বাংলায় কোম্পানির শাসন প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করেছিল আর্মেনীয়রা

১৭৫৭ সালের ২৩ জুন। পলাশীর যুদ্ধে রবার্ট ক্লাইভের বাহিনীর হাতে বাংলার পরাজয়। জর্জ ব্রুস ম্যালেসন তার দ্য ডিসাইসিভ ব্যাটলস অব ইন্ডিয়া (১৮৮৩) গ্রন্থে পলাশীকে ব্রিটিশদের সবচেয়ে নিষ্প্রাণ বিজয় বলে চিহ্নিত করেন।

১৭৫৭ সালের ২৩ জুন। পলাশীর যুদ্ধে রবার্ট ক্লাইভের বাহিনীর হাতে বাংলার পরাজয়। জর্জ ব্রুস ম্যালেসন তার দ্য ডিসাইসিভ ব্যাটলস অব ইন্ডিয়া (১৮৮৩) গ্রন্থে পলাশীকে ব্রিটিশদের সবচেয়ে নিষ্প্রাণ বিজয় বলে চিহ্নিত করেন। ম্যালেসনের মতে, পলাশীর ফলেই কেপ অব গুড হোপ, মরিশাস দখল, মিসরে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়েছিল। পলাশীই ইংল্যান্ডের মধ্যবিত্তের সন্তানদের জন্য এক অসীম সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছিল; যেখানে প্রতিভা ও পরিশ্রমের সত্যিকারের মূল্যায়ন সম্ভব হয়েছিল। প্রতিটি প্রকৃত ইংরেজের চেতনার গভীরে এ উপলব্ধি রয়ে গেছে।

ঐতিহাসিকদের মতে, পলাশীর পরিণতিই উন্মোচন করেছিল উপমহাদেশের অন্তর্দ্বন্দ্ব। ধ্বংস হয়েছিল স্থানীয় রাজবংশগুলোর পরাক্রম, ধসে পড়েছিল বাংলার সমৃদ্ধ অর্থনীতি।

পলাশীর ইতিহাসে সাধারণত ক্লাইভের সঙ্গে জাফর, জগৎ শেঠ ও উমিচাঁদের জোটের কথাই পুনরাবৃত্ত হয়। তবে বাংলায় তখন আরো এক শক্তির উপস্থিতি ছিল—আর্মেনীয়রা। তাদের সহায়তা ছাড়া ১৭৫৬ সালের কলকাতার পতনের পর ক্লাইভ ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পক্ষে পলাশীর বিজয় এতটা সহজ নাও হতে পারত।

সে সময়ের তিন প্রভাবশালী আর্মেনীয়র কথাই বলা যাক। খোজা ওয়াজিদ, যিনি ক্লাইভকে সমর্থন করলেও পরে ফরাসিদের প্রতি আনুগত্যের সন্দেহে গ্রেফতার হন; জোসেফ এমিন একজন অভিযাত্রী, যিনি লন্ডনে পাড়ি জমিয়েছিলেন এবং এক দশক ধরে ইংরেজ অভিজাতদের আলোচনায় ছিলেন এবং খোজা পেট্রাস আরাটুন ইংরেজ কোম্পানির মিত্র, যিনি ১৭৬৩ সালে হত্যার শিকার না হলে মীর কাসিমের পর বাংলার নবাবও হতে পারতেন।

আঠারো শতকজুড়ে আর্মেনীয়রা পারস্য, তুরস্ক ও আফগানিস্তান থেকে ব্যাপকভাবে ভারত অভিমুখী হয়ে পড়ে। এর পেছনে প্রধানত ক্যাথলিক ও ইসলামে জবরদস্তিমূলক ধর্মান্তর, ১৭২০-এর দশকের আফগান আক্রমণ এবং ১৭৪০-এর দশকে নাদির শাহের লুণ্ঠনকে দায়ী করা হয়। পাশাপাশি এশিয়ার বাণিজ্যিক সুযোগের সন্ধানে ইউরোপীয় কোম্পানিগুলো কৌশলে আর্মেনীয়দের নিজেদের পক্ষে টেনে নিয়েছিল।

সম্রাট আকবর পারস্য উপসাগরে আর্মেনীয় বাণিজ্যে করমুক্তি দিয়েছিলেন। ষোলো শতকে সুরাটে (গুজরাট) ও সতেরো শতকের শেষে চিনসুরায় (পশ্চিমবঙ্গ) তারা বসতি গড়ে তোলে। ১৬৬৫ সালে সম্রাট আওরঙ্গজেব এক ফরমানে মুর্শিদাবাদ জেলার সৈদাবাদে তাদের বসবাসের অনুমতি দেন। মুর্শিদাবাদ ছাড়াও সুরাট ও বারাণসী আর্মেনীয় বাণিজ্যের কল্যাণে রেশম শিল্পের প্রাণকেন্দ্র হয়ে ওঠে।

