জেরুজালেমে অতীত ইতিহাস বর্তমানেও অস্তিত্ব বজায় রেখে চলেছে। দুনিয়ার অন্য কোনো স্থান পরিদর্শনে অন্তত ইতিহাসের এই মাত্রায় জীবিত থাকার ঘটনা দেখিনি। হয়তো যেকোনো বিতর্কিত এলাকাতেই এমনটা ঘটে, তবে ১৯৮৩ সালে যখন প্রথমবারের মতো জেরুজালেম গিয়েছিলাম, তখন বিষয়টা যেন নিজে থেকেই এসে চোখে ধরা দিল কিংবা বলা ভালো আমাকে দেখতে বাধ্য করল। শুরুতে শহরে হাঁটতে গিয়ে নিজের প্রতিক্রিয়ার শক্তি দেখেও আমি চমকে গিয়েছিলাম। সেই ছোটবেলা থেকেই যে শহর নিয়ে মনে নানা কল্পনার ছবি তৈরি হয়ে গিয়েছিল, সেই শহরে হেঁটে বেড়ানোটা অদ্ভুত এক অভিজ্ঞতা। কারণ ছোটবেলা থেকেই রাজা ডেভিড কিংবা যিশুর গল্প শুনতাম। একজন তরুণ সন্ন্যাসিনী হিসেবে সকালে বাইবেলের দৃশ্য ধ্যানে কল্পনা করার শিক্ষা পেয়েছি এবং সেটা আমি করতামও। তাই গার্ডেন অব গেথসমান, মাউন্ট অব অলিভ কিংবা দ্য ভিয়া ডোলোরোসার ছবি আমার কল্পনায় গড়ে উঠেছিল। আর তখন আমি এসব জায়গার মধ্য দিয়ে নিত্যদিন ঘুরে বেড়াতে যাচ্ছিলাম। আমি আবিষ্কার করলাম সত্যিকার রক্তমাংসের জেরুজালেম কল্পনার চেয়ে অনেক বেশি আবেগময় ও বিভ্রান্তিকর জায়গা। যেমন— আমাকে মাথায় রাখতে হয়েছে যে, জেরুজালেম একই সঙ্গে ইহুদি ও মুসলমানদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান। আমি দেখেছি কাফতান বাঁধা কিংবা কঠোর ইসরায়েলি সেনা পশ্চিম দেয়ালের পাথরে চুমু খাচ্ছে আবার হারাম আল-শরিফে শুক্রবারের জুমার নামাজ আদায়ের জন্য মুসলমানদের দেখেছি তাদের সেরা পোশাকটা পরে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যেতে— এই দুটো দৃশ্য পাশাপাশি দেখে ধর্মীয় বহুত্ববাদের চ্যালেঞ্জটা প্রথমবারের মতো আমি উপলব্ধি করতে পারি। মানুষ একই প্রতীককে পুরোপুরি ভিন্ন ভিন্ন ভাবে বিবেচনা করতে পারে। পবিত্র শহরের প্রতি এই মানুষদের অনুভব নিয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই, কিন্তু আমার ক্ষেত্রে তাদের মতো সেই আবেগ অনুপস্থিত। তার পরও জেরুজালেম আমারও; বিংশ শতকের জেরুজালেমে আমার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ছোটবেলায় কল্পনা করা বাইবেলের দৃশ্যগুলোর সঙ্গে আবদ্ধ।
একজন ব্রিটিশ নাগরিক হিসেবে জেরুজালেমের সঙ্গে আমার কোনো রাজনৈতিক সম্পর্ক নেই। এখানে কাজ করার সময় ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনি উভয়ই আমাকে তাদের নিজেদের যুক্তিগুলো উপস্থাপন করেছে। অতীতের ঘটনাবলির এই জীবন্ত থাকার ঘটনা শুনেবুঝে আমি বিস্মিত হয়েছি। ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার পেছনের ঘটনাবলি কিংবা ১৯৬৭ সালের ছয়দিনের যুদ্ধের খুঁটিনাটি বিশদে শোনা হয়ে যায়। এই বিবরণীর নোট নিতে নিতে বুঝতে পারি তাদের এসব বিবরণীর একটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে উদগ্রীব আর তা হলো, শুরুটা কে করেছিলেন? কারা প্রথম সহিংসতার আশ্রয় নিয়েছিলেন, জায়নবাদী নাকি আরবরা? কে ফিলিস্তিনের সম্ভাবনাকে বুঝতে পেরেছিলেন এবং রাষ্ট্রটি গঠন করেছিলেন? কারা আগে জেরুজালেমে বাস করতেন, ইহুদি নাকি ফিলিস্তিনিরা? বর্তমানের জটিল পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলা শুরু করলে ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনি উভয়ই ফিরে যান ব্রোঞ্জ যুগে এবং সেখান থেকে আসেন মধ্যযুগে তারপর এই সমকালে। আবার ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনিরা যখন প্রত্যেকে গর্বভরে ‘তাদের’ শহর ঘুরিয়ে দেখাচ্ছিলেন, তখন বিভিন্ন স্থাপনাগুলো তাদের সংঘাতের উপাদান হয়ে উঠছিল।
জেরুসালেমে প্রথম সকালেই আমার এক ইসরায়েলি সহকর্মী আমাকে কিং হেরডের পাথর শনাক্ত করার উপায় শিখিয়ে দিয়েছিলেন। মনে হচ্ছিল, এই পাথরগুলো খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতক থেকে জেরুজালেমের প্রতি ইহুদিদের ওয়াদাকে সবসময় স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে— ইসলামের আগমনের বহুকাল আগে এই ওয়াদার জন্ম। ওল্ড সিটি দিয়ে ঘুরে বেড়ানোর সময় আমাকে জানানো হলো— অটোমানদের শাসনামলে জেরুজালেম নিদারুণভাবে অবহেলিত হয়েছে। উনিশ শতকে ইহুদিদের বিনিয়োগের মাধ্যমে জেরুজালেম প্রাণ ফিরে পেয়েছিল। তারা আমাকে স্যার মোজেজ মন্টেফিওরে নির্মিত বায়ুকল ও রথচাইল্ডদের তৈরি করা হাসপাতাল দেখালেন। ইসরায়েলের জন্যই জেরুজালেম সমৃদ্ধশালী হচ্ছে, যেমনটা ইতিহাসে আগে আর কখনো হয়নি।
আমার ফিলিস্তিনি বন্ধুরা আমাকে একেবারে ভিন্ন এক জেরুজালেম দেখালেন। তারা হারাম আল-শরিফের জাঁকজমক ও তার সীমানাঘেঁষে তৈরি সুন্দর মাদ্রাসা দেখালেন। মামলুক আমলে এগুলো তৈরি হয়েছিল, তাদের কাছে এগুলো জেরুজালেমের প্রতি মুসলমানদের ওয়াদার প্রতীক। তারা আমাকে জেরিকোয় নবী মুসার মাজারে নিয়ে গেলেন, খ্রিস্টানদের হাত থেকে জেরুজালেমকে রক্ষার জন্য এটা নির্মিত হয়েছিল। কাছাকাছি আরো দেখলাম অসাধারণ উমাইয়া প্রাসাদ। বেথলহেমের মধ্য দিয়ে গাড়িতে যাওয়ার সময় হঠাৎ আমার ফিলিস্তিনি হোস্ট গাড়ি থামিয়ে আমাকে রাস্তার পাশে র্যাচেলের সমাধি দেখালেন। তিনি বললেন, এ ইহুদি সমাধিকে শত শত বছর ধরে ফিলিস্তিনিরা দেখেশুনে রেখেছেন, কিন্তু বদলে তারা বেদনাদায়ক পুরস্কার পেয়েছেন।
একটা কথা ঘুরেফিরে বারবার আসে। সবচেয়ে সেক্যুলার ইসরায়েলি কিংবা ফিলিস্তিনিও বলেন যে, জেরুজালেম তাদের মানুষদের কাছে ‘পবিত্র’। এমনকি ফিলিস্তিনিরা শহরটিকে আল-কুদস বা পবিত্র নামে ডাকেন। অবশ্য ইহুদিরা ঘৃণাভরে এগুলো উড়িয়ে দেয় এবং দাবি করে যে, জেরুজালেম প্রথমে ইহুদিদের পবিত্র শহর এবং এই শহর মুসলমানদের কাছে কখনই মক্কা বা মদিনার মতো গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। এসবের পরিপ্রেক্ষিতে ‘পবিত্র’ শব্দটি কী অর্থ প্রকাশ করে? যেখানে একদল ভ্রমাত্মক মানুষ, যারা চরম অপবিত্র কাজে লিপ্ত সেই শহর কী করে পবিত্র হতে পারে? একজন কট্টর নাস্তিক ইহুদি কেন পবিত্র শহর নিয়ে চিন্তিত এবং পশ্চিম দেয়াল নিয়ে এত আধিপত্যবাদী? কেন একজন অবিশ্বাসী আরবও আল-আকসা মসজিদের সামনে প্রথমবারের মতো দাঁড়ালে কান্নায় ভেঙে পড়ে? জেরুজালেম খ্রিস্টানদের কাছে কেন পবিত্র সেটা আমি বুঝতে পারি; কারণ জেরুজালেম যিশুর মৃত্যু ও পুনরুত্থানের স্থান। এখান থেকেই খ্রিস্টীয় বিশ্বাসের জন্ম হয়েছিল। অন্যদিকে ইহুদি ও ইসলাম ধর্মের গঠনকালীন সময়টা ছিল জেরুজালেম থেকে দূরে, সিনাই উপত্যকা বা আরবীয় হিজাজে। যেমন: ঈশ্বর মোজেজকে দশ প্রত্যাদেশ দিয়েছিলেন সিনাই পর্বতে এবং এখানেই ঈশ্বর ইসরায়েলের প্রতি তার ওয়াদাকে ব্যক্ত করেছিলেন। অথচ সিনাইয়ের পরিবর্তে ইহুদিদের কাছে জেরুজালেমের মাউন্ট সিনাই কেন পবিত্র? স্পষ্টতই আমার ধারণায় ভুল ছিল, আমার ধারণা ছিল কোনো শহর পবিত্র কিনা সেটা নির্ভর করে স্যালভেশনের ইতিহাস, মানুষের জীবনে ঈশ্বরের হস্তক্ষেপের পৌরাণিক বিবরণের ওপর নির্ভর করে।
আমি বুঝেছি যে, জেরুজালেমের সঙ্গে ‘পবিত্র’ শব্দটি স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়ালেও, এর অর্থ স্বতঃসিদ্ধ মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে শব্দটি অনেক বেশি জটিল। তিনটি একেশ্বরবাদী ধর্ম শহরটিকে কেন্দ্র করে যে ঐতিহ্য গড়ে তুলেছে, তা বিস্ময়করভাবে সাদৃশ্যপূর্ণ। তার ওপর কোনো পবিত্র স্থান বা শহরের প্রতি ভক্তি একটি বৈশ্বিক রীতি। ধর্মের ইতিহাসবিদরা বিশ্বাস করেন যে, সব সংস্কৃতিতেই ধর্মবিশ্বাসের এ ধরনের প্রকাশ দেখা যায়। মানুষ একটি পবিত্র ভূগোল তৈরি করেছে, যার সঙ্গে আধুনিক, বৈজ্ঞানিক মানচিত্রের কোনো সম্পর্ক নেই। শহর, বন, পর্বত আধ্যাত্মিকতার প্রতীক হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন কারণে জেরুজালেম ইহুদি, খ্রিস্টান ও মুসলিমদের পবিত্র ভূগোলের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। এ কারণে শহরটিকে তারা কেউই নিরপেক্ষভাবে দেখতে পারেন না। কারণ এটা তাদের নিজেদের অস্তিত্বের ধারণা ও পরম সত্য বা ঈশ্বরের ধারণার সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে; এসব বিশ্বাস মানুষের জাগতিক জীবনকে অর্থবহ ও মূল্যবান করে তোলে। পশ্চিমে আমরা ঈশ্বরকে দেখি নরাত্বোরোপমূলক ও ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গিতে, আর তাই হরহামেশাই স্বর্গীয় ধারণ অবিশ্বাস্য, অপ্রাসঙ্গিক আকারে হাজির হয়। অনেকে ‘ঈশ্বর’ শব্দটিকে ভালোভাবে গ্রহণ করতে পারেন না, কারণ ঈশ্বরের নামে অনেক ছেলেমানুষি ও অগ্রহণযোগ্য আচরণ মানুষ করে থাকে। তাই ঈশ্বরের পরিবর্তে ‘পবিত্র’ শব্দটি ব্যবহার করা সহজ। মানুষ যখন দুনিয়াকে পর্যবেক্ষণ করেছে, তখন মানুষ তার অস্তিত্বের মূলে এক ধরনের ব্যাখ্যাহীনতা ও রহস্য অনুভব করেছে। তারা মনে করে, এই রহস্য তাদের ও প্রকৃতির সঙ্গে সংযুক্ত এবং এসব ছাড়িয়ে অন্য কোনো জগতেও বিস্তৃত। যাহোক, আমরা এই রহস্যকে নামকরণ করেছি— ঈশ্বর, ব্রহ্মা বা নির্বাণ। এই ব্যাখ্যাহীনতা মানুষের জীবনে একটা বাস্তবতা। ধর্মতত্ত্বে বিশ্বাস যেমনটাই হোক না কেন, একটা দারুণ গান শুনলে বা সুন্দর একটা কবিতা শুনলে আমাদের সবার প্রতিক্রিয়াই প্রায় একই রকম হয়। আমরা এই অভিজ্ঞতাকে সন্ধান করতে যাই— কোনো এক জায়গায় যেমন গির্জা বা সিনাগগে খুঁজে না পেলে আমরা অন্যত্র দৃষ্টি দিই। পবিত্রতার প্রকাশ হয় বিভিন্নভাবে— ভয়, শ্রদ্ধা, উদ্দীপনা, শান্তি এবং বাধ্যতামূলক নৈতিক কর্মকাণ্ডে। এসব যেন আমাদের অস্তিত্বকে পূর্ণ করে।
দ্বিতীয় যে ধারণাটি নিয়ে আমাদের আলোচনা করতে হবে সেটা হলো পুরাণ। মানুষ যখন পবিত্র বিষয় নিয়ে কথা বলে কিংবা মানুষের বিভিন্ন বেদনা নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করে, তখন সে যৌক্তিকভাবে, বুদ্ধি দিয়ে তার এই অভিজ্ঞতাকে বর্ণনা করতে পারে না। তখন সে পুরাণের আশ্রয় নেয়। এমনকি ফ্রয়েড ও কার্ল য়ুং প্রথম মানুষের আত্মার তথাকথিত বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান শুরু করেছিলেন। কিন্তু আত্মাকে ঘিরে বিভিন্ন ঘটনাকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তারাও ধর্ম ও পুরাণের শরণাপন্ন হয়েছেন এবং তারা নিজেরা কিছু নতুন পুরাণ তৈরি করেছেন।
বর্তমানে পুরাণ শব্দটি অবমূল্যায়িত। এখন পুরাণ বলতে এমন কিছু বোঝানো হয়, যা সত্য নয়। শুধু পুরাণ বলে অনেক কিছুকে উড়িয়ে দেয়া হয়। জেরুজালেমের ক্ষেত্রেও বিষয়টি সত্য। ফিলিস্তিনিদের দাবি, ইহুদিদের কথা অনুযায়ী রাজা ডেভিডের প্রতিষ্ঠিত ইহুদি সাম্রাজ্যের কোনো প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ নেই; সলোমনের মন্দিরেরও কোনো নিশানা পাওয়া যায়নি। ইসরায়েলের রাজ্য সম্পর্কে সমসাময়িক কোনো দলিলে কিছু উল্লেখ নেই, আছে কেবল বাইবেলে। তাই এটা একটা ‘পুরাণ’ বৈ অন্য কিছু নয়। অন্যদিকে ইসরায়েলিরা জেরুজালেমের হারাম আল-শরিফ থেকে পয়গম্বর মোহাম্মদ (সা.)-এর স্বর্গে আরোহণের ঘটনাকে অগ্রাহ্য করে। আল-কুদসের প্রতি মুসলমানদের ভক্তির মূলে রয়েছে এ ঘটনা। কিন্তু আমার বিশ্বাস, এটাই হচ্ছে মূল বিন্দু। পুরাণ কখনই ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত ঘটনাকে বর্ণনা করার জন্য তৈরি হয়নি। পুরাণের উদ্দেশ্য এসব ঘটনার অন্তর্গত গুরুত্বকে তুলে ধরা। স্পষ্ট ও যৌক্তিকভাবে যে বাস্তবতাকে আলোচনা করা যায় না, তার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করতে তৈরি হয় পুরাণ। পুরাণের সবেচেয়ে ভালো সংজ্ঞা হচ্ছে, এটা প্রাচীন মনস্তত্ত্বের একটি রূপ। কারণ এটা মানুষের অন্তরের অতলের কথা প্রকাশ করে, যা দারুণ রহস্যময় ও আমাদের কাছে এখনো বিস্ময়কর। এভাবে ‘পবিত্র ভূগোল’-এর পুরাণ মানুষের অভ্যন্তরীণ জীবনের সত্য প্রকাশ করে। পুরাণ মানুষের দুষ্পাঠ্য বেদনা ও ইচ্ছাকে স্পর্শ করে এবং এ কারণে প্রবল ও আধিপত্যবাদী আবেগের স্ফুরণ ঘটাতে পারে। ‘শুধুমাত্র’ পুরাণ বলে জেরুজালেমের গল্পগুলোকে খারিজ করা উচিত হবে না। এসব গল্প গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এগুলো পুরাণ।
জেরুজালেমের প্রশ্নটি বিস্ফোরক, কারণ শহরটি পৌরাণিক মর্যাদা পেয়েছে। বর্তমান সংঘাতের দুপাশে থাকা মানুষ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মাঝে মাঝেই আবেগময় পুরাণগুলো বাদ দিয়ে অধিকার ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে যৌক্তিক আলোচনার আহ্বান জানান। এমনটা সম্ভব হলে হয়তো ভালোই হতো। কিন্তু এটা বলা বোধহয় নিরাপদ হবে না যে, পুরাণের গুরুত্ব আমাদের কাছে শেষ হয়ে গেছে। অতীতে মানুষ ধর্ম থেকে পুরাণকে মুছে ফেলতে চেয়েছে। স্থানীয় ক্যানানাইটদের পুরাণ থেকে নিজেদের বিশ্বাসকে আলাদা রাখতে প্রাচীন ইসরায়েলের পয়গম্বর ও সংস্কারকরা দারুণভাবে সচেষ্ট ছিলেন। তারা সফল হননি। ‘কাবালাহ’-এর রহস্যবাদে পুরনো দিনের গল্প ও কিংবদন্তি শক্তিশালী রূপে ফিরে আসে। এভাবে ধর্মের অধিকতর যৌক্তিক রূপের ওপর বিজয়ী হয় পুরাণ। জেরুজালেমের ইতিহাস পর্যবেক্ষণ করলে আমরা দেখতে পাই যে, মানুষ যখন দুর্দশায় পড়েছে এবং যুক্তি দিয়ে সান্ত্বনা খুঁজে পায়নি, তখন সে প্রবৃত্তিগতভাবে পুরাণের দিকে ঝুঁকে পড়েছে।
মাঝে মাঝে অনেক ঘটনা মানুষের অভ্যন্তরের বাস্তবতার সঙ্গে এমনভাবে মিলে যায় যে, সেগুলো সঙ্গে সঙ্গে পৌরাণিক মর্যাদা পেয়ে যায় এবং এ থেকে প্রবল পৌরাণিক উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়। এ রকম দুটি ঘটনা হচ্ছে— চতুর্থ শতকে যিশুর সমাধি আবিষ্কার ও ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দে ইসরায়েলের জেরুজালেম বিজয়। উভয় ক্ষেত্রেই সংশ্লিষ্টরা ভেবেছিলেন, তারা প্রাচীন মানুষদের এ ধরনের চিন্তা পদ্ধতি মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলেছেন; কিন্তু ঘটনাক্রম এত শক্তিশালী ছিল যে, তারা আর সেগুলোকে উপেক্ষা করতে পারেননি। আমাদের শতকে ইহুদি ও ফিলিস্তিনের মানুষের ওপর এমন মাত্রায় বিপর্যয়ে গিয়েছে তাতে পুরাণ যে আবার তাদের সামনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ফুটে উঠবে, তাতে বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই। তাই কাজটা ভালো বা মন্দ যে রকমই হোক না কেন, জেরুজালেমের পুরাণকে বিবেচনায় নেয়াটা জরুরি। এখানকার মানুষের আধ্যাত্মিকতার চাহিদা ও ধরনকে বুঝতে হলে এটা করতেই হবে।
জেরুজালেমের ইতিহাসে দৃষ্টি দিতে হলে আমাদের আরেকটি বিষয়ে মনোযোগ দিতে হবে— প্রতীকীবাদ বা সিম্বলিজম। আজকের বিজ্ঞাননির্ভর সমাজে আমার স্বাভাবিকভাবেই চিত্র বা প্রতীকের পরিপ্রেক্ষিতে চিন্তা করি না। আমরা অনেক বেশি যৌক্তিক ও মুক্তচিন্তার পদ্ধতি বিকশিত করেছি। আমরা কোনো বস্তু থেকে সব ধরনের অবেগনির্ভর বিষয়কে বাদ দিয়ে শুধু বস্তুর ওপরই দৃষ্টি নিবদ্ধ করি। এ পদ্ধতি পশ্চিমের অনেক মানুষের ধর্মীয় অভিজ্ঞতাকে বদলে দিয়েছে, যা শুরু হয়েছিল ষোড়শ শতকে। আমরা এখন কোনো প্রতীককে শুধু একটা প্রতীক বলেই বিবেচনা করি, যে রহস্যকে প্রতীকটি প্রতিনিধিত্ব করে সেটিকে আমরা একেবারেই ভুলে যাই। প্রাক-আধুনিক দুনিয়ায় কিন্তু মানুষ এভাবে চিন্তা করত না। একটি প্রতীক যে বিষয় নির্দেশ করে তাতে যেন সে বাস্তবেও অংশ নেয়। এভাবে একটি ধর্মীয় প্রতীক তার অনুসারীদের এক পবিত্র জগতে নিয়ে যেতে পারে। ইতিহাসে পবিত্রতাকে মানুষ সরাসরি উপভোগ করতে পারেনি, পেরেছিলেন খুব অল্প কয়েকজন বিশেষ মানব। পবিত্রতা মানুষ পরোক্ষ ও ভিন্নভাবেই অনুভব করেছে। এভাবে পবিত্রতা কোনো কোনো নারী বা পুরুষের মধ্যে অনুভূত হয়— যারা অবতার। এ রকমভাবে পবিত্রতাকে পাওয়া যাবে পবিত্র গ্রন্থ, আইন ও শাস্ত্রে। প্রাথমিককালের এবং সর্বব্যাপী প্রতীকগুলোর অন্যতম হচ্ছে ভৌগোলিক স্থান। মানুষ পর্বত, শহর, মন্দিরকে পবিত্র হিসেবে অনুভব করেন। যখন তারা এসব স্থানে প্রবেশ করেন, তখন তাদের কাছে মনে হয় তারা এক ভিন্ন জগতে প্রবেশ করছেন, যদিও তা তাদের জাগতিক দুনিয়ার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ এক জায়গা। ইহুদি, খ্রিস্টান ও মুসলমানদের কাছে জেরুজালেম এমনই এক স্বর্গীয় প্রতীক।
এসব কিন্তু এমনি এমনি ঘটে না। কোনো স্থান যখন এভাবে পবিত্র হিসেবে বিবেচিত হতে শুরু করে এবং মানুষকে স্বর্গীয় কোনো জগতে প্রবেশ করার সুযোগ করে দেয়, তখন পূজারিরা তাদের সৃষ্টিশীল শক্তিকে অন্যদের সেই পবিত্র স্থানের প্রতি আকর্ষণ করতে ব্যয় করেন। আমরা দেখি যে মন্দির, গির্জা ও মসজিদের স্থাপত্য প্রতীকীভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে; অনেক ধার্মিকের কাছে এই স্থান হয়ে ওঠে ঈশ্বরের নৈকট্য লাভের রাস্তা। বিধিবদ্ধ প্রার্থনা পদ্ধতি এবং আচার-অনুষ্ঠান পবিত্র স্থানের ধারণাকে আরো উসকে দেয়। পশ্চিমের অনেক প্রোটেস্ট্যান্ট ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার ওপর বিশ্বাস হারানোর মনোভাব উত্তরাধিকার সূত্রে বহন করে। তারা ধর্মীয় আচার-প্রথাকে অর্থহীন হিসেবে বিবেচনা করেন। কিন্তু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানকে আধ্যাত্মিক অনুভবের মঞ্চ বললে তা অধিকতর সঠিক মূল্যায়ন হবে, এমনকি পুরোপুরি সেকুলার প্রেক্ষিত থেকে বিবেচনা করলেও এটা সত্যি। জেরুজালেমকে নিয়ে অনেক পুরাণের জন্ম হয়েছে এই শহর ও তার বিভিন্ন ধর্মীয় স্থাপনার অন্তর্নিহিত তাত্পর্য ব্যাখ্যা করতে।
রোমানীয়-আর্মেনিয়ান পণ্ডিত মির্চা এলিয়াদের মতে, এসব পুরাণের একটি হচ্ছে শাশ্বত প্রত্যাবর্তন। প্রায় সব সংস্কৃতিতেই তিনি এ ধারণা খুঁজে পেয়েছেন। এই ধারণা অনুসারে আমরা দুনিয়াতে যত কিছুর মুখোমুখি হই, সেগুলোর একটি করে প্রতিরূপ থাকে স্বর্গে। এই পৌরাণিক ধারণাটির মূল হচ্ছে যে এই দুনিয়ায় আমাদের জীবন অসম্পূর্ণ এবং অন্যত্র থাকা একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন। মানুষের সব কর্মকাণ্ড ও দক্ষতার স্বর্গীয় আদিরূপ আছে; ঈশ্বরের কর্মকাণ্ড অনুকরণ করে মানুষ সেগুলোকে ধারণ করতে পারে। ইমিটাটিও ডেই বা ঈশ্বরের অনুকরণ (ইহুদি ও খ্রিস্টানদের কিছু শাখার মধ্যে প্রচলিত) আজো পালন করা হয়। ইহুদিরা এখনো সাবাথ পালন করে, খ্রিস্টানরা গির্জায় মদ পান করে। এসব কর্মকাণ্ড অর্থহীন কিন্তু অনুসরণকারীরা বিশ্বাস করেন এগুলো এক অর্থে ঈশ্বর একদিন করেছিলেন। কোনো পবিত্র স্থানে আচার-অনুষ্ঠান ঈশ্বরকে অনুসরণ করার আরেকটি উপায়। এ পৌরাণিক ধারণাটি পবিত্র শহরের ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই শহরকে স্বর্গে ঈশ্বরের আবাসের প্রতিরূপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। দুনিয়ার কোনো মন্দিরকে স্বর্গে অবস্থিত দেবতার ঘরের অবিকল প্রতিরূপ বলে মান্য করা হয়। একটি মন্দির মর্ত্যে ঈশ্বরের ঘর হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।
যুক্তিনির্ভর আধুনিকতার শীতল আলোর সামনে এসব পুরাণ কিম্ভূতকিমাকার মনে হবে। কিন্তু এসব পুরাণ শুরুতে তৈরি করে তারপর কোনো নির্দিষ্ট ‘পবিত্র’ স্থানের বিপরীতে বসিয়ে দেয়া হয়নি। বরং এসব পুরাণ হচ্ছে মানুষের অভিজ্ঞতাকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা। ধর্মের ক্ষেত্রে তত্ত্বীয় ব্যাখ্যার আগে অভিজ্ঞতার আগমন ঘটেছে। মানুষ প্রথমে অনুভব করে যে, কোনো উদ্যান বা পর্বতের চূড়ায় তারা ঈশ্বরের দেখা পেয়েছে। এসব অনুভবে তাদের সহায়তা করেছে বিভিন্ন চারুভাবনা যেমন— স্থাপত্য, সংগীত, প্রার্থনা স্তোত্র। এসব বিষয় মানুষকে এক ভিন্ন জগতে নিয়ে যায়। তারপর মানুষ তাদের এসব অভিজ্ঞতাকে পুরাণের কাব্যের ভাষায় কিংবা পবিত্র ভূগোলের ব্যাখ্যা হতে দেখতে চায়। জেরুজালেম ইহুদি, খ্রিস্টান ও মুসলমানদের কাছে ‘তৈরি হওয়া’ এমনই একটি স্থান, কারণ এ শহর তাদের স্বর্গের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়।
বুদ্ধ বোধিপ্রাপ্তির পরে একবার বলেছিলেন যে, মানুষকে পর্বতের চূড়া থেকে নেমে লোকালয়ে ফিরে সব জীবের প্রতি দয়া-করুণার চর্চা করতে হবে। কোনো পবিত্র স্থানের আধ্যাত্মিকতার ক্ষেত্রেও এ বিষয় প্রয়োগ করা যায়। শুরু থেকেই জেরুজালেম কাল্টের কাছে দান ও সামাজিক ন্যায়বিচার একটি আবশ্যিক বিষয় ছিল। শহর কখনো পবিত্র হতে পারে না, যদি না সেখানে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হয়। তবে দুঃখের বিষয় এ নৈতিক বিষয়টি বেশির ভাগ সময়ই উপেক্ষা করা হয়েছে। বেশকিছু নৃশংস ঘটনা ঘটেছে জেরুজালেমকে পবিত্র বিবেচনা করে ন্যায়বিচার ও দয়াবান সমাজ প্রতিষ্ঠার আগেই তাকে অধিকার করতে গিয়ে। জেরুজালেমের দীর্ঘ ও উত্তাল ইতিহাসে এসব অন্তর্নিহিত স্রোত তাদের স্ব স্ব ভূমিকা রেখেছে।
কারেন আর্মস্ট্রংয়ের জেরুজালেম: ওয়ান সিটি, থ্রি ফেইথস গ্রন্থের ভূমিকা
অনুবাদ: শানজিদ অর্ণব