গত শতক থেকে দক্ষিণ এশিয়ার ঐতিহ্যবাহী মাদ্রাসাগুলো ইসলামী জ্ঞান সংরক্ষণ এবং বিকাশে মূল প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করেছে। মোগল যুগ ও পরবর্তী সময়ে এ রকম অনেক ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ইসলামী আলেমরা পরিচালনা করেছেন। তাদের তৈরি করা কার্যকর পাঠ্যক্রম মাদ্রাসাগুলোয় এখনো প্রচলিত আছে। দক্ষিণ এশিয়ায় এ রকম একটি প্রভাবশালী ইসলামী জ্ঞানচর্চা কেন্দ্র লক্ষ্ণৌর ফিরিঙ্গি মহল। একসময় এটি মাদ্রাসা ছিল। সতেরো-আঠারো শতকের শেষের দিকে প্রতিষ্ঠানটি খ্যাতি অর্জন করেছিল। ভবনটি মূলত একজন ইউরোপীয় ব্যক্তির মালিকানাধীন বাসভবন ছিল। ‘ফিরিঙ্গি’ অর্থ বিদেশী বা ইউরোপীয় এবং মহল অর্থ প্রাসাদ। তাই ফিরিঙ্গি মহল হচ্ছে বিদেশী বা ইউরোপীয় প্রাসাদ।
সম্রাট আওরঙ্গজেব ১৬৯৫ সালে ভবনটি মোল্লা নিজাম-উদ-দীনকে উপহার দেন। ফিরিঙ্গি মহল দ্রুতই একটি বিলাসবহুল বাসভবন থেকে একটি প্রসিদ্ধ ইসলামী শিক্ষা কেন্দ্র হয়ে ওঠে। ইসলামী জ্ঞানচর্চায় কেন্দ্রটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবদান হচ্ছে দারস-এ-নিজামী পাঠ্যক্রম তৈরি। দারস-এ-নিজামী একটি বিস্তৃত ইসলামী শিক্ষা পাঠ্যক্রম, যা দক্ষিণ এশিয়ার মাদ্রাসা শিক্ষার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত।
ফিরিঙ্গি মহলের প্রতিষ্ঠা ছিল ইন্দো-ইসলামী বিদ্যাচর্চা ও শিক্ষা কার্যক্রমে বড় অগ্রগতির স্মারক। মোল্লা নিজাম-উদ-দীন সিহালভি (১৬৭৭-১৭৪৮) এবং তার পরিবারের নেতৃত্বে লক্ষ্ণৌর প্রতিষ্ঠানটি ইসলামী শিক্ষার ওপর ভিত্তি করে একটি নিয়মনিষ্ঠ পাঠ্যক্রম গঠন করেছিল। পাঠ্যক্রমটি সমগ্র অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করেছিল এবং এর প্রতিষ্ঠানটি ‘ভারতের কেমব্রিজ’ নামে খ্যাতি পেয়েছিল। ফিরিঙ্গি মহলের পণ্ডিতরা কেবল ধর্মতত্ত্ববিদ ছিলেন না, বরং তারা যুক্তিবিদ্যা, দর্শন, গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা ও সাহিত্যেও পারদর্শী ছিলেন। ইসলামী শিক্ষার এ সামগ্রিক পদ্ধতির লক্ষ্য ছিল মানকুলাত (কুরআন ও হাদিসের মতো ঐশী উৎস থেকে প্রাপ্ত জ্ঞান) এবং মা’কুলাত (যুক্তি ও বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে প্রাপ্ত জ্ঞান, যেমন দর্শন ও যুক্তিবিদ্যা) উভয় ক্ষেত্রেই উপযুক্ত বিদ্বান-পণ্ডিত তৈরি করা। নিজাম-উদ-দীনের পিতা মোল্লা কুতুব-উদ-দীন এবং পরবর্তী প্রজন্মসহ ফিরিঙ্গি মহলের বংশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বরা এ সমন্বিত পাঠ্যক্রমকে পরিমার্জিত করতে অবদান রেখেছিলেন। আঠারো শতকের গোড়ার দিকে মোল্লা নিজাম-উদ-দীন আনুষ্ঠানিকভাবে দারস-ই-নিজামীকে একটি পাঠ্যক্রমে রূপ দিয়েছিলেন। এ পাঠ্যক্রম কুরআনের ব্যাখ্যা ও হাদিস থেকে শুরু করে যুক্তি-দর্শন পর্যন্ত বিভিন্ন শাখার কাঠামোগত পাঠদান করতে সক্ষম ছিল।
পরবর্তী সময়ে ফিরিঙ্গি মহলের শিক্ষার্থীরা ভারতের শীর্ষস্থানীয় পণ্ডিত ও আইনজ্ঞ হয়ে ওঠেন। ধীরে ধীরে ফিরিঙ্গি মহলের প্রভাব এ পাঠ্যক্রমের মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন প্রান্তের মাদ্রাসাগুলোয় ছড়িয়ে পড়ে। পাঠ্যক্রমটি ভারতীয় উপমহাদেশজুড়ে ব্যাপকভাবে গৃহীত হওয়ার ফলে ফিরিঙ্গি মহল দক্ষিণ এশিয়ার ইসলামী শিক্ষার মেরুদণ্ড হয়ে ওঠে।
