১৯৩৭-এর নির্বাচন

১৯৩৭-এর নির্বাচন নিয়ে যাদের বিশেষ অনুসন্ধিৎসা রয়েছে তাদের জন্য ১৯৭১ সালে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে গৃহীত ডেভিড ডেনিস টেলরের পিএইচডি অভিসন্দর্ভ ‘ইন্ডিয়ান পলিটিকস অ্যান্ড দি ইলেকশনস অব নাইন্টিন থার্টি সেভেন’ একটি স্মরণীয় পাঠ হতে পারে। অভিসন্দর্ভটির পিডিএফ সংস্করণ ইন্টারনেটে পাওয়া যায়।

১৯৩৭-এর নির্বাচন নিয়ে যাদের বিশেষ অনুসন্ধিৎসা রয়েছে তাদের জন