এ কে ফজলুল হক ও কৃষক প্রজা পার্টি

আজ ২৭ শে এপ্রিল শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক সাহেবের পঞ্চম মৃত্যুবার্ষিকী। পাঁচ বৎসর পূর্বে (১৯৬২) যখন তিনি ঢাকায় মারা যান সেদিনও আমি জেলে ছিলাম। হক সাহেব ছিলেন পূর্ব বাংলার মাটির মানুষ এবং পূর্ব বাংলার মনের মানুষ। মানুষ তাঁহাকে ভালবাসতো ও ভালবাসে। যতদিন বাংলার মাটি থাকবে বাঙালি তাঁকে ভালবাসবে। শেরে বাংলার মতো

আজ ২৭ শে এপ্রিল শেরে বাংলা . কে. ফজলুল হক সাহেবের পঞ্চম মৃত্যুবার্ষিকী। পাঁচ বৎসর পূর্বে (১৯৬২) যখন তিনি ঢাকায় মারা যান সেদিনও আমি জেলে ছিলাম। হক সাহেব ছিলেন পূর্ব বাংলার মাটির মানুষ এবং পূর্ব বাংলার মনের মানুষ। মানুষ তাঁহাকে ভালবাসতো ভালবাসে। যতদিন বাংলার মাটি থাকবে বাঙালি তাঁকে ভালবাসবে। শেরে বাংলার মতো নেতা যুগ যুগ পরে দুই একজন জন্মগ্রহণ করে। ...আজ লাহোর প্রস্তাবের মালিকের মৃত্যুবার্ষিকী। আর লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তি করে আমি যে দফা দাবি পেশ করেছি তার উপর বক্তৃতা করার জন্য দিনটিতে আমাকে ১৫ মাস বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হলো। আল্লার মহিমা বোঝা কষ্টকর!

শেখ মুজিবুর রহমান (কারাগারের রোজনামচা, পৃ.২৩১-৩২)

 

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কারাগারে বসে তার পূর্বসূরি অপর মহান নেতা শেরেবাংলার রাজনৈতিক কৃতিত্বকে এভাবেই উদারতা দিয়ে স্বীকার করেন। বয়সের দিক দিয়ে একজন প্রবীণ (জন্ম ১৮৭৩) আর অপরজন নবীন (জন্ম ১৯২০) একজন নানা, অন্যজন নাতি। শেরেবাংলা নাতির ওপর বাংলার রাজনীতির অপার সম্ভাবনা দেখতে পেয়েছিলেন। মজা করে বলতেনও, ‘আমি বুড়া, তুই গুঁড়া

আজ বুড়ো আর গুঁড়োর কথাই বলছি। বুড়োই আধুনিক বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা। শেরেবাংলা আবুল কাসেম ফজলুল হক। তীব্র সাম্প্রদায়িক হিন্দু-মুসলিম রাজনীতির সময়ে যিনি নিজেইগ্রেট বাঙালি রেস’-এর প্রতিভূ বলে দাবি করতেন। একজন চাখার থেকে, অপরজন টুঙ্গিপাড়া থেকে আগত। দুই মহান বাঙালি। একজন বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা, অন্যজন বাঙালি জাতীয়তাবাদকে জাগ্রত করে একটি জাতি-রাষ্ট্রের জন্মদাতা। বাঙালি জাতির জনক। কিন্তু নাতির (বঙ্গবন্ধুর) আওয়ামী লীগের মতো বুড়োর (শেরেবাংলার) এমন কোনো রাজনৈতিক দল আজ নেই, যারা আজ বলবে কীভাবে বরিশালের চাখারের আবুল কাশেম বাঙালির কাছে শেরেবাংলা বাবাংলার বাঘহয়ে উঠলেন; হিন্দু মুসলিমে বিভক্ত রাজনীতির কুয়াশার মধ্যে কীভাবে অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির প্রথম সূত্রপাত করেন কে ফজলুল হক; কৃষক প্রজা পার্টি প্রতিষ্ঠা করে কীভাবে সৃষ্টি করেন তৃতীয় ধারার রাজনীতি।

