যশোরে নীল চাষ ও নীলকুঠি

চৌগাছা বাজার থেকে একটি পাকা সড়ক গেছে দক্ষিণে ঝিকরগাছার দিকে। ৫০০ গজ গেলেই একটি মোড়। মোড় থেকে পাকা সড়ক পশ্চিম দিকে গেছে মাসিলা সীমান্তের দিকে। সেখান থেকে সামনে গেলেই কুঠিপাড়া।

চৌগাছা বাজার থেকে একটি পাকা সড়ক গেছে দক্ষিণে ঝিকরগাছার দিকে। ৫০০ গজ গেলেই একটি মোড়। মোড় থেকে পাকা সড়ক পশ্চিম দিকে গেছে মাসিলা সীমান্তের দিকে। সেখান থেকে সামনে গেলেই কুঠিপাড়া। প্রধান সড়ক ধরে কিছুদূর গেলেই সরু রাস্তা নেমে গেছে কপোতাক্ষ নদের তীরে। চারপাশে দেবদারু গাছের ছায়া। দিনের বেলায়ও সূর্যের আলো পড়ে না মাটিতে। নদের একেবারে পূর্ব তীরে একটি পুরনো দ্বিতল বাড়ি। এটাই চৌগাছার নীলকুঠি। বাড়িটির কারণে নাম হয়েছে কুঠিপাড়া। যশোর জেলায় টিকে থাকা একমাত্র নীলকুঠি এটি।

যশোরে যেমন নীল চাষ শুরু হয়েছিল, তেমন এখান থেকেই আন্দোলন শুরু হয়েছিল নীল চাষ বন্ধের। নীল চাষবিরোধী আন্দোলনের পুরোধা ছিলেন চৌগাছার কৃতী সন্তান দিগম্বর বিশ্বাস ও বিষ্ণুচরণ বিশ্বাস। প্রথম জীবনে তারা নীলকুঠিতে দেওয়ানের কাজ করতেন। কৃষকদের ওপর নীলকরদের অত্যাচার ও শোষণ প্রত্যক্ষ করে দেওয়ানি পদে ইস্তফা দেন এবং বিদ্রোহী কৃষকদের সংগঠিত করতে থাকেন। বিদ্রোহীরা অস্ত্র চালনা জানত না, দিগম্বর বিশ্বাস অর্থ ব্যয় করে বরিশাল থেকে লাঠিয়াল এনে নীলচাষীদের বল্লম ও লাঠিখেলা শেখান এবং প্রতিরোধ বাহিনী গড়ে তোলেন। কৃষকদের সাহায্যার্থে তারা তৎকালীন সময়ে ১৭ হাজার টাকা ব্যয় করে সর্বস্বান্ত হয়ে যান। ঐতিহাসিক সতীশচন্দ্র মিত্রের ভাষায় ‘বিশ্বাসদের কিছু সংগতি ছিল, যাহা ছিল সবই এই আন্দোলনে ব্যয় করিলেন। প্রজার জোট ভাঙ্গিবার জন্যে নীলকরেরা ক্ষেপিয়া গেল। বিশ্বাসেরা বরিশাল হইতে লাঠিয়াল আনিলেন, দেশের লোককে লাঠি ধরাইলেন...’।

