মির্জা নাথানের বয়ানে ইসলাম খানের নওয়ারা

কামানের গর্জনে পৃথিবী কেঁপে ওঠে এবং তার ধোঁয়ায় সূর্য অন্ধকারে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। জলস্থল প্রকম্পিত করে কামান গর্জে ওঠে। ভীতসন্ত্রস্ত মানুষ মাঠ ছেড়ে ছুটে পালায়, নদীর কুমির অগভীর স্থান ত্যাগ করে গভীর জলে আশ্রয় নেয়, বনের বাঘ বনের মাঝে পথ হারিয়ে চিত্কার করে পাহাড়ে ছুটে পালায়।

কামানের গর্জনে পৃথিবী কেঁপে ওঠে এবং তার ধোঁয়ায় সূর্য অন্ধকারে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। জলস্থল প্রকম্পিত করে কামান গর্জে ওঠে। ভীতসন্ত্রস্ত মানুষ মাঠ ছেড়ে ছুটে পালায়, নদীর কুমির অগভীর স্থান ত্যাগ করে গভীর জলে আশ্রয় নেয়, বনের বাঘ বনের মাঝে পথ হারিয়ে চিত্কার করে পাহাড়ে ছুটে পালায়।

সুবাহ বাংলার মোগল অ্যাডমিরাল ইহতিমাম খানের পুত্র মির্জা নাথানের (বাহারীস্তান--গায়বী, পৃ. ৫৫) উদ্ধৃতিটি পাঠকের মনে প্রশ্ন তুলতে পারে, কোন কালিক স্থানিক প্রেক্ষাপটে এটি হয়েছিল?

এক কথায় উত্তরের মতো বলতে হয়১৬০৮ সালে বর্তমান বাংলাদেশের উত্তর অঞ্চলের শাহজাদপুর নামক কোনো এক স্থানে। সুবাদার ইসলাম খান তার নৌকা ফাতেহ--দরিয়াতে বসে উপভোগ করছিলেন ভাটি অঞ্চলের বারোভূঁইয়াদের সঙ্গে আসন্ন যুদ্ধে তার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার নওয়ারা বা নৌবহরের সামরিক মহড়া। সামরিক মহড়ার পটভূমি হলো উত্তর ভারতীয় সাম্রাজ্যবাদী মোগলদের সামরিক অভিযান, রাজ্য জয় বাংলার সুবাহ হয়ে ওঠার ইতিহাস।

