গল্পটা গ্রিসের। খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীর। অ্যাথেনীয় সেনাপতি থেমিস্টোক্লিস পরাশক্তি পারস্যের মোকাবেলা করতে রওনা হয়েছেন। হঠাৎ থেমে পড়লেন দুই মোরগের লড়াই দেখে। সৈন্যদের ডেকে তিনি ঘোষণা করেন, ‘দেখো, এরা তাদের গৃহদেবতার জন্য, পূর্বপুরুষদের স্মৃতির জন্য, গৌরবের জন্য, স্বাধীনতার জন্য কিংবা সন্তানদের নিরাপত্তার জন্য লড়াই করছে না। তারা লড়াই করছে, কারণ তারা কারো কাছে হার মানতে চায় না।’
সেদিনের ঘটনায় অনুপ্রাণিত হয়ে গ্রিকরা পারসিক আক্রমণ প্রতিহত করে। বিজয় গ্রিক সভ্যতাকে আরো দীর্ঘস্থায়ী করে। কিন্তু যে মোরগ দেখে তারা সেদিন অনুপ্রাণিত হয়েছে, তার নিয়তি সুবিধাজনক হয়নি। আজ মানুষের টেবিলে রুটি কিংবা ভাতের সঙ্গে পরিবেশিত হয় মোরগের মাংস। শুধু গ্রিকদের না, বর্তমানে মুরগি সারা পৃথিবীতেই জনপ্রিয় খাদ্য। মৃদু স্বাদ ও মসৃণ গঠনের কারণে প্রায় সব ধরনের রান্নায় হাজির থাকে মুরগি। ব্রিটিশ নাগরিকরা বেড়ে ওঠে চিকেন টিক্কা মাসালার স্বাদ জিহ্বায় নিয়ে; আর চৈনিকদের সঙ্গে জড়িয়ে আছে কেনটাকি ফ্রায়েড চিকেন। আজ গ্রামবাংলার বেশির ভাগ পরিবারেই উঠানে মোরগ দৌড়াতে দেখা যায়। উৎসব হোক কিংবা না হোক, মোরগের মাংস থাকে খাবারের টেবিলে।
রন্ধনশৈলীতে মুরগির আধিপত্য বিস্তার করার গল্প বেশ বিস্ময়কর। আসলে মুরগিকে প্রথমে খাওয়ার জন্য নয়, লড়াইয়ের জন্য গৃহপালিত করা হয়। বিশ শতকের বৃহৎ শিল্পভিত্তিক উৎপাদনের সূচনার আগ পর্যন্ত মুরগির অর্থনৈতিক ও পুষ্টিগত অবদান ছিল সীমিত। ইতিহাসে মানবজাতির জন্য উপকারী হলেও ঘোড়া বা ষাঁড়ের মতো যুগান্তকারী হয়ে ওঠেনি। তার পরও মুরগি শতাব্দীর পর শতাব্দীজুড়ে সংস্কৃতি, শিল্প, খাদ্য, বিজ্ঞান ও ধর্মে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। প্রাচীন সংস্কৃতিতে মুরগি পবিত্র প্রাণী; নারীত্ব ও উর্বরতার প্রতীক। মিসরের মন্দিরে ডিম ঝুলিয়ে রাখা হতো, যেন নীল নদের বন্যা ফলপ্রসূ হয়। পারসিক বিশ্বাসে মোরগ এক সদয় আত্মা, যে নতুন ভোরের ডাক দেয়। রোমানদের কাছে মোরগের গুরুত্ব ছিল ভবিষ্যদ্বাণী বলতে পারায়। যুদ্ধের সময় রোমান সৈন্যদলের সঙ্গে থাকত মুরগি। যুদ্ধের আগে মোরগের আচরণ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হতো। সিসেরোর লেখায় পাওয়া যায়, খ্রিস্টপূর্ব ২৪৯ সালে নৌযুদ্ধের আগে একদল মোরগের আচরণে ক্রুদ্ধ হয়ে কনসাল তাদের পানিতে ছুড়ে ফেলেন। ইতিহাস বলে, তিনি সেই যুদ্ধে পরাজিত হয়েছিলেন। বাইবেলের ওল্ড টেস্টামেন্টে কোরবানিসংক্রান্ত অনুচ্ছেদ থেকে বোঝা যায়, স্রষ্টার পছন্দ ছিল লাল মাংস; হাঁস-মুরগি