আরেকজনের নাম বলতে হয়। তিনি হলেন অমৃতবাজার পত্রিকার সম্পাদক শিশিরকুমার ঘোষ। তার বাড়ি ছিল ঝিকরগাছার পলুয়া-মাগুরায় (পরে অমৃতবাজার নাম হয়)। যশোর ও নদীয়া তখন নীলকরদের দোর্দণ্ডপ্রতাপ। সে সময়ের হিন্দু প্যাট্রিয়ট পত্রিকায় তিনি ‘যশোহরের সংবাদদাতা’-হিসেবে নীলকরদের অত্যাচারের কাহিনী লিখে পাঠাতে শুরু করেন (১৮৫৯-৬০ খ্রিস্টাব্দ)। ১৮৬২ খ্রিস্টাব্দের শেষ দিকে পাদ্রি বসন্ত কুমারের সহযোগিতায় তিনি কলকাতা থেকে একটি কাঠনির্মিত প্রেস ক্রয় করেন। এ প্রেস থেকে তিনি সাহিত্য, শিল্প, বিজ্ঞান ও কৃষিবিষয়ক অমৃত প্রবাহিনী নামে একটি পাক্ষিক পত্রিকা প্রকাশ করেন নিজ গ্রাম থেকে। কম্পোজিটর, প্রেসম্যান ও এডিটরের কাজসহ অধিকাংশ রচনা তিনি নিজেই লিখতেন। পত্রিকাটির মন্ত্র ছিল ‘আমরা ইংরেজ হইতে স্বতন্ত্র, কাজেই আমাদের আদর্শ ও পন্থাও ভিন্ন’। এ পত্রিকায় তিনি নীলকরদের অত্যাচারের কাহিনী তুলে ধরতেন। ফলে ইংরেজদের বিরাগভাজন হন তিনি। এছাড়া যশোরের রায় বাহাদুর যদুনাথ মজুমদার প্রজাদের পক্ষে মামলায় বিনা পারিশ্রমিকে লড়তেন। কারণ সে সময় নীল চাষ করতে না চাইলে নীলকররা চাষীদের নামে মিথ্যা মামলা দায়ের করতেন।

বেঙ্গল ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ার যশোরের (১৯১২) প্রণেতা এমএলএল ওমালি বলেন, ‘চৌগাছায় একটি বড় নীল কারখানা ছিল, মি. বাকসওয়ার্থ দ্বারা নির্মিত হয়েছিল, যা ৩০ বছরেরও বেশি আগে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এছাড়া নীলকান্ত পাড়ে নামে একজন ধনী ব্যবসায়ী দ্বারা নির্মিত একটি ছোট নীল কারখানাও ছিল এখানে। একদিন নীলকান্ত পাড়ে যখন কলকাতা থেকে নীল বিক্রির ১৪ হাজার টাকা ফেরত আনছিল। তখন তিনি ডাকাতদের কবলে পড়েন। তার সব টাকা লুট করে নেয় ডাকাতরা। নীলকান্ত পাড়ে কখনই এই টাকার ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারেননি। তাই একদিন তারিণী চরণ ঘোষের কাছে এই নীল কারখানাটি বিক্রি করে দেন। তারিণী চরণ ঘোষের বাড়ি ছিল চৌগাছা বাজারের উত্তরে। তিনি জমিদার ছিলেন এবং এক সময় কৃষ্ণনগরে আইন ব্যবসা করতেন।’

বৃহত্তর যশোর জেলায় একসময় শত শত নীলকুঠি গড়ে উঠেছিল। তবে জেলার কোনো কোনো স্থানে নীলকুঠি ছিল, নীল আন্দোলনকালে এদের মালিক কে ছিলেন বা এসব কুঠিতে কী পরিমাণ জমি নীল চাষের আওতায় এসেছিল, অথবা ১৮৬২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত এদের উৎপাদন ও এর হ্রাস-বৃদ্ধি কী রকম ছিল তা সঠিক করে বলা সম্ভব নয়। ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দে রামশংকর সেন যশোর জেলার কৃষিশুমারি সম্পাদন করেন। তিনি ছিলেন যশোর জেলার ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ও ডেপুটি কালেক্টর। ফলে এ সময় কর্মরত বিভিন্ন নীলকুঠি সম্পর্কে সংক্ষেপে কিছু জানা যায়। যশোর জেলার নীল উৎকৃষ্ট হওয়ায় রাতারাতি বড়লোক হওয়ার আশায় ইংল্যান্ডের ধনী ব্যক্তি ও তাদের পুত্ররা এ দেশে এসে নীল চাষ শুরু করে। নীল চাষের জন্য নীলকর সাহেবরা ব্যক্তিগত অথবা যৌথভাবে ব্যবসা শুরু করে।

