বলখ, এটি শুধু একটি শহরের নাম নয়, এটি ইতিহাসের হৃদয়ে গাঁথা এক প্রাচীন স্পন্দন, যেখানে ধুলো মাটিজুড়ে প্রতিধ্বনিত হয় জ্ঞানের, সাধনার ও সৃষ্টির চিরন্তন সুর। পৃথিবীর প্রাচীনতম শহরগুলোর একটি হিসেবে বলখ ছিল বাকটিয়ার রাজধানী, যাকে বলা হতো শহরগুলোর জননী। উত্তর আফগানিস্তানের এ ভূখণ্ড ছিল পারস্য, গ্রিক, বৌদ্ধ ও ইসলামী সভ্যতার এক অভূতপূর্ব মিলনস্থল। তবে বলখ মানে কেবল একটি নগর নয়, এটি এক বিস্তৃত অঞ্চল, যার বুকে জন্ম নিয়েছেন এমনসব জ্ঞানতাপস, কবি ও দার্শনিক, যাদের চিন্তা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে জগৎকে আলোকিত করেছে এবং করে যাচ্ছে। তাদের কণ্ঠে উঠে এসেছে আত্মার আকুলতা, মানবতার ব্যথা, আর অন্বেষণের তৃষ্ণা। এ শহরের বাতাসে আজও ভেসে বেড়ায় সে অলৌকিক চেতনাস্রোত। লেখাটিতে আমরা স্মরণ করছি সে বিরল আত্মাগুলোর কথা, যারা বলখের আলোকে হয়ে উঠেছেন সময়ের ঊর্ধ্বে এক অনন্ত অনুপ্রেরণা।
জালাল উদ্দিন রুমি, বলখে জন্ম নেয়া সুফি
জালাল উদ্দিন মুহাম্মদ রুমি (১২০৭-৭৩) একটি নাম, যার মধ্যে নিহিত রয়েছে প্রেম, বেদনা ও আধ্যাত্মিক জাগরণের এক অবিস্মরণীয় ইতিহাস। বলখের মাটি থেকে উঠে এসে তিনি একসময় থিতু হন কনিয়ায়, কিন্তু তার হৃদয় চিরকালই ছিল আগের সে সুফি সাধনার শিকড়ে প্রোথিত। মঙ্গোল আক্রমণের প্রেক্ষাপটে তার পরিবার নির্বাসিত হয়, আর রুমি হয়ে ওঠেন একাধারে হানাফি ফকিহ, মাতুরিদি ধর্মতত্ত্ববিদ ও আধ্যাত্মিক পথিক। তবে শামস-ই তাবরিজির আগমন তার জীবনকে পাল্টে দেয়। শামসের সঙ্গে সে সম্পর্ক ছিল আলোকের মতো, যা রুমির ভেতরের শুষ্ক জ্ঞানকে রূপান্তর করে আগুনে পরিণত করেছিল। শামসের অদৃশ্য হওয়ার পর রুমি নিজেই রূপ নেন কবিতে, প্রেমিকে, এক অনুসন্ধানরত আত্মায়। তার মসনবী ও দিওয়ান-ই শামস-ই তাবরিজি তাই কেবল সাহিত্য নয়, এগুলো এক অন্তর্দাহ, এক চিরন্তন মিলনের আকাঙ্ক্ষা। রুমি বিশ্বাস করতেন সংগীত, কবিতা ও ঘূর্ণায়মান নৃত্যের (সেমা) মাধ্যমে মানুষ আল্লাহর সান্নিধ্যে পৌঁছতে পারে। এ দর্শন থেকেই জন্ম নেয় মেভলেভি তরিকা বা ঘূর্ণায়মান দরবেশ সম্প্রদায়। তার কাব্য পেরিয়ে গেছে ফার্সির সীমা, পৌঁছেছে বাংলা, উর্দু, ইংরেজিসহ বহু ভাষায়, যেখানে তিনি হয়ে উঠেছেন এক সর্বজনীন প্রেমিক আত্মা। কনিয়ার তার সবুজ গম্বুজবিশিষ্ট সমাধি আজও প্রমাণ করে রুমি ছিলেন কেবল একজন কবি নয়, বরং ভালোবাসা ও আধ্যাত্মিক মুক্তির এক নিরন্তর আহ্বান।