নয়। কোথাও খোদা মুরগি চাননি। বুক অব ম্যাথিউয়ে যিশু জেরুজালেমের মানুষের প্রতি তার ভালোবাসার উপমা দেন মুরগির মাধ্যমে। যিশু যেন মুরগির মতোই তার বাচ্চাদের আগলে রাখেন। মোরগ গসপেলে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাকে স্মরণ করিয়ে দেয়। যিশুর অন্যতম শিষ্য পিটার যে তাকে অস্বীকার করবে, তা আগেই ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছিল। বলা হয়েছিল, ভোরে মোরগ ডাকার আগেই পিটার তিনবার যিশুকে অস্বীকার করবে। ঘটনাটিকে স্মরণীয় রাখতে নবম শতাব্দীতে পোপ নিকোলাস প্রথম নির্দেশ দেন প্রতিটি গির্জার ওপর মোরগের মূর্তি স্থাপন করতে। এ কারণেই অনেক গির্জার চূড়ায় এখনো মোরগাকৃতির স্থাপনা দেখা যায়।
ঠিকমতো প্রশিক্ষণ দেয়া গেলে মোরগ ভয়ংকর প্রাণীতে পরিণত হতে পারে। প্রকৃতি মোরগকে যেন পায়ে কাঁটাযুক্ত অস্ত্র দিয়েছে। মানুষ সেটিকে আরো প্রাণঘাতী করে তুলেছে ধাতব কাঁটা ও ছোট ছুরি পায়ে বেঁধে। সেটা করেছে মোরগযুদ্ধের সূত্র ধরেই। যুক্তরাষ্ট্রে মোরগযুদ্ধ অবৈধ। তবে পৃথিবীর যেসব অঞ্চলে এ খেলা এখনো প্রচলিত, সেখানে সম্ভবত এটি প্রাচীনতম খেলা। প্রাচীন বিশ্বজুড়ে মোরগযুদ্ধের চিত্রশিল্প দেখা যায়। ইতালির পম্পেই নগরীতে প্রাপ্ত প্রথম শতাব্দীর মোজাইক তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
শিল্পী: জ্যাক পেপিঁ
মোরগ গৃহপালিত হয় সাত হাজার থেকে ১০ হাজার বছর আগে। সবচেয়ে প্রাচীন জীবাশ্ম পাওয়া যায় চীনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে, যা প্রায় ৫৪০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের। কিন্তু ওই অঞ্চলের শুষ্ক ও ঠাণ্ডা সমতলে মোরগের বুনো পূর্বপুরুষদের বসবাস ছিল না। তাই যদি সেগুলো সত্যিই মোরগের হাড় হয়, তবে সম্ভবত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে গিয়েছে। গৃহপালিত মোরগের পূর্বপুরুষ হচ্ছে লাল বনমোরগ। আধুনিক মোরগের সঙ্গে এর সাদৃশ্য স্পষ্ট—লাল ঝুঁটি ও গলার ঝুলন্ত লতিকা, পায়ের কাঁটা এবং সঙ্গীকে ডাকার অভ্যাস সবই পরিচিত বৈশিষ্ট্য। এর আবাসভূমি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল থেকে ফিলিপাইন পর্যন্ত বিস্তৃত। বনমোরগ বনভূমিতে কীট, বীজ ও ফল খুঁজে খায়; রাত হলে গাছে উড়ে গিয়ে বাসা বাঁধে। সম্ভবত এজন্যই মানুষ সহজেই আকর্ষিত হয়েছে। কারণ তারা এমন প্রাণী চাইছিল যাকে ধরা ও পালন করা সহজ। তবে বিজ্ঞানীরা আরো তিনটি ঘনিষ্ঠ প্রজাতির সন্ধান পেয়েছেন, যারা সম্ভবত লাল বনমোরগের সঙ্গে মিলিত হয়েছিল। আধুনিক মোরগের অন্তত একটি বৈশিষ্ট্য দক্ষিণ ভারতের ধূসর বনমোরগের কাছ থেকে পাওয়া। তার