ইউরোপীয়রা সমুদ্রপথে ভারত আবিষ্কারের পর মানচিত্র অনুসরণ করে বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে এ উপমহাদেশে আসতে থাকে। উপমহাদেশের সমৃদ্ধি ও বাণিজ্যের সুযোগ দেখে তারা আকৃষ্ট হন। বিশেষ করে বাংলার সমৃদ্ধ অর্থনীতি ও বন্দর শহরগুলো তাদের মনোযোগ কাড়ে। সতেরো শতকের মাঝামাঝি সময়ে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলায় বাণিজ্য বিস্তারের প্রচেষ্টা শুরু করে। এ সময় ইংরেজ, পর্তুগিজ, ডাচ, ফরাসি ও ডেনিশদের মতো অন্যান্য ইউরোপীয় বণিকরাও বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে বাণিজ্যিক কেন্দ্র গড়ে তুলছিলেন।
বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে আসা ইউরোপীয় বণিকদের চিঠি ও নথিপত্র থেকে জানা যায়, খ্রিস্টানদের পাশাপাশি অনেক ইহুদি ব্যবসায়ীও ভারতীয় উপমহাদেশে এসেছিলেন। পরে ইহুদি ব্যবসায়ীরা কলকাতা ও অন্যান্য জায়গায় স্থায়ীভাবে ব্যবসা শুরু করেন এবং স্থানীয় বাণিজ্যে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন।
আগে বিভিন্ন ইহুদি পণ্ডিতের ভাষ্যে বাংলায় ইহুদিদের বসবাস নিয়ে উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে তার অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। বিভিন্ন গ্রন্থ থেকে জানা যায়, বাংলায় ইহুদিদের বসবাস শুরু হয় বাণিজ্য সূত্রে। দ্য জিউস কোয়ার্টারলি রিভিউ নামে একটি ত্রৈমাসিক জার্নাল থেকে বাংলায় ইহুদিদের অস্তিত্ব সম্পর্কে জানা যায়। জার্নালে উল্লেখ করা হয়, ১৬৭৯ সালে জ্যাকব জেসুরুন আলভারেজ নামে লন্ডনের এক ইহুদি বণিক কলকাতায় জন মেন্ডেজ দ্য কোস্টা নামের আরেক ইহুদি বণিককে দেখতে আসেন। তার পরিবার সে সময়ে পূর্ব ভারতে ব্যবসা পরিচালনা করত।
ইহুদিরা উপমহাদেশে আসার পরে মাদ্রাজের সেন্ট জর্জ দুর্গে একটি ইহুদি বণিক সম্প্রদায় গঠন করেন। তাদের বসবাস ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে সহায়তা করেছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। কোম্পানির দুটি পত্র থেকে বাংলায় ইহুদিদের বাণিজ্য নিয়ে স্পষ্টভাবে জানা যায়। ১৬৮৭ সালের ১২ ডিসেম্বরে মাদ্রাজের সেন্ট জর্জ দুর্গে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তাদের কর্মকর্তাদের উদ্দেশে একটি নির্দেশিকা দেয়। সেখানে উল্লেখ করা হয়, ‘আমরা ইংরেজ, ইহুদি, অন্যান্য বিদেশীকে অনুমতি দিচ্ছি যে তারা চাইলে বাংলার যেকোনো পণ্য ইংল্যান্ডে পাঠাতে পারে।’ ১৬৯৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বরে আরেকটি ঘোষণায় দেখা যায়, ‘আমরা বেনারস, পাটনা, ঢাকা, মৌলদা ও কাশিমবাজার থেকে প্রয়োজনীয় পণ্য সহজেই সংগ্রহ করতে পারব। কারণ আর্মেনীয়, পর্তুগিজ, বেনিয়া, ইহুদি, ডাচ ও ফরাসিরাসহ যারা বাংলায় বসবাস করছে তাদের কাছে বাণিজ্যের অনুমতি রয়েছে। এ সুযোগে তারা আমাদের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক গড়ে তুলতে আগ্রহী হবে। ইংরেজদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন ও অর্থ উপার্জনের সুযোগ তারা হাতছাড়া করতে চাইবে না।’ এ দুই ঘোষণায় ইহুদিদের নাম উল্লেখ করা হয়।
