ভ্লাদিমির লেনিন: লৌহমানবের প্রেমিকা

লেনিন রোমান্টিক মানুষ ছিলেন, এমনটা তার শত্রু বা মিত্র কেউই বলবেন না বলেই মনে হয়। তার সব ছবিতেই যে চেহারাটি ফুটে উঠেছে, তাতে দেখা যায় একজোড়া ক্ষুরধার চোখ আর হিমালয়সম দৃঢ় প্রতিজ্ঞাদীপ্ত একটি মুখ। লেনিন ছিলেন পেশাদার বিপ্লবী, রুশ দেশে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন করাই ছিল তার জীবনের আরাধ্য। তিনি সফল হয়েছিলেন আর তার জন্য পর্বতসম বাধাও তাকে ডিঙাতে হয়েছে। একজোড়া ছেঁড়া জুতো আর কোট পরেই বিরতিহীনভাবে মাঠে-ময়দানে ছুটে বেড়িয়ে বক্তৃতা করেছেন। নির্বাসিত থেকেছেন বহু বছর।

লেনিনের স্ত্রী ও বিপ্লবের সহকর্মী ছিলেন নাদেজদা ক্রুপস্কায়া। নাদেজদাও লেনিনের মতো আরেক দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বিপ্লবী। নির্ঝঞ্ঝাটেই এ দম্পতি তাদের বৈবাহিক জীবন পার করেছেন। তবে রুশ বলশেভিক বিপ্লবের আগে লেনিনের সঙ্গে এক ফরাসি-রুশ নারী ইনেসা আরমান্দের ‘বন্ধুত্বের অধিক’ সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। লেনিন তখন নাদেজদার সঙ্গে ঘর করছেন। তবে এ তিনজন বিপ্লবীর অসম্ভব রকমের পরিষ্কার চিন্তা ও সমাজতান্ত্রিক নৈতিকতার কারণে কোনো রকম অশান্তি ও স্ক্যান্ডাল ছাড়াই তারা এ ত্রিমুখী সম্পর্ককে অব্যাহত ও শেষ করতে পেরেছিলেন। কাজেই বলা যায় বলশেভিক বিপ্লবের আগে লেনিন তার নিজের জীবনেও বিপ্লব সম্পন্ন করতে পেরেছিলেন।

লেনিন ও ইনেসা আরমান্দের সম্পর্কটি কমিউনিস্ট কর্তৃপক্ষের সেন্সরশিপ কাটিয়ে দুনিয়ার সামনে কখনই বিস্তারিতভাবে প্রকাশিত হতে পারেনি, গত শতকে নব্বইয়ের দশকে সোভিয়েত আর্কাইভ উন্মুক্ত হওয়ার পর এই সম্পর্কের বিস্তারিত প্রকাশ পেতে শুরু করে। ২০০২ সালে সোভিয়েত আর্কাইভ ঘেঁটে মাইকেল পিয়ারসন লেখেন লেনিন’স মিস্ট্রেস: দ্য লাইফ অব ইনেসা আরমান্দ নামের বই। এ গ্রন্থটিতে লেনিন ও ইনেসার সম্পর্ক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

তবে এখানে আরো একটি বিষয় উল্লেখ করা জরুরি। লেনিন ও ইনেসার মধ্যে যেসব চিঠি আদান-প্রদান হয়েছিল, তার কিছু তারাই ধ্বংস করেছেন। এমন ইঙ্গিত ইনেসাকে লেখা লেনিনের একটি চিঠিতে পাওয়া যায়। লেনিন ১৯১৪ সালের জুন বা জুলাইয়ে ইনেসাকে লিখেছিলেন, ‘আসার সময় আমাদের সব চিঠি তোমার সঙ্গে নিয়ে আসবে। অনুগ্রহ করে সব চিঠি নিয়ে আসবে। এ বিষয়ে আমরা সাক্ষাতে কথা বলব।’

