পলাশীর যুদ্ধ বৃহত্তর বাংলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। বলা হয়ে থাকে এর মধ্য দিয়েই বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়েছিল। ভুল নেই সে কথায়। মোগল শাসনের শেষ দিকে দাক্ষিণাত্যে আসফ জাহী ও উত্তরে আওয়াধের পাশাপাশি বাংলাও কার্যত স্বাধীন হয়ে পড়েছিল। এরপর মুর্শিদকুলী খাঁর আমল থেকে বাংলাকে স্বাধীনই বলা চলে। যদিও আমরা দেখি শওকত জংকে সিংহাসনে বসানোর জন্য দিল্লির বাদশাহর কাছে তদবির করেছিলেন ঘষেটি বেগম। অর্থাৎ বাংলার সেই সময়টা ছিল লবিং, ষড়যন্ত্র আর নানা কূটকচালিতে ভরা। প্রাসাদ ও নবাব পরিবারে নানা তদবির, তোষামোদ, ষড়যন্ত্র হচ্ছিল। আর বাংলার সাধারণ জনতাকেও এর জন্য ভুগতে হয়েছিল।
বাংলার নবাবিতে সিরাজের অধিকার ছিল মাত্র ১৫ মাস। এ সময় আসলে কোনো শাসকের জন্যই বিশেষ কিছু না। কিন্তু সিরাজের ক্ষেত্রে বিশেষ হয়ে উঠেছিল। এর অন্যতম কারণ তার আমলেই ব্রিটিশ কোম্পানি বাংলার দখল পায়। তবে প্রথমে সিংহাসনে বসাতে হয়েছিল মীর জাফরকে। এরপর মীর কাসিম। তারপর দেওয়ানি আসে কোম্পানির হাতে। এর জন্য সময় দিতে হয়েছিল। চেষ্টা করতে হয়েছিল।
অবশ্য এসব সম্ভব হয়েছিল সিরাজ সিংহাসনে ওঠার আগে বাংলায় ঘটে যাওয়া নানা ঘটনার কারণে। জনপ্রিয় ধারায় আলোচনার ক্ষেত্রে ১৭৫৬ ও ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দের কথাই বেশি আসে, কিন্তু এর আগে থেকেই নানা ঘটনার কারণে বাংলার অবস্থা একটু বা অনেকটা দুর্বল হয়ে পড়েছিল। বাংলা নিয়ে চলছিল নানা রকম সমীকরণ, রাজনীতি ও বাংলাকে গ্রাস করার চেষ্টা।
বাদশাহ আওরঙ্গজেব তার শেষ দিনগুলোয় অপেক্ষা করতেন বাংলার রাজস্বের। এর অন্যতম কারণ তিনি লাগাতার যুদ্ধ করে কোষাগারের অবস্থা খারাপ করে ফেলেছিলেন। বেশির ভাগ যুদ্ধই ছিল অনিবার্য, তবে আওরঙ্গজেব চাইলে অনেক যুদ্ধ এড়াতে পারতেন। যুদ্ধ এড়িয়ে কেন্দ্রকে শক্তিশালী করা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু দিল্লিতে তার দীর্ঘ অনুপস্থিতি উত্তর ভারতের পাশাপাশি পূর্ব ভারতকেও দুর্বল করে ফেলেছিল। অন্যদিকে দক্ষিণ ভারতে বাদশাহ থাকলেও সেখানে মারাঠাদের জোর বেড়েছে বৈ কমেনি। একের পর এক আক্রমণ তারা করেছে মোগল বাদশাহিতে। আওরঙ্গজেব থাকতে বা তার পরেও নির্দিষ্ট এলাকার বাইরে তারা যায়নি কিন্তু লুটের পর লুট করে মহারাষ্ট্রের কাছাকাছি অঞ্চলে তেমন কিছু ছিল না। তাই তারা সিদ্ধান্ত নেয় পূর্ব ভারতও বাদ দেবে না। তাদের লুণ্ঠনের শিকার হয় বাংলাও।
