১৯৪৭ সালের ৩ জুন লর্ড মাউন্টব্যাটেনের ঐতিহাসিক ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে আসামের সিলেট জেলায় গণভোটের আয়োজন হয়। এ গণভোটে সিদ্ধান্ত নেয়া হয় সিলেটবাসীর সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ পূর্ববঙ্গে (পাকিস্তান) যোগ দিতে চায়, নাকি আসামের (ভারত) অংশ হয়ে থাকতে চায়। গণভোটের ফলাফলে দেখা যায় ৫৬ দশমিক ৫৬ শতাংশ ভোট পাকিস্তানের পক্ষে এবং ৪৩ দশমিক ৪৪ শতাংশ ভারতের পক্ষে পড়ে। এভাবে সিলেট ১৩ দশমিক ১২ শতাংশ ভোটের ব্যবধানে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়।
সিলেটের মোট ভোটারের মধ্যে ৫৬ দশমিক ৯৩ শতাংশ মুসলিম ছিলেন এবং ভোটের ফলাফলও ভোটারদের সাম্প্রদায়িক বিভাজন অনুযায়ী ছিল। এ কারণেই অনেক জাতীয় নেতা ও ঐতিহাসিক মনে করেন, এ ফলাফল প্রত্যাশিত ছিল। জওহরলাল নেহরু এ সম্পর্কে মাউন্টব্যাটেনকে বলেন, ‘নির্বাচনী অনিয়ম, ভুয়া পরিচয়ে ভোটদান ও বাংলার মুসলিম ন্যাশনাল গার্ডের হস্তক্ষেপ ছিল। কিন্তু ভোটের সংখ্যা ও ফলাফল থেকে স্পষ্ট হয় এসব অনিয়ম গণভোটের মূল ফলাফলে প্রভাব ফেলেনি।’ একই ধরনের মন্তব্য করেন সরদার প্যাটেল ও ঐতিহাসিক অমলেন্দু গুহও। গুহ উল্লেখ করেন সিলেটে মুসলিম জনসংখ্যা ৬০ শতাংশ হওয়ায় এ ফলাফল স্বাভাবিক।
তবে এ ধারণা, কেবল হিন্দুরা ভারতের পক্ষে ও মুসলিমরা পাকিস্তানের পক্ষে ভোট দিয়েছেন, তা প্রকৃত চিত্রকে সরলীকৃতভাবে উপস্থাপন করে। গবেষণা থেকে প্রমাণ মেলে, মুসলিম সম্প্রদায়ের একটি অংশ ভারতের পক্ষে ভোট দিয়েছিল।
ভোটের বিশ্লেষণ
সিলেট গণভোটে ভোটারদের সম্প্রদায়গত পরিচয় ও ভোটের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলেই দেখা যায়, ফলাফল শুধু সাম্প্রদায়িক ভোটাভুটির ওপর নির্ভরশীল ছিল না। নির্বাচন কমিশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সিলেটের মোট ভোটার সংখ্যা ছিল ৫ লাখ ৪৭ হাজার ৫১৫। এর মধ্যে মুসলিম ভোটার ৩ লাখ ১১ হাজার ৭০৭ (৫৬ দশমিক ৯৩ শতাংশ) ও অমুসলিম (প্রায় সব হিন্দু) ভোটার ২ লাখ ৩৫ হাজার ৮০৮ জন (৪৩ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ)। মুসলিম ভোটার সংখ্যা অমুসলিম ভোটারের চেয়ে ১৩ দশমিক ৮৬ শতাংশ বেশি ছিল।
গণভোটে বৈধ ভোটারের সংখ্যা ছিল ৪ লাখ ২৩ হাজার ৬৬০, যা মোট ভোটারের ৭৭ দশমিক ৩৮ শতাংশ। এর মধ্যে পাকিস্তানের পক্ষে ভোট পড়ে ২ লাখ ৩৯ হাজার ৬১৯ (৫৫ দশমিক ৫৬ শতাংশ) এবং ভারতের পক্ষে ১ লাখ ৮৪ হাজার ৪১টি (৪৩ দশমিক ৪৪ শতাংশ)।