সম্রাট আকবরের রাজত্বকালে বাংলার উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলে মোগলদের রাজনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া শুরু। ১৫৭৬ সালে রাজমহলের যুদ্ধে মোগল সেনাপতি খান জাহান দাউদ খান কররানীকে পরাজিত করে উত্তর বাংলায় বিশেষত রাজধানী তান্ডা তত্সংলগ্ন এলাকায় (বর্তমান মালদহ-দিনাজপুর হয়ে পূর্ব দিকে করতোয়া নদী পর্যাপ্ত) মোগল শাসন প্রতিষ্ঠিত করেন। কিন্তু মোগলদের সমগ্র বাংলা নিয়ন্ত্রণে আনতে পরবর্তী প্রায় চার দশক সময় অতিবাহিত হয়েছিল। আকবর পুত্র জাহাঙ্গীরের সময় বাংলার সব এলাকাতেই মোগলদের পূর্ণ আধিপত্য কায়েম হয়। সম্রাট জাহাঙ্গীর তার অত্যন্ত প্রিয় মানুষ বিহারের সুবাদার ইসলাম খান চিশতিকে ১৬০৮ সালে বাংলার সুবাদার হিসেবে নিযুক্ত করেন। ইসলাম খানের অন্যতম চ্যালেঞ্জ ছিল পূর্ব বাংলারবিশেষত নদীমাতৃক ভাটি অঞ্চলের স্থানীয় স্বাধীন জমিদার তথা বারোভূঁইয়া আফগান শাসকদের দমন করা। তিনি অত্যন্ত দক্ষতা, সাহসিকতা কৌশলী নেতৃত্বের মাধ্যমে অতি অল্প সময়ের মধ্যেই দুঃসাহসিক কাজে সফল হন। সাফল্যের কারণ বহুমাত্রিকস্থানীয় জমিদারদের অনৈক্য, মোগলদের অধিকতর উন্নত রণকৌশল, বাংলার ভৌগোলিক প্রতিবেশকে অনুধাবন সে অনুযায়ী সিদ্ধান্ত গ্রহণ। এসব অনুঘটকের পাশাপাশি আরেকটি সামরিক উপাদান ইসলাম খানকে দারুণভাবে সাহায্য করেছিল; আর তা হলো নওয়ারা। বাংলায় মোগল অধিপত্য প্রতিষ্ঠার ইতিহাসে নৌবহরের ভূমিকা চিত্রায়ণের রাহা ত্যাগ করে এর পরিচয় পরিচালনার কিছু দিক সংক্ষিপ্ত পরিসরে পাঠকের সামনে তুলে ধরাই লেখার উদ্দেশ্য। আমাদের বক্তব্যের জন্য আকর সূত্র হিসেবে নির্ভর করতে হবে সুবাদার ইসলাম খান চিশতির নওয়ারার প্রধান কর্মকর্তা ইহতিমাম খানের পুত্র মির্জা নাথানের লেখা বাহারীস্তান--গায়বী গ্রন্থটির ওপর। লেখক মির্জা নাথান নিজেও ছিলেন বাংলায় নিয়োজিত মোগল নৌবহরের একজন দক্ষ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। বারোভূঁইয়াদের সঙ্গে মোগল বাহিনীর হয়ে একাধিক যুদ্ধে তিনি অংশগ্রহণ করেছিলেন। গ্রন্থটির খোঁজ দীর্ঘদিন গবেষক মহলে অজানা ছিল। আচার্য যদুনাথ সরকার প্রথম প্যারিসের বিবলিওথিকে ন্যাশনাল-এর সংগ্রহভাণ্ডার থেকে ফারসি ভাষায় লেখা গ্রন্থের অদ্যাবধি জানা একমাত্র পাণ্ডুলিপিটি আবিষ্কার করেন এবং এর পরিচয় পাঠকদের সামনে তুলে ধরেন। ১৯৩৬ সালে আসাম সরকার গ্রন্থের ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশ করে। দুই খণ্ডে প্রকাশিত ইংরেজি অনুবাদটি করেছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি উর্দু বিভাগের অধ্যাপক মহিউদ্দিন আহমেদ বোরাহ। ১৯৮৯ সালে মান্যবর খালেকদাদ চৌধুরী বাংলা অনুবাদ করে বাংলাভাষী পাঠককুলের সামনে বইটিকে তুলে ধরেন। আলোচনায় ব্যবহূত অনুবাদের জন্য আমরা তার কাছে কৃতজ্ঞ। ১৬০৮ থেকে ১৬২৫-এর জানুয়ারি কালপর্বের ঘটনাসংবলিত প্রামাণ্য গ্রন্থটি চারটি দপ্তর- বিভক্ত। কিছুটা রোজনামচা, কিছুটা ধারাবাহিক বিবরণীর ভঙ্গিতে লেখা পুস্তক রচনার উদ্দেশ্যে ছিল (লেখকের ভাষায়): ...নূরুদ্দীন মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর বাদশাহ গাজীর...রাজত্বকালে বাংলায় সংঘটিত ঘটনাসমূহের সামান্য অংশও যদি লিপিবদ্ধ করা হয়, (তাহলে) কালের পৃষ্ঠায় সেই পবিত্র লেখা স্থায়ী হয়ে থাকবে; এই গ্রন্থের বিস্ময়কর সত্য ঘটনাসমূহ থেকে দূরদর্শী বিজ্ঞ ব্যক্তিগণ অনেক জ্ঞান লাভ করতে পারবেন। তারিখ উপস্থাপনে কার্পণ্য থাকলেও ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণসংবলিত ইতিহাসগ্রন্থটি সপ্তদশ শতাব্দীর প্রথম দিককার বাংলার ইতিহাস পুনর্গঠনের জন্য একমাত্র সমসাময়িক লিখিত আকর সূত্র।