কিতাব আল-মাদখাল আল-কাবীর গ্রন্থের পঞ্চদশ শতকের পাণ্ডুলিপি
আবু মাশার আল-বলখি
আবু মাশার আল-বলখি (৭৮৭-৮৮৬) এক বিস্ময়কর মননশীল আত্মা, যিনি বলখের ধুলোবালির শহর থেকে উঠে এসে মধ্যযুগের জ্ঞানের জগতে এক অমোঘ আলো ছড়িয়ে দেন। ইসলামী ইতিহাসে তিনি শুধু একজন জ্যোতির্বিদ নন, বরং ছিলেন দার্শনিক, প্রাকৃতিক বিজ্ঞানী এবং জ্ঞানের এক নিরন্তর অন্বেষণকারী। প্রথম জীবনে হাদিস ও ধর্মতত্ত্ব নিয়ে অধ্যয়ন করলেও ৪৭ বছর বয়সে তিনি আকাশের দিকে মুখ তুলে তাকান নক্ষত্রপুঞ্জের ভাষা বুঝতে চান, সময়ের ছন্দ খুঁজে ফেরেন গ্রহের গতি ও মানব জীবনের আন্তঃসম্পর্কে। তার শ্রেষ্ঠতম কীর্তি কিতাব আল-মাদখাল আল-কাবীর (৮৪৮), যা লাতিনে অনূদিত হয়ে ‘গ্রেট ইন্ট্রোডাকশন’ নামে ইউরোপীয় রেনেসাঁর জ্যোতির্বিদ্যাকে প্রভাবিত করে। জন অব সেভিল ও হারম্যান অব কারিন্থিয়ার অনুবাদের ফলে আবু মাশার হয়ে ওঠেন অ্যারিস্টটলীয় দর্শনের প্রবেশদ্বার, যেমনটি রিচার্ড লেমের মতো। তিনি গ্রিক যুক্তিবিদ্যা, পারস্য জ্ঞান, ভারতীয় জ্যোতির্বিদ্যা ও ইসলামী তত্ত্ব মিলিয়ে জ্যোতিষশাস্ত্রকে এক গাণিতিক-দার্শনিক উচ্চতায় নিয়ে যান। তার তাহাউইল সিনি আল-আলাম, মাওয়ালিদ আল-রিজাল ওয়ান-নিসা, ও কিতাব আল-মিলাল ওয়াল-দুয়াল একদিকে ইতিহাস, ধর্ম, জন্মপত্র ও জ্যোতিষীয় বিশ্লেষণের সন্ধি ঘটায়। আল-কিন্দি, রজার বেকন, অ্যালবার্টাস ম্যাগনাসের মতো মনীষীরাও তার রচনার প্রভাবে উদ্ভাসিত হন। আবু মাশার ছিলেন সে সেতুবন্ধ, যিনি পূর্ব ও পাশ্চাত্যের জ্ঞানকে মিলিয়ে দেন যার আলো আজও জ্যোতিষ, দর্শন ও ইতিহাসের আকাশে দীপ্তিমান।
আবু জায়েদ আল-বলখি—ভূগোল ও মানসিক স্বাস্থ্যের অগ্রদূত
আবু জায়েদ আহমেদ ইবনে সাহল আল-বলখি (৮৫০-৯৩৪) ছিলেন ইসলামী স্বর্ণযুগের এক অনন্য বহুমুখী মনীষী, যিনি বর্তমান আফগানিস্তানের বলখের নিকটবর্তী শামিসিতিয়ানে জন্মগ্রহণ করেন। চিকিৎসা, ভূগোল, মনোবিজ্ঞান, সমাজতত্ত্ব, সাহিত্য ও ধর্মতত্ত্বসহ ৬০টিরও বেশি বিষয়ে তার রচনা ছিল, যার প্রভাব পরবর্তী শতাব্দীগুলোর জ্ঞানচর্চায় সুদূরপ্রসারী। ভূগোলবিদ হিসেবে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘বলখি মানচিত্র বিদ্যালয়’, যার ভিত্তি ভূমি ছিল তার রচিত সুওয়ার আল-আকালিম। এতে তিনি বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলকে ‘আক্লিম’ বা জলবায়ুভিত্তিক এলাকায় ভাগ করে প্রতিটির জনজীবন, কৃষি ও পরিবেশ বিশ্লেষণ করেন। এ আঞ্চলিক পদ্ধতির ভৌগোলিক চর্চা পরবর্তীকালে আল-ইস্তাখরি ও আল-মুকাদ্দাসির মতো মনীষীদের প্রভাবিত করে।
