ঈশা খাঁর এগারসিন্দুর ও জঙ্গলবাড়ি দুর্গ

বাংলার বারোভূঁইয়ার আলোচনা এলে প্রথম নামটি আসে ঈশা খাঁর। তাকে কেউ ঈসা খান, কেউ ঈশা খাঁ লিখে থাকেন। নামের বানান যা-ই হোক না কেন, তিনি ছিলেন ষোড়শ শতাব্দীর বাংলার প্রধান ভূস্বামীদের একজন।

বাংলার বারোভূঁইয়ার আলোচনা এলে প্রথম নামটি আসে ঈশা খাঁর। তাকে কেউ ঈসা খান, কেউ ঈশা খাঁ লিখে থাকেন। নামের বানান যা-ই হোক না কেন, তিনি ছিলেন ষোড়শ শতাব্দীর বাংলার প্রধান ভূস্বামীদের একজন। অনেক ইতিহাসবিদ ও সমাজ বিশ্লেষক তাকে ষোড়শ শতাব্দীর বাংলার প্রধান ভূঁইয়াও বলে থাকেন। তার জন্ম ও পরিবার নিয়ে পর্যটকরা নানা তথ্য দিয়েছেন। আবুল ফজলের মতে, তিনি আফগান, আবার কোনো কোনো সূত্রে তার পূর্বপুরুষ হিসেবে বাইশওয়াড়া রাজপুত গোত্রের নাম পাওয়া যায়। তবে এতসব তথ্যে না গিয়েও আমরা ইতিহাসের পাতায় চোখ বোলালে দেখি পূর্ববঙ্গের একটি বড় এলাকা ছিল ঈশা খাঁর শাসনে। এর মধ্যে বর্তমান ঢাকা যেমন ছিল, তেমনি ছিল বৃহত্তর ময়মনসিংহ।

বাংলায় পূর্ণাঙ্গভাবে মোগল আধিপত্য প্রতিষ্ঠা হয় সপ্তদশ শতাব্দীতে বাদশাহ জাহাঙ্গীরের শাসনামলে তার সুবাদার ইসলাম খানের হাত ধরে। এর আগে আকবর দীর্ঘদিন চেষ্টা করেছেন কিন্তু বাংলায় তার দবদবা তৈরি করার সুযোগ পাননি। এর অন্যতম কারণ ছিল বাংলার বারোভূঁইয়ারা। তাদের মধ্যে আবার প্রধান ছিলেন ঈশা খাঁ।

এ ভূস্বামীর সূচনার ইতিহাসের দিকে লক্ষ করলে স্পষ্ট ইতিহাস তেমন মেলে না। শুরুতে তাকে সরাইলের জমিদার রূপে পাওয়া যায়। সরাইল বর্তমান ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় অবস্থিত। কথিত আছে, ঈশা খাঁর পিতা কালিদাস গজদানী ছিলেন আলাউদ্দীন হোসেন শাহর জামাতা। সে সূত্রে ধর্মান্তরিত হন কালিদাস এবং তার নাম হয় সোলায়মান খাঁ। তিনি শ্বশুর সূত্রে সরাইলের জমিদারি পেয়েছিলেন। এরপর ইসলাম শাহর শাসনামলে তাজ খান অভিযান করে সোলায়মানকে পরাজিত করেন এবং তার দুই পুত্র ঈশা খাঁ ও তার ভাইকে বন্দি করে তুরানে দাস হিসেবে বিক্রি করেন। পরে তাজ খানের শাসনামলে তাদের ফেরত আনেন তাদের এক চাচা।

বস্তুত কালিদাসের ধর্মান্তর হওয়া, ঈশার দাস হিসেবে বিক্রীত হওয়া ইত্যাদি বিষয় ভুল বলে প্রমাণ করেছেন ইতিহাসবিদ মোহাম্মদ মোহর আলী। তবে তা ভিন্ন আলাপ। বর্তমান আলোচনার প্রাসঙ্গিকতা ধরে রাখতে এটুকু জানিয়ে রাখা যায় ঈশা খাঁ ছিলেন একজন আফগান এবং দিল্লিতে মোগল শাসনের সূচনাকালে আফগানরা বাংলায় জমায়েত হয়েছিলেন। সে সময় সরাইলের জমিদারি পান ঈশা খাঁ এবং পরে তিনি সোনারগাঁ দখল করেন। ধীরে উত্তর অংশের আরো ভূমি তিনি নিজ অধিকারে নেন।