বাংলা আক্রমণের সময় মারাঠাদের অন্যতম নেতা ছিলেন রঘুজি ভোঁসলে। ১৭৪২ সালের এপ্রিলের প্রথম দিকে তিনি বাংলা আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেন। ভাস্কর পণ্ডিতকে দায়িত্ব দেয়া হয় এ আক্রমণের। তার নেতৃত্বে ৪০ হাজার সৈন্যের একটি অশ্বারোহী বাহিনী পাঠানো হয়। ভাস্কর পণ্ডিত ওড়িশা সীমান্তের অরণ্য ও ঝাড়খণ্ড অঞ্চলের মধ্য দিয়ে বাহিনীসহ বাংলায় প্রবেশ করেন। বিশাল বাহিনী পালনের জন্য মারাঠাদের যথেষ্ট অর্থ দরকার হতো। বাংলা দখল করে শাসন করা তাদের উদ্দেশ্য ছিল না। তারা কেবল লুট করতে চেয়েছিল।
ভাস্কর পণ্ডিত দিনহাটায় ঘাঁটি স্থাপন করেন এবং ঘাঁটির নিরাপত্তার জন্য চতুর্দিকে পরিখা খনন করেন। ফলে মারাঠা ঘাঁটি আক্রমণ করা দুরূহ হয়ে পড়ে। এ শক্তিশালী ঘাঁটি থেকে মারাঠারা বর্ধমান ও মুর্শিদাবাদ অঞ্চলে লুটতরাজ আরম্ভ করে দেয়।
এ সময় বাংলার নবাব ছিলেন আলীবর্দী খাঁ। তিনি ছিলেন ওড়িশায়। সেখান থেকে ফেরার সময় মারাঠাদের লুটতরাজ ও উপদ্রবের খবর পান। তার সঙ্গে স্বল্পসংখ্যক সৈন্য ছিল। এ ক্ষুদ্র বাহিনী নিয়ে তিনি হুগলি জেলার মুবারক মঞ্জিল থেকে বিরাট মারাঠা বাহিনীর বিরুদ্ধে অগ্রসর হন। ১৭৪২ সালের ১৫ এপ্রিল তিনি বর্ধমানে পৌঁছেন এবং মারাঠা বাহিনীর সাক্ষাৎ পান।
আলীবর্দী খাঁ একজন ভালো যোদ্ধা ও সেনাপতি ছিলেন। কেমন করে যুদ্ধ করতে হয় তা জানতেন। তার ছোট সেনাদলের সঙ্গেও তাই ভাস্কর পেরে উঠছিলেন না। এরপর ভাস্করই নিজে থেকে প্রস্তাব দেন যে তিনি ১০ লাখ টাকা পেলে চলে যাবেন। কিন্তু আলীবর্দী রাজি হননি। তাই বিক্ষিপ্ত যুদ্ধ চলতে থাকে।
একপর্যায়ে মারাঠাদের একটি বড় সৈন্য দল আলীবর্দী খাঁকে ঘিরে ফেলে। সুযোগ বুঝে ভাস্কর পণ্ডিত নবাবের কাছে ১ কোটি টাকা দাবি করে সন্ধির প্রস্তাব করেন। কিন্তু আলীবর্দী সে প্রস্তাবেও রাজি হননি।
বাংলার ইতিহাস মূলত বারবার বিশ্বাসঘাতকতার ইতিহাস। আলীবর্দীর দুরবস্থায় মীর হাবিব ইস্পাহানি বিশ্বাসঘাতকতা করে তার সৈন্যদল ত্যাগ করে মারাঠাদের সঙ্গে যোগ দেয়। এদিকে মারাঠারা অবরুদ্ধ নবাবের রসদপত্র সরবরাহের পথ বন্ধ করে দেয় এবং আরেকটি মারাঠা দল আশপাশের ৪০ মাইলব্যাপী অঞ্চলজুড়ে লুটতরাজ করতে থাকে। আশ্রয়হীনভাবে অবরুদ্ধ থাকায় খাদ্যের অভাবে নবাব ও তার