লেনিনের এই বন্ধুর চেয়ে অধিক মানুষটি কিংবা প্রেমিকা যাই বলা হোক না কেন, এই ইনেসা আরমান্দ ছিলেন জন্মগতভাবে ফরাসি। মা-বাবা দুজনই ছিলেন মঞ্চের শিল্পী। ইনেসার মা ছিলেন একজন কৌতুকশিল্পী ও বাবা ছিলেন অপেরা গায়ক। মাত্র পাঁচ বছর বয়সেই বাবাকে হারান ইনেসা। এরপর চলে আসেন মস্কোয়। রাশিয়ায় তিনি একটি ফরাসি বংশোদ্ভূত রুশ পরিবারে শিক্ষক হিসেবে কাজ পান এবং এ এস্টেটেই পালিত হন।

এখানে আসার পর জীবনের শুরুর দিকের ঝড়-ঝঞ্ঝা অতিক্রম করে তার জীবনে কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসে। এরপর শিক্ষিত, সংস্কৃতি ও শিল্পমনা এই ইনেসার বিয়ে হলো তার আশ্রয় দেওয়া সেই ধনী পরিবারেরই বড় ছেলে আলেক্সান্দার আরমান্দের সঙ্গে, যাদের বাড়িতে তিনি বড় হয়েছিলেন। শিগগিরই তাদের ঘরে আসে চারটি সন্তান। সবকিছুই ঠিকঠাক চলছিল, কিন্তু এ নিস্তরঙ্গ ছিমছাম জীবন ইনেসার পছন্দ ছিল না। ইনেসার স্বামী আলেকজান্দার আরমান্দ ও তার ভাইয়েরা র্যাডিক্যাল রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন। লেনিনের লেখা দ্য ডেভেলপমেন্ট অব ক্যাপিটালিজম ইন রাশিয়া পড়ে ইনেসা বিপ্লবী চিন্তায় উদ্বুদ্ধ হন। সমাজ পরিবর্তনের জন্য তিনি কাজ করার সিদ্ধান্ত নেন। পরিবারের সম্পদ ব্যবহার করে তিনি কৃষকদের সন্তানদের জন্য একটি স্কুল চালু করেন। নয় বছর ইনেসা শান্তিতেই আলেকজান্দারের সঙ্গে সংসার করেন। এরপর ইনেসা তার স্বামীর ছোট ভাই ১৭ বছর বয়সী ভ্লাদিমিরের প্রেমে পড়েন। ইনেসার বয়স তখন ২৮। ভ্লাদিমির তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও বিপ্লবী রাজনীতিতে সক্রিয়। প্রেমের পরিণতিতে ১৯০৩ সালে তাদের একটি সন্তানের জন্ম হয়। এসবের মধ্যে ইনেসা আরো গভীরভাবে সমাজতান্ত্রিক রাজনীতির মধ্যে ডুবে গিয়েছিলেন।

১৯০৪ সালে ইনেসা রাশিয়ান সোস্যাল ডেমোক্রেটিক লেবার পার্টিতে যোগ দেন। ফলে একসময় তখনকার রুশ শাসক জারদের নজরে পড়েন। ১৯০৫ সালের বিদ্রোহে ভূমিকা রাখার কারণে তাকে গ্রেফতার করে রাশিয়ার উত্তরাঞ্চলে নির্বাসনে পাঠানো হয়। ১৯০৮ সালে সেখানে থেকে ইনেসা পালিয়ে প্যারিস চলে যান। প্যারিস তখন প্রেম আর বিপ্লবের সৌরভে সুবাসিত এক শহর। প্যারিসে থাকাকালে ইনেসা ফরাসি সমাজতান্ত্রিক কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন, বিপ্লবী সাহিত্য অনুবাদ করেন এবং অর্থনীতি বিষয়ে ডিগ্রি নেন।