১৬০৮ সালের মে বাংলার সুবাদারের নিয়োগাদেশ পেয়েই ইসলাম খান বিহার থেকে রাজমহলের দিকে রওনা হন এবং জুনের শুরুতে সেখানে পৌঁছান। ভাটি অঞ্চলের জমিদারদের পরাজিত করে সমগ্র বাংলাকে সম্রাট জাহাঙ্গীরের সাম্রাজ্যভুক্ত করার জন্য একটি বৃহৎ সুচিন্তিত অপারেশন প্ল্যান বা সামরিক পরিকল্পনার প্রয়োজন ছিল। এর পাশাপাশি দরকার ছিল বাংলার মোগল প্রশাসনে এবং সামরিক বাহিনীতে রদবদল করার। সুবাদার ইসলাম খান রাজমহলে এসে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রাদেশিক কর্মকর্তার বদলির প্রস্তাব এবং সেগুলোয় নতুন, দক্ষ পরিশ্রমী কর্মকর্তা নিয়োগের সুপারিশ সম্রাট জাহাঙ্গীরের কাছে পাঠান। সম্রাট তাত্ক্ষণাৎ সেগুলোকে অনুমোদন করেন। মির্জা নাথান কর্মকর্তাদের অপসারণ নতুন নিয়োগের পূর্ণাঙ্গ তালিকা বিবরণ তুলে ধরেছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি বদল ছিল() আবু হাসান সিতাব খানকে বাংলার দিওয়ান এবং () মির্জা নাথানের বাবা ইহতিমাম খানকে মীর বহর (নৌবহরের প্রধান) নিয়োগ।

ইসলাম খান অনুধাবন করেছিলেন, জল-জঙ্গলে পরিপূর্ণ বাংলার দক্ষিণ-পূর্বাংশের ভাটি এলাকায় যুদ্ধ করার জন্য একটি শক্তিশালী নৌবহর দরকার। ফলে তিনি তার নৌবহরকে সুসজ্জিত পুনর্গঠিত করার সিদ্ধান্ত নেন।

তুজুক--জাহাঙ্গিরি এবং মির্জা নাথানউভয় সূত্র থেকেই জানা যায়, নব্যনিযুক্ত অ্যাডমিরাল ইহতিমাম খানকে সুবার নৌবহরকে শক্তিশালী করার জন্য নৌকা, নৌবহরে ব্যবহূত কামান এবং আগ্নেয়াস্ত্রে সুসজ্জিত করার জন্য প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হয়।

ইসলাম খান আরো উপলব্ধি করেছিলেন, রাজধানী তান্ডা থেকে অভিযান প্রক্রিয়া অসম্ভব। তিনি বুড়িগঙ্গার তীরবর্তী কসবা ঢাকাকে সুবাহ বাংলার রাজধানী করার সিদ্ধান্ত নেন। বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা পার্শ্ববর্তী অন্যান্য নদীর মাধ্যমে মোগল নওয়ারা খুব সহজেই বাংলার দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলের বড় বড় নদী, যেমন পদ্মা, ব্রহ্মপুত্র, মেঘনায় পৌঁছতে পারবে। তিনি রাজমহল থেকে রাজধানী ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন। সঙ্গে ছিল বিরাট এক সৈন্যবাহিনী, একটি বড় হস্তী বাহিনী নৌবহর। অন্যদিকে সম্রাটের অনুমোদন পেয়ে ইহতিমাম খান তার সন্তান এবং সব আত্মীয়স্বজন নিয়ে বাংলার দিকে রওনা হন। ইহতিমাম খানকে আগ্রা থেকে রওনা হওয়ার সময় পথিমধ্যে পাটনা থেকে রাজা মানসিংহের সৈন্যবাহিনীর ব্যবহূত নৌকা কামান এবং বাংলা রোটাস থেকে আনা কামান বাংলায় নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। ইহতিমাম খানকে আরো আদেশ দেয়া হয়েছিল, চান্দে সৈন্যদের হিসাব হালনাগাদ করে প্রয়োজনীয় সংখ্যক সেনা, নৌবহর নৌসেনাদের সঙ্গে নিয়ে বাংলার উদ্দেশে রওনা হবেন। অবশিষ্ট বাহিনী রোটাসে রেখে যাবেন।

সম্রাট জাহাঙ্গীর বাংলায় প্রেরিত নওয়ারার গুরুত্ব উপলব্ধি করে স্বয়ং এটির তত্ত্বাবধায়ন করেছিলেন। মির্জা নাথান সম্রাটের পাঠানো নৌবহরের প্রস্তুতি বিদায়ের ক্ষণ বর্ণনায় বলেন:

...এক শুভক্ষণে বাদশা কর্তৃক তাঁর নৌবাহিনী পরিদর্শনের উদ্দেশ্যে তিনি (ইহতিমাম খান) নৌবাহিনীকে সম্রাটের ঝরোকার নিচে সমবেত করেন। সম্রাট সেখান থেকে তাঁর করী-বাহিনীর লড়াই-এর মহড়া পরিদর্শন করেন। অতঃপর ইহতিমাম খান বাংলা যাত্রা করেন। যাত্রার সময় তাঁর গোলন্দাজ বাহিনীর কামান গর্জনে দিগ্বিদিক প্রকম্পিত হয়ে ওঠে। (পৃষ্ঠা ২৫)

আগ্রা থেকে যাত্রা করে নবম দিনে ইহতিমাম খান এলাহাবাদে পৌঁছান। পূর্বোক্ত নির্দেশ মোতাবেক তিনি রাজা মানসিংহের পুত্র কল্যাণ সিংহের কাছ থেকে ৩৩০টি গজনাল (ছোট কামান), হাত-নাল (বন্দুক) এবং শের-দাহান (ব্যাঘ্র মুখাকৃতি) কামান সঙ্গে নেন। এখান থেকে কিছুসংখ্যক নৌকাও তার বহরে যুক্ত হয়। নৌবহরের সঙ্গে ঝাঁসিতে ওয়াজির খানের দেখা হয়। ওয়াজির খানের বহর থেকে জলতরঙ্গ নাদুলা নামক দুটি যুদ্ধজাহাজ এবং চারটি শের-দাহান কামান নৌবহরে যুক্ত হয়।

বাংলার দিকে দ্রুতগতিতে অগ্রসর নৌবাহিনীর প্রথম যুদ্ধ অনুশীলন বাংলার পৌঁছর আগেই হয়ে যায়। সুবাদার ইসলাম খানের জন্য পাঠানো তরমুজ বোঝাই দুটি নৌকা চাজুহার গাওয়াররা ডাকাতি করে। পরে মির্জা নাথান জলদস্যুদের পরাজিত করে নৌকা দুটি উদ্ধার করেন। গাওয়াররা মোগল নওয়ারাকে অনুসরণ করে এবং বন্দুকের গুলি ছুড়তে থাকে। মোগল নৌগোলন্দাজদের কামানের গোলায় জলদস্যুদের অনেকেই নিহত হন। নৌবহর আকবরনগরে পৌঁছলে ইসলাম খান অন্য আমাত্যদের নিয়ে ইহতিমাম খানের বাহিনীকে স্বাগত জানান। রোটাস পাটনা থেকে সংগৃহীত নৌযানগুলোর একটা মহড়া ওই সময় হয়। নৌবাহিনীর গোলন্দাজদের দাগানো গোলায় চারদিকে ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি হয়। মির্জা নাথানের ভাষ্যে:

ভয়ংকর কামানের গগনবিদারী আওয়াজ, তাঁর ধোঁয়া, জল স্থল আছন্ন করে ফেলে। জনসাধারণের হূদয় তাতে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। নদী খালের তীরস্থ কুমিরগুলো পালিয়ে গভীর জলে আশ্রয় নেয়। বনের সিংহ ব্যাঘ্র গুহা থেকে গুহাভ্যন্তরে ছুটে পালায়। বিজয়ী তুর্যনিনাদের বিদ্রোহীদের চেতনা বিলুপ্ত হয়, মানুষের কান বধির হয়, বিদ্রোহী জমিদারদের মূল উচ্ছেদ করে এবং রাজভক্তদের আনন্দ দান করে।