ধান নদী আর খালে ভরপুর বরিশালের চাখার। সেখানে ১৮৭৩ সালে ফজলুল হকের জন্ম এক মুসলমান মধ্যবিত্ত জোতদার পরিবারে। বাবা ছিলেন বরিশালের একজন জনপ্রিয় আইনজীবী। টুঙ্গিপাড়ার শেখ পরিবার আর বরিশালের চাখারের ফজলুল হকের পরিবারচিন্তা-চেতনা বিত্তবৈভবে ছিল কাছাকাছি। শেরেবাংলা ছিলেন মেধাবী এবং উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত। এমএ ডিগ্রি লাভ করেন কলকাতার বিখ্যাত প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ইংরেজি অংকশাস্ত্রে। তার শিক্ষা সর্বভারতীয় রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারে ভূমিকা পালনে সহায়ক হয়। একই সঙ্গে তাকে ইংরেজ সরকারের সঙ্গে রাজনীতির কলকাঠি চালাতেও সক্ষম করে তোলে।

ফজলুল হকের রাজনৈতিক সচেতনতা জাগ্রত হয় ছাত্রজীবনেই। তখনকার রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু রাজধানী কলকাতায়। তখন ঢাকা বিস্মৃত এক পুরোনো শহর। প্রথম পর্যায়ে তিনি ১৮৮৯ থেকে ১৯০০ পর্যন্ত কলকাতায় ছিলেন। শিক্ষাজীবন এবং আইন ব্যবসার সূত্রপাত হয় ওই সময়কালে। কলকাতাকেন্দ্রিক রাজনৈতিক আন্দোলন, কংগ্রেসের রাজনীতি, আলীগড়কেন্দ্রিক মুসলিম স্বাতন্ত্র্যবাদ রাজনীতির ধারা, নবাব আবদুল লতিফ এবং স্যার সৈয়দ আমীর আলীর নেতৃত্বে মুসলিম পুনর্জাগরণ কর্মকাণ্ড ইত্যাদি যুবক ফজলুল হককে আলোড়িত করে। বাবার মৃত্যুর পর ফজলুল হক বিশ শতকের শুরুতে কলকাতা ছেড়ে বরিশালে চলে আসেন। আইনজীবী হিসেবে যোগদান করেন বরিশাল বারে। বরিশালে তখন অশ্বিনী কুমার দত্তের নেতৃত্বে চলছে সমাজসংস্কার রাজনৈতিক আন্দোলন। ফজলুল হক বরিশাল থাকাকালীন পৈতৃক ক্ষুদ্র জমিদারিও পরিচালনা করেন। কোর্ট-কাচারিতে বিচারবঞ্চিত প্রজাদের আর্তনাদ এবং জমিদারদের প্রজাপীড়ন মহাজনদের শোষণ-অত্যাচার নিজ চোখে প্রত্যক্ষ করেছেন। এসব প্রজাপীড়ন তার মানসিক বিপ্লব ঘটিয়েছিল, যা পরবর্তী রাজনৈতিক জীবনে লক্ষ্য করি। সে থেকেই কৃষক প্রজা মুক্তি আন্দোলনে নিজেকে সমর্পণ করেন। গড়ে তোলেন কৃষক প্রজা সংগঠন। তিনি প্রায়ই বলতেন, ‘ফজলুল হককে বই পড়ে কৃষক প্রজার দুঃখ-দুর্দশার কথা জানতে হয়নি।১৯০৫ সালে অবহেলিত ঢাকাকে রাজধানী করে গঠিত হয় পূর্ববঙ্গ আসাম নতুন প্রদেশ। কর্মচাঞ্চল্য ফিরে আসে ঢাকা পূর্ব বাংলার জনজীবনে। ফজলুল হক সঠিক সিদ্ধান্ত নেন। স্যার সলিমুল্লাহর সঙ্গে বঙ্গভঙ্গের সমর্থনে আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। সে থেকে ঢাকার নবাব সলিমুল্লাহর রাজনীতির সঙ্গে তার সখ্য গড়ে ওঠে। ১৯০৬ সালে ঢাকায় যখন অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ গঠিত হয়, তখন সাংগঠনিক তত্পরতায় তিনি সরাসরি জড়িয়ে পড়েন। এখান থেকেই রাজনীতির পাঠ শুরু। ফজলুল হক কিছুদিন সরকারি চাকরিও করেছিলেন। কিন্তু স্বাধীনচেতা ফজলুল হকের ইংরেজ সরকারের গোলামি বেশি দিন সহ্য হয়নি। ১৯০৭-১১ সাল পর্যন্ত তিনি ইংরেজ সরকারের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট এবং কিছুদিন মাদারীপুরের এসডিও ছিলেন।