শিক্ষাবিদদের পাশাপাশি এর অনুষদরাও গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও রাজনৈতিক ভূমিকা পালন করেছিলেন। মাওলানা আবদুল বারী (১৮৭৮-১৯২৬) এবং আলতাফ হোসেন হালির (১৮৩৭-১৯১৪) মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিরা ফিরিঙ্গি মহলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। মাওলানা আবদুল বারীর নামের শেষে যুক্ত হয়েছিল ফিরিঙ্গি মহলি। ছিলেন খিলাফত আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা। আলতাফ হোসেন হালি ছিলেন বিশিষ্ট কবি, যিনি আলিগড় আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। মির্জা গালিবের জীবনীকার হিসেবে তিনি বিখ্যাত। এ রকম আরো অনেকেই সংশ্লিষ্ট ছিলেন যারা দক্ষিণ এশিয়ার বৌদ্ধিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক জমিনে বিস্তৃত প্রভাব রেখেছিলেন।
আঠারো শতাব্দীর শুরুতে দারস-এ-নিজামী তৈরি শুরু হয়। এতে ফিকহ, তাফসির, হাদিস ও ইসলামী তত্ত্বসহ ঐতিহ্যবাহী বিষয়, সেই সঙ্গে মানতিক (যুক্তি), হিকমাত বা ফালসাফা (দর্শন), ইলম আল-হিসাব (গণিত) এমনকি জ্যোতির্বিজ্ঞানের মতো বিদ্যাও অন্তর্ভুক্ত ছিল। পাঠ্যক্রমটি ধর্মীয় সিলেবাসের বাইরে গিয়ে যুক্তিবিদ্যা ও বিশ্লেষণী চিন্তাভাবনা বিকাশেও জোর দিয়েছিল। মোল্লা নিজাম-উদ-দীন যুক্তিবিদ্যা এবং দর্শনে আধুনিক পাঠ প্রবর্তন করেন। তিনি ছাত্রদের জন্য দরকারি পাঠ্যবই অন্তর্ভুক্ত করে শিক্ষার্থীদের বিশ্লেষণী ক্ষমতা বিকশিত করার ব্যবস্থা করেছিলেন। দারস-এ-নিজামী পাঠ্যক্রমের প্রভাব দক্ষিণ এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। অনেক মাদ্রাসা এটিকে পাঠ্যক্রমের মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করে। দারুল উলুম দেওবন্দের মতো খ্যাতিমান ও প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানও এটি অনুসরণ করেছিল। আজও ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ এবং বিশ্বব্যাপী সুন্নি মাদ্রাসাগুলোর অনেকে তাদের পাঠ্যক্রমে দারস-এ-নিজামীর সংস্করণ ব্যবহার করেন। যুগোপযোগী হওয়ার কারণে একবিংশ শতাব্দীতে এসেও এটি নিজের গুরুত্বকে বজায় রেখেছে।
আঠারো ও উনিশ শতকে ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসন ভারতীয় ইসলামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় আমূল পরিবর্তন নিয়ে আসে, যার মধ্যে ফিরিঙ্গি মহলও ছিল। ব্রিটিশরা পাশ্চাত্য শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করে ইংরেজিকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে। তারা ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করে এবং ধীরে ধীরে স্থানীয় মাদ্রাসায় পৃষ্ঠপোষকতা কমিয়ে দেয়। ফলে মোগল শাসনকালে তৈরি হওয়া শিক্ষা ও আইন ব্যবস্থার বিপর্যয় ঘটে। এ প্রেক্ষাপটে ফিরিঙ্গি মহলের পণ্ডিতরা তাদের ধর্মীয় ঐতিহ্য রক্ষা করতে এবং পরিবর্তিত ঔপনিবেশিক পরিস্থিতিতে খাপ খাওয়ানোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন। এর একটি দিক ছিল মূল ধর্মীয় শিক্ষা এবং মুসলিম পরিচয়ের ওপর নতুন করে গুরুত্ব দেয়া, কারণ তখন ব্রিটিশ নীতির ফলে পারস্য ও আরবি শিক্ষা বর্জন শুরু হয়েছিল। ফিরিঙ্গি মহলের উলামারা দীর্ঘকাল ধরে ধর্মীয় জ্ঞানের পাশাপাশি জ্ঞানের অন্য যৌক্তিক শাখাগুলোয় শিক্ষা দিয়েছিলেন। তারা ইসলামী শিক্ষাকে রক্ষা করতে সাংস্কৃতিক একত্রীকরণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। ফিরিঙ্গি মহল এবং এর সংশ্লিষ্ট পণ্ডিতরা নতুন জ্ঞানকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেননি, বরং নিজেদের মতো করে পরিবর্তন করে শিক্ষা দেয়া শুরু করেছিলেন।