ইনেসা আরমান্দ ও লেনিনের মধ্যে প্রথম সাক্ষাৎ হয়েছিল সম্ভবত প্যারিস বা ব্রাসেলসে, সেটা ছিল ১৯০৯ বা ১৯১০ সাল। ইনেসা তত্ক্ষণাত্ভাবে লেনিনের ব্যক্তিত্ব, কারিশমা ও সবচেয়ে বেশি তার বিপ্লবী আদর্শের প্রতি আকর্ষিত হন। ১৯০৯ সালে ইনেসা প্যারিসে চলে আসেন। ততদিনে ইনেসা চারবার জেল খেটেছেন। তখন লেনিন তার স্ত্রী নাদেজদা ক্রুপস্কায়ার সঙ্গে সেখানে বাস করছেন। এ দম্পতির বিয়ে হয়েছে ১১ বছর হয়। প্যারিসে সে সময় বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা পলাতক বিপ্লবী নেতা-কর্মীদের স্বর্গ। লেনিন ও নাদেজদা তখন রুশ বিপ্লবীদের পথ দেখাচ্ছেন।

সময় ১৯১০, স্থান প্যারিস। লেনিনের বয়স তখন ৪০। প্যারিসের এভিনিউ ডি’ অর্লিন্সে লেনিন, ক্রুপস্কায়া ও অন্যান্য নির্বাসিত রুশ বিপ্লবী আড্ডা জমাতেন। তাদের আলাপ-আলোচনার জন্য ওপরের তলায় একটি কামরা ছিল। সে বছরই শরতে এ আড্ডায় ৩৬ বছর বয়সী সবুজ চোখের ইনেসার আগমন ঘটে।

লেনিন তখন প্রতিপক্ষ তাত্ত্বিকদের কাছ থেকে কঠোর আক্রমণের মুখে আছেন। অর্থের অভাবে তার জার্নাল প্রলেটারি বন্ধ হয়ে গেছে। লেনিন দেখলেন, ইনেসা চারটি ভাষায় দক্ষ এবং দারুণ সাংগঠনিক ক্ষমতাসম্পন্ন। ফলে লেনিন ইনেসার গুরুত্ব বুঝতে সময় নিলেন না।

সাধারণ লক্ষ্যের উদ্দেশ্যে কাজ করতে করতে লেনিন ও ইনেসার মধ্যে ঘনিষ্ঠতা বাড়তে থাকে। কার্ল মার্ক্সের কন্যা ও জামাইয়ের শেষকৃত্যে দেয়া নিজের ভাষণকে লেনিন ফরাসি ভাষায় অনুবাদের দায়িত্ব দেন ইনেসাকে। পিয়ারসন জানাচ্ছেন, এ ঘনিষ্ঠতাই প্রেমে রূপান্তরিত হয়। নির্বাসনে সাত বছর লেনিন ইনেসার সঙ্গে কাজ করেছেন। লেনিনের বিভিন্ন কাজে এ সময় ইনেসা দারুণভাবে সহায়তা করেছেন। ১৯১৯ সালে ইনেসাই ছিলেন মস্কোর সবচেয়ে ক্ষমতাশালী নারী। তার পরও ইনেসাকে চেনেন, এমন মানুষের সংখ্যা খুব কম। লেনিনের ইমেজ রক্ষায় কমিউনিস্ট পার্টির কঠোর সেন্সরশিপই ইনেসার এ হারিয়ে যাওয়ার পেছনে দায়ী।

লেনিন ও ইনেসা প্যারিসের আর দশটা প্রেমিক যুগলের মতো ছিলেন না অতি অবশ্যই। তারা আইফেল টাওয়ারের ছায়া ভাগাভাগি করেননি, সিন নদীর তীরে জ্যোত্স্নাস্নাত রাতে হেঁটে বেড়াননি, বরং দুজনের বিপ্লবী মতাদর্শই ছিল তাদের ঘনিষ্ঠ হওয়ার প্রভাবক। তবে ইনেসার সৌন্দর্যকেও একেবারে উপেক্ষা করা উচিত হবে না। সে সময় নাদেজদার তুলনায় ইনেসা যথেষ্টই আকর্ষণীয় ছিলেন।