সৈন্যরা ভীষণ দুর্দশায় পতিত হন। এ অবস্থায়ও আলীবর্দী সাহসের সঙ্গে মারাঠাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এ অবরোধ ভাঙতে সক্ষম হন এবং ২৬ এপ্রিল কাটোয়ায় পৌঁছেন।
এরপর কাটোয়ার যুদ্ধ হয়। তার আগে মারাঠারা লুট করে মুর্শিদাবাদ। কেবল লুট করাই না। সেই সঙ্গে দোকান, বাজার ও ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দিত মারাঠারা। একসময় হুগলিও দখল করে ফেলে ভাস্করের বাহিনী। রাজমহল, মেদিনীপুর থেকে যশোর অবধি তারা লুণ্ঠন করেছিল। অবস্থা এমন হয়েছিল যে ‘বর্গি’ (মারাঠাদের বর্গি বলা হয় বাংলায়) বিষয়টাই মানুষের কাছে দুঃস্বপ্ন হয়ে উঠেছিল। ফলে শাসন ব্যবস্থা, রাজকোষ ও সাধারণ মানুষও এলোমলো হয়ে পড়ে। বিষয়টি সামলাতে নবাব ও তার পরিবারের বহু সময় লেগেছিল। আসলে সামলানো যায়নি।
বাংলায় তার পরও অর্থের অভাব খুব বেশি ছিল না। অর্থ থাকার কারণেই সেখানে তৈরি হয়েছিল ব্যাংকিং ব্যবস্থা। বর্তমান সময়ের মতো ছিল না কিন্তু বাংলায় ধনিক একটা শ্রেণী ছিল, যাদের কাজ অনেকটাই ছিল ব্যাংকিংয়ের মতো। একালে যেমন ব্যাংক নানাভাবে ক্ষমতার সেবা করে, আবার প্রয়োজনে ক্ষমতাসীনকে বিপদেও ফেলতে পারে, সেকালেও এমন হয়েছিল। মানিকচাঁদ, জগৎ শেঠ, উমিচাঁদরা সেই ঘরানারই মানুষ ছিলেন। তারা ক্লাইভের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। অবশ্য ক্লাইভও কম যান না। যোগাযোগ শুরু করেছিলেন তিনিই।
১৭৫৬ সালের ডিসেম্বরে মানিকচাঁদকে এক চিঠিতে ক্লাইভ লিখেছেন, ‘মাদ্রাজ থেকে এ অঞ্চলে এসে আমি শুনেছি ইংরেজ কোম্পানির প্রতি আপনি বিশেষ বন্ধুত্ব প্রকাশ করেছেন। এ কারণে আমি আপনাকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করি। আমার এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই—তবু আশা করব, কোম্পানির প্রয়োজনে আপনি সর্বাত্মক সহায়তা করবেন।’
পরের বছর জানুয়ারিতে জগৎ শেঠ ক্লাইভকে লেখেন, ‘আপনি হয়তো এমনটা ভেবে খুশি হন যে নবাবকে আমি যা উপদেশ দান করি তিনি সে মতো কাজ করবেন এবং আশা করেন আমি আপনার ও দেশের সাধারণ লাভের জন্য কাজ করব। বস্তুত আমার কাজ একজন ব্যবসায়ীর এবং আমি সেই মতোই কথা বলার চেষ্টা করব, যা তিনি মানতে পারেন। কিন্তু আপনি সম্পূর্ণ বিপরীত কাজ করেছেন এবং জোর করে কলকাতা দখল করে নিয়েছেন। এরপর হুগলি দখল করে ধ্বংস করেছেন। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় যুদ্ধ করা ছাড়া আপনার ভিন্ন কোনো লক্ষ্য নেই। এ অবস্থায় আমি কীসের ভিত্তিতে নবাবের সঙ্গে আপনার সমঝোতার প্রস্তাব করতে পারি? আপনার এ প্রতিকূল আচরণ দেখে আপনার উদ্দেশ্য সম্বন্ধে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এ ধরনের আচরণ বন্ধ করুন এবং আমাকে আপনার চাহিদা সম্পর্কে জানান। এরপর আপনি আমার ওপর নির্ভর করতে পারেন, আমি নবাবের ওপর আমার প্রভাব বিস্তার করে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করব। আসলে আপনি কীভাবে আশা করেন যে একটি সুবা কিংবা শাহজাদার ওপর আপনি আক্রমণ করবেন আর নবাব তা এড়িয়ে যাবেন? নিজেকে প্রশ্ন করে দেখুন।’
অর্থাৎ তারা হয়ে উঠেছিলেন ক্লাইভের পরামর্শদাতা। কোম্পানির কলকাতা দখল, বেহিসাব কাজ ইত্যাদিন কারণে ক্লাইভ ও কোম্পানিকে সতর্ক করেছিলেন বাংলার এ ব্যবসায়ীরা। অন্যদিকে প্রাসাদ ষড়যন্ত্র তো ছিলই। সিরাজ বুঝেছিলেন ইংরেজরা তার গৃহবিবাদের সুযোগ নেবে। তাই তিনি ঘসেটি বেগমকে নিষ্ক্রিয় করার চেষ্টা করেন। সিরাজ মতিঝিল প্রাসাদ অধিকার করে ঘসেটি বেগমকে মুর্শিদাবাদ নিয়ে আসার ব্যবস্থা করেন।
ইংরেজদের প্রতাপ বাড়ছিল তাতে সন্দেহ নেই। সিরাজ তাদের শক্তি কমানোর চিন্তা করেছিলেন। সেই ইচ্ছা থেকেই ওয়াটসনকে কলকাতার দুর্গপ্রাচীর ভেঙে ফেলতে বলেন। এছাড়া নবাবের অনুমতি ছাড়া এ ধরনের কাজ না করার নির্দেশ দেন। কিন্তু তারা কথা শোনেনি। ১৭৫৬ সালের ২৭ মে সিরাজ তার সেনাবাহিনী কাশিমবাজার দুর্গ অবরোধ করেন। তিনি কাশিমবাজার দুর্গের কুঠিয়াল ওয়াটসনকে দরবারে হাজির হয়ে তার নির্দেশ যথাযথভাবে পালন করার জন্য অঙ্গীকারপত্র লিখতে বলেন। ওয়াটসন এ অঙ্গীকারপত্র লিখতে বাধ্য হয়েছিলেন।
এরপর ১৮ জুন সিরাজউদ্দৌলা কলকাতা আক্রমণ করেন। তুমুল যুদ্ধ হওয়ার পর ২০ জুন কলকাতা দুর্গ সিরাজের দখলে আসে। তিনি দুর্গে প্রবেশ করেন এবং দরবারে উপবেশন করে উমিচাঁদ ও কৃষ্ণবল্লভকে সেখানে উপস্থিত হওয়ার আদেশ দেন। এরপর সেনাপতি মানিকচাঁদের হাতে দুর্গের শাসনভার ছেড়ে দিয়ে সিরাজউদ্দৌলা রাজধানীতে ফিরে আসেন।
অথচ সেই মানিকচাঁদই পরবর্তী সময়ে যোগ দিয়েছিলেন ক্লাইভের সঙ্গে। এমন বহু ঘটনাই ঘটছিল পলাশীর যুদ্ধের আগে। সেসবের খুব বেশি কিছু সমসাময়িক সময়ে লোকচক্ষুর সামনে আসেনি। এসেছিল আরো পরে। কিন্তু ততদিনে বাংলায় নবাবি পার করে ব্রিটিশ আমল শুরু হয়ে গেছে।
আসরার আবেদিন: প্রাবন্ধিক