রাজধানী আকবরনগরে উপস্থিত হয়ে রকম একটি সামরিক মহড়া নৌযানের ভারী গোলাবর্ষণের মাধ্যমে ইহতিমাম খান তার সরব উপস্থিতি হুংকার জানিয়ে দেন। মির্জা নাথানের উপযুক্ত ভাষ্যের অন্তর্নিহিত সুর ইঙ্গিত করে যে এটি ছিল বিদ্রোহী জমিদারের প্রতি প্রচ্ছন্ন হুমকি। শুরুতেই আমরা উল্লেখ করেছি, অনুরূপ একটি মহড়ার কথা যেখানে সুবাদার ইসলাম খান চিশতি শাহজাদপুরে তার নওয়ারার পূর্ণশক্তি সামর্থ্যের সামরিক প্রদর্শনী করেছিলেন। দীর্ঘ নৌপথ অতিক্রম করে ইসলাম খানের বাদশাহি বহর এবং ইহতিমাম খানের রণতরীর বহর ঢাকার চাঁদনীঘাটে এসে পৌঁছায়। পথিমধ্যে একাধিক স্থানে নদীর সরু বাঁক, নাব্য কিংবা নৌবহরের অফিসারদের বেতনাদি নিয়ে বিদ্রোহ ইত্যাদি সংকট দেখা দিলেও মির্জা নাথান এবং পিতা ইহতিমাম খান দক্ষতার সঙ্গে সব সংকট সমাধান করেন।

বাংলায় ইহতিমাম খানের নওয়ারার প্রথম সামরিক পরীক্ষা হয় মুসা খানের নৌবহরের সঙ্গে শীতলক্ষ্যা নদীর বুকে। রণক্ষেত্রে মোগলদের কামানের গোলার আঘাতে মুসা খানের নৌবহরের ক্ষতি হয় এবং অনেক হতাহত হয়। যুদ্ধটিতে চূড়ান্ত কোনো ফয়সালা হয়নি। এক পর্যায়ে ইসলাম খান মুসা খানের যাত্রাপুর দুর্গ আক্রমণ করার পরিকল্পনা নেন। দুর্গটির তিনদিকে বিল এবং একদিকে নদী থাকায় মোগল স্থলবাহিনী দুর্গটি আক্রমণ করতে ব্যর্থ হয়। ইছামতী নদীতে মোগল নওয়ারা প্রবেশ করতে পারলে সহজেই দুর্গ দখল করা যেত। কিন্তু নদীতে প্রবেশের জন্য ব্যবহূত খালটি শুকিয়ে গেছে এবং প্রচুর বালি পড়ে মুখটি বন্ধ হয়ে থাকায় তা রণতরী চলাচলের অনুপযুক্ত। সুবাদার খালটি খননের জন্য মনসবদারের মধ্যে কাজ ভাগ করে দেন। তিনদিন অতিবাহিত হওয়ার পরও কাজটি সম্পন্ন হয়নি। ইসলাম খান অনুধাবন করেন, মির্জা নাথান ছাড়া কাজটি শেষ হবে না। সুবাদারের অনুরোধে মির্জা নাথান খাল খননের কাজ শুরু করেন।

নৌবহরের বার হাজার নাবিকের মধ্যে মাত্র দুহাজারকে... নৌবহরে রেখেমির্জা নাথান বাকি দশ হাজার খাল খননের কাজে নিযুক্ত করেন। চার প্রহর সেখানে দাঁড়িয়ে তিনি স্বয়ং তাদের তাদের কাজ তদারক করেন এবং তাদের মধ্যে তামার মুদ্রা, চাল, ভাঙ এবং আফিম বিতরণ করে তিনি নাবিকদের উৎসাহ দেন। এভাবে দুপ্রহরের মধ্যে তিনি খালের মুখ খননের কাজ শেষ করেন। (পৃ. ৬৩)

অভিজ্ঞ কুশলী বিশেষজ্ঞরা দুই মাসে যে কাজ করতে ব্যর্থ হয়েছিল মির্জা নাথানের নেতৃত্ব কঠোর পরিশ্রম সে কাজ অতি অল্প সময়ের মধ্যে সম্পন্ন হয়।

নৌবহরের নাবিকরা সাতদিন সাত রাতের মধ্যে খালের খননকার্য শেষ করে খালটি ইছামতী নদীর সাথে যোগ করে দেয়। (পৃ. ৬৫)

আগ্রাসী মোগল বাহিনী প্রথমে যাত্রাপুর দুর্গ এবং পরে ডাকছড়া দুর্গ পদানত করে। দুটি ক্ষেত্রেই মোগল নওয়ারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দুই দুর্গের পতনের ফলে মিত্র জমিদারদের অনেকেই মুসা খানের পক্ষ ত্যাগ করে।