‘লেনিন সেই ছোটখাটো ফরাসি নারীর ওপর থেকে তার মঙ্গোলীয় চোখগুলো সরাতে পারছিলেন না’— ফরাসি সমাজতান্ত্রিক চার্লস র্যাপপোর্ট উল্লেখ করেছেন। লেনিন তার চিঠিতে ইনেসাকে ‘আমার প্রিয় বন্ধু’ বলে সম্বোধন করেন। আর ইনেসা প্যারিস পর্বের অনেক পরে ১৯১৩ সালে সে সময়ের স্মৃতিচারণ করে লেনিনকে লিখেছিলেন, ‘প্যারিসে আমার সব কর্মকাণ্ডই হাজারো সুতো দিয়ে তোমাকে স্মরণের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল।’ এ চিঠি থেকে লেনিনের প্রতি আরমান্দের প্রেমকে অনুমান করা যায়। ইনেসা আরো লিখেছেন, ‘আমি শুধু তোমার কথা শুনতে না, বরং তোমাকে কথা বলতে দেখতেও ভালোবাসি। প্রথমত. কথা বলার সময় তোমার চেহারা খুব জীবন্ত হয়ে ওঠে; দ্বিতীয়ত. কথা বলার সময় তোমাকে দেখার সুবিধা হলো, সে সময় তুমি আমার এ তাকিয়ে থাকা দেখতে পাও না।’

১৯১৪ সালে ইনেসাকে লেনিন একটি চিঠিতে লিখেছেন:

‘আমার প্রিয় ও প্রিয়তম বন্ধু!

তোমার প্রতি হাজারো চুমুর শুভেচ্ছা। তোমার সাফল্য কামনা করছি। আমি নিশ্চিত যে তুমি বিজয়ী হবে।’

নাদেজদা তার স্বামী লেনিন ও ইনেসার সম্পর্কের কারণে শেষেরজনের প্রতি ঘৃণা বা ঈর্ষা বোধ করেছিলেন, এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। বিপ্লবের প্রতি তাদের তিনজনের দায়বদ্ধতাই হয়তো এ সম্পর্কে কোনো জটিলতা তৈরি হতে দেয়নি। লেনিন ও নাদেজদা পোল্যান্ডের ক্রাকৌতে গেলে ইনেসাও তাদের সঙ্গে যান। কিছুদিন পর প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে ইনেসা পুনরায় নির্বাসিত লেনিনের সঙ্গে যোগ দেন, এবার সুইজারল্যান্ডে।

সুইজারল্যান্ডে লেনিন, নাদেজদা ও ইনেসা একসঙ্গে পার্বত্যাঞ্চলে হাঁটতে বের হতেন। নাদেজদা নিজেই এ স্মতিচারণ করে গেছেন। ১৯১৬ সালের জানুয়ারিতে লেনিন সোফি ছদ্মনাম দিয়ে ইনেসাকে প্যারিসে পাঠান। তবে লেনিন যতটা আশা করেছিলেন, ইনেসা ফরাসিদের মধ্যে লেনিনের প্রতি ততটা সমর্থন তৈরি করতে পারেননি। লেনিন তার অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেন। ইনেসাও কঠোর ভাষায় জবাব দিয়েছিলেন, ‘রূঢ় শব্দ ব্যবহার করে কিছু অর্জন হবে না। এ আচরণ যোগাযোগ রক্ষা করার ক্ষেত্রে নেতিবাচক ভূমিকা রাখবে।’