আর্মেনীয় জাহাজ ভারত-পারস্য-তুরস্ক-চীন যাত্রা করত। এ সুবাদে আঠারো শতকের কলকাতায় গড়ে ওঠে আর্মেনীয় স্ট্রিট, আরমানিটোলা, আর্মেনীয় ঘাট। ১৭৩৪ সালে আর্মেনীয় ঘাটেই ১৮৫৪-৫৭ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া রেলওয়ের প্রথম টিকিট সংরক্ষণ কক্ষ চালু হয়। ১৮৭৩-১৯০২ সাল পর্যন্ত শিয়ালদাহ থেকে আর্মেনীয় ঘাট পর্যন্ত ঘোড়ায় টানা ট্রাম চলত কলকাতা ট্রামওয়ে কোম্পানির।

বিশ শতকে ভারতে আর্মেনীয়দের সংখ্যা ছিল প্রায় ২৫ হাজার। এর মধ্যে কলকাতায়ই ছিল এক হাজার, যা শহরের ৩ হাজার ২০০ ব্রিটিশ বাসিন্দার এক-চতুর্থাংশেরও বেশি। তাদের বাণিজ্যিক প্রতিভা, স্থাপত্য ও সাংস্কৃতিক ছোঁয়ায় বাংলার ইতিহাসের এক অনন্য অধ্যায় রচিত হয়েছিল। আজও তা ইতিহাসের পাতায় অপেক্ষা করছে স্বীকৃতির।

বাংলায় আর্মেনীয়দের উত্থানের নেপথ্যে ছিল ইউরোপীয় ও আঞ্চলিক শক্তিদ্বন্দ্বের ফাঁকে বাণিজ্যিক সুবিধা হাতিয়ে নেয়ার অসামান্য দক্ষতা। প্রভুভক্তি দেখাতে তারা ইংরেজিয়ানার আবরণেও জড়িয়েছিল নিজেদের।

১৭৪৪ সালে জোসেফ এমিন পারস্য ও পরে আফগানিস্তান থেকে পালিয়ে কলকাতায় আশ্রয় নেন। সেখানে তখন প্রায় চার হাজার আর্মেনীয় বসতি। এমিন ইংরেজদের আচার-ভাষা, শিল্প-বিজ্ঞানের পাঠ নিতে ব্যাকুল ছিলেন। ১৭৫৬ সালে এমিন লন্ডনে পৌঁছান একজন লস্কর হিসেবে। সেখানে তিনি এডমান্ড বার্কের সান্নিধ্যে আসেন, যিনি তাকে নিজ ছায়ায় টেনে নেন। বার্কের বিখ্যাত রচনা ‘অন দ্য সাবলাইম অ্যান্ড বিউটিফুল’-সহ অন্যান্য লেখা নকল করেছিলেন এমিন।

তিনি মিসেস এলিজাবেথ মন্টাগু, স্যার উইলিয়াম জোন্স, নর্থাম্বারল্যান্ড ও কাম্বারল্যান্ডের ডিউকদের মতো প্রভাবশালীদের পৃষ্ঠপোষকতাও লাভ করেছিলেন। এক পর্যায়ে তিনি উলউইচে সামরিক প্রশিক্ষণ নিয়ে ফরাসিদের বিরুদ্ধে ইংরেজ বাহিনীতেও যোগ দেন। ১৭৭২ সালে বার্কের অনুরোধে ক্লাইভ এমিনের সামরিক পদোন্নতির সুপারিশ করেন। কিছুদিন পর তিনি কলকাতায় ফিরে মন্টেগু-জোন্স ও ৭৩ গ্রাহকের সহায়তায় ৬৬ বছর বয়সে প্রকাশ করেন আত্মজীবনী দ্য লাইফ অ্যান্ড অ্যাডভেঞ্চারস অব জোসেফ এমিন (১৭৯২)।

বার্ক এমিনকে লেখা এক চিঠিতে প্রশ্ন তুলেছিলেন—

সেই দিন কে ভেবেছিল, সেন্ট জেমস পার্কে তোমার সাথে আমার সাক্ষাতের পর এই রাজ্যই ভারতের বৃহৎ অংশ শাসন করবে? কিন্তু রাজ্য আসে-যায়... সম্রাটের চোখ উপড়ে ফেলা হয়, পথের পসারিরাই সাম্রাজ্যের কর্ণধার হয়ে ওঠে।

সত্যিই, ক্লাইভের বাংলায় এমন বহু ‘পসারি’ ও রাজনীতির নেপথ্য নায়ক ছিল—যাদের মধ্যে আর্মেনীয়দের উপস্থিতি অনস্বীকার্য।