যশোর জেলায় প্রথম নীলকুঠি গড়ে ওঠে রূপদিয়ায়। মি. বন্ড নামের এক নীলকর ১৭৯৫ খ্রিস্টাব্দে কোম্পানির ‘কোর্ট অব ডাইরেক্টর্স’-এর অনুমতি নিয়ে এখানে কুঠি স্থাপন করেন। এছাড়া আলীনগরে (বর্তমান বাণিজ্য কেন্দ্র নওয়াপাড়া) আরো একটি কুঠি নির্মাণের অনুমতি পান তিনি। তাই বলা চলে যশোরে ইউরোপীয়দের কর্তৃত্বাধীনে নীল চাষ শুরু ১৭৯৫ খ্রিস্টাব্দে। মি. বন্ড নীল চাষ শুরু করলে অন্য নীলকরদের যশোরে আগমন ঘটে। এর পরের বছর ১৭৯৬ খ্রিস্টাব্দে টাফট নামে অন্য একজন ইংরেজ মাহমুদশাহীতে নীল চাষের অনুমতি লাভ করেন। এ মাহমুদশাহী ছিল যশোরের একটি পরগনা। ১৮০১ খ্রিস্টাব্দে অ্যান্ডারসন নামে একজন সিভিল সার্জন যশোরের বারান্দি ও নীলগঞ্জে নীল উৎপাদন শুরু করেন। এছাড়া তিনি দৌলতপুরেও নীলকুঠি বসান। বারান্দি ও নীলগঞ্জ যশোর শহরের উপকণ্ঠে ছিল। অ্যান্ডারসনের কুঠিগুলো কাছাকাছি হওয়ায় ঝিকরগাছা কুঠির নীলকর জেনিংস ও রূপদিয়া কুঠির নীলকর বন্ড আপত্তি জানায়। তারা অভিযোগ উত্থাপন করে, অ্যান্ডারসনের কুঠির নীল চাষ তাদের নীল চাষের এলাকায় ঢুকে পড়বে। এরই মধ্যে জেলায় নীলকরদের কার্যক্রম ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হয়ে পড়েছিল। কালেক্টর নীলকরদের পারস্পরিক কোন্দলের বিষয়টি অনুধাবন করেন এবং তা নিরসনে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়নের প্রয়োজনীতা অনুভব করেন। তিনি মনে করেন, পুরনো কুঠি থেকে নতুন নীলকুঠির দূরত্ব কমপক্ষে ১০ মাইল হওয়া উচিত। নতুন নীলকুঠি স্থাপনের ক্ষেত্রে তার মতের ভিত্তিতে একটি নীতিমালা প্রবর্তনে তিনি কর্তৃপক্ষের কাছে সুপারিশ করেন। তবে কোম্পানি প্রশাসন তার সুপারিশ যৌক্তিক মনে করেনি। ফলে কোনো বিধিনিষেধ আরোপিত হয়নি। নতুন কুঠি স্থাপনে কোনো বাধা না থাকায় নতুন নীলকরের আগমন অব্যাহত থাকে। জেলায় নীলকরের সংখ্যা বাড়ে। সেই সঙ্গে নীলকুঠির সংখ্যা ও নীল জমির পরিমাণ বাড়ে।

নীল চাষের কারবারে কয়েকটি কুঠি বা চাষের এলাকা নিয়ে একটি কনসার্ন নামে পরিচিত ছিল। প্রত্যেক কনসার্নের অধীনে বেশকিছু কুঠি থাকত।

তৎকালীন যশোরে বনগাঁ মহকুমার মোল্লাহাটিতে বেঙ্গল ইন্ডিগো কোম্পানির সদর দপ্তর ছিল। মোল্লাহাটি কনসার্নের ম্যানেজার ছিলেন স্যার টি লারমোর সাহেব। পরে ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে মি. জেমস ফারলং ম্যানেজার নিযুক্ত হন। মোল্লাহাটি, বাঘডাঙ্গা, পিপুলবাড়িয়া, পিঁপড়াগাছি, ভবানীপুর, বেনাপোল, দুর্গাপুর, গাইঘাটা, হুগলী, মীর্জাপুর ছিল মোল্লাহাটি কনসার্নের অধীন। দেশভাগের সময় এ বনগাঁ ভারতের ভেতর পড়ে। এ কুঠি এলাকার জনজীবন নিয়ে ‘নীলদর্পণ’ নাটক রচনা করেন দীনবন্ধু মিত্র। কপোতাক্ষ নদের পশ্চিম পাশে চৌগাছার পুড়াপাড়া বাজারের পাশে ছিল কাঠগড়া কানসার্ন। এর অধীন ছিল কাঠগড়া, খালিশপুর, চৌগাছা, গুয়াতলা, কাদবিলা ও ইলিশমারি নীলকুঠি। তেলকুপি কনসার্নের অবস্থান ছিল বাঘারপাড়ায়। এর মালিক ছিলেন যোগেশ্বর রায়। এ কনসার্নে নীল চাষের জমির পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৭৫ বিঘা। এসব জমিতে প্রতি বছর ২৩ মণ ৩৫ সের নীল উৎপাদন হতো।