পরিসংখ্যানে দেখা যায়, মুসলিম ভোটারের একটি অংশ ভারতের পক্ষে ভোট দেয়। আনুমানিক দশমিক ৭৪ শতাংশ মুসলিম ভারতের পক্ষে ভোট দিয়েছে, যার সংখ্যা প্রায় ৩ হাজার ১৩৫। এছাড়া ৭২ হাজার ১১৪ (২৩ দশমিক ১৪ শতাংশ) মুসলিম ও ৬৫ হাজার ৪৮৬ (২৭ দশমিক ৭৭ শতাংশ) হিন্দু ভোটার ভোটদানে অংশ নেননি বা নিতে পারেননি।
এ তথ্যগুলো থেকেও স্পষ্ট গণভোটের ফলাফল সম্পূর্ণভাবে সম্প্রদায়ভিত্তিক নয় বরং এতে বিভিন্ন কারণে ভিন্ন সম্প্রদায়ের ভোটাররা বিপরীত পক্ষেও ভোট দিয়েছেন।
ভোটার তালিকা
১৯৪৭ সালের গণভোটে ভোটারদের তথ্য বিশ্লেষণের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি ছিল ভোটার তালিকা। ১৯৪৬ সালের ভোটার তালিকাকে ভিত্তি করে গণভোটের জন্য প্রয়োজনীয় সংশোধন করা হয়। সংশোধনীর মাধ্যমে ২৬ মুসলিম ও ১৩ হাজার ৭১৯ অমুসলিমের নাম তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়। অমুসলিমদের সংখ্যাটি বেশি ছিল, কারণ উত্তর ভারতের চা-বাগানের শ্রমিকদের গণভোটে ভোটাধিকার দেয়া হয়নি।
সিলেটে ২২১টি চা-বাগান ছিল, যেখানে মোট শ্রমিক সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৯৭ হাজার ২৭২। এদের মধ্যে ১৯৪৬ সালে মাত্র ৩০ হাজার ৫০২ জনকে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার উপযোগী বলে গণ্য করা হয়। এর মধ্যে মাত্র ১১ হাজার ৪৪৯ ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত হন। বাকি ১ লাখ ৬৬ হাজার ৭৫০ শ্রমিক ভোটাধিকার থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত হন।
যদি ৩০ হাজার ৫০২ জনের মধ্যে ১১ হাজার ৪৪৯ ভোটার হতে পারেন, তবে ১ লাখ ৯৭ হাজার ২৭২ শ্রমিকের মধ্যে প্রায় ৭৪ হাজার ২৭২ ভোটার হওয়ার কথা ছিল। এ সংখ্যা অমুসলিম ভোটারের মোট সংখ্যায় যোগ করলে তা ৩ লাখ ২১ হাজার ৭৯৯ জনে পৌঁছায়। অন্যদিকে মুসলিম ভোটারের সংখ্যা ছিল ৩ লাখ ১১ হাজার ৭৩৩।
মুসলিমদের মোট জনসংখ্যা হিন্দুদের তুলনায় বেশি হলেও ভোটারের হার তাদের কম ছিল। কারণ তাদের মধ্যে শিশুদের অনুপাত বেশি ছিল। শ্রমিকদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়। এছাড়া ১৯৪৬ সালের তালিকায় নিবন্ধিত ১১ হাজার ৪৪৯ জনের নামও গণভোটের তালিকা থেকে বাদ পরে।
জনসংখ্যার গঠন
১৯৩১ সালের তথ্যানুযায়ী, সিলেট জেলায় মুসলিমের সংখ্যা ছিল ১৮ লাখ ৯২ হাজার ১১৭। অন্যদিকে অমুসলিমের সংখ্যা ছিল ১২ লাখ ২৪ হাজার ৪৮৫। তবে চা-বাগানের ১ লাখ ৯৭ হাজার ২৭২ শ্রমিকের সংখ্যা এ পরিসংখ্যানের অন্তর্ভুক্ত ছিল না। সরদার প্যাটেলের অনুমান অনুযায়ী, সিলেটে হিন্দু জনসংখ্যার হার ছিল প্রায় ৪৫ শতাংশ।