মুসা খানের সঙ্গে যুদ্ধে নৌবহরের নেতৃত্বে নির্জা নাথান ছিলেন সক্রিয়। একাধিকবার রণতরীতে স্থাপিত কামান শত্রুদের হতাহত করেছে, মনোবল ভেঙে দিয়েছে। বাংলার উত্তর-পূর্ব দক্ষিণ-পশ্চিমের স্বাধীন জমিদারদের বশ করতেও মোগল নওয়ারার ভূমিকা ছিল অনন্য।

বাংলায় ব্যবহূত নৌ-তরীর অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল রণকামানের সংযুক্তি। কখনো কখনো দুটি বা ততোধিক নৌকা জোড়া দিয়ে প্রশস্ত পাটাতন তৈরি করে তাতে কামান স্থাপন করা হতো। শেখ কামাল সিলেট এলাকা থেকে রাজধানী জাহাঙ্গীরনগরে ফেরার সময় একাধিক মান্দ-কোসা নৌকা জোড়া দিয়ে ঘরের মতো বানিয়ে ১০টি বিখ্যাত হাতি পরিবহন করেছিলেন। কামানবাহী রণতরীর মধ্যে ছিল কাতারি, মানিকি, বাতিলা। এছাড়া মালবাহী নৌকা হিসেবে মান্দ, ভাদিয়া পাতিলা নৌকার উল্লেখ পাওয়া যায়।

বাংলার মোগল নাওয়ারার পরিসংখ্যানগত কোনো চার্ট বাহরীস্তান- পাওয়া যায়নি। কিন্তু বিভিন্ন সময়ে ঘটনার বর্ণনা প্রসঙ্গে নৌবহরের কোনো একটা অংশের পরিসংখ্যান পাওয়া যায়। দৃষ্টান্তস্বরূপ একটি ঘটনার উল্লেখ করা যায়। ঘোড়াঘাটে সুবাদার ইসলাম খান নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকা নৌবহরের অংশটিকে মুতাকিদ খানের নেতৃত্বে রেখে গিয়েছিলেন। আমরুল পরগনায় এসে নৌবহরের অংশের সব নাবিক পালিয়ে গিয়েছিলেন। কেননা মুতাকিদ খান তাদের পাওনা টাকা দেননি। ভোরবেলায় দেখা যায় নৌবহরের ৩০০ রণতরী মালবাহী নৌকার মাত্র ৭০০ জন রয়েছে। মির্জা নাথান অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে নৌবহরকে নিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি চার-পাঁচটি নৌকা একসঙ্গে বেঁধে দু-তিনজন করে লোক নিয়ে একটি দল গঠন করে দুপুরের মধ্যেই সব শাহি নৌবহরকে মূল বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত করতে সমর্থ হয়েছিলেন।

নৌবহরের অপারেশন প্ল্যান বা যুদ্ধ পরিকল্পনার একটি সংক্ষিপ্ত বর্ণনা করে আলোচনার সমাপ্তি টানতে চাই। শুরুতে উল্লেখ করা শাহজাদপুরের নৌবহরের মহড়ার অপারেশন প্ল্যান ছিলে রকম:

কাটারি, মানিকি বাতিলা নৌকাগুলোকে সাজিয়ে ভাসমান ব্রিজ তৈরি করা হয় এবং বড় বড় কামান নৌকাগুলোয় রাখা হয়। পূর্ণাঙ্গ অস্ত্রসজ্জিত ছয়টি যুদ্ধ কোষ-নৌকা দিয়ে সেতুর সামনে নিরাপত্তা বলয়ের সৃষ্টি করা হয়। চলাচলের সুবিধার জন্য সেতুর গতিপথে সব নৌ-যাতায়াত বন্ধ করে দেয়া হয়। ইসলাম খান ঈদের দিন ঈদগাহ থেকে নামাজ পড়ে এসে সওয়ার হন তার চান্দনী (ফতেহ--দরিয়া) নামক নৌকায়। সুবাদার অন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপস্থিতির সঙ্গে সঙ্গে মির্জা নাথানের নির্দেশে প্রদীপে সলতের আগুনে সামনে থাকা কামান থেকে শুরু হয় বারুদ বর্ষণ। এরপরের ঘটনাপ্রবাহ তো আমাদের সবারই জানা।

 

শহিদুল হাসান: সহকারী অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

-মেইল: [email protected]

আরও