‘দর্শন হলো সত্য ও বাস্তবতা সম্পর্কে জ্ঞান। দার্শনিকের তাত্ত্বিক জ্ঞানের লক্ষ্য হলো সত্যকে অর্জন করা এবং তার ব্যবহারিক জীবনে সত্য অনুসারে আচরণ করা।’
কথাটি বলেছেন আবু ইউসুফ ইয়াকুব ইবনে ইসহাক আল-কিন্দি। যিনি আল-কিন্দি নামেই জগৎখ্যাত। বিস্তর লেখালেখি ও যাপিত জীবনের মধ্য দিয়ে তিনি প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের দার্শনিক তৎপরতায় প্রভাব ফেলে গিয়েছেন। মূলত তার হাত ধরেই দর্শনশাস্ত্র মুসলিম সংস্কৃতির অংশ হিসেবে স্বীকৃত হয়। তিনি যে পথে যাত্রা শুরু করেছেন, সেই পথেই পরবর্তী সময়ে যুক্ত হন আল-ফারাবি, ইবনে সিনা, ইবনে রুশদ, আল-রাজি ও ইবনে বাজার মতো উজ্জ্বল সব নাম। আর এজন্যই ঐতিহাসিকরা প্রায়শ আল-কিন্দিকে আরবদের দার্শনিক বা ‘প্রথম আরব দার্শনিক’ হিসেবে অভিহিত করেন ।
অষ্টম ও নবম শতাব্দীতে আল-কুফা এবং বসরা ছিল মুসলিম সংস্কৃতির প্রধান দুটি কেন্দ্র। কুফা ছিল যুক্তিবাদী অধ্যয়নের প্রতি বেশি আগ্রহী। আর তেমন বৌদ্ধিক পরিবেশে আল-কিন্দি তার শৈশবকাল অতিবাহিত করেন। ছোটবেলা থেকেই তিনি বিজ্ঞান ও দর্শনের প্রতি বেশি আগ্রহী ছিলেন; বিশেষ করে বাগদাদে যাওয়ার পর তিনি তার বাকি জীবন এ কাজেই উৎসর্গ করেছিলেন। বাগদাদে তিনি ছিলেন আব্বাসীয় খলিফা আল-মামুন, আল-মু’তাসিমের দরবারে। সেটা ছিল মুসলিম আমলের বৌদ্ধিক বিকাশের অন্যতম সেরা সময়। আল-কিন্দি তার কালপর্বের সর্বোচ্চ উৎকর্ষকে ব্যবহার করেছেন।
এটা সত্য যে তিনি নব্য-প্লেটোনিক অ্যারিস্টটলীয়বাদ থেকে তার ধারণাগুলো পেয়েছিলেন। তবে তিনি সেই ধারণাগুলোকে সাজিয়েছিলেন সম্পূর্ণ নতুন প্রেক্ষাপটে। যেমন তিনি অ্যারিস্টটলের আনমুভড মুভার (Unmoved Mover) ধারণাকে তিনি প্রতিস্থাপন করেছেন সৃষ্টিকর্তার ধারণা দিয়ে। এভাবে হেলেনীয় ঐতিহ্যকে ইসলামের জ্ঞানতত্ত্বের সঙ্গে একত্র করে তিনি স্থাপন করেছেন দর্শনের নয়া ভিত্তি। এ সমঝোতা দীর্ঘকাল ধরে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য দর্শনের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল। আল-কিন্দি মূলত চেয়েছেন দর্শন ও ধর্মের মধ্যকার দূরত্বের মীমাংসা। যুক্তি দর্শনের পদ্ধতি; আর বিশ্বাস ধর্মের পথ। আল-কিন্দি দর্শন ও ধর্মের মধ্যে ঐক্য স্থাপনের পথ বের করতে চেয়েছেন। তার ভাষায়, এ দুইয়ের মধ্যে ঐক্য কয়েকটি যুক্তির ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত। প্রথমত, ধর্মতত্ত্ব দর্শনেরই গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং ধর্মতত্ত্বের সাধনা যুক্তিসংগতভাবে নির্ধারিত তথা দার্শনিকভাবে প্রমাণিত।