বিভাজন ও মেরুকরণ
গণভোটের প্রচার-প্রচারণার মূল বিষয় হয়ে উঠেছিল হিন্দু-মুসলিম ধর্মীয় বিভাজন। তবে জাতীয়তাবাদী মুসলিমরা স্পষ্টভাবে ভারতের পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছিল। মুসলিম নেতারা ও জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের স্থানীয় শাখার সদস্যরা, যেমন হোসাইন আহমদ মাদানি, মাহমুদ আলী, হুরমত আলী বড়লস্কর, ইব্রাহিম আলী চৌধুরী, আব্দুল রশিদ, আব্দুল জলিল এবং অন্যরা মুসলিম ভোটারদের প্রভাবিত করতে জনসভা ও বিশাল শোভাযাত্রার আয়োজন করেন। উত্তর ও দক্ষিণ সিলেট ছিল জামিয়তের শক্তিশালী এলাকা। ১৯৪৬ সালে মুসলিম লীগকে পরাজিত করে আসাম অ্যাসেম্বলিতে নির্বাচিত হয় জমিয়ত। তখনকার আসাম সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বসন্ত কুমার দাস মুসলিম ভোটারদের মধ্যে জনপ্রিয় ছিলেন। এমনকি দেশভাগের পর তিনি ১৯৪৭ সালে পূর্ব পাকিস্তান অ্যাসেম্বলিতে নির্বাচিত হন এবং পরে পাকিস্তানের শিক্ষামন্ত্রী হন। বসন্ত কুমার দাস সিলেটের কংগ্রেস নেতাদের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী ছিলেন। রেফারেন্ডাম চলাকালে সিলেটকে ভারতেই রাখার জন্য তিনি কঠোর পরিশ্রম করেছিলেন।
মুসলিম লীগ স্বেচ্ছাসেবীরা জাতীয়তাবাদী মুসলিম ও জমিয়ত সমর্থকদের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালালেও কিছু ভোটার ভারতের পক্ষে ভোট দিয়েছিল। অন্যদিকে কিছু তফসিলি সম্প্রদায়ের নেতা পাকিস্তানের পক্ষে খোলামেলা প্রচারণা চালিয়েছিলেন। বাংলার বর্ণ নেতা ও মুসলিম লীগের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রার্থী যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল সিলেটে এসে তার বর্ণের সমর্থন সংগ্রহ করেন। যাতে সিলেট জেলা পূর্ব বাংলার (পাকিস্তান) সঙ্গে যুক্ত হয়। আরেক বর্ণ নেতা প্রসন্ন কুমার দাস সিলেটে তার জাতির মানুষের কাছে বলেছিলেন, ‘মুসলিমদের সঙ্গে হাত মিলাও, যারা “নিঃস্বদের, নিঃস্বদের দ্বারা এবং নিঃস্বদের জন্য” একটি রাষ্ট্র তৈরি করতে চলেছে।’ অন্যদিকে স্থানীয় তফসিলি জাতির নেতা ও সংবিধান সভার সদস্য অক্ষয় কুমার দাস সিলেটকে ভারতেই রেখে দেয়ার পক্ষে পূর্ণ সমর্থন দিয়েছিলেন। সিলেটের বেশির ভাগ তফসিলি জাতির জনগণ তার প্রভাবের অধীনে ছিলেন। ১৯৩১ সালে সুরমা উপত্যকায় (সিলেট ও কাছাড়) ১৩ লাখ ২৮ হাজার ৭৭৮ হিন্দুর মধ্যে ৭ লাখ ৫৫ হাজার ৯৭৩ জন (৫৬ দশমিক ৮৯ শতাংশ) ছিলেন বর্ণ হিন্দু এবং ৫ লাখ ৭২ হাজার ৮০৫ (৪৩ দশমিক ১১ শতাংশ) ছিলেন তফসিলি সম্প্রদায়। ১৯৪৭ সালে ২ লাখ ৩৫ হাজার ৮০৮ অমুসলিম ভোটারের মধ্যে ১ লাখ ১ হাজার ৬৫৭ জন তফসিলি সম্প্রদায়ের ভোটার ছিলেন। মনে করা হয় এ তফসিলি সম্প্রদায়ের অধিকাংশ ভোটার ভারতকে সমর্থন করেছিলেন। তবে কিছু ভোটার পাকিস্তানের পক্ষে ভোট দিয়েছেন। জাতীয়তাবাদী মুসলিম ও তফসিলি সম্প্রদায়ের গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে এ বিভাজন এবং মেরুকরণ সম্ভবত একে অন্যকে ভারসাম্য প্রদান করেছিল, যাতে ভারত ও পাকিস্তানের পক্ষে বৈধ ভোটের সংখ্যা প্রায় সমান হয়ে যায় এবং অমুসলিম ও মুসলিম ভোটারের সংখ্যা একে অন্যের কাছাকাছি চলে আসে।
আড়ালে থাকা তথ্য
১৮৭৪ সালে সিলেট জেলা বাংলা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আসামের সঙ্গে যুক্ত হয়। সে সময় থেকেই সিলেটের মানুষ বারবার বাংলার সঙ্গে পুনরায় যুক্ত হওয়ার দাবিতে আন্দোলন করেছে। অন্যদিকে আসামের নেতারা চেয়েছিলেন সিলেটকে আসাম থেকে বাদ দিতে, যাতে আসামের বাঙালি জনগোষ্ঠী কমে যায়।
আসামের কিছু নেতা গণভোটের পক্ষে মত দিয়েছিলেন। তারা বলেছিলেন, সিলেট প্রকৃতপক্ষে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত। গণভোটের কোনো প্রয়োজনই ছিল না। বিশ্লেষক অমলেন্দু গুহ এ ঘটনাকে উল্লেখ করেছেন, আসামের নেতাদের জন্য সিলেটকে বাদ দেয়ার এটি ছিল অন্যতম সুযোগ।
গণভোটের সময় আসামের কোনো কংগ্রেস নেতা সিলেট সফর করেননি। কাছাড় জেলা থেকে কিছু বাংলা ভাষাভাষী নেতা সিলেটে ভারতের পক্ষে প্রচারে অংশ নেন। অন্যদিকে অনেক মুসলিম লীগ নেতা, যেমন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী সিলেট সফর করেন।
সারসংক্ষেপ
সিলেটের গণভোটে ভারত ও পাকিস্তানের পক্ষে দেয়া ভোটের সংখ্যা মূলত জেলার সম্প্রদায়গত জনসংখ্যার প্রতিফলন মনে হলেও গণভোট সম্পূর্ণভাবে সাম্প্রদায়িক ছিল না। এর কয়েকটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, ভারতের পক্ষে দেয়া ভোটের সংখ্যা অমুসলিমদের ভোটের সংখ্যা থেকে ৩ হাজার ১৩৫ বেশি ছিল। দ্বিতীয়ত, কিছু মুসলিম ভারতকে এবং কিছু হিন্দু পাকিস্তানকে ভোট দিয়েছিলেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায়।
[জে বি ভট্টাচার্যের দ্য সিলেট রেফারেন্ডাম (১৯৪৭): মিথ অব আ কমিউনাল ভোটিং প্রবন্ধ অবলম্বনে]
মিনহাজুল আবেদীন: সহসম্পাদক, বণিক বার্তা