বাংলায় এসব ইহুদি বণিকের ব্যবসা গড়ে ওঠার পেছনে আলভারো দা ফনসেকার উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তিনি ১৬৯৩ সাল থেকে মাদ্রাজের ইহুদি বণিকদের সঙ্গে বাংলায় ব্যবসার প্রসার ঘটান। ১৬৯৪ সালে ইংরেজ কর্মকর্তা জব চার্নক ও আলভারো দা ফনসেকার মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ হয়। একই বছরে উভয়ের মধ্যে বাণিজ্য নিয়ে একটি বড় লেনদেন হয়। আলভারো দা ফনসেকা ও তার সহযোগী ডোমিঙ্গো দ্য কোস্টা মিলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে বাংলায় তৎকালীন ২৫ হাজার মুদ্রা বিনিয়োগের প্রস্তাব দেন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এ প্রস্তাবে অত্যন্ত খুশি হয়। এ প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে সাফির নামক জাহাজে করে পণ্য বোঝাই করে বাংলায় পাঠানো হয়। পণ্য পাঠানোর দায়িত্বে ছিলেন ফনসেকার প্রতিনিধি ডোমিঙ্গো দা কোস্টা। এসব নথিপত্র থেকে বোঝা যায় আলভারো দা ফনসেকা ও তার সহযোগীদের মাধ্যমে বাংলায় ইহুদি বণিকদের বাণিজ্য বিস্তৃত হয়।
আঠারো শতকের মাঝামাঝি সময়ে আব্রাহাম জ্যাকবস নামে এক ইহুদি বণিকের কথা জানা যায়। যিনি আর্মেনীয় বণিক পেত্রোস আরাতুনের সঙ্গে মিলে ‘ব্ল্যাক হোল ট্র্যাজেডির পর ফুলতা আশ্রয় নেয়া ইংরেজ বন্দিদের জন্য খাদ্য ও অন্যান্য জরুরি রসদ পাঠাতেন। যার কারণে তিনি ইংরেজদের কাছে বেশ প্রশংসনীয় ছিলেন। পেত্রোস আরাতুন তার এক চিঠিতে আব্রাহাম জ্যাকবসকে স্পষ্টভাবে একজন ইহুদি বলে উল্লেখ করেছেন।
মাদ্রাজের সেন্ট জর্জ দুর্গ থেকে ইহুদিরা বাংলায় বাণিজ্য পরিচালনা করলেও তারা বাংলায় বসবাস শুরু করেন। যখন লর্ড কর্নওয়ালিস বাংলার গভর্নর জেনারেল হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন, তখন ইহুদি বণকিরা বাংলায় স্থায়ী বসতি গড়ে তোলেন।
আঠারো শতকে এক ইহুদি ব্যক্তির মাধ্যমে বাংলায় পাকাপোক্তভাবে ইহুদি ডায়াস্পোরা গড়ে ওঠে। তার নাম ইসরায়েল লেভিন সলোমনস। তিনি ছিলেন একজন আশকেনাজি ইহুদি। তার আদি নিবাস ছিল আমস্টারডামে। ইসরায়েল লেভিন সলোমনস একসময় আমস্টারডাম ছেড়ে লন্ডনে বসবাস শুরু করেন। লন্ডনে আসার হেস্তার নামে এক নারীকে বিয়ে করে সেখানে ‘দ্য হোয়াইট হাউজ’ নামে একটি বিলাসবহুল ভবনে দাম্পত্য জীবন শুরু করেন। তাদের সংসারে মোট ১০ সন্তান জন্ম নেয়। তাদের মধ্যে ছয়জন ছেলে ও চারজন মেয়ে।
লন্ডনে দীর্ঘ সময় বসবাসের সুবাদে ইসরায়েল লেভিন সলোমনস সেখানে বাণিজ্যিক সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন। পাশাপাশি বনে যান বিপুল সম্পদের মালিক। আঠারো শতকের দ্বিতীয়ার্ধে তিনি ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে সুদৃঢ় বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তোলেন। তিনি জার্মানির বার্লিন, ফ্রাঙ্কফুর্ট, তৎকালীন স্টেটিন, হল্যান্ডের আমস্টারডাম, হেগ, রটারডাম, বেলজিয়ামের ব্রাসেলস, অ্যান্টওয়ার্প, ফ্রান্সের