যে বংশের হাত ধরে বাংলায় কাওয়ালির বিস্তার

মোহাম্মদ নাদীম এহতেশাম রেজা খাঁ। তিনি নাদীম কাওয়াল নামেই ঢাকায় পরিচিত। বর্তমান ঢাকায় কাওয়ালি চর্চার প্রধানপুরুষ বলা যায় তাকে। বাংলাদেশে কাওয়াল সংগীতের প্রবেশ তার পূর্বপুরুষদের হাত ধরেই। নাদীম কাওয়াল বাস করেন মিরপুর। কিন্তু চষে বেড়ান সারা দেশ। নেশা-পেশা বলতে যদি কিছু থাকে তা কেবল কাওয়ালি। কাওয়ালির

মোহাম্মদ নাদীম এহতেশাম রেজা খাঁ। তিনি নাদীম কাওয়াল নামেই ঢাকায় পরিচিত। বর্তমান ঢাকায় কাওয়ালি চর্চার প্রধানপুরুষ বলা যায় তাকে। বাংলাদেশে কাওয়াল সংগীতের প্রবেশ তার পূর্বপুরুষদের হাত ধরেই। নাদীম কাওয়াল বাস করেন মিরপুর। কিন্তু চষে বেড়ান সারা দেশ। নেশা-পেশা বলতে যদি কিছু থাকে তা কেবল কাওয়ালি। কাওয়ালির ইতিহাস বাংলায় আবির্ভাব সম্পর্কে বলতে গিয়ে কথার ঝাঁপি খুলে বসলেন। আনন্দ আর উত্তেজনায় অনর্গল বলে গেলেন কাওয়ালি চর্চায় যুক্ত সাধকদের নাম। জানালেন ৫০০-৬০০ বছর ধরে বংশপরম্পরায় কাওয়ালি চর্চার গৌরবের কথা। তার পূর্বপুরুষদের লেখা কাওয়ালি শত বছর ধরে বিখ্যাত ব্যক্তিরা গেয়ে আসছেন।

বাংলাদেশে কাওয়ালি সংগীতের আগমন নিয়ে নাদীম কওয়াল জানালেন, ৫০০-৬০০ বছর আগের কথা। আমাদের পূর্বপুরুষরা ইরাকের নাজাফ থেকে ভারতবর্ষে আসেন। তারা আজমীর শরিফে অবস্থান নেন। খাজা গরীবে নেয়াজের মাহফিলে কাওয়ালি পরিবেশন করতেন। সেখানে আমার বড় দাদা ২৯ বছর কাওয়ালি পরিবেশন করেছেন। বাবা পরিবেশন করেছেন নয় বছর। পরদাদারাও ছিলেন একই দায়িত্বে। হযরত শাহ জালাল ইয়েমেনি (রা.), হযরত শাহ পরান (রা.)-সহ অনেক সুফি-সাধক ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে বাংলায় আসতে শুরু করলে তাদের সঙ্গে কাওয়ালদেরও আগমন ঘটে। কাওয়ালরা ঢাকার নবাবদের বিশেষ মেহমান হিসেবে গুরুত্ব পেতেন। নবাব সলিমুল্লাহ, নবাব হাবিবুল্লাহতখনকার নবাবরা সুফি-সাধকদের বায়াত গ্রহণ করেন। এভাবে ১০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে আমাদের পূর্বপুরুষরা দিল্লি ঢাকায় যাতায়াত করতেন। এখনো আহসান মঞ্জিলের সামনে ওয়াইজ ঘাটে আমার বড় দাদার মাজার শরিফ আছে।