তবে আল-কিন্দি যে ধর্ম ও দর্শনের মধ্যে ফারাক করেননি, তা নয়। তার ভাষ্য, ধর্মতত্ত্ব দর্শনের চেয়ে উচ্চতর স্থান অধিকার করে। ধর্ম একটি ঐশ্বরিক বিজ্ঞান এবং দর্শন মানবিক। দার্শনিক যুক্তি প্রমাণের নীতিগুলোর ওপর নির্ভর করে। আল-কিন্দির দৃষ্টিতে কুরআনের যুক্তি ঐশ্বরিক হওয়ায় মানবিক দার্শনিক যুক্তিগুলোর চেয়ে বেশি নিশ্চিত ও বিশ্বাসযোগ্য। কুরআন অনেক গুরুত্বপূর্ণ জিজ্ঞাসার সমাধান দেয়, যেমন শূন্য থেকে বিশ্বের সৃষ্টি এবং পুনরুত্থানের মতো বিষয়গুলো নিয়ে। আল-কিন্দি মনে করেন যে কুরআনের যুক্তিগুলো যেহেতু স্পষ্ট ও ব্যাপক; তাই সেগুলো নিশ্চয়তা ও দৃঢ়তার দিকে পরিচালিত করে। অতএব কুরআনের যুক্তি দার্শনিকের যুক্তির চেয়ে শ্রেষ্ঠ।
আল-কিন্দির দার্শনিক ব্যাখ্যার পথ অনুসরণ করেন আল-ফারাবি, ইবনে সিনা এবং ইবনে রুশদ। আল-কিন্দির বয়ানে খোদা সম্পর্কে নিশ্চিত জ্ঞান হলো দর্শনের চূড়ান্ত লক্ষ্য। টলেমির আলমাজেস্টের ওপর থিওনের ভাষ্যে আমরা স্রষ্টাকে অপরিবর্তনীয়, সরল, অদৃশ্য প্রকৃতির এবং গতির প্রকৃত কারণ হিসেবে বর্ণনা করতে দেখি। আল-কিন্দি বলেছেন, স্রষ্টাই গতির কারণ এবং তিনি চিরন্তন, তিনি নিজেকে না সরিয়েই গতি ঘটান অর্থাৎ অ্যারিস্টটলীয় আনমুভড মুভার (Unmoved Mover)। আল-কিন্দি এভাবে হেলেনীয় দর্শনের ঐতিহ্যকে অনুসরণ করেছেন। তবে আল-কিন্দির মৌলিকত্ব হলো, পরবর্তী নব্য-প্লেটোনিজমে প্রচলিত দার্শনিক ধারণাগুলোর সঙ্গে সৃষ্টিকর্তা বিষয়ে ইসলামী ধারণার মিলন। আল-কিন্দির দর্শন ভাবনায়, স্রষ্টা অপরিবর্তনীয়। তিনি পরম একত্ব, একত্ব ছাড়া আর কিছুই নয়। বাকি সবকিছুই বহুবিধ।
দেখা যায়, আল-কিন্দি সমসাময়িক মুতাজিলাদের মতো যুক্তির আশ্রয়ে খোদার গুণাবলি ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি খোদার অস্তিত্বের জন্য কার্যকারণ তত্ত্বের ওপর নির্ভর করেন, যা কিছু ঘটে তার অস্তিত্বের অবশ্যই একটি কারণ থাকতে হবে। অ্যারিস্টটলের দ্বারা বর্ণিত কারণগুলো হলো বস্তুগত (material), আকারগত (formal), কার্যকর (efficient) এবং চূড়ান্ত (final)। অন্যদিকে আল-কিন্দির দর্শনে খোদা হলেন মানুষ ও বিশ্বজগতের জন্য কার্যকর কারণ। একমাত্র তিনি-ই চিরন্তন। সত্তারা আসে এবং বিলীন হয়ে যায়। সমগ্র বিশ্ব, নক্ষত্র ও বিশ্বজগৎ—কোনোকিছুই চিরন্তন নয়। স্থান ও সময়ের ভেতরে যা কিছু সসীম, সবকিছুই নশ্বর। একমাত্র খোদাই চিরন্তন। আল-কিন্দির চোখে খোদার অস্তিত্বের আরেকটি প্রমাণ হলো সব প্রাকৃতিক প্রাণীর মধ্যে পরিলক্ষিত শৃঙ্খলা। জগতের অন্তর্নিহিত নিয়ম, এর অংশগুলোর শ্রেণীবিন্যাসের স্তর, তাদের মিথস্ক্রিয়া, প্রতিটি সত্তার মধ্যে সবচেয়ে নিখুঁত অবস্থা যা তার সর্বোচ্চ কল্যাণ উপলব্ধি করে—এ সবই প্রমাণ করে যে একজন নিখুঁত সত্তা আছেন যিনি শ্রেষ্ঠতম জ্ঞান অনুসারে সবকিছু পরিচালনা করেন।
অ্যারিস্টটলের দর্শন ব্যবস্থায় জগৎ স্থানের ক্ষেত্রে সসীম কিন্তু সময়ে অসীম। ইসলামী চিন্তাধারায় জগতের অনন্ততা খণ্ডন করা হয়েছে। কারণ ইসলাম বিশ্বাস করে যে জগৎকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আল-কিন্দি দাবি করেছিলেন পৃথিবী চিরন্তন নয়। এ সমস্যার তিনি গাণিতিক ভিত্তিতে অনন্তের ধারণা নিয়ে আলোচনা করে একটি মৌলিক সমাধান দিয়েছেন।