পরও খাবার হিসেবে মোরগের সুবর্ণ সময় আসে ২০০৪ সালে। সে সময় বিজ্ঞানীরা মুরগির জিনোমের পূর্ণাঙ্গ মানচিত্র প্রকাশ করে। এই জিনোম মানচিত্র সহস্র বছরের গৃহপালনের ফলে কীভাবে একটি প্রজাতির পরিবর্তন ঘটে, তা অধ্যয়নের জন্য অনন্য সুযোগ এনে দেয়। উদ্ভাবন হতে থাকে লেয়ার ও ব্রয়লারের মতো নতুন ও মাংসল জাত। বর্তমানে জিনে পরিবর্তন ঘটিয়ে মানুষ মুরগিকে সারা বছর ডিম পাড়াতে ও প্রজননে সক্ষম করেছে।
একবার মোরগ গৃহপালিত হয়ে গেলে সাংস্কৃতিক যোগাযোগ, বাণিজ্য, অভিবাসন ও আঞ্চলিক বিজয়ের মাধ্যমে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে মোরগের পরিচিতি ঘটে। মোরগের পশ্চিমমুখী যাত্রার সূচনাস্থল হতে পারে সিন্ধু সভ্যতা। হরপ্পার নগররাষ্ট্র চার হাজার বছরেরও বেশি আগে মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে জমজমাট বাণিজ্য করত। ভারতের পশ্চিম উপকূলে অবস্থিত প্রাচীন বন্দর থেকে মোরগের হাড় পাওয়া গেছে, যা ইঙ্গিত করে যে মোরগ আরব উপদ্বীপে রফতানি হতে পারে। খ্রিস্টপূর্ব ২০০০ সালের দিকে মেসোপটেমিয়ার কিউনিফর্ম ফলকে মেলুহ্হার নামে বিশেষ পাখির উল্লেখ পাওয়া যায়। মেলুহ্হা বলতে সিন্ধু উপত্যকাকে বোঝানো হতে পারে; আর পাখিটি সম্ভবত মোরগ। এর প্রায় ২৫০ বছর পর মিসরে পৌঁছায় মোরগ। মিসরে মূলত লড়াইয়ের জন্য এবং অভিজাত পশুপাখির সংগ্রহে অন্তর্ভুক্ত থাকত মোরগ। তখন রাজকীয় সমাধিগৃহে মোরগের চিত্রাঙ্কন দেখা যায়। সাধারণ মিসরীয়দের মধ্যে মোরগ জনপ্রিয় হয়ে উঠতে আরো এক হাজার বছর সময় লেগে যায়। সে সময় মিসরীয়রা কৃত্রিমভাবে ডিম ফোটানোর কৌশল আয়ত্ত করে। তারা শত শত চুল্লি বা ওভেন-সমৃদ্ধ বিশাল ইনকিউবেশন কমপ্লেক্স তৈরি করে। প্রতিটি চুল্লি ছিল একটি বড় ঘর যা করিডোর ও ভেন্টের মাধ্যমে যুক্ত। চুল্লিতে খড় ও উটের গোবরের আগুন থেকে সৃষ্ট তাপ নিয়ন্ত্রণ করা হতো। এভাবে ডিম পরিচর্যা ও সংরক্ষণ করা হতো প্রাচীন মিসরে। ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের প্রত্নতাত্ত্বিক খননে খ্রিস্টপূর্ব ৮০০ সালের আশপাশে মোরগের হাড় পাওয়া গেছে। রোমানদের মধ্যে মোরগ ছিল এক বিলাসবহুল খাদ্য। তারা ডিম ভাজি ও রান্নার নতুন কৌশল উদ্ভাবন করেছিল। যদিও তারা ডিমের বদলে মোরগের মগজ পিষে রান্না করতেই বেশি আগ্রহী ছিল। চাষীরা মোরগ মোটা করার নানা পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছিলেন। মুরগি খাওয়া তখন এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে আইন করে নিষিদ্ধ করতে হয় রোমান সম্রাটকে। খ্রিস্টপূর্ব ১৬১ সালে এক আইন পাস হয়, যাতে প্রতি বেলা মাত্র একটি