পূর্বপুরুষদের নাম উল্লেখ করে তিনি বলেন, হযরত নাজমুল হাসান আবু ইলাহি নকশবন্দি ভারতের পাটনা মিতান ঘাট থেকে বাংলায় আসেন। তার সঙ্গে বেহের শরিফ থেকে নাজমুল হাসান আবু ইলাহির ওস্তাদ হযরত মাখদুম জাহান মখদুম শরফুদ্দীন আহমাদ সোনারগাঁ আসেন। সোনারগাঁয় তার মাজার শরিফ আছে। ৭৫০-৮০০ বছর থেকে আমাদের পূর্বপুরুষরা ধারা বহন করছেন। আমার পূর্বপুরুষ হযরত আমীর খুসরো লিখেছিলেন নিজামুদ্দিন আউলিয়াকেমোহে আপনেহি রঙ মে রঙ দে নিজাম... এটি পরে নুসরাত ফতেহ আলী খান গেয়েছেন। আমীর খুসরো সাহেবের বেশকিছু জনপ্রিয় গান আছে, যা নুসরাত ফতেহ আলী খানসহ অনেক জনপ্রিয় হিন্দি-উর্দু শিল্পী গেয়েছেন। দেশ ভাগের অল্প কিছু আগে আমার পরদাদা আমীর রেজা খাঁ, দাদাজান ক্বায়াম রেজা খাঁ, বাবা এহতেশাম রেজা খাঁ পাকাপাকিভাবে ভারত থেকে বাংলায় চলে আসনে। সে হিসেবে বলা যায় বাংলায় কাওয়ালির ইতিহাস আর আমার বংশধরদের বাংলা আগমনের ইতিহাস একই সুতোয় বাঁধা। বাংলায় আমরা চার পুরুষ কাওয়ালির ধারা বহন চর্চা করে চলছি। এখানে যত শিল্পী আছেন প্রায় সবাই আমার বাবা-দাদার সঙ্গে থেকে হারমোনিয়াম বাজিয়েছেন, ঢোল বাজিয়েছেন। এরপর নিজেরাই চর্চা শুরু করেছেন। এভাবেই বাংলাদেশে কাওয়ালি সংগীত ছড়িয়ে পড়েছে।

নাদীম কাওয়ালের বাবা-দাদাদের থেকে বায়াতপ্রাপ্ত অনেক কাওয়ালের বংশধর বর্তমানে কাওয়াল চর্চায় সম্পৃক্ত। নাদীম শোনালেন বাংলাদেশের কাওয়ালদের হদিস, ঢাকার লালবাগের সমির কাওয়ালের কথা। সমির শিখেছেন তার বাবার থেকে। সমির কাওয়ালের শিষ্য হাসান কাওয়াল। জেনেভা ক্যাম্পে জাহান কাওয়াল, মানজার কাওয়াল... তারা শিখে শিখে কাওয়াল হয়েছেন। তাদের শিষ্য আবার জাহাঙ্গীর কাওয়াল, নূর আলম কাওয়াল, চট্টগ্রামে বাবা গোলাম রহমান মাইজভাণ্ডারির সঙ্গে ছিলেন আবু কাওয়াল, তার ছেলে ছিলেন ইসলাম কাওয়াল। বাবা-ছেলে দুজনেই মারা গেছেন। চট্টগ্রামের উকিল কাওয়াল আগে ঢোল বাজাতেন। ঢোল বাজাতে বাজাতে কাওয়ালি শুরু করেছেন এবং চট্টগ্রামে ভালোই সুনাম করেছেন। নারায়ণগঞ্জে হারুন কাওয়াল তার বাবা, ইসলাম কাওয়ালএভাবে সারা দেশে কাওয়ালি চর্চা ছড়িয়ে পড়েছে। সবাই এখন খুব ভালো করছেন বলে জানান নাদীম।

জানতে চাওয়া হয়েছিল সংগীতের দুরাবস্থার যুগে তার পরিবারের কেউ কাওয়ালি চর্চায় সম্পৃক্ত আছেন কিনা? নাদীম কাওয়াল বললেন, অবশ্যই থাকতে হবে। এই যে আজ আপনি আমার সঙ্গে কথা বলছেন, তো গানের কারণেই। আমার কাওয়ালি চর্চার কারণে আপনি আমাকে জানতে এসেছেন। সারা দেশ থেকে আমরা দাওয়াত পাই। হামদ-নাত পরিবেশন করি। গান ছাড়া এত সম্মান পাওয়ার মতো আমার আর কিছু নেই। কর্ম দিয়েই এখানে আসতে হয়েছে। যদি বলেন আমি কেমন আছি, সংসার কীভাবে চলছে, এক কথায় বলবআলহামদুলিল্লাহ! আপনি আমার বাসায় আসলে বুঝতে পারবেন গান-বাজনা করে আমি খুবই ভালো আছি।