উনিশ শতকের শেষদিকে ভারতে মাদ্রাসা সংস্কারের একটি আন্দোলন শুরু হয় এবং ফিরিঙ্গি মহলের পণ্ডিতরা নাদওয়াতুল উলেমার (১৮৯৩ সালে লক্ষ্ণৌতে প্রতিষ্ঠিত) মতো উদ্যোগে অংশগ্রহণ করেন, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পাঠ্যক্রম আধুনিকীকরণ করতে চেয়েছিলেন, তবে ইসলামী শিক্ষার মূলতত্ত্ব বজায় রেখে। এর মাধ্যমে কিছু আধুনিক বিষয় বা দক্ষতা, যেমন ইংরেজি ভাষা বা সাধারণ বিজ্ঞান কিছু মাদ্রাসায় ধীরে ধীরে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছিল। তবে সবকিছুই অন্তর্ভুক্ত হচ্ছিল উলামাদের তত্ত্বাবধানে এবং ইসলামী বিষয়গুলোকে প্রধান রেখে। ভারসাম্যটি সূক্ষ্ম ছিল, কারণ ফিরিঙ্গি মহলের শিক্ষকরা ধর্মনিরপেক্ষ প্রভাব নিয়ে সতর্ক ছিলেন। অনেক শিক্ষক পরিবর্তনশীল দুনিয়ায় শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করার প্রয়োজনীয়তাও বুঝতে পেরেছিলেন।
উল্লেখ্য, ফিরিঙ্গি মহলের সদস্যরা উপনিবেশবিরোধী আন্দোলন বিশেষত খিলাফত আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েছিলেন। তারা মুসলিম সম্প্রদায়কে সংগঠিত করেছিলেন। ভারতের অনেক জাতীয়তাবাদী নেতা যেমন মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহরু, আবুল কালাম আজাদ, সরোজিনী নাইডু ফিরিঙ্গি মহলে এসেছিলেন।
ফিরিঙ্গি মহল পূর্ণ পশ্চিমা শিক্ষা গ্রহণের বিরোধিতা করেছিল। কিন্তু তারা অনেক নতুন বিষয় সংযোজন করেছিলেন, যাতে তাদের স্নাতকরা আধুনিক জ্ঞান থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন না হয়ে পড়েন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিশেষ করে বিশ শতকের মাঝামাঝি এবং উপনিবেশ-পরবর্তী যুগে কিছু মাদ্রাসার পাঠ্যক্রমে আধুনিক ইতিহাস বা ভূগোলের মতো বিষয় যুক্ত করা হয়েছিল, যদিও মূল কাঠামো ছিল দারস-এ-নিজামী। ব্রিটিশ শাসনামলে ফিরিঙ্গি মহলের স্থায়িত্ব পরিবর্তিত সময়ের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়ার ক্ষমতার মধ্যে ছিল, অর্থাৎ এটি আধুনিকতা গ্রহণ করলেও ঐতিহ্যবাহী শিক্ষার ওপর জোর দিয়েছিল। কৌশলটি ঔপনিবেশিক সময়ে এটিকে টিকে থাকার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছিল, যখন অনেক স্থানীয় প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়েছিল। ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীনতা অর্জন করার সময় ফিরিঙ্গি মহল কেবল দারস-এ-নিজামী ঐতিহ্য রক্ষাই করেনি, বরং এমন নেতা ও চিন্তাবিদদের তৈরি করেছিল যারা নতুন জাতিকে সঠিক ধর্মীয় এবং শিক্ষামূলক দিকনির্দেশনা দিয়েছিলেন।
ফিরিঙ্গি মহলের সদস্যরা শুধু ধর্মীয় শিক্ষায় নয়, সাংবাদিকতা, আইন, বিজ্ঞানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রেখেছেন, যা ধর্মীয় এবং আধুনিক জ্ঞানের সংমিশ্রণ বজায় রাখার মাধ্যমে তাদের সৃষ্ট ঐতিহ্যকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। ফিরিঙ্গি মহলের তৈরি করা ইসলামী পাঠ্যক্রম ইসলামী শিক্ষার শক্তিকে তুলে ধরার পাশাপাশি ক্রমাগত পরিবর্তনশীল এ বিশ্বের জ্ঞানচর্চার সঙ্গে সমন্বয় সাধনের গুরুত্বকেও তুলে ধরে।
শেখ আফনান বিরাহীম: গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটিং সায়েন্স মাস্টার্স প্রোগ্রামে অধ্যয়নরত