১৯১১ সালে ঢাকা আর রাজধানী থাকল না। পূর্ব বাংলার মানুষের আশা ভঙ্গ হলো। বঙ্গভঙ্গ পরিকল্পনা সরকার ধরে রাখতে পারল না। কলকাতার হিন্দু সমাজপতি রাজনীতিবিদদের চাপে সরকার পিছু হটল। ফজলুল হকও ১৯১১ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে কলকাতা হাইকোর্টে যোগদান করেন এবং একই সঙ্গে রাজনীতিকে ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেন। ১৯১২ সালে প্রাদেশিক মুসলিম লীগে যোগদান করে সরাসরি রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করেন। ফজলুল হক ঢাকার নবাব রাজনীতিবিদ সলিমুল্লাহর নেতৃত্বে সাক্ষাৎ করেন ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জের সঙ্গে। এবার তাদের দাবি পূর্ব বাংলার জন্য ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা। ১৯১৫ সালে সলিমুল্লাহ মারা যান। ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আন্দোলন পরিচালনার ভার পড়ে ধনবাড়ীর নওয়াব সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী কে ফজলুল হকের সঙ্গে। দুজনই পূর্ব বাংলার স্বার্থ আদায়ের বিষয়ে সর্বদাই সোচ্চার ছিলেন। এবারও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াল ইংরেজ সরকার নয়, বরং প্রতিবেশী ধনী এলিট উচ্চবর্ণের হিন্দু নেতারা। নওয়াব সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী এবং ফজলুল হকের কর্মপ্রচেষ্টার সফলতা আসে ১৯২১ সালে। কাঙ্ক্ষিত ঢাকা বিশ্ববিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে পূর্ব বাংলায় একটি মধ্যবিত্ত শ্রেণীর আত্মবিকাশ ঘটে। জাগ্রত মধ্যবিত্ত শ্রেণীটিই ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদের ঢেউ তোলে।

তৃতীয় ধারার রাজনীতি: নিখিল বঙ্গ প্রজা সমিতি থেকেকৃষক প্রজা পার্টি

যে কৃষক প্রজাকুলের মুক্তির পণ নিয়ে বাংলার উদীয়মান নেতা কে ফজলুল হক রাজনৈতিক মঞ্চে আবির্ভূত হলেন, তাকে কংগ্রেস কিংবা নবাব জমিদারদের সংগঠন মুসলিম লীগ ধরে রাখতে পারল না। ১৯২৭ সালে প্রতিষ্ঠা করেন তৃতীয় ধারার সংগঠন নিখিল বঙ্গ প্রজা সমিতি। শক্তিশালী জনপ্রিয় দুটি রাজনৈতিক দলের বাইরে গিয়ে এককভাবে তৃতীয় ধারা সৃষ্টি করা ছিল এক দুরূহ রাজনৈতিক কর্ম। বাংলাদেশের চলমান রাজনীতির দুই ধারার শক্তিশালী রাজনৈতিক বলয় থেকে তৃতীয় ধারা সফল না হওয়ার বিষয়টি থেকে তা সহজেই আন্দাজ করা যায়। কিন্তু ফজলুল হক তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা এবং সততাবলে বাংলার রাজনীতিতে একক হয়ে ওঠেন।

কীভাবে হয়েছিল কৃষক প্রজা আন্দোলনের সূচনাপর্বটি?