মুরগি খাওয়ার অনুমতি ছিল। তবে মোরগের এ জনপ্রিয়তা দীর্ঘ হয়নি। রোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর ইউরোপে মুরগির গুরুত্ব কমে যায়। পরিচর্যার অভাবে মুরগির আকৃতিও আবার কমতে থাকে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হাঁস ও তিতিরের মতো শক্তপোক্ত পাখি খাবারের টেবিলে জায়গা করে নেয়। যখন ইউরোপীয়রা উত্তর আমেরিকায় পৌঁছায়, তখন তারা সেখানে প্রচুর সংখ্যায় স্থানীয় টার্কি ও হাঁস পায়, যেগুলো সহজেই ধরা ও খাওয়ার উপযোগী ছিল। কলম্বাসের আগেই প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল থেকে পলিনেশীয়রা দক্ষিণ আমেরিকার উপকূলে মুরগি নিয়ে এসেছিল। বিশ শতকের অনেকটা সময় পর্যন্ত মুরগি ডিমের উৎস হিসেবে মূল্যবান ছিল। আমেরিকান খাদ্য ও অর্থনীতিতে ভূমিকা ছিল অপেক্ষাকৃত কম। গরু ও শূকর শিল্পায়নের ফলে খাবারের তালিকায় প্রবেশ করে। তখনো মুরগি পালন ছিল স্থানীয় ও ছোট পরিসরের ব্যাপার।
মোরগ উৎপাদনের বাণিজ্যিক ভিত্তি স্থাপন হয় তখন, যখন মোরগের খাদ্যে অ্যান্টিবায়োটিক ও ভিটামিন মেশানো শুরু হয়। এর মধ্য দিয়ে মুরগিকে ঘরের ভেতরে বড় করা সম্ভব হয়। বিশ শতকের প্রথম ভাগ পর্যন্ত মুরগি সাধারণত খোলা জায়গায় ঘুরে খাবার সংগ্রহ করত। কিন্তু এখন তাদের আবদ্ধ পরিবেশে, নিয়ন্ত্রিত খাদ্য দিয়ে, জলবায়ু ও শিকারির ঝুঁকি থেকে দূরে রেখে বড় করা হয়, যেখানে তাদের একমাত্র কাজ হলো খাওয়া। কারখানাভিত্তিক খামার ব্যবস্থা মুরগিকে প্রোটিন উৎপাদনের যন্ত্রে পরিণত করেছে। মুরগিকে এতটাই ছোট খাঁচায় রাখা হয় যে তারা ডানা মেলতেও পারে না। বড় খামারগুলো যত বেশি মুরগি উৎপাদন করতে লাগল, ততই তার চাহিদা বাড়তে লাগল। ১৯৯০-এর দশকের গোড়াতেই মুরগি গরুর চেয়ে জনপ্রিয় আমেরিকান মাংসে পরিণত হয়। নাটকীয়তাও তৈরি হয়েছে মোরগকে কেন্দ্র করে। এক্ষেত্রে কিউবার কথা অপ্রাসঙ্গিক হবে না। কিউবার একটি ধর্মের নাম সানতেরিয়া। আদিবাসী ক্যারিব সংস্কৃতি এবং পশ্চিম আফ্রিকার ইয়োরুবা ধর্মের উপাদান নিয়ে গড়ে ওঠা এ ধর্ম পতঙ্গ, ছাগল, ভেড়া, কচ্ছপ ও অন্যান্য প্রাণীর পাশাপাশি মুরগিও কোরবানি করে ধর্মীয় রীতির অংশ হিসেবে। সানতেরিয়া ধর্মের অনুসারীরাই ১৯৯৩ সালের একটি ফার্স্ট অ্যামেন্ডমেন্ট মামলার আবেদনকারী ছিলেন, যেখানে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট সর্বসম্মতভাবে পশু বলি নিষিদ্ধকারী স্থানীয় আইনগুলো বাতিল করে। বিচারপতি অ্যান্থনি কেনেডি রায়ের মধ্যে লিখেছিলেন, যদিও পশু বলির প্রথা কিছু লোকের কাছে জঘন্য মনে হতে পারে, ধর্মীয় বিশ্বাসগুলোর গ্রহণযোগ্য, যৌক্তিক, সুসংগত বা অন্যদের কাছে বোধগম্য হওয়া প্রয়োজন নয়, এটি প্রথম সংশোধনীর অধীনে সুরক্ষার যোগ্য।
