রসুন বিশ্বব্যাপী রান্না ও চিকিৎসা উভয় ক্ষেত্রেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ঝাঁঝালো স্বাদ ও বহুমুখী গুণাগুণের কারণে মানবসভ্যতার খাদ্যসংস্কৃতিতে রসুনকে বিশেষ মর্যাদা দেয়া হয়েছে। প্রাচীন মিসর, সুমেরীয় সভ্যতা, চীন ও ভারত সব সভ্যতাই রসুনকে খাদ্য, ওষুধ এবং আচার-অনুষ্ঠানের অংশ হিসেবে ব্যবহার করেছে। আধুনিক বিশ্বের রান্নায়ও রসুন একটি অপরিহার্য উপাদান। অর্থনৈতিক দিক থেকেও রসুন একটি প্রভাবশালী বৈশ্বিক ফসল।
ঠিক কোন দেশ থেকে রসুনের যাত্রা শুরু এ নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। সুসান ময়ার্স রসুন নিয়ে গারলিক ইন হেলথ, হিস্ট্রি অ্যান্ড ওয়ার্ল্ড কুইজিন শীর্ষক গ্রন্থ লিখেছেন। সেখানে তিনি রসুনের বিভিন্ন প্রাচীন সভ্যতা ও বিভিন্ন দেশে রসুনের অবস্থান এবং ব্যবহার সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। গ্রন্থে রসুনের ভৌগোলিক উৎপত্তি নিয়ে নির্দিষ্টভাবে কোনো অঞ্চলের কথা বলা নেই। এ বিষয়ে নির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি বলে সুসান ময়ার্স উল্লেখ করেছেন। তার গ্রন্থ থেকে জানা যায়, বহু পশ্চিমা উৎসমতে, রসুন এশিয়ার দেশজ উদ্ভিদ এবং সেখান থেকে ইউরোপে বিস্তৃত হয়েছে। আবার কিছু চীনা গ্রন্থে বলা হয় এটি মূলত ইউরোপীয় উদ্ভিদ, যা পূর্বদিকে বিস্তৃতি লাভ করে। ১৮০০-এর দশকের শেষ দিকে ফরাসি ইতিহাসবিদ আলফঁসে দ্য কাঁদোল প্রাচীন যুগে কোন ফসল কোথায় চাষ হতো তা নির্ণয়ের জন্য প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন পরীক্ষা করেন। তার ১৮৮৩ সালে প্রকাশিত গ্রন্থ L’origine des plantes cultivées-এ তিনি প্রস্তাব করেন রসুন সাইবেরিয়ার দক্ষিণ-পশ্চিমে কিরগিজ অঞ্চলের দেশজ উদ্ভিদ। যেখান থেকে এটি দক্ষিণ ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে এবং সেখানকার প্রাকৃতিক পরিবেশে অভ্যস্ত হয়ে যায়। অর্থাৎ ইউরোপের উপযুক্ত ভূমিতে এটির চাষাবাদ বিস্তৃত হয়।
কিন্তু আধুনিক উদ্ভিদবিদেরা আলফঁসের প্রদত্ত তথ্যের সঙ্গে কিছুটা ভিন্নমত প্রকাশ করেন। তাদের মতে, রসুনের উৎপত্তি মধ্য-পশ্চিম এশিয়া এবং দক্ষিণ-পশ্চিম সাইবেরিয়ায়। সেখান থেকে এটি পূর্বদিকে চীন এবং পশ্চিম দিকে ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। এ সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেন যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের গবেষক ড. ফিলিপ সাইমন। রসুনের সবচেয়ে কাছাকাছি বুনো প্রজাতিকে আফগানিস্তান, তুর্কিস্তান ও উজবেকিস্তান সীমান্তবর্তী অঞ্চলে বেড়ে উঠেছে বলে ফিলিপ সাইমন তার গবেষণায় দেখিয়েছেন। তার মতে, এসব উদ্ভিদ বা ফসল ওই অঞ্চলের কঠোর পার্বত্য আবহাওয়ায় বেঁচে থাকার অসাধারণ ক্ষমতা রাখে।