নারিকেলবাড়িয়া কনসার্নও ছিল বাঘাপাড়ায় নারিকেলবাড়িয়া বাজারের পাশে চিত্রা নদীর কূলে। গৌরচন্দ্র সাধু খাঁ নামের এক ব্যক্তি এর মালিক ছিলেন। এ কনসার্নে ৪৫৪ বিঘা জমিতে নীল চাষ হতো। যশোরের বাঘারপাড়ায় পশ্চিমা কনসার্ন নামে আরো একটি কনসার্ন ছিল। এর মালিক ছিলেন গুরুচরণ ব্যানার্জি। এ কনসার্নের অধীন ১ হাজার ৫৯৫ বিঘা জমিতে নীল চাষ হতো। ঝিকরগাছা কনসার্নের সদর কুঠি ছিল ঝিকরগাছা কপোতাক্ষ নদের তীরে, কৃষ্ণনগর এলাকায়। ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে এর ম্যানেজার ছিলেন হেনরি ম্যাকেঞ্জি। এর অধীনে ৫ হাজার ২৫ বিঘা জমিতে নীল চাষ হতো।

যশোরের চৌগাছা কুঠি ছবি: লেখক

টমাস ম্যাচেল বেঙ্গল ইন্ডিগো কোম্পানিতে এক নীলকর হিসেবে যোগ দেন ১৮৪৬ খ্রিস্টাব্দে এবং থাকতে শুরু করেন গ্রামবাংলারই বিভিন্ন নীলকুঠিতে। নীলকর জীবনের রোজনামচা তিনি লিখে রাখতেন তার জার্নালে। সেই সঙ্গে জার্নালের পাতায় পাতায় আঁকতেন বাংলার গ্রাম্য জীবনের ছবি। তার রোজকার বর্ণনায় মূর্ত হয় বেনাপোল, ঝিকরগাছা, যশোরসহ আশপাশের নীলকুঠির গ্রামগুলো। ১৮৫১ সালের ১৯ আগস্ট তিনি শার্শার পিঁপড়াগাছি নীলকুঠি থেকে ঝিকরগাছার দিকদানা নীলকুঠিতে যান। সেদিন তিনি ডায়েরিতে লেখেন, ‘পিঁপড়াগাছি গিয়েছিলাম। সেখানে প্রাতরাশ সেরে স্মিথের সঙ্গে তার প্রধান ফ্যাক্টরি দিকদানা গেলাম। ফিরবার সময় ভীষণ মাথা ধরল। তার উপর ফেরার রাস্তাটি জলের তলায়। রাস্তার সবচেয়ে ভালো অংশটিতেও দুই ইঞ্চি জল জমে আছে। চারিদিকে দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ ধানের জমি। জল আর ধানের জমিতে আমরা রাস্তা হারালাম। অবশেষে একটা গ্রাম দেখতে পেয়ে সেখানে ঢুকলাম। এখানে কাউকে জিজ্ঞেস করে রাস্তার দিশা জেনে নিতে হবে। কিন্তু আমাদের দেখেই গ্রামের লোকেরা তড়িঘড়ি ঘরে ঢুকে খিল এঁটে দিল। দু-একটা লোক ঘর থেকে কিছুটা দূরে ছিল, তারা তো হাঁচড়পাঁচড় করে সটান গাছের মগডালে উঠে বসে রইল। আমরা নিচ থেকে অনেক অনুনয় বিনয় করেও তাদের না পারলাম গাছ থেকে নামাতে, আর না পেলাম পথের দিশা। তারা নির্বাক হয়ে