বিশ শতকের গোড়ায় শিক্ষার প্রসার, কিছু উদার প্রগতিশীল যুবকের উত্থানের ফলে বাংলার মুসলমানদের মধ্যে রাজনৈতিক এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি পাচ্ছিল। প্রেক্ষাপটে ফজলুল হক সাধারণ পরিবার থেকে আসা শিক্ষিত যুবক হিসেবে ১৯১৩ সালে বাংলার আইন পরিষদের নির্বাচিত নেতা হন। সে সময় থেকেই গ্রাম্য মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তান হওয়ায় তিনি আইন পরিষদে কৃষকদের দাবি-দাওয়ার বিষয়টি তুলতে লাগলেন। ১৯১৩ সালের নির্বাচন প্রচারণা থেকেই ফজলুল হক নিজেকে একজন কৃষক বলে দাবি করে কৃষক অধিকার সংরক্ষণে বিশেষ কর্মসূচি হাতে নিতে দেখা যায়। সময় প্রজা আন্দোলন বেশ জোরদার হচ্ছিল। হিন্দু-মুসলিম উভয় ক্ষেত্রেই জমিদাররা ছিলেন ব্রিটিশ অনুগত রাজনীতিবিদ। অবস্থায় ফজলুল হক কৃষক প্রজা আন্দোলন দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। ১৯১৪ সালে জামালপুরের কামারচর অঞ্চলে তার নেতৃত্বে বিশাল এক কৃষক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সম্ভবত কৃষক প্রজা সভাই ছিল প্রথম কোনো কৃষক প্রজার রাজনৈতিক সমাবেশ। আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে ফজলুল হকের নিজ জেলা বাকেরগঞ্জের কৃষক প্রজাদের মধ্যে। ১৯১৫ সালে তিনি তার নিজ জেলায় হিন্দু-মুসলমান কৃষক প্রজাকে সমবেত করে বেশ কয়েকটি জনসমাবেশ করেন।

সমাবেশ থেকে তিনি অনুধাবন করতে পারেন, কৃষক অধিকার আন্দোলন জোরদার করতে হলে একটি সংগঠন তৈরি করা প্রয়োজন। ভাবনা থেকে তিনি কয়েকজন আইনজীবী সচেতন নব্য শিক্ষিত যুবক নিয়ে প্রথম গড়ে তোলেনক্যালকাটা এগ্রিকালচারাল এসোসিয়েশন সংগঠনের পরিধি বিস্তার সীমিত পরিসরে হলেও পরবর্তী সময়ে তিরিশ-চল্লিশের দশকে কৃষক প্রজা সংগঠন প্রতিষ্ঠার অগ্রদূত হিসেবে বিশেষ ভূমিকা পালন করে।ক্যালকাটা এগ্রিকালচারাল এসোসিয়েশন’-এর সূত্র ধরে ১৯২১ সালে তৎকালীন বাকেরগঞ্জ জেলার গৌরনদীর আগৈলঝাড়া গ্রামে প্রজা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে স্থানীয় কৃষক প্রজার ব্যাপক সমাবেশ ঘটে। কংগ্রেস কিংবা মুসলিম লীগের সমাবেশে কেবল হিন্দু কিংবা মুসলমানের সম্প্রদায় বিশেষের সমাগম ঘটে। কিন্তু ফজলুল হকের কৃষক সমাবেশের বড় বৈশিষ্ট্য ছিল তিনি হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের সাধারণ মানুষকে এক করেছিলেন। এসব সমাবেশে জমিদার, জোতদার, মহাজনের অত্যাচারের বৈশিষ্ট্য-চিত্র বক্তৃতা প্রচারপত্রের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়। কৃষকের মুখপত্র হিসেবে কলকাতায় প্রতিষ্ঠা করেন নবযুগ পত্রিকা (১৯২১) পত্রিকায় যুক্ত হন দুই উদীয়মান বাঙালি তরুণ। একজন বর্ধমান থেকে আসা কবি নজরুল ইসলাম, অন্যজন নোয়াখালীর সন্দ্বীপ থেকে আসা মুজফ্ফর আহমদ। পরবর্তী সময়ে তিনজন বাঙালির রাজনীতি সাহিত্য-সংস্কৃতির ময়দানে উজ্জ্বল তারকা হয়ে ওঠেন। সময় রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে ১৯২৫ সালে চিত্তরঞ্জন দাসের অকালমৃত্যু ঘটলে তার নেতৃত্বে ১৯২৩ সালে সম্পাদিত হিন্দু-মুসলিম মিলিত চুক্তি বেঙ্গল প্যাক্ট কংগ্রেসের হিন্দু নেতারা অস্বীকার করে বসেন। চুক্তির উদ্দেশ্য ছিল বাংলার হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে যুগ-যুগান্তরে সৃষ্ট বৈষম্য ভেদাভেদ হ্রাস করা। ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে ফজলুল হক কৃষক প্রজার মুক্তির কল্যাণেবেঙ্গল কাউন্সিল প্রজা পার্টিগঠন করেন। ঘটনাটি ঘটেছিল ১৯২৯ সালের মধ্যভাগে। সংগঠনের সূত্র ধরে আসেনিখিল বঙ্গ প্রজা সমিতি স্যার আবদুর রহিম এবং কে ফজলুল হক হন সমিতির সভাপতি সহসভাপতি। খুব অল্প সময়ে উভয় বাংলায় সংগঠনের প্রজা সমিতি শাখা গড়ে ওঠে। প্রতি জেলায় উদীয়মান যুবক সচেতন ব্যক্তিরা এর নেতৃত্বে সমবেত হয়। কয়েক বছর পর সংগঠনের নামে পরিবর্তন আসে। ১৯৩৬ সালে প্রজা সমিতির বার্ষিক সভায় ফজলুল হকের নেতৃত্বেনিখিল কৃষক প্রজা সমিতি বদলেকৃষক প্রজা পার্টিনামকরণ করে বাংলার রাজনীতিতে নতুন করে তৃতীয় ধারায় আবির্ভূত হয়। সময়ের ব্যবধানে ততদিনে কৃষক প্রজা আন্দোলন বাংলার ঘরে ঘরে রাজনৈতিকভাবে বেশ সচেতন জোরদার হয়ে ওঠে।