তবে ময়মনসিংহ জেলা গেজেটিয়ার (নুরুল ইসলাম খানের সম্পাদনায় ১৯৯২ সালে প্রকাশিত) বলছে, ‘ঈশা খান কররানী-বংশের প্রতিষ্ঠাতা নরপতি তাজ খান কররানীর বিশেষ অনুগ্রহে দাসত্ব থেকে মুক্তিলাভ করে ভাটী অঞ্চলের (ঢাকা-ময়মনসিংহ জেলার পূর্বাংশে) জমিদারীপ্রাপ্ত হন। তিনি কররানী সুলতানগণের অধীনে জমিদার হিসাবে জীবন শুরু করলেও স্বীয় বুদ্ধি ও বিচক্ষণতার দ্বারা শীঘ্রই সোনারগাঁও অঞ্চলের একজন ক্ষমতাশালী জমিদার হিসেবে পরিগণিত হন।’

জঙ্গলবাড়িতে ঈশা খাঁর তৈরি মসজিদ ও দিঘি ছবি: উইকিমিডিয়া কমনস

ঈশা খাঁর ইতিহাসে মন দিলে বলতে হয় এ তথ্যে কিছু ভুল আছে। তিনি মূলত আফগান এবং ওই সময় আফগানরা বাংলায় ক্ষমতাসীন হয়েছিল। ফলে ‘মুক্তিলাভ’ ও তাজ খানের কৃপার আলাপ এড়িয়ে আমাদের মনোযোগের বিষয় হতে পারে ঈশা খাঁর শাসনাধীন অঞ্চল। অর্থাৎ ঢাকা ও ময়মনসিংহ।

লেখার শুরুতেই বলা হয়েছে ঈশা খাঁর অধীনে ছিল বৃহত্তর ময়মনসিংহ। ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলে দেখা যায়, তিনি অচিরেই (মোটামুটি ওই শতকের আটের দশকে) কিশোরগঞ্জ মহকুমার জঙ্গলবাড়ি দুর্গটি দখল করেন। এ দুর্গ তিনি দখল করেছিলেন সেখানকার কোচ রাজাকে পরাজিত করে। কামরূপের ইতিহাস লেখক রাই কেএল বড়ুয়া বাহাদুর লিখেছেন, ‘১৫৪৮ খ্রিস্টাব্দের ভিতর তিনি পশ্চিম সিলেট, সমগ্র ত্রিপুরা, পূর্ব ঢাকা এবং ময়মনসিংহ জেলার অধিপতি হন।’ সে সূত্রে আমরা বলতে পারি ঢাকার পাশাপাশি ঈশা খাঁর শাসন অঞ্চল মূলত ময়মনসিংহ।

ঈশা খাঁর শাসন অঞ্চল নিয়ে ইতিহাসবিদরা লিখেছেন তিনি বাইশ পরগনার অধিপতি ছিলেন। এগুলো বিশ্লেষণ করে বর্তমান লেখকের মত হলো মূলত ঢাকার পূর্বাংশ, বর্তমান নারায়ণগঞ্জ থেকে শুরু করে উত্তরে কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ হয়ে উত্তর-পশ্চিমে টাঙ্গাইল, জামালপুর ও শেরপুরের পূর্বাংশের কিছুটা নিয়ে গঠিত ছিল ঈশা খাঁর জমিদারি বা শাসন অঞ্চল। ঈশা খাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত দুর্গ এগারসিন্দুর বা এগারসিন্ধুর অবস্থান এ অঞ্চলেই।

বর্তমানের এগারসিন্দুর নাম হলেও প্রচলিত আছে এ অঞ্চলে ১১টি নদী একত্র হওয়ায় এর নাম হয়েছিল এগারসিন্ধু। পরে অপভ্রংশ হয়ে এর নাম হয় এগারসিন্দুর। এটি মূলত বর্তমান ঢাকা বিভাগের কিশোরগঞ্জ জেলার পাকুন্দিয়া উপজেলার একটি গ্রাম। আবুল ফজলের আকবরনামায় এর উল্লেখ পাওয়া যায়। এখানেই ঈশা খাঁ একটি বন্দর তৈরি করেন এবং বাংলা অঞ্চলের বাণিজ্যে বন্দরটি ভূমিকা রেখেছিল।

ময়মনসিংহ ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে ঈশা খাঁর শাসন ও প্রভাব নিয়ে লিখেছেন পরিব্রাজক র‍্যালফ ফিচ। তিনি ঈশা খাঁকে দেখেছেন ভাটি অঞ্চলের একজন প্রধান শাসক ও মোগলদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ সংগঠকদের প্রধান হিসেবে। আকবর তার সেনাপতি খান-ই-জাহান হোসেন কুলী বেগ, শাহবাজ খান, ওয়াজির খান ও মান সিংকে বাংলায় প্রেরণ করেন। খান-ই-জাহানের সঙ্গে দাউদের যুদ্ধ হয়, দাউদ পরাজিত হন কিন্তু বাংলার বারোভূঁইয়াদের পরাজিত করা সম্ভব হয়নি। এরপর শাহবাজ ও ওয়াজির খানও টানা আক্রমণ চালান। ঈশা খাঁ এ সময় কখনো এগারসিন্ধু, কখনো জঙ্গলবাজি দুর্গকে কাজে লাগিয়ে এসব আক্রমণ প্রতিহত করেছেন। সর্বশেষ মান সিংয়ের সঙ্গে তার যুদ্ধ হয় এবং এতে মান সিং পরাজিত হন।

