দেয়া হলো :
The land of Mohamd Assad Chowdhry of Pargannah of Deeang, at a place called Bareeah, was laid open by the shock from 10-12 cubits in width, and became, as it were a deep creek; the water rising up so, that the ground of the farmers inhabiting the place in 8 cubits overflowed. ... to the westward, Akl’poorah, an island of the salt-works, was leveled with the water on its east side, and on the north and south the ground opened up from 5 to 7 cubits in width, and sunk like a pit to the depth of 10 cubits, the water spouting up; nor is there the least appearance of its subsiding: we know not what will come of it.
সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি
১. আবদুর রহিম, ১৩০৪ সালের ভুমি কম্পের পুথি। ও দুর্ভিক্ষের বিবরণ, সহর কলিকাতায় মুন্সী মনিরদ্দিন আহাহ্মদ সাহেবের দরজীপাড়া মছজীদ বাট স্ট্রীট ১৫৫ নং ভবনে ছোলেমানী প্রেস, দ্বিতীয় মুদ্রন হয় ১৩০৭ বঙ্গাব্দ
২. সিফাতুল কাদের চৌধুরী এবং আফতাব আলম খান, ‘ভূমিকম্প’, সিরাজুল ইসলাম সম্পাদিত, বাংলাপিডিয়া, ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি
৩. জ্যঁ ফ্রাসোঁয়া সাল, ‘মহাস্থান’, আবদুল মমিন চৌধুরী সম্পাদিত, বাংলাদেশের ইতিহাস: আঞ্চলিক পরিপ্রেক্ষিতে আদি বাংলা, প্রথম খণ্ড, প্রত্নতত্ত্ব রাজনৈতিক ইতিহাস রাষ্ট্রগঠন, ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি, ২০১৯: ৪১১-৪৪৮
৪. স্বাধীন সেন, ‘উত্তর-পশ্চিম বাংলাদেশ: প্রত্নস্থান ও প্রত্নবসতি’, আবদুল মমিন চৌধুরী সম্পাদিত, বাংলাদেশের ইতিহাস: আঞ্চলিক পরিপ্রেক্ষিতে আদি বাংলা, ২০১৯: ১৩৩-১৬৮
৫. Susmita Basu Majumdar, Mahasthan Record Revisited: Querying the Empire from a Regional Perspective (1st ed.). London–New York: Routledge–Taylor & Francis Group; Delhi: Manohar Publishers, 2023
৬. Edward Gulston, ‘An Account of an Earthquake at Chattigaon: Translated from the Persian by Mr. Edward Gulston, in the Service of the Honorable East India Company, and Communicated by him to the Reverend Mr. Hirst’, Philosophical Transactions, Vol. 53, 1793: 252-254.
৭. Edris Alam and Dominey-Howes, ‘A Catalogue of Earthquakes between 810 BC and 2012 for the Bay of Bengal’, Nat Hazards, 81, 2016, 2031-2102
৮. Sahidul Hasan : Disaster in Bangladesh: Revisiting the Archaeological Evidences (From earliest times to c. 1800 CE), Bangladesh Historical Studies , ISSN: 1560-7569 , vol.27, 2024, Bangladesh History Association , pp.1-16 , .
ড. শহিদুল হাসান: সহযোগী অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়