১৯৩৭ সালের নির্বাচন ১৪ দফা ইশতেহার ঘোষণা

১৯৩৫ সালে ভারত শাসন আইনে ১৯৩৭ সালে ইংরেজ সরকার প্রাদেশিক নির্বাচনের আয়োজন করে। নির্বাচনের বড় বৈশিষ্ট্য ছিল, ১৯৩৫ সালের আইনে সরকার ভোটাধিকার প্রয়োগের যোগ্যতা শিথিল করে বিপুলসংখ্যক কৃষক প্রজা ভোটাধিকারের আওতায় আসে। এবার রাজনৈতিক নির্বাচনী প্রতিষ্ঠার খেলা।কৃষক প্রজা পার্টিদুটি রাজনৈতিক দলকে মোকাবেলার প্রস্তুতি নিয়ে মাঠে নামে। কংগ্রেস হিন্দুর প্রতিনিধিত্ব করে, আর মুসলিম লীগ মুসলমানের। আবার উভয় সংগঠনই সর্বভারতীয়। বাংলা বাঙালির মনের কথা কেউ বলে না। গ্রামীণ জনপদ চাখার থেকে যাওয়া ফজলুল হক বাংলার মানুষের অভিযোগের জায়গাটা ধরতে পারলেন। কৃষক প্রজা পার্টি অসাম্প্রদায়িক চরিত্র নিয়ে হাজির হয় বাংলার হিন্দু মুসলমান কৃষক প্রজার কাছে। আবার প্রতিষ্ঠান বাংলার উদীয়মান মুসলিম মধ্যবিত্তের প্রথম রাজনৈতিক সংগঠনও হয়ে ওঠে। মুসলিম লীগ তখন পর্যন্ত অবাঙালি এবং নবাব-জমিদারদের রাজনৈতিক আশ্রয়স্থল ছিল। মুসলিম লীগ বাংলার মুসলিম জনতার কাছে জনপ্রিয় সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হয়ে ওঠে চল্লিশের দশকে যখন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং আবুল হাশিম প্রমুখ এর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ততদিনে দলটি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে জড়িয়ে প্রবল জনমত গড়ে তুলেছিল।

যা হোক ফজলুল হকের কৃষক প্রজা পার্টি নিপীড়িত কৃষক প্রজার দল হয়ে ওঠে সহসাই। দলটির প্রথম দাবি ছিল, কোনো ক্ষতিপূরণ ছাড়াই কৃষকের মৃত্যুফাঁস কুখ্যাত জমিদারি প্রথা বাতিল করতে হবে। তিনি কৃষক প্রজা পার্টির পক্ষ থেকে ১৪ দফা ইশতেহার ঘোষণা করেন। ইশতেহারে যেসব দাবি ছিল তাতে দেখা যায়, জমিদারি ব্যবস্থা বাতিল বা উচ্ছেদ, জমির মালিকানা পরিবর্তনের স্বীকৃতি, নজর সেলামি নামে এক ধরনের করপ্রথা বাতিল, ঋণ সালিশি বোর্ড গঠন করে কৃষকদের ওপর বিশাল ঋণের বোঝা থেকে মুক্ত পাটের ন্যায্য নাম নির্ধারণ করা। ছিল কৃষক প্রজার এক মুক্তির সনদ। বাংলার কংগ্রেস কিংবা মুসলিম লীগ এরূপ জনবান্ধব নির্বাচনী ইশতেহার দিতে পারেনি। দুটি দলে যুক্ত নেতাদের শ্রেণী-অবস্থানের কারণেই ভোটের মূল স্রোত কৃষকের মনের কথা মাঠে-ময়দানে উচ্চারিত হয়নি। এছাড়া আরো কটি দফা জনগণকে আকৃষ্ট করেছিল। শিক্ষা স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ব্যাপারে বলা হয়, প্রাথমিক শিক্ষা হবে অবৈতনিক বাধ্যতামূলক, আর প্রতি থানায় প্রতিষ্ঠিত করা হবে একটি হাসপাতাল। ১০ নং দফাটি যদিও যুগের অগ্রবর্তী ছিল, তবু পরবর্তী রাজনীতির জন্য ছিল একটি দিকনির্দেশনা। তাহলো বাংলায় সম্পূর্ণরূপে স্বশাসিত সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার দাবি। আমরা জানি, ১৯৪৭ সালের পর পাকিস্তান পর্বে বাংলার রাজনীতির অন্যতম দাবি হয়ে উঠেছিল বাংলার পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা। ধারায়ই ১৯৪০ সালে লাহোরে মুসলিম লীগের বার্ষিক অধিবেশনে শেরেবাংলা ভবিষ্যৎ পাকিস্তানের জন্য যে শাসনতান্ত্রিক রূপরেখা ঘোষণা করেন, সেখানে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের ব্যবস্থা ঘোষণা করা হয়। দাবি ১৯৫৪ সালে প্রাদেশিক নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের ২১ দফার অন্যতম হয়ে ওঠে। আর ১৯৬৬ সালে ছয় দফার প্রথম দফাই হয়ে দাঁড়ায় লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন, যার ভিত্তি ধরেই ১৯৭০ সালের নির্বাচনী বৈতরণীতে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। ১৯৩৭ সালের শেরেবাংলার ১৪ দফা থেকে ১৯৭০ সালে বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা।  শেরেবাংলা থেকে বঙ্গবন্ধু, অতঃপর স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়।

১৯৩৭ সালের নির্বাচনের সময়ে ফজলুল হক হয়ে ওঠেন বাঙালি জাতীয়তাবাদী নেতা। নির্বাচনে রাজনৈতিক স্লোগান ওঠে, ‘লাঙ্গল যার জমি তার, ঘাম যার দাম তার ফজলুল হক হয়ে ওঠেন জনগণেরহক সাহেব বাংলাদেশের শতকরা ৮৫ ভাগ মানুষই কৃষক। আর অধিকাংশই বাঙালি মুসলমান। তবু হক সাহেব ঘোষণা করেন— ‘কৃষক আন্দোলন শুধু কৃষকদেরই আন্দোলন, কৃষকেরা কোন ধর্মাবলম্বী তা আমাদের জানবার বিষয় নয়।’  জনগণ ১৯৩৭ সালের নির্বাচনে কৃষক প্রজা পার্টিকে বেছে নেয়। প্রভাবশালী জমিদার কুলীন নব্য শিক্ষিত নেতাকে ধরাশায়ী করে কৃষক প্রজা পার্টি সদস্যরা বিজয়ী হয়। নির্বাচনে বরিশাল পটুয়াখালী আসনে একটি আকর্ষণীয় ঘটনা ঘটে। রাজনৈতিক ইতিহাসে সে সময় ঘটনাটি জব্বর আলোচিত বিষয় ছিল। ঘটনাটি হলো কে ফজলুল হক বরিশালের নিজের আসন ছাড়াও চ্যালেঞ্জ জানিয়ে পটুয়াখালীর একটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। আসনের মুসলিম লীগের প্রার্থী ছিলেন প্রভাবশালী নেতা ঢাকার নবাব পরিবারের সদস্য স্যার খাজা নাজিমউদ্দীন। এটি ছিল খাজা পরিবারের জমিদারি এলাকা আসন থেকে তিনি আগেও দুবার নির্বাচিত হয়েছিলেন। ফজলুল হক তার ভাষণে চমৎকার গল্প করতে পারতেন। মানুষের মনের ভাষা বুঝতেন। পটুয়াখালী জনসভায় তিনি হাজির হলেন ধুতি শার্ট আর মাথায় রুমি টুপি পরে। মঞ্চে দাঁড়িয়ে প্রথমেই বললেন, ‘ভাইয়েরা, মাত্র চারটি যুদ্ধের কথা আমি আপনাদের সামনে আজ বলব, প্রথম যুদ্ধ হয়েছে রয়-রয়, দ্বিতীয় যুদ্ধ হয়েছে কয়-কয়, তৃতীয় যুদ্ধ হয়েছে গয়-গয়, আর এবার যুদ্ধ হবে হয়-নয়।তারপর উত্সুক জনতা কথার মানে জানতে চাইল। তিনি ব্যাখ্যা করলেন, প্রথম যুদ্ধ রাম-রাবণে, দ্বিতীয় যুদ্ধ কংস কৃষ্ণের, তৃতীয় যুদ্ধ গান্ধী আর গভর্নমেন্টে, আর এবার হবে হক-নাজিমউদ্দীনে।জনতা হো হো করে হেসে উঠলেন। - যুদ্ধে সবাইকে অবাক করে দিয়ে খাজার পটুয়াখালীর কৃষক প্রজারা তাদের হক সাহেবকেই ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করে। সবার হক সাহেব বরিশালে নিজের আসন থেকেও বিজয়ী হন। তিনিই বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রতিভূ শেরেবাংলা কে ফজলুল হক। হক সাহেব ১৯৩৭ সালে প্রথম সংসদীয় গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা করেন। কলকাতার রাইটার্স বিল্ডিং থেকে সরকার পরিচালনা করেন। ফজলুল হক সরকারের আমলেই বাংলাদেশে মুসলিম মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিকাশের পথ উন্মুক্ত হয়। কারণ হিন্দু কিছু প্রতিক্রিয়াশীল মধ্যবিত্ত এবং জমিদার মহাজনের প্রভাবে বাঙালি মুসলমানের দাঁড়ানোর কোনো সুযোগ ছিল না। কৃষকের মুক্তি কল্যাণে ১৯৩৮ সালে ঋণ সালিশি বোর্ড, ১৯৩৯ সালে প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৪০ সালে মহাজনি আইন তৈরি হয় হক সাহেবের একক নেতৃত্বে। সে কারণে বাঙালি কৃষক প্রজা কখনো তাদের প্রিয় হক সাহেবকে ভুলতে পারেনি। বিশ-চল্লিশ দশকের বাংলার হিন্দু-মুসলমান সমাজ রাজনীতির ব্যবধান রেখার বাস্তব অবস্থা অনুধাবন করতে পারলে ফজলুল হকের সে সময়ের ভূমিকা মূল্যায়ন সহজ হবে।

চল্লিশের দশকে কৃষক প্রজার নেতা ফজলুল হক হয়ে ওঠেন শেরেবাংলা, বাংলার বাঘ। রাজনীতির বাস্তবতা তাকে ঠেলে দেয় মুসলিম লীগের দিকে। যোগদান করেন অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগের ২৭তম বার্ষিক অধিবেশনে। মঞ্চে হাজার হাজার জনতার ধ্বনি দিয়ে ওঠেন—‘শের বাঙ্গাল, জিন্দাবাদ!’ মঞ্চে বক্তৃতারত লীগের সভাপতি মুহম্মদ আলী জিন্নাহ তার বক্তৃতা বন্ধ রাখতে বাধ্য হন কিছু সময়ের জন্য। ফজলুল হক আসন গ্রহণ করেন। মঞ্চে থেকে জিন্নাহ সাহেব বলেন, ‘বাঘকে খাঁচায় পোরা হয়েছে, এবার শান্ত হোন।’  লাহোরের অধিবেশনে হক সাহেব ভারতের ভবিষ্যৎ শাসনতান্ত্রিক রূপরেখা কী হবে তা মুসলিম লীগের পক্ষ থেকে ঘোষণা করেন। সেদিন ছিল ২৩ মার্চ। তিনি ঘোষণা করেন, ভারতের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত এলাকা ভারতের পূর্বাঞ্চল (আজকের বাংলাদেশ) নিয়ে গঠিত হবে আলাদা স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র। তার ভাষণে বাংলার বাস্তবতা চিন্তা করে ভবিষ্যৎ একটি রূপরেখাও প্রদান করা হয়। তিনি বলেন, স্বাধীন স্বতন্ত্র রাষ্ট্র বা অঞ্চল অবশ্যই সম্পূর্ণ স্বায়ত্তশাসিত এবং সার্বভৌম হবে। অর্থাৎ ঘোষণার মধ্যেইস্বাধীন বাংলাদেশেরভবিষ্যৎ রূপরেখা বিদ্যমান ছিল। কিন্তু প্রস্তাব অধিবেশনে গৃহীত হলেও লীগের সভাপতি মুহম্মদ আলী জিন্নাহ বাংলার নেতা শেরেবাংলার প্রভাব ভারতের পূর্বাঞ্চল নিয়ে আলাদা স্বাধীন দেশ গঠনের পরিকল্পনায় প্রমাদ গুনলেন। ছয় বছর পর দিল্লিতে মুসলিম লীগের পার্লামেন্টারি সদস্যদের অধিবেশন বসে। সেখানে জিন্নাহর চতুরতায় পশ্চিম-পূর্বাঞ্চল নিয়ে যে দুটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের কথা বলা হয়েছিল তা পরিবর্তন করে একটি মাত্র পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাব গৃহীত হয়। তার আগেই বাঙালি জাতীয়তাবাদী নেতা হক সাহেবের সঙ্গে জিন্নাহর চরম মতবিরোধ শুরু হয় ফজলুল হককে লীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়। জিন্নাহপন্থী গোষ্ঠীটি জানত শেরেবাংলাকে লীগ থেকে বহিষ্কার না করলে লাহোর প্রস্তাবের ওই অংশটি বাতিল করা যাবে না।

১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের আবির্ভাব। কিন্তু লাহোর প্রস্তাব আর বাস্তবায়ন হয়নি। দীর্ঘ ২৩ বছর বাঙালি লাহোর প্রস্তাব অনুযায়ী বাংলাদেশ স্বতন্ত্র রাষ্ট্র এবং পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন দাবিতে সংগ্রাম করেছে। দেখা যায়, ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট জোট যে ২১ দফা দাবিসংবলিত ইশতেহার ঘোষণা করে, সেখানে ১৯ নং দফায় বলা হয়, ‘লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে পূর্ববঙ্গকে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন সার্বভৌম করা হইবে।এক যুগ পর ১৯৬৬ সালে বাঙালির আরেক জাতীয়তাবাদী নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছয় দফা ঘোষণা করেন। বাঙালির মুক্তির সনদ ছয় দফার প্রথম দফাই ছিল লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন। শেরেবাংলা থেকে বঙ্গবন্ধু দীর্ঘ সংগ্রামের প্রবহমান স্রোতধারাই বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাস।

 

. মো. এমরান জাহান: অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

আরও