তবে আল-বলখির সবচেয়ে দূরদর্শী অবদান ছিল মানসিক স্বাস্থ্য ও মনোবিজ্ঞানে। তার চিকিৎসা গ্রন্থ মাসালিহ আল-আবদান ওয়া আল-আনফুস উদ্বেগ, বিষণ্নতা, ফোবিয়া, রাগ ও ট্রমার উপসর্গ ও চিকিৎসা নিয়ে লিখিত এক অগ্রগামী পাঠ। তিনি প্রথমবারের মতো অন্তর্নিহিত ও বাহ্যিক বিষণ্নতার পার্থক্য নির্ধারণ করেন, যা আধুনিক মনোরোগবিদ্যায় এন্ডোজেনাস ও রি-অ্যাক্টিভ ডিপ্রেশন নামে পরিচিত। তার চিকিৎসা পদ্ধতিতে জ্ঞানীয় পুনর্গঠন, খাদ্য নিয়ন্ত্রণ, ব্যায়াম ও সামাজিক সম্পৃক্ততা ছিল, যা আজকের কগনিটিভ বিহেভিওরাল থেরাপির পূর্বসূরি। তিনি বিশ্বাস করতেন মন ও দেহ অখণ্ডভাবে জড়িত এবং আত্মপ্রত্যয়, ধৈর্য, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও প্রার্থনার মাধ্যমে মানসিক সুস্থতা ফিরে আসে। তার গুরু আল-কিন্দির দর্শনচর্চার প্রভাবে গ্রিক, পারস্য ও ভারতীয় চিন্তাধারার সঙ্গে ইসলামী দর্শনের সংমিশ্রণ ঘটান। আল-বলখি ছিলেন এক বিরল বুদ্ধিজীবী, যিনি পূর্ব-পশ্চিমের জ্ঞানকে সংযুক্ত করে চিকিৎসা ও মানসিক স্বাস্থ্যে এক আধুনিক আলো ফেলে গেছেন।
সিল্ক রোডের ওপর বলখের কৌশলগত অবস্থান এটিকে পারস্য, ভারত ও মধ্য এশিয়ার সঙ্গে যুক্ত করেছিল। এটি জরথুস্ত্রীয় অগ্নি মন্দির, বৌদ্ধ মঠ এবং পরে ইসলামিক মাদ্রাসগুলোর আবাসস্থল ছিল। সবগুলোই রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ছিল এবং একই সঙ্গে সমৃদ্ধ পাণ্ডুলিপি দ্বারা অলংকৃত ছিল। এ অনন্য মেলবন্ধনটি আধ্যাত্মিক, সাহিত্যিক ও বৈজ্ঞানিকভাবে সমৃদ্ধ একটি কেন্দ্রস্থল গড়ে তুলেছিল।
বলখে এমন ব্যক্তিদের জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় গভীর অবদান প্রমাণ করে যে এটি কেবল একটি শহর ছিল না, এটি ছিল দুর্লভ মেধার বের হয়ে আসার এক স্থান। এসব ব্যক্তির কাজ শতাব্দীজুড়ে অনুরণিত হয়, রহস্যময় কবিতা থেকে শুরু করে প্রাথমিক মনোবিজ্ঞান এবং মানচিত্রণ পর্যন্ত। বলখকে বিবর্ণ ধ্বংসাবশেষ হিসেবে নয়, অনন্ত বৌদ্ধিক ও আধ্যাত্মিক আলোর ঝরনাধারা হিসেবে স্মরণ করাই সমুচিত।
শেখ আফনান বিরাহীম: গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটিং সায়েন্সে মাস্টার্স প্রোগ্রামে অধ্যয়নরত