বর্তমানে অবশ্য রসুনের প্রায় ১৫০ সমগোত্রীয় প্রজাতি দক্ষিণ ইউক্রেনের কৃষ্ণ সাগর অঞ্চল থেকে শুরু করে পশ্চিমে চীন এবং দক্ষিণে আফগানিস্তান, তুরস্ক ও ইরান পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলে পাওয়া যায়।
চীন থেকে কোরিয়া এবং জাপান হয়ে ভারত
খাদ্য-সংস্কৃতি লেখক রবিন চেরি তার ‘গার্লিক: অ্যান এডিবল বায়োগ্রাফি- দ্য হিস্ট্রি, পলিটিকস অ্যান্ড মিথলজি বিহাইন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড’স মোস্ট পঞ্জেন্ট ফুড, উইথ ওভার হানড্রেড রেসিপিস’ শীর্ষক গ্রন্থে রসুনের সঙ্গে মানবসভ্যতা, সামাজিক ইতিহাস, পৌরাণিক বিশ্বাস, খাদ্য-সংস্কৃতিতে এটির বিশ্লেষণ ও রান্নার রেসিপি তুলে ধরেছেন। গ্রন্থটিতে লেখক বর্ণনা করেছেন, প্রচলিত চীনা চিকিৎসাবিদ্যার (টিসিএম) বিকাশ প্রাচীন মিসরের চিকিৎসা-ঐতিহ্যের সঙ্গে সমান্তরালভাবে এগিয়েছে। টিসিএমে রসুনের চিকিৎসাগুণের স্বীকৃতি খ্রিস্টপূর্ব ২৬০০ সাল থেকেই পাওয়া যায়। সে সময় এক সম্রাট এটিকে বিষনাশক অলৌকিক কার্যকারিতার জন্য চিহ্নিত করেন। সম্রাট হুয়াং-তি, চীনের এক কিংবদন্তি শাসক, সাংস্কৃতিক পথপ্রদর্শক ও চীনা চিকিৎসা জ্ঞানের জনক বলে বিবেচিত। তার আবিষ্কারের ওপর ভিত্তি করেই টিসিএমের নীতিমালা গড়ে ওঠে, যা পরে হুয়াং-তি চিং (সম্রাটের মৌলিক ওষুধ) নামে লিপিবদ্ধ করা হয়। কথিত আছে, একদিন হুয়াং-তি তার অনুসারীদের নিয়ে বাইরে হাঁটছিলেন। এ সময় সবাই ইউ-ইউ নামের একটি ফলের পাতা খান। পাতাটি বিষাক্ত হওয়ায় সবাই অসুস্থ হয়ে পড়েন। হুয়াং-তি কাছাকাছি বুনো রসুন গাছ দেখতে পান। তার নির্দেশে অসুস্থ সবাই রসুন খান এবং সবাই সুস্থ হয়ে ওঠেন। এ ঘটনার পর সম্রাট রসুনকে চাষাবাদের আওতায় আনার উদ্যোগ নেন। রসুন চাষের এ উদ্যোগের ফলে পরে এটি ব্যাপকতা লাভ করে। বর্তমানে চীন কম উৎপাদন ব্যয় ও উচ্চ দেশীয় চাহিদার কারণে বিশ্বের সবচেয়ে বড় রসুন উৎপাদক দেশ।
চীনারা রসুনকে তাদের প্রতিবেশী কোরিয়ায় নিয়ে যায়। সেখানে এটি ব্যাপকভাবে চাষ হয়। আজকের দিনে কোরিয়ানরা মাথাপিছু রসুন খাওয়ার ক্ষেত্রে বিশ্বের সেরা, তারা বিখ্যাত রসুনসমৃদ্ধ কিমচির কারণে তারা বছরে গড়ে ২২ পাউন্ড রসুন খায়। তার বিপরীতে একজন আমেরিকান বছরে মাত্র আড়াই পাউন্ড রসুন খায়।
কোরিয়ানরা রসুনকে জাপানে পরিচয় করায়। অবশ্য প্রথম কয়েক শতাব্দী এটি জাপানে খাদ্য হিসেবে খুব জনপ্রিয়তা পায়নি। তবু রসুনের চিকিৎসাগুণে কাম্পো—জাপানের ভেষজভিত্তিক চিকিৎসা ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত হয়। কাম্পো চীনা টিসিএমের ওপর ভিত্তি করে গঠিত হলেও এতে ভেষজ গবেষণা ও ব্যবহারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়। কাম্পো চিকিৎসা জাপানের জাতীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থার অংশ এবং জাপানি মেডিকেল স্কুলে এটি পড়ানো হয়। জাপানে রসুনকে এত শক্তিশালী মনে করা হয় যে এটিকে তারা ওষুধের মর্যাদা দিয়েছে।