মান সিংয়ের সঙ্গে ঈশা খাঁর যুদ্ধ নিয়ে প্রচলিত কিংবদন্তি হলো মান সিং তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে এলে ঈশা খাঁ বলেছিলেন, এ যুদ্ধে বহু লোক ও সম্পদ ক্ষয় হবে। তার চেয়ে দুই সেনাপতি দ্বন্দ্বযুদ্ধ করা ভালো। সে দ্বন্দ্বযুদ্ধে মানের তরবারি পড়ে গেলেও ঈশা তাকে হত্যা না করে আরেকটি তরবারি নিয়ে যুদ্ধ করার সুযোগ দিলে ঈশার বীরত্ব ও মহানুভবতায় মুগ্ধ মান আর যুদ্ধ করেননি। তিনি ঈশাকে নিয়ে গিয়েছিলেন আগ্রায়। ইতিহাসবিদ মোহর আলী এটিকে নিছক কিংবদন্তি হিসেবে চিহ্নিত করেন। তবে প্রচলিত ইতিহাস অনুসারে এ দ্বন্দ্ব যুদ্ধ হয়েছিল এগারসিন্ধু দুর্গে। কিশোরগঞ্জে অবস্থিত হলেও এটি সে সময় বৃহত্তর ময়মনসিংহেরই অংশ ছিল।

ঈশা খাঁর সঙ্গে জড়িত আরেকটি ঐতিহাসিক স্থান হলো জঙ্গলবাড়ি দুর্গ। এটিও কিশোরগঞ্জে অবস্থিত। একে ঈশা খাঁর দ্বিতীয় রাজধানী বলা হয়। মূলত ১৫৮৫ খ্রিস্টাব্দে ঈশা খাঁ তৎকালীন কোচ রাজা লক্ষ্মণ হাজরা ও রাম হাজরাকে পরাজিত করে জঙ্গলবাড়ি দুর্গ দখল করেন।

তবে এ দুর্গের নির্মাণশৈলী ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্য দেখে ধারণা করা হয় এর নির্মাতা কোচ রাজারা নন। ঈশা তো অবশ্যই নন, কেননা তিনি দখল করেছিলেন। দুর্গের নির্মাণশৈলী থেকে ধারণা করা হয়, এটি প্রাক-মুসলিম যুগে নির্মিত। তবে ঈশা খাঁর হাতে দুর্গটি যাওয়ার পর তিনি এর সংস্কার তো করেনই, সঙ্গে নতুন কিছু সংযোজনও করেন। এ দুর্গের দক্ষিণ, পশ্চিম ও উত্তর দিকে গভীর পরিখা খনন করা আছে। পরিখাটি পূর্ব দিকে নরসুন্দা নদীর সঙ্গে যুক্ত। দুর্গের সামনে ঈশা খাঁর সময়ে খনন করা একটি দিঘি আছে। এ দিঘির পাশেই আছে তিন গম্বুজবিশিষ্ট একটি মসজিদ। ধারণা করা হয়, ঈশা খাঁই মসজিদটি নির্মাণ করেছেন। মসজিদটিতে রয়েছে মোগল স্থাপত্যশৈলীর ছাপ। মসজিদের পাশেই ঈশা খাঁর বংশধরদের বাঁধানো কবর রয়েছে।

ঈশা যখন জঙ্গলবাড়ি দখল করেন, সে সময় কোচ রাজারা ওই অঞ্চলে শক্তিশালী ছিল। কোচদের দখলে ছিল ময়মনসিংহের একটি বড় অংশ। কোচ রাজাদের পরাজিত করার মাধ্যমে জঙ্গলবাড়ি দুর্গ দখলের পাশাপাশি ময়মনসিংহের একটি বড় অংশের ওপর ঈশা খাঁর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। বলা চলে এর মধ্য দিয়েই তিনি বৃহত্তর ময়মনসিংহে তার আধিপত্য বাড়িয়েছিলেন। বস্তুত ঢাকা বা সোনারগাঁ ঈশা খাঁর রাজধানী বা শাসন কেন্দ্র বলা হলেও তার শাসনকালের একটা বড় অংশ তিনি জঙ্গলবাড়ি ও এগারসিন্ধুকে ব্যবহার করেছিলেন এবং তার শাসন অঞ্চলের মধ্যে ময়মনসিংহ ছিল সবচেয়ে বড় অংশ।

মাহমুদুর রহমান: লেখক ও সাংবাদিক

আরও