প্যারিস, বোর্দো, ইতালির লিভোর্নো, ইংল্যান্ডের ব্রিস্টল, গ্লাসগো, লিভারপুল, অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা, ডেনমার্কের কোপেনহেগেন, রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গ, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, জ্যামাইকা ও উত্তর আমেরিকার চার্লস্টন, ফিলাডেলফিয়ার ইহুদি বণিকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করতেন এবং ভালো সম্পর্ক বজায় রাখতেন। একইভাবে সলোমনস ভারতীয় উপমহাদেশের বাণিজ্যে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। তিনি মাদ্রাজের সেন্ট জর্জ দুর্গের গুরুত্বপূর্ণ ইহুদি বণিকদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাখেন এবং বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপন করেন। তাদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ দুজন হলেন মোজেস দ্য ক্যাস্ত্রো ও জ্যাকব বার্নেট। এ দুই বণিক বাংলায় ইসরায়েল লেভিন সলোমনসের ব্যবসা বিস্তার করার জন্য তাকে সহায়তা করেছেন। উভয়ের সঙ্গে ইসরায়েল লেভিন সলোমনসের চিঠি চালাচালি হতো। তারা নিয়মিতই ভারতীয় উপমহাদেশের বাণিজ্যের খবর সালোমনসকে অবহিত করতেন। সলোমনসের সঙ্গে প্রথম বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে মোজেস দ্য ক্যাস্ত্রোর।
ক্যাস্ত্রোর পরিবার ছিল লন্ডনের সবচেয়ে শক্তিশালী ও ধনাঢ্য ইহুদি বণিক পরিবারগুলোর একটি। এ পরিবারের সাত ভাই বিশ্বের নানা প্রান্তে হীরার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ভারতীয় উপমহাদেশেও তাদের সমৃদ্ধ বাণিজ্য ছিল। তাদের ব্যবসার জন্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে স্বীকৃতি পান। এ পরিবারের অনেক সদস্য যেমন ড্যানিয়েল, ডেভিড, আইজ্যাক ও বিশেষ করে মোজেস দ্য ক্যাস্ত্রো বহু বছর ধরে মাদ্রাজে বসবাস করেন। তারা ইংল্যান্ড থেকে আমদানি করতেন কোরালের মালা, নানা মূল্যবান পাথর ও রৌপ্যমুদ্রা। বিনিময়ে ভারতে হীরার ব্যবসা পরিচালনার অনুমতি পেতেন। মোজেস সেন্ট জর্জ দুর্গে লন্ডনের ক্যাস্ত্রো পরিবারের শেষ প্রতিনিধি ছিলেন।
ইহুদি রত্ন ব্যবসায়ী। ছবি: আইশ ডটকম
মাদ্রাজে দীর্ঘদিন ব্যবসা-বাণিজ্যের পর একসময় মোজেস দ্য ক্যাস্ত্রো ইংল্যান্ডে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ১৭৮১-৮২ সালের দিকে বেশকিছু চিঠিতে দেখা যায়, মোজেস দ্য ক্যাস্ত্রো মাদ্রাজে অবস্থান করার সময় ইসরায়েল লেভিন সলোমনসের মধ্যে বাণিজ্য নিয়ে কথা হতো। মোজেস ক্যাস্ত্রো যখন মাদ্রাজ থেকে লন্ডনে ফিরে যান, তখন তিনি বিষয়টি সলোমনসকে অবহিত করেন। মোজেস চলে যাওয়ার পর তিনি সম্পর্ক রাখতেন জ্যাকব বার্নেটের সঙ্গে। তবে বার্নেট ইহুদি ছিলেন না। বার্নেট লন্ডনে থাকাকালীন সলোমনসের ব্যবসায়িক সহযোগী ছিলেন। ১৭৭৭ সালে তিনি ব্যবসার উদ্দেশ্যে মাদ্রাজে এসে বসবাস শুরু করেন এবং মাদ্রাজ থেকে পত্রের মাধ্যমে সলোমনসের সঙ্গে নিয়মিত ব্যবসায়িক যোগাযোগ বজায় রাখেন।