রবিন চেরির গবেষণামতে, চীনের তিয়ান শান পর্বতমালা থেকে আরো দক্ষিণমুখী পথ ধরে রসুন ভারতে প্রবেশ করে। সম্ভবত চীনে আগমনকালের কাছাকাছি সময়েই ভারতে আসে। প্রমাণ হিসেবে রবিন চেরি উল্লেখ করেন যে ভারতে রসুনের চিকিৎসাগত গুরুত্ব পাওয়ায় তিনটি প্রাচীন চিকিৎসাপদ্ধতি—সিদ্ধ বা ভিত্তি, আয়ুর্বেদ ও ইউনানিতে। সিদ্ধ চিকিৎসাপদ্ধতি খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ বা সপ্তম শতাব্দীর, যা বিশ্বের প্রাচীনতম চিকিৎসাশাস্ত্রগুলোর একটি; এর অপেক্ষাকৃত নবীন সহোদর আয়ুর্বেদ প্রায় দুই হাজার বছরের পুরনো। উভয় পদ্ধতিতেই সুস্বাস্থ্যকর হৃৎপিণ্ড বজায় রাখা ও রক্ত পরিশুদ্ধ করার জন্য রসুন সেবনের পরামর্শ দেয়া হয়েছে।
ভারতের তৃতীয় চিকিৎসা-ঐতিহ্য ইউনানি মূলত প্রাচীন গ্রিক চিকিৎসা ব্যবস্থা, যা গত তেরো শতকে মুসলিম বিশ্বে বিকশিত হয়েছে। এ ঐতিহ্যকে প্রসারিত করেন বিশিষ্ট ইসলামী চিকিৎসক ইবনে সিনা, যিনি হিপোক্রেটিস ও গ্যালেনের শিক্ষার ওপর ভিত্তি করে নিজের তত্ত্ব গড়ে তোলেন। ইউনানি চিকিৎসায় পক্ষাঘাত ও পেটব্যথা থেকে শুরু করে আলসার ও স্মৃতিহীনতা পর্যন্ত নানা রোগের চিকিৎসায় রসুন ব্যবহৃত হয়।
‘তাকুনিয়াম স্যানিতাতিস’-এ রসুনের উপকারিতা প্রসঙ্গেছবি: হ্যাকনি সিটিজেন
মধ্যযুগে ইউরোপে রসুন
সুসান ময়ার্সের বর্ণনা মতে, রোমান সৈন্যরা উত্তর ইউরোপের বিজিত অঞ্চলে রসুন নিয়ে আসে। সামরিক দখলদারদের চাহিদা মেটাতে স্থানীয় মানুষ রসুন ও পেঁয়াজের মতো অন্যান্য সবজি চাষ শুরু করে। সৈন্যরা চলে যাওয়ার পরও এসব চাষ অব্যাহত থাকে। ডেনমার্কসহ ভাইকিংদের (উত্তর ইউরোপের স্ক্যান্ডিনেভীয় জনগোষ্ঠীর সমষ্টি—তারা মূলত নরওয়ে, ডেনমার্ক ও সুইডেনের বাসিন্দা) জমিতেও রসুন চাষের তথ্য পাওয়া যায়। পিজি ফুয়েট তার দ্য ভাইকিং অ্যাচিভমেন্ট শীর্ষক গ্রন্থে জানিয়েছেন ভাইকিংদের সমাজে পেঁয়াজজাতীয় উদ্ভিদগুলোর মধ্যে রসুন খুবই জনপ্রিয় ছিল।
রোম পতনের পর ঔষধি গাছপালার জ্ঞান মূলত খ্রিস্টান সন্ন্যাসীরাই সংরক্ষণ করেছিলেন। তারা মঠ ও ধর্মশিক্ষালয়ের বাগানে এসব গাছ লাগাতেন। ওয়ালাফ্রিড স্ট্রাবো (৮০৯-৮৪৯ খ্রি.) হরতুলাস পাণ্ডুলিপিতে রাইখেনাউ মঠের বাগানের রসুনসহ নানা ঔষধি গাছের আলোচনা আছে। মধ্যযুগীয় আয়ারল্যান্ডে কোষ্ঠকাঠিন্যের ওষুধ হিসেবে মুরগির স্যুপে রসুন সেদ্ধ করার উল্লেখও পাওয়া যায়।
ইংল্যান্ডের মধ্যযুগীয় পাণ্ডুলিপিতে রসুনের রেসিপি প্রচুর। বারো শতকে আলেকজান্ডার নেকহ্যাম লিখেছিলেন, রোস্ট করা মুরগির জন্য রসুনের সস ব্যবহার করা উচিত নয়, কিন্তু হাঁসের জন্য রসুনের সস অপরিহার্য; কবুতর রান্নায় রসুন ও অন্যান্য ভেষজ মিশিয়ে পাউরুটি দিয়ে পুর দিতে হবে।