খোজা ওয়াজিদ ছিলেন তাদেরই একজন—লবণপত্রিক বাণিজ্যের সম্রাট, ফরাসি-ইংরেজ-ডাচ সবার সঙ্গে ব্যবসায়িক সখ্য, মক্কা-বসরার সঙ্গে বাণিজ্যিক সেতু। এভাক ডি আরাটুন, খাচিক ডি খোজামালের মতো আর্মেনীয় বণিকদের প্রতিও ঝুঁকেছিল ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোর দৃষ্টি। খোজা পেট্রাস আরাটুন, মুর্শিদাবাদের মোগল দরবার ও সৈদাবাদের সঙ্গে সখ্য রাখা আরেক প্রবাদপুরুষ। তার দুই ভাই খোজা গ্রেগরি আরাটুন ও খোজা বারসিক আরাটুন কলকাতার বণিক ও কূটনীতিক মহলে ছিলেন প্রাতিস্বিক।

ওয়াজিদের আসল খেলা ছিল কূটনীতির ছদ্মাবরণে ইউরোপীয় শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক অক্ষুণ্ন রেখে লবণপত্রিকের একচেটিয়া অধিকার ধরে রাখা। ক্লাইভ-সিরাজের মধ্যস্থতায় ফরাসিদের জড়ানোর পরামর্শ দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু ১৭৫৭ সালে হুগলি দখলের সময় তার ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। ইংরেজদের সন্দেহ—সিরাজের প্রতি তার সহানুভূতি, বাংলায় ফরাসি হস্তক্ষেপে তার ভূমিকা। ১৭৫৯ সালে ডাচদের সঙ্গে জাফরের ষড়যন্ত্রে যোগ দেন ওয়াজিদ। চিনসুরার যুদ্ধে ডাচদের পতনের পর সব ইউরোপীয়র কোপানলে পড়েন তিনি। ক্লাইভের কারাগারে বন্দি অবস্থায় ‘আত্মহননের’ মাধ্যমে ইতিহাসের আঁধারে মিলিয়ে যান বাংলার বণিক সম্রাট।

ওয়াজিদের পতনের সঙ্গে সংগতি রেখে আড়াতুনের উত্থান, যিনি এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ধীরে ধীরে ইংরেজদের সঙ্গে তার সম্পর্ক সুদৃঢ় করেছিলেন। কলকাতার ব্ল্যাক হোলের পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সৈন্যদের জন্য রসদ সরবরাহ করেছিলেন আড়াতুন। ভারতীয়-আর্মেনীয় ঐতিহাসিক মেস্রোব জ্যাকব সেথ লিখেছেন, মানবতাবাদী আর্মেনীয়রা না থাকলে ফুলটার ব্রিটিশ শরণার্থীদের আত্মসমর্পণ করতে অনাহারে মরতে হতো।’ পলাশী ষড়যন্ত্রে সিরাজউদ্দৌলাকে উৎখাত করতে জাফরের সঙ্গে ক্লাইভের আলোচনার সময় আরাটুন গোয়েন্দা হিসেবে নিযুক্ত হন। এ দায়িত্ব স্বাভাবিকভাবে ওয়াজিদেরই হওয়ার কথা ছিল।

ক্লাইভের সঙ্গে আরাটুনের অবস্থান ও প্রভাব হেস্টিংসের সমকক্ষ ছিল, যিনি তখন মাত্র ১৯ বছরের এক কূটনীতিক, ভবিষ্যৎ গভর্নর জেনারেল। আরাটুন মাদ্রাজে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাউন্সিলের সদস্য হন এবং বাংলার আর্মেনীয়দের প্রতিনিধিতে পরিণত হন—যাদের পরবর্তী পরিচয় গঠিত হয় দানশীলতা, ধার্মিকতা এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যিক স্বার্থের প্রতি অটল আনুগত্য দিয়ে।

পলাশীর আগে ও পরে আর্মেনীয়দের সহায়তা বাংলায় ব্রিটিশ বাণিজ্য ও সামরিক উপস্থিতিকে অভাবনীয়ভাবে সংহত করেছিল। কলকাতা মহানগরী গঠনের পাশাপাশি ভারতীয় আর্মেনীয়দের বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক উদ্যোগ লন্ডনের ঔপনিবেশিক কেন্দ্রটিকে পুনর্নির্মাণেও ভূমিকা রাখে—১৬৬৬ সালের মহা অগ্নিকাণ্ডের ১০০ বছর পর, ইংরেজ কোম্পানির বিশাল সাম্রাজ্যিক লুণ্ঠনের অর্থে। উদাহরণস্বরূপ, আর্মেনীয় বাণিজ্যিক সহায়তায় লিডেনহল স্ট্রিটে নির্মাণ হয় ইস্ট ইন্ডিয়া হাউজ—বিশ্বের প্রথম বহুজাতিক কোম্পানির বহু বছরের সদর দপ্তর।

মিনহাজুল আবেদীন: সহসম্পাদক, বণিক বার্তা

আরও