বাংলাদেশে কাওয়ালি সংগীতের আয়োজন কারা করেন, কারা- বা এর শ্রোতাএসব নিয়ে জানতে চাইলে নাদীম বলেন, ‘‘বাংলাদেশের এমন জায়গা বাদ নেই আমি অনুষ্ঠান করিনি। বিশেষভাবে চিশতিয়া সিলসিলা তথা খাজা গরীবে নেওয়াজের অনুরাগীরা আমাদের দাওয়াত করে থাকেন। হযরত আহমদুল্লাহ মাইজভাণ্ডারির দরবারে, সাত মাজার, শ্যামপুরীসহ এমন অনেক দরবার আছে যেখানে মিলাদ-মাহফিল হয়, সেখানেই আমাদের ডাক পড়ে। অনেকে ব্যক্তিগত অনুষ্ঠানে আমাদের ডাকেন। কাওয়ালির অতি আধ্যাত্মিক শাখার নাম মাহফিলে সামা। ওজু করে, মাথায় টুপি পরে, এহতেরামের সঙ্গে বসে গান পরিবেশন শ্রবণ করতে হয়। আজমীর শরিফ, বোগদাদ শরীফে মাহফিলে সামা হয়। মাহফিলে সামার একটা গানে হযরত মাওলানা রুমি লিখেছেন, তু কারিমি/মান কামিনা/বারদা আম-লেকিন আজ/লুতফে সুমা/পারওয়ার্দা আম। তিনি নিজেও মাহফিলে সামা শুনেছেন। মাহফিলে সামার জন্য অনেক গান লিখেছেন।

মাওলানার রুমির লেখার সূত্র ধরে জানতে চাওয়া হলোবেশির ভাগ কাওয়ালি চর্চা হয় হিন্দি, উর্দু কিংবা ফার্সি ভাষায়। বাংলা ভাষায় কাওয়ালি চর্চা হয় কিনা, চর্চা করার সুযোগ আছে কিনা?

নাদীম কাওয়াল জানালেন, অবশ্যই হয়। যে গানে আল্লাহ তার নবীর ভক্তি আছে, আধ্যাত্মিকতা আছে সেগুলোই তো কাওয়ালি। এই যে নবী মোর পরশমণি, দে দে পাল তুলে দে, ত্রিভুবনের প্রিয় মুহাম্মদ... এমন অনেক গান কাওয়ালি হিসেবে পরিবেশন করা হয়। কাজী নজরুল ইসলাম অসংখ্য গান লিখেছেন যেগুলো উন্নতমানের কাওয়ালি। ফকির লালন শাহ লিখেছেন, পারে কে কে যাবি... নবীর নৌকাতে আয়...

কাওয়ালি উপমহাদেশের সংগীতের ঐতিহ্যবাহী একটি শাখা। এতে নতুন নতুন গান যুক্ত হয় কিনা, বর্তমান সময়ের শিল্পী, গীতিকাররা গান লিখে ঐতিহ্যকে এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছেন কিনা জানতে চাইলে নাদীম কাওয়াল বলেন, আমরাও লিখি। কিন্তু আমাদের লেখা আর কাজী নজরুল, লালন ফকিরদের লেখা তো এক হবে না। ফলে নতুন গান এলেও বিখ্যাত জ্ঞানীদের লেখা গানই টিকে যাচ্ছে শতকের পর শতক। কাওয়ালি লেখার জন্য আধ্যাত্মিক চর্চা কিংবা বিশেষ ক্ষমতার দরকার হয়। মেহবুব--এলাহি নিজামুদ্দিন আউলিয়ার মুরিদ হযরত আমীর খুসরো লিখলেন, মোহে আপনেহি রঙ মে রঙ দে নিজামযার অর্থ তিনি তার পীরকে বলছেনহে নিজামুদ্দিন আউলিয়া, আপনি যে আল্লাহর মেহবুব হতে পেরেছেন, আমাকেও তার প্রিয় করে নিন। সহজ সরল ভাষায় মনের আকুতি নিবেদন করা সবার পক্ষে সম্ভব না। এর জন্য আধ্যাত্মিক চর্চা লাগে। আমরা তো আর সেসব মহান মানুষের সঙ্গ পাইনি। ফলে তাদের সঙ্গ যারা পেয়েছেন তাদের লেখার মতো আমাদের লেখা হবে না অবশ্যই।

নাদীম কাওয়াল জানালেন ২৮ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জে তার অনুষ্ঠান আছে। এছাড়া আগামী ফেব্রুয়ারি থেকে নারায়ণগঞ্জেই খাজা গরীবে নেওয়াজের ওরশ মাহফিলে সাতদিনের জমজমাট অনুষ্ঠান হয়। সেখানে তিনি থাকবেন। বাপ-দাদাদের মতো বিখ্যাত কাওয়াল হতে পারেননি, কিন্তু পূর্বপুরুষের ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন, চর্চা করছেন এবং ভালো আছেন ভাবনা নাদীম কাওয়ালকে গর্বিত করে।

 

মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ: সাংবাদিক লেখক 

 

আরও