চৌদ্দ শতকে উইলিয়াম ল্যাংল্যান্ডের পিয়ার্স প্লম্যান–কাব্যে রসুনকে সাধারণ মানুষের ব্যবহৃত মসলা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ইংল্যান্ডে পাওয়া সবচেয়ে প্রাচীন সালাদের রেসিপি দ্য ফর্ম অব কুরি ((১৩৯৩) শীর্ষক গ্রন্থ। বইতে রাজা রিচার্ড দ্বিতীয়র দরবারের রান্নার বিবরণীতে রসুনের কথা উল্লেখ আছে। ১৫০০ সালের দিকে লেখা ফরমন্ড লিস্টে বাগানের জন্য প্রয়োজনীয় ৪৮টি উদ্ভিদের তালিকায় রসুন, চিভ, লিকের নাম রয়েছে।
রেনেসাঁ যুগ (চতুর্দশ থেকে ষোড়শ শতাব্দী)
রেনেসাঁ যুগে ইউরোপে ‘ফিজিক গার্ডেন’ নামে চিকিৎসাবিদ্যার বাগান গড়ে তোলা হয়। সেখানে রসুনসহ বহু উদ্ভিদ চাষ করা হতো। এসব বাগান জুরিখসহ (১৫৬০) প্যারিসের (১৫৯৭) বিভিন্ন শহরে করা হয়। প্যারিসের বাগানটিকে ১৬২৫ সালে নাম বদলে বিখ্যাত ‘জাদাঁ দে প্লান্ত’ করা হয়।
ইতালির সিয়েনার চিকিৎসক পিয়েত্রো ম্যাত্তেলি (১৫০১-১৫৭৭) প্রথম দিকের ওষুধবিষয়ক গ্রন্থ লেখেন। তিনি উষ্ণ প্রকৃতির মানুষের জন্য রসুন না খাওয়ার পরামর্শ দেন। তবে তিনি হজমের সমস্যা, কৃমি, কিডনির পাথর এবং প্রসব-পরবর্তী জমাট রক্ত বের করতে রসুন ব্যবহারের কথা লিখেছেন। তার বই জার্মান ভাষায় ১৫২৬ এবং চেক ভাষায় ১৫৬২ সালে অনূদিত হয়।
রাশিয়ার জারতন্ত্রে লুই চতুর্দশের ফরাসি দরবারের মতোই বিলাসী ভোজসভার আয়োজন থাকত। ‘মস্কোভি’ নামে পরিচিত ষোলো শতকের রাজদরবারে রাজহাঁস ও ময়ূরের মতো বিরল পাখি পরিবেশন করা হতো; তাতে রসুন ব্যবহার করা হতো। নেপোলিয়নের প্রভাবের ফলে উনিশ শতকে রুশ রন্ধনশৈলীতে ফরাসি প্রভাব আসে, যা রসুনের মর্যাদা বৃদ্ধি করে।
ফরাসি, স্প্যানিশ, ইতালীয় এবং পূর্ব ইউরোপীয়রা রান্নায় রসুন ব্যাপকভাবে ব্যবহার করলেও ব্রিটিশ উচ্চবিত্তরা একে নিন্দা করতেই থাকে। তাদের মতে, রসুন শুধু নাবিকদের খাবার, কারণ এটি বমি প্রশমিত করে। তবে কিছু ব্যতিক্রমও ছিল। রানী এলিজাবেথ যুগের থমাস মুফেট লিখেছিলেন, ‘চার মাসের বেশি বয়সী হাঁস খেলে রসুনের সস, ব্যায়াম ও মদ ছাড়া সেটি হজম হয় না।’ শেকসপিয়রের রচনায়ও রসুন নিয়ে তার সমকালের মনোভাবের প্রতিফলন দেখা যায়। তার নাটক আ মিডসামার নাইটস ড্রিমে বটম চরিত্র সতর্ক করে দিয়ে বলে: ‘প্রিয় অভিনেতারা, রসুন বা পেঁয়াজ খেয়ো না, আমাদের নিশ্বাস সুগন্ধি হওয়া দরকার।’
আমেরিকায় রসুন
রসুনের বন্য স্বজন প্রজাতিকে স্থানীয় আমেরিকানরা খাদ্য ও ওষুধ— উভয়ভাবেই ব্যবহার করত। প্রকৃত রসুন উত্তর বা দক্ষিণ আমেরিকার নিজস্ব উদ্ভিদ নয়। তবে বন্য রসুন ও আরো কয়েকটি সমগোত্রীয় জাত সেখানে ছিল। বুনো প্রজাতির রসুন উত্তর আমেরিকার পূর্ব ও মধ্যাঞ্চলে কানাডার নিউ ব্রান্সউইক ও অন্টারিও থেকে শুরু করে দক্ষিণে ফ্লোরিডা এবং পশ্চিমে টেক্সাস পর্যন্ত জন্মায়।