ইরাকে মুদ্রিত স্ট্যাম্পে আল-কিন্দির প্রতিকৃতি, ১৯৬২ ছবি: ইরাকি পোস্ট
আল-কিন্দির আত্মা সম্পর্কে মতবাদ প্লেটো, অ্যারিস্টটল ও প্লোটিনাসের মতবাদ দ্বারা প্রভাবিত। তার ভাষ্য অনুসারে, আত্মা একটি সরল সত্তা। এটি আধ্যাত্মিক ও ঐশ্বরিক পদার্থ এবং দেহ থেকে পৃথক ও স্বতন্ত্র। যখন এটি দেহ থেকে পৃথক হয়, তখন এটি বিশ্বের সবকিছুর জ্ঞান অর্জন করে এবং অতিপ্রাকৃতের দৃষ্টিভঙ্গি লাভ করে। দেহ থেকে পৃথক হওয়ার পর আত্মা বুদ্ধির জগতে যায়, স্রষ্টার আলোতে ফিরে আসে। আত্মা কখনো ঘুমায় না। শুধু যখন শরীর ঘুমিয়ে থাকে, তখন ইন্দ্রিয় ব্যবহার করে না। আর যদি শুদ্ধ হয়, তাহলে আত্মা ঘুমের মধ্যে চমৎকার স্বপ্ন দেখতে পারে এবং নিজের দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে অন্য আত্মার সঙ্গে কথা বলতে পারে। তার কাছে ঘুম মানে ইন্দ্রিয় ব্যবহার ত্যাগ করা। যখন আত্মা ইন্দ্রিয় ব্যবহার ত্যাগ করে এবং কেবল যুক্তি ব্যবহার করে, তখন এটি স্বপ্ন দেখে।
আল-কিন্দির ভাষ্য অনুসারে, আত্মার দুই ধরনের রূপ রয়েছে, বস্তুগত ও অবস্তুগত। প্রথমটি হলো ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য। যখন আত্মা বস্তুগত রূপ অর্জন করে, তখন এটি এর সঙ্গে এক হয়ে যায়, অর্থাৎ বস্তুগত রূপ এবং আত্মা এক ও অভিন্ন হয়ে যায়। একইভাবে যখন আত্মা অজৈব যুক্তিসংগত রূপগুলো অর্জন করে, তখন তারা আত্মার সঙ্গে একত্রিত হয়। এইভাবে আত্মা আসলে যুক্তিসংগত হয়ে ওঠে। এর আগে এটি সম্ভাব্যতার ক্ষেত্রে যুক্তিসংগত ছিল।
আল-কিন্দি এভাবে গ্রিক দর্শন ও ইসলামী বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যের মধ্যে সেতুবন্ধকারী হিসেবে কাজ করেছেন। বিশেষ করে প্লেটো ও অ্যারিস্টটলের দর্শন ও বৈজ্ঞানিক গ্রন্থগুলো আরবিতে অনুবাদ ও ব্যাখ্যার মাধ্যমে তিনি এ জ্ঞানকে বৃহত্তর পাঠকের জন্য সহজলভ্য করে তোলেন। এ প্রচেষ্টা ইসলামী দর্শনের পরবর্তী বিকাশের ভিত্তি গড়ে দেয়। পাশাপাশি তিনি আরবি দার্শনিক পরিভাষার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন এবং ইসলামী জগতে দর্শনচর্চাকে একটি স্বতন্ত্র শাখা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সহায়তা করেন। হেলেনীয় চিন্তার দিকে ঝুঁকে পড়ার কারণে তার সমালোচনা করেছেন বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন চিন্তকরা। তিনি তার চিন্তার পরিণতির চেয়ে চিন্তার বিষয়বস্তু ও প্রক্রিয়া বেশি জরুরি। সেদিক থেকে বললে আধুনিক আরব বিশ্বে মালেক বেন নবি ও তহা আবদুর রহমানের মতো যে দার্শনিকদের তৎপরতা; তার শুরুটা মূলত আল-কিন্দির থেকেই।
আহমেদ দীন রুমি: লেখক