মাদ্রাজে দুই বছর অবস্থান করার পর জ্যাকব বার্নেট মাদ্রাজ ত্যাগ করে বেনারসে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ধারণা করা হয়, বার্নেটের মাদ্রাজ ছেড়ে বাংলায় চলে যাওয়ার মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন ইসরায়েল লেভিন সলোমনস। বার্নেট ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছ থেকে বাংলায় বসবাসের অনুমতি লাভ করেছিলেন। বেনারসে যাওয়ার পেছনে তার একটা উদ্দেশ্য ছিল, তিনি সেখানে হীরার ব্যবসা শুরু করবেন। মাদ্রাজ ত্যাগের সময় তিনি লেভিনক অবহিত করে পত্র লেখেন। বার্নেট লেখেন ‘আগামী জানুয়ারিতে আমি মাদ্রাজ ত্যাগ করে বাংলার উদ্দেশ্যে রওনা হব। বাংলার বাণিজ্য নিয়ে খোঁজ নেয়ার পর সেখানে যাওয়ার ব্যাপারে উৎসাহ পেয়েছি। আশা করছি সেখানে আমাদের বাণিজ্য করতে পারব।’
বার্নেট ১৭৮০ সালের শুরুতে বেনারসে পৌঁছান। পরে দ্য ক্যালকাটা গেজেট নামে একটি পত্রিকায় বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে তার বাণিজ্যের কথা ঘোষণা দেন। বিজ্ঞাপনে লেখা হয়, ‘বাংলার গভর্নর জেনারেল ও কাউন্সিলের অনুমতি নিয়ে কলকাতার স্বাধীন বণিক মি. বার্নেট বেনারসে বসবাস শুরু করেছেন। তিনি হীরার বাণিজ্যের অনুমতি পেয়েছেন। তিনি আহ্বান জানাচ্ছেন, যদি কেউ হীরা কেনাবেচা সংক্রান্ত কোনো কাজে সহায়তা চায়, তবে তিনি তাদের প্রয়োজনীয় সেবা দিতে প্রস্তুত।’
বেনারস থেকে বার্নেট ইসরায়েল লেভিন সলোমনসকে বলেন, ‘আমি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে হীরা সংগ্রহ করেছি।’ এসব চিঠিপত্রের মাধ্যমে উভয়ের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক দৃঢ় হয়। পরে ১৭৮০ সালের ১৮ নভেম্বরে বার্নেটের পাঠানো এক চিঠি থেকে বোঝা যায়, বেনারসে তার বাণিজ্যিক কার্যক্রম লাভজনক ছিল। চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, ‘এখানে হীরা বাজার ইতিবাচক দিকে মোড় নিচ্ছে।’
পরবর্তী কয়েক বছর ধরে এভাবে জ্যাকব বার্নেট ও ইসরায়েল লেভিন সলোমনসের মধ্যে যোগাযোগ চলমান থাকে। ফলে সলোমনস সবসময়ই বাংলায় হীরা ও মূল্যবান রত্নপাথরের বাজারের অবস্থা সম্পর্কে ভালোভাবে অবগত থাকতেন। তবে শুধু হীরা ও মুক্তার জোগানদার হিসেবেই নয়, বার্নেট ছিলেন আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দু। বার্নেট বাংলার বাণিজ্যে সক্রিয় হয়ে ওঠার মাধ্যমে লেভিন সলোমনসের মাদ্রাজের বাণিজ্যিক কার্যক্রম বাংলায় স্থানান্তর হয়। বেনারসে বসবাস শুরু করার পর সলোমনস পরিবারের কোনো সদস্যকে ভারতে পাঠানোর জন্য বারবার সলোমনসকে অনুরোধ করেন। যাতে তিনি বার্নেটের সঙ্গে যৌথভাবে বাংলার ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা করতে পারেন।
সে সময় বাংলায় বাণিজ্যিক সুযোগ-সুবিধা ক্রমে বাড়ছিল। এসব খবর জানার পরে বাংলায় ইসরায়েল লেভিন সলোমনসের দৃষ্টি দিন দিন বাড়তে থাকে। বার্নেট ১৭৮০ সালের নভেম্বরে সলোমনসকে লেখা এক চিঠিতে ফের তার পরিবার থেকে তার প্রতিনিধি হিসেবে কাউকে পাঠাতে বলে। বার্নেট লেখেন, ‘আপনি কি আপনার প্রতিনিধি হিসেবে কাউকে বাংলায় পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন? তারা আসার সংবাদ পেলে আমি এখানে সব ধরনের ব্যবস্থা করে রাখব।’