স্থানীয় আমেরিকানদের বিভিন্ন নথিতে দুই প্রজাতির বন্য রসুনের উল্লেখ পাওয়া যায়। এগুলো হলো অ্যালিয়াম ক্যানাডেন্স ও উড অ্যালিয়াম। উড অ্যালিয়াম বিশেষভাবে বিখ্যাত মার্কিন আদিবাসী গোষ্ঠী এবং উত্তর আমেরিকার পূর্ব-মধ্যাঞ্চলের ইউরোপীয় বসতিদের মধ্যে ব্যবহারের জন্য। ইরোকুইস জনগোষ্ঠীর খাদ্যতালিকায় সেদ্ধ বন্য লিক ও বন্য রসুনের উল্লেখ আছে। ১৬৭৪ সালে গ্রিন বে থেকে শিকাগো যাওয়ার পথে যাজক মারকেট ও তার সঙ্গীরা বুনো জাতের এ দুই প্রকার রসুন সংগ্রহ ও খেয়েই কঠিন পরিবেশে বেঁচে ছিলেন এমন তথ্য পাওয়া যায়।
১৮০৪-০৬ সালে অনুসন্ধানমূলক গবেষণায় বের হওয়া লুইস ও ক্লার্ক তাদের জার্নালে লিখেছেন, কিছু বন্য প্রজাতির রসুন খেলে পেট ফাঁপা দূর হয়। পরের দিকে ১৮৫০ সাল থেকে নিউইয়র্ক শেকারদের ভেষজ পণ্যের তালিকায় রসুন অন্তর্ভুক্ত ছিল। উল্লেখ্য, শেকার খ্রিস্টান ধর্মীয় সম্প্রদায়, যারা আঠারো ও উনিশ শতকে যুক্তরাষ্ট্রে বিশেষভাবে পরিচিত ছিল। শেকারদের প্রভাব আমেরিকার কৃষি, ভেষজ চিকিৎসা, নকশা, স্থাপত্য ও সমবায়ী অর্থনৈতিক ধারণায় দীর্ঘস্থায়ী।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিভিন্ন অভিবাসী সংস্কৃতির মিশ্রণ ঘটে। এ সময় আমেরিকান খাদ্যে রসুনের সম্মানজনক অবস্থান তৈরি হয়। এশীয় অভিবাসনে ভারত, চীনা ও থাই খাবারের জনপ্রিয়তা বাড়ে। এসব খাবারে প্রচুর রসুন ব্যবহার হয়।
প্রাচীন, মধ্যযুগ পেরিয়ে রসুন এখন বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় মসলা। প্রতি বছর এত রসুন উৎপাদন ও সংগ্রহ করা হয় যে তা দিয়ে পৃথিবীর প্রতিটি মানুষকে দিনে অর্ধেক কোয়া করে রসুন দেয়া সম্ভব। রসুনের ইতিহাস ও বিভিন্ন দেশে বিস্তৃত হওয়ার তথ্য থেকে বলা যায়, এটি কেবল একটি মসলা নয়, বরং মানবসভ্যতার বিভিন্ন যাত্রাপথ ও অগ্রগতিতে সাংস্কৃতিক, চিকিৎসাগত ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব বহন করে এসেছে। প্রাচীন মিসর, চীন ও ভারত থেকে শুরু করে মধ্যযুগীয় ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকার আদিবাসী সমাজ—সবাই রসুনকে খাদ্য ও ওষুধের অংশ হিসেবে গ্রহণ করেছে। এর উৎপত্তিকাল নিয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য না থাকলেও গবেষণাগুলো ইঙ্গিত করে যে মধ্য-পশ্চিম এশিয়া ও দক্ষিণ-পশ্চিম সাইবেরিয়া অঞ্চল থেকে রসুন পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে বিস্তৃতি লাভ করে। বাণিজ্য, যুদ্ধ, উপনিবেশ, সাংস্কৃতিক বিনিময় এবং অভিবাসনের প্রতিটি পর্যায়ে রসুন মানুষের খাদ্য-সংস্কৃতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত থেকেছে। আধুনিক যুগে এশীয় রান্নার প্রভাব ও বৈশ্বিক কৃষি-বাণিজ্যের সম্প্রসারণ রসুনের চাহিদাকে বহুগুণ বাড়িয়েছে। দীর্ঘ ঐতিহাসিক পথচলায় রসুন বর্তমানে একটি বৈশ্বিক ফসল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।
বাশার খান: সহসম্পাদক, বণিক বার্তা