মোরগ বিশ্বায়নের প্রতীক, মধ্যবিত্ত খাদ্যরুচির সর্বজনীন প্রতীক। মুরগি সিজার সালাদে জায়গা করে নিয়েছে; ঠাঁই করে নিয়েছে ক্লাব স্যান্ডউইচে। মুরগি দই ও মসলা মেখে গ্রিলে সেঁকে মৃদু গ্রেভিতে ভাসিয়ে পরিণত হয় সত্যিকারের ব্রিটিশ খাবার চিকেন টিক্কায়। এটি ব্রিটেনের সাংস্কৃতিক বহুত্বকে প্রতিফলিত করে। ব্রিটিশ রেস্তোরাঁগুলোয় সবচেয়ে বেশি পরিবেশিত খাবার। যদিও উৎসের দিক থেকে চিকেন টিক্কা একটি ভারতীয় খাবার, কিন্তু ব্রিটিশদের গ্রেভিতে মাংস খাওয়ার প্রবণতা পূরণ করতে ‘মাসালা’ সস যুক্ত হয়। দিল্লি ও লাহোরের শেফদের দাবি, চিকেন টিক্কা মাসালা হলো একটি খাঁটি মোগল রেসিপি, যা রাজকীয় রাঁধুনিরা মোগল যুগে তৈরি করেছিলেন ১৬ থেকে ১৮ শতকের মধ্যে। যদি চিকেন টিক্কা মাসালার গল্পের কোনো আমেরিকান প্রতিস্বর থাকে, তবে সেটা হলো জেনারেল টসোর চিকেন। নিউইয়র্ক টাইমস এটিকে বিশ্বের সবচেয়ে বিখ্যাত হুনানীয় খাবার বলে বর্ণনা করেছে। তবে খোদ হুনান প্রদেশের রাঁধুনিদের কাছেই এটি একটি চমকপ্রদ তথ্য, কারণ তারা খাবারটির কথা শোনেননি। সাধারণভাবে ধরা হয়, এ ডিপ-ফ্রাই করা চিকেন টুকরোকে ঝাল মরিচ সসে দেয়ার আইডিয়ার পেছনে ছিলেন হুনানে জন্মগ্রহণকারী শেফ পেং চাং-কুই। পেং ১৯৪৯ সালের কমিউনিস্ট বিপ্লবের পর তাইওয়ানে পালিয়ে যান। তিনি এ খাবারের নাম রেখেছিলেন উনিশ শতকের এক সামরিক কমান্ডারের নামে। ১৯৭৩ সালে পেং নিউইয়র্কে চলে আসেন এবং একটি রেস্টুরেন্ট খোলেন যা কূটনীতিকদের পছন্দের জায়গা হয়ে ওঠে। তিনি সেখানে তার খাবারটি পরিবেশন করতে শুরু করেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমেরিকান স্বাদের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে খাবারটি আরো মিষ্টি হয়ে ওঠে। এখন হুনানের রাঁধুনিদের কাছে ঐতিহ্যবাহী একটি খাবারে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে এখনো দেশী মুরগিই পালন করা হয়। এ মুরগি ছেড়ে দেয়া থাকে ও বাড়িময় ঘুরে খাবার খায়। তবে শহরাঞ্চলে মুরগি বলতে ব্রয়লার মুরগিই দখল করে রেখেছে বাজারের সিংহভাগ। দেশে উৎসব থেকে ঘরোয়া রান্না, আলিশান রেস্তোরাঁ থেকে রাস্তার পাশের হোটেল, সর্বত্র খাবার টেবিলে ছড়িয়ে রয়েছে মুরগির মাংস।
বিশ্বব্যাপী মুরগির জয়যাত্রা মহাকাব্যিক। মানবসভ্যতার কৃষি, সংস্কৃতি ও রন্ধন শিল্পে জড়িয়ে যাওয়ার অসাধারণ আখ্যান। সে আখ্যান প্রমাণিত হয় মুরগির উপস্থিতি দিয়েই। আজ পৃথিবীতে মানুষের তুলনায় মুরগি রয়েছে প্রায় তিন গুণ।
আহমেদ দীন রুমি: লেখক