এবার লেনিনের সঙ্গে তার মতাদর্শিক বিরোধ দেখা দিল। লেনিনের মত ছিল, রাশিয়াকে এ যুদ্ধ থেকে বিরত থাকতে হবে; কিন্তু ইনেসার মত ছিল, রাশিয়াকে জার্মানদের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যেতে হবে নিজের মাতৃভূমি রক্ষা করতে। মতের এ ভিন্নতায় লেনিন ও ইনেসার মধ্যে অস্বস্তি তৈরি হয়। লেনিন ইনেসাকে লিখলেন, ‘দেশের প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে আমরা ভিন্নমতে থাকলে সেটা আমার জন্য দুঃখজনক। এসো চোখে চোখ রেখে কথা বলি।’ লেনিনের চিঠি পেয়ে ইনেসা নতি স্বীকার করেন। তার পুরো জীবন ছিল লেনিন ও তার আদর্শের প্রতি অনুগত। লেনিনকে রাশিয়ায় ফেরত পাঠানোর জন্য জার্মানি যে ট্রেনযাত্রার (সিলড ট্রেন) ব্যবস্থা করেছিল, সেই ট্রেনে ইনেসাও লেনিনের সঙ্গী হয়েছিলেন। এ সফর ছিল লেনিন ও ইনেসার সম্পর্কের চূড়ান্ত মাত্রা।

বিপ্লবের পর লেনিন গৃহযুদ্ধ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। দুজনের বিয়ের পর থেকে বিপ্লব, নতুন সমাজ নির্মাণ থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত লেনিন ও নাদেজদা অবিচ্ছেদ্য এক যুগল হয়েই ছিলেন। বিপ্লবের পর ইনেসা মনোযোগ দিয়েছিলেন নারী অধিকারবিষয়ক কর্মকাণ্ডে। তিনি মস্কো সোভিয়েতের নির্বাহী কমিটিতে নিয়োগ পান। ১৯১৮ সালের আগস্টে লেনিন গুলিবিদ্ধ হন। একটুর জন্য লেনিন বেঁচে যান। এরপর লেনিন ইনেসার খোঁজ করেন। ‘এ ঘটনা আমাদের সম্পর্ক পুনরায় উষ্ণ করে তোলে এবং আমরা অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠি’— ইনেসা লিখেছেন তার মেয়েকে। ইনেসার জন্য এবার ক্রেমলিনের কাছে একটি অ্যাপার্টমেন্টের ব্যবস্থা করা হলো। এছাড়া তিনি একটি ফোন পেলেন, যেটা দিয়ে সরাসরি লেনিনের সঙ্গে কথা বলা যায়। নাদেজদা অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন। তিনি কিছুদিনের জন্য ক্রেমলিন ছেড়ে গেলেন।

১৯১৮ সালের শেষ নাগাদ ইনেসা তার  স্বামী আলেক্সান্দার আরমান্দকে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ পাইয়ে দেন। শিগগিরই তিনি পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির নারী বিভাগের প্রধানের দায়িত্ব নেন। তিনি আইন প্রণয়নের ক্ষমতা পান। দিনে তিনি তখন ১৪ ঘণ্টা করে কাজ করতেন।

ইনেসার বন্ধু পোলিনা ভিনোগ্রাদস্কায়া ১৯২০ সালে তার সঙ্গে দেখা হওয়ার পর চমকে গিয়েছিলেন। পোলিনা লিখেছেন, ‘ইনেসার সারা শরীর ধুলায় ঢাকা। তিনি সমানে কাশছিলেন। আঙুলগুলো গরম করার জন্য ফুঁ দিচ্ছিলেন।’

লেনিন সে সময় তার গুলির ক্ষত থেকে সেরে উঠেছেন। ইনেসাকে একগাদা চিঠি লিখলেন। একজন ডাক্তারকে পাঠালেন ইনেসার চিকিৎসার জন্য। ডাক্তার ইনেসার শরীরে নিউমোনিয়া শনাক্ত করলেন। লেনিন ইনেসাকে লিখলেন:

‘তোমার নিজের প্রতি যত্নবান হওয়া উচিত। তোমার মেয়েদের বলো যেন আমাকে প্রতিদিন ফোন করে তোমার অবস্থা সম্পর্কে জানায়। তোমার কী প্রয়োজন, সেটা জানাও। ঘর গরম রাখার জন্য আরো কাঠ? খাবার? তোমার রান্না কে করে দেয়? ...সবগুলো প্রশ্নের জবাব দাও।

-তোমার লেনিন।’

জীবনের শেষ বছর ইনেসা মস্কোয় ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স অব কমিউনিস্ট উইম্যান আয়োজনে ব্যাপক পরিশ্রম করেন। কিন্তু সম্মেলন সফল হলেও অতি পরিশ্রম তার শরীরে মরণ আঘাত হানে। ইনেসা এ যাত্রা ধকল কাটিয়ে উঠলেন। কিন্তু কর্মভার আগের মতোই রইল। লেনিন তাকে কিছুদিন ছুটি কাটানোর জন্য অনুরোধ করলেন। তাকে কিসলোভদস্কের স্বাস্থ্যনিবাস বা ককেশাস পার্বত্য অঞ্চলের রিসোর্টে যেতে অনুরোধ করলেন। ইনেসা ককেশাসে গিয়েছিলেন। হঠাৎ লেনিন জানতে পারেন ককেশাসের পার্বত্য অঞ্চলে বিপ্লববিরোধীদের অবস্থান তৈরি হয়েছে। তিনি ইনেসাসহ ওই এলাকা থেকে অন্যদের বের করে আনার নির্দেশ দিলেন।

ইনেসা যেখানে ছিলেন সেখানে রোগী ও অতিথিদের রাইফেল দেয়া হলো আত্মরক্ষার জন্য। নিজের ডায়েরিতে ইনেসা এসব ঘটনা নিয়ে একটি শব্দও লেখেননি, তিনি বরং তার একাকিত্বের যাতনায় তখন লিখেছেন, ‘একটি উদগ্র মন একাকী। চারপাশে মানুষের কথা শুনলেও এখন ক্লান্ত লাগে। ...ভেতরে ভেতরে এ মৃত্যুর অনুভূতি যদি কখনো চলে যায় তাহলেই বরং অবাক হব। ...অন্যরা যখন হাসে তখন সেটা আমার কাছে অদ্ভুত লাগে... আমার মধ্যে যতটুকু উষ্ণতা অবশিষ্ট আছে তা শুধু আমার সন্তান আর ভিআইয়ের (লেনিন) জন্য...আমার হূদয় যেন মরে গেছে।’

ইনেসা যেখানে ছিলেন তার কাছাকাছি দুজন পার্টি সদস্য খুন হন। আর ১৪ সেপ্টেম্বর ওখান থেকে সবাইকে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়। ইনেসা উঠলেন একটি সামরিক ট্রেনে। তাদের ওপর বন্দুক ও ভারী অস্ত্রের হামলা হয়েছিল। একদিন পর তাদের ট্রেন বেলসানে পৌঁছে। এখানে তার কলেরা ধরা পড়ে। তাকে হাসপাতালে নেয়া হয়। কিন্তু ২৩ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে তিনি অজ্ঞান হয়ে যান। পরদিন সকালে ইনেসা পৃথিবীর মায়া কাটান। ককেশাসে অবকাশযাপনও তাকে রক্ষা করতে পারেনি। নির্বাসন, বন্দিজীবন, ভ্রমণ আর পরিশ্রম তার স্বাস্থ্যকে নিঃশেষ করে দিয়েছিল। কলেরায় আক্রান্ত হয়ে ইনেসা যখন মারা গেলেন তখন তার বয়স মাত্র ৪৬ বছর।

যে মানুষটিকে তিনি ভালোবাসতেন, সম্মান করতেন, তার কাছ থেকে বহু দূরে একাকী ইনেসা মৃত্যুবরণ করেন। মস্কো থেকে ৮৫০ মাইল দূরে নালচিকে তার মৃত্যু হয়। লেনিন ইনেসার দেহ মস্কোয় নিয়ে আসার ব্যবস্থা নেন।