১৭৮০ সালে বার্নেট এ পরামর্শ দেয়ার পরে পরবর্তী পাঁচ বছর বিষয়টিই দুজনের মধ্যে আলোচনার কেন্দ্রে ছিল। অবশেষে ১৭৮৫ সালে সলোমনস এ পরামর্শ বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেন। বার্নেটের কাছ থেকে বাংলায় হীরার ব্যবসার সম্ভাবনা নিয়ে উৎসাহব্যঞ্জক বার্তা পেয়ে এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক সুবিধার কথা বিবেচনায় রেখে ইসরায়েল লেভিন সলোমনস একই বছরে লন্ডনে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদের কাছে বাংলায় বিশেষ করে বেনারসে তার দুজন প্রতিনিধি পাঠানোর আবেদন করেন। যারা কমিশনের ভিত্তিতে অথবা নিজস্ব উদ্যোগে হীরা কেনাবেচার কাজ পরিচালনা করবেন। তবে এসবের পেছনে ইসরায়েল লেভিন সলোমনসের উদ্দেশ্য ছিল, বাংলায় হীরার ব্যবসাকে নতুনভাবে পুনর্গঠন ও শক্তিশালী করে তোলা।
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে ইসরায়েল লেভিন সলোমনসের অনুমতি চাওয়ার প্রয়োজন হয়েছিল একটি রাজনৈতিক কারণে। তখনকার সময়ে বাংলায় ইউরোপীয় সাধারণ বণিকদের জন্য প্রায় নিষিদ্ধ অঞ্চল ছিল। কেবল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মকর্তারা, নির্দিষ্ট পেশাজীবীরা এবং অনেক আর্থিক সামর্থ্যবান ব্যক্তিই বাংলায় বসবাসের বিশেষ অনুমতি পেতেন। বাংলায় ইউরোপীয়দের প্রবেশ এবং বসবাসের সব সিদ্ধান্তই গভর্নর জেনারেলের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণে ছিল।
লন্ডন থেকে ভারতে আসার জন্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মধ্যে নানা রকম বাছাই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হতো। কিন্তু ইসরায়েল লেভিন সলোমনস ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। তিনি বহু বছর ধরে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একজন বৃহৎ অংশীদার ছিলেন। এ কারণে তার আবেদনটি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা হয়। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নির্বাচন কমিটি বিষয়টি খতিয়ে দেখে। যথাযথ যাচাই-বাছাই শেষে কোম্পানির পরিচালকরা তার আবেদন মঞ্জুর করেন। তারা সলোমনসকে বলেন, ‘তিনি যেন তার প্রতিনিধি হিসেবে কাকে বাংলায় পাঠাবেন, সে নাম জানান।’ চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়ার পর ১৭৮৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল লেভিন সলোমনস তার পারিবারিক প্রতিনিধি হিসেবে লিওন প্রেগারের নাম জমা দেন।
এ সিদ্ধান্ত শুধু একজন প্রতিনিধি নিয়োগের ঘটনা ছিল না বরং এটি ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রেক্ষাপটে ইহুদি বণিক সম্প্রদায়ের একটি কৌশলগত অগ্রযাত্রা। এ পদক্ষেপের মাধ্যমে ইসরায়েল লেভিন সলোমনস তার ব্যবসা মাদ্রাজ থেকে বাংলায় স্থানান্তর করেন এবং বাংলাকে ইহুদি বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
রুদ্র ইকবাল: সাংবাদিক, বণিক বার্তা