গাছের উপর বসে আমাদের দিকে এমনভাবে চেয়ে রইল যেন তারা চোখের সামনে ছাল ছাড়ানো জীবন্ত দু’টো বেবুন (লম্বা মুখের বাদর বিশেষ) দেখছে। জায়গাটা যেহেতু আমারই ফ্যাক্টরির অন্তর্গত তাই আমিই উদ্যোগ নিয়ে ঘোড়া থেকে নামলাম। লোকগুলোকে গাছ থেকে নামা বা কথা বলাব। আমি পড়ে থাকা একটা কুড়াল তুলে নিলাম। চিৎকার করে বললাম, “‍রাস্তা দেখাবে কিনা?’’ ওপর থেকে কোনো উত্তর এল না। নিচে ওদের অনেকগুলো মাটির কলসি পড়ে ছিল। ঠাস করে কুড়ালের ঘা পড়ল একটির ওপর। “‍রাস্তা দেখাবে কিনা?’’ আবার নিরুত্তর। আবার ঘা পড়ল আরেকটি কলসির ওপর। “‍রাস্তা দেখাবে কিনা?’’ তৃতীয়বার একই প্রশ্নের পুনরাবৃত্তি করলাম। একজন হাত তুলে উত্তরদিক দেখাল আর অন্যজন হাত তুলে দক্ষিণদিক নির্দেশ করল। ঠাস করে কুড়াল নামল আর একটি কলসির ওপর। এ রকম অনেকগুলো কলসি ভাঙার পর একজন গাছ থেকে নেমে আমাদের রাস্তা দেখাল। ঘটনাটা অবিশ্বাস্য মনে হলেও সত্যি। এরা কখনো প্রশ্নের উত্তরে গড়গড়িয়ে কথা বলে যায় আবার কখনো তারা বিস্ময় আর ভয় নিয়ে মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে নির্বাক হয়ে। যেন আমরা যা বলছি তার এক বর্ণও বুঝতে পারছে না কিংবা সেগুলোর কোনো উত্তর তাদের জানা নেই। হিন্দুরা সাধারণত প্রকৃতিগতভাবে চুপচাপ। হঠাৎ করে কোনো কিছুতে চমক লাগলে এরা চিন্তাশক্তি হারিয়ে ফেলে। কিন্তু এই একই লোক অন্য পরিস্থিতিতে কথার জাদুতে অবাক করে দেবে। পরদিন ২০ আগস্ট দিকদানা থেকে ফিরছিলাম। ফ্যাক্টরিতে এসে ঘোড়া থেকে নামতেই একটি লোক দৌড়ে এসে আমার ঘোড়া নিয়ে যেতে এল। এই লোকটিকেই গতকাল আমি বেধড়ক চাবুক মেরেছি। তাকে বললাম কাল তুমি ওই রকম বোকার মতো কথা বলছিলে কেন? উত্তর এল, ‘‘হুজুর আমার মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছিল, আমার বুদ্ধিশুদ্ধি কিছু নেই।’’ লোকটির পিঠে এখনো চাবুকের দাগ স্পষ্ট হয়ে আছে। অথচ যে তাকে চাবুক মারল তার প্রতি মানুষটির কোনো রাগ নেই, অভিযোগ নেই। সে মনে মনে ভেবে নিয়েছে যে এই প্রহার তার প্রাপ্য ছিল। পিঠের ওপর চামড়ার চাবুক কিন্তু সামান্য ব্যাপার নয়।’

যা-ই হোক, বৃহত্তর যশোর জেলায় মোট কুঠির সংখ্যা ছিল ৯৯। এর মধ্যে ইউরোপীয় কুঠির সংখ্যা ছিল ৫১। দেশীয়দের মালিকানাধীন ছিল ৪৮। ১ লাখ ৩ হাজার ২২৩ বিঘা জমি নীল চাষের আওতায় এসেছিল। এখানে প্রতি বছর ৪ হাজার ৬৭৭ মণ ৩৩ সের ১৩ ছটাক নীল উৎপাদন হতো। ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দে এর দাম ছিল ১২ লাখ ৬২ হাজার ৭৬৯ রুপি ১৫ আনা। ওপরের হিসাব গ্রহণ করা হয়েছে রামশংকর সেনের কৃষিবিষয়ক পরিসংখ্যান থেকে। এটি ১৮৭২-৭৩ খ্রিস্টাব্দে পরিচালিত জরিপের ফল। ১৮৫৯-৬২ খ্রিস্টাব্দে নীল আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করে। ফলে নীল চাষ ব্যাহত হয়। উপরোক্ত জরিপ ১৮৬২ খ্রিস্টাব্দের পরবর্তী সময়ে পরিচালিত হওয়ায় এতে পূর্ববর্তী সময়ের তুলনায় কম নীল চাষ ও নীল উৎপাদন পরিদৃষ্ট হয়।

নীল আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে নীল উৎপাদন অর্ধেক কমে গিয়েছিল কিনা তা সঠিক করে বলা দুষ্কর। তবে এতে নীল চাষ ব্যাপকভাবে কমে। কলকাতার নীল ব্যবসায়ী আর টমাস অ্যান্ড কোম্পানির হিসাবমতে, যশোর থেকে কলকাতায় রফতানীকৃত নীলের হিসাব থেকেও এ কথা প্রমাণ হয়। এতে দেখা যায়, ১৮৪৯-৫০ থেকে ১৮৫৮-৫৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত গড়ে প্রতি বছর নীল রফতানি করা হতো ১০ হাজার ৭৯১ মণ। এ জেলা থেকে সবচেয়ে বেশি পরিমাণ নীল রফতানি হয়েছিল ১৮৪৯-৫০ খ্রিস্টাব্দে। রফতানীকৃত এ নীলের পরিমাণ ছিল ১৬ হাজার ৮১৮ মণ। ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দের আগে সবচেয়ে কম নীল উৎপাদন হয়েছিল ১৮৫৫-৫৬ খ্রিস্টাব্দে, ৬ হাজার ৮৮৫ মণ।

১৮৫০-এর দশকে যশোর জেলায় ১০৩ বর্গমাইল এলাকায় নীল চাষ হতো। ওয়েস্টল্যান্ডের হিসাবে ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে এ জেলায় নীল চাষের পরিমাণ ৫৪ হাজার একর। ১৮৭২-৭৩ খ্রিস্টাব্দে রামশংকর সেনের কৃষিশুমারি রিপোর্ট মোতাবেক যশোরে নীল চাষের জমির পরিমাণ ছিল ৩১ হাজার ৩৩৩ একর। অর্থাৎ ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দে এ জেলায় ৪৯ বর্গমাইল এলাকা নীল চাষের অধীনে ছিল। তাই বলা যায়, ১৮৫৯-৬২ খ্রিস্টাব্দে তীব্র নীল আন্দোলনের পর যশোর জেলায় ক্রমান্বয়ে নীল চাষ কমতে থাকে। শেষাবধি বিশ শতকের প্রথম দশকে এসে তা বিলুপ্ত হয়ে পড়ে।

তথ্যসূত্র:

১. যশোহর খুলনার ইতিহাস-সতীশচন্দ্র মিত্র।

২. নীল বিদ্রোহ ও বিদ্বৎসমাজ-কঙ্কর গুপ্ত।

৩. যশোর জেলায় নীল চাষ, নীলকর, নীলচাষি সর্ম্পক, মো. রেজাউল করিম।

৪. নীল বিদ্রোহ, বাংলায় নীল আন্দোলন (১৮৫৯-৬২) বেøয়ার বি ক্লিং।

৫. বিদ্রোহী ভারত-সুপ্রকাশ রায়।

৬. নীলকর টমাস ম্যাচেলের দিনলিপি (১৮৪০-৫২) অনুবাদ পার্থসারথি ভৌমিক।

সাজেদ রহমান: ইতিহাস গবেষক

আরও