মৃত্যুর আটদিন পরে ইনেসার কফিন ভোরে মস্কোয় এসে পৌঁছে। লেনিন ইনেসার সন্তান ও স্বামী আলেক্সান্দারকে নিয়ে কফিনবাহী ট্রেন থেকে মরদেহ গ্রহণ করতে যান। ইনেসার মরদেহ হাউজ অব অনারে নারী সদস্যদের গার্ড অব অনারে রাখা হয়।

তাকে রেড স্কয়ারের কাছে ক্রেমলিন দেয়ালের পাশে কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক সংগীতের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় সম্মানে সমাহিত করা হয়।

লেনিনকে তার জীবনে প্রকাশ্যে আবেগ প্রকাশ করতে দেখা গেছে কালেভদ্রে। সামান্য কয়েকটি উপলক্ষের একটি ছিল ইনেসার মৃত্যু। রুশ বিপ্লবের একজন গুরুত্বপূর্ণ নারীবাদী আলেক্সান্দ্রা কোলনতাই স্মৃতিচারণে উল্লেখ করেছেন, ‘আমরা যখন কফিনের পেছনে হাঁটছিলাম, লেনিনকে যেন তখন চেনা যাচ্ছিল না। তার চোখ বন্ধ, নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে থাকতেও তার কষ্ট হচ্ছিল।’ আর লেনিনের স্ত্রী ক্রুপস্কায়া লিখেছিলেন, ‘ইনেসার মৃত্যুতে ভলোদায়ার (লেনিন) প্রতিক্রিয়া নিয়ে আমার ভয় হচ্ছিল। তিনি কাঁদছিলেন এবং তার দৃষ্টি বহু মাইল দূরে কিছু খুঁজছিল।’

রুশ-ইতালীয় বিপ্লবী অ্যাঞ্জেলিকা বালাবানোভ জানিয়েছেন, ‘লেনিনের পুরো অবয়বই যেন বেদনার্ত ছিল...মনে হচ্ছিল তিনি দুমড়ে-মুচড়ে গেছেন...তার চোখে যেন বন্যা নামতে যাচ্ছিল...’

শোনা যায় ইনেসার জন্য লেনিনের এ শোক বিভিন্ন মহলে বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল। লেনিনের মৃত্যুর পর সোভিয়েত ইউনিয়নের শীর্ষ পদটির দাবিদারদের মধ্যে বিভিন্ন মাত্রায় ঠাণ্ডা লড়াই হয়েছিল। কথিত আছে, এ সময় স্ট্যালিন লেনিনের স্ত্রী নাদেজদাকে হুমকি দিয়ে বলেছিলেন, ‘লেনিনের প্রকৃত স্ত্রী কে ছিলেন, সেটা আমি দুনিয়ার সামনে বলে দেব।’ বন্ধু ইনেসাকে হারিয়ে ক্রুপস্কায়াও দুঃখ পেয়েছিলেন। ইনেসার স্মৃতিচারণে তিনি একটি প্রবন্ধও লেখেন। 

ইনেসা তার ভালোবাসা ও জীবন দুই-ই বিপ্লবের বেদিতে সমর্পণ করেছিলেন। বাস্তবত, লেনিনের ও ইনেসার সম্পর্ক খুব বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। দুজনের সম্পর্ক একটা সময় গভীরতায় পৌঁছার ইঙ্গিত স্পষ্ট হয়েছিল। লেনিন ও ইনেসা উভয়ের চিঠিতেই বহুবার চুমু খাওয়ার আকাঙ্ক্ষা দেখা যায়। কিন্তু সত্যিকার অর্থে তারা পরস্পরকে কাছে পেয়েছেন ৯সামান্যই।

১৯১৩ সালে এক চিঠিতে লেনিনকে লেখা ইনেসার চিঠি থেকে তার মনের ব্যথা, বিরহ টের পাওয়া যায়: ‘আমরা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছি, প্রিয়!’ সম্পর্কের ছেদ বা দূরত্ব টেনেছিলেন লেনিনই। সময়টা ছিল ১৯১৩ সাল। এর ফলে ইনেসার মধ্যে গভীর বেদনার সৃষ্টি হয়েছিল, ইনেসা চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘তোমার চুমু ছাড়া আমি বেঁচে থাকতে পারব, যদি দুচোখ দিয়ে অন্তত তোমাকে দেখতে পাই।... মাঝে মাঝে তোমার সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পেলে সেটা অসম্ভব আনন্দের হবে এবং এটা কারো কোনো ক্ষতিসাধন করবে না। আমাকে কেন এ অধিকার থেকে বঞ্চিত করবে?’

না, লেনিন ইনেসাকে শেষ পর্যন্ত বঞ্চিত করেননি। ১৯১৪ সালের জানুয়ারি থেকে লেনিন ইনেসাকে ১৫০টির বেশি চিঠি লিখেছেন। বেশির ভাগ চিঠিই বিভিন্ন আদেশ-নির্দেশসংক্রান্ত। তবে কিছু চিঠির শেষে অপরাধবোধ, বেদনা ও ইনেসার প্রতি উদ্বেগ প্রকাশ পেয়েছে।

ইনেসার সঙ্গে লেনিনের ঘনিষ্ঠতা নাদেজদা ক্রুপস্কায়াকে বিচলিত করেনি। তিনি বরং ইনেসার সঙ্গে বন্ধুর মতোই আচরণ করেছিলেন। তিনি লিখেছেন, ‘ইনেসার সঙ্গে সাক্ষাৎ মানেই আনন্দ আর সুখকর অনুভূতি। প্রথমবার দেখেই তাকে ভালো লেগেছিল। কমরেডদের প্রতি তার বিশেষ কোমল মমতা কাজ করত।’

লেনিনের একজন জীবনীকার লেভ ডানিলকিন মনে করেন, লেনিন ও ইনেসার মধ্যে কোনো প্রেমময় সম্পর্ক ছিল, এমন কোনো দালিলিক প্রমাণ নেই। যা আছে, সেটা শুধুই অনুমান আর গুজব। লেভ বরং মনে করেন, ইনেসা ও ক্রুপস্কায়ার সঙ্গে লেনিনের সম্পর্ক ‘নতুন সমাজতান্ত্রিক নৈতিকতা’কে অনুসরণ করেছে, যে ধারণা নিকোলাই শেরনিশেভস্কি হোয়াট ইজ টু বি ডান উপন্যাসে তুলে ধরেছেন: ‘সম্পর্কে যেকোনো কিছুই অনুমোদনযোগ্য, যদি তা সংশ্লিষ্টদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে হয়।’ এ কারণেই ডানিলকিন মনে করেন, ক্রুপস্কায়া ও ইনেসা কেউ কারো প্রতি ঈর্ষান্বিত হননি। সে সময় সমাজতান্ত্রিক দুনিয়ার এ নতুন নৈতিকতা আরো অনেকের মধ্যেই প্রকাশ হতে দেখা গিয়েছিল, যা ছিল সেই যুগের প্রেক্ষাপটে দারুণ বৈপ্লবিক।

ইনেসার জীবনীকার মাইকেল পিয়ারসনের মতে, পাঁচ সন্তানের জনক, লেনিনের প্রেমিকা ও বিপ্লবী ইনেসা আরমান্দ ছিলেন রাশিয়ার অন্যতম ক্ষমতাশালী নারী। কিন্তু কমিউনিস্ট পার্টির সেন্সরশিপের খড়গে তার গল্প দুনিয়ার সামনে প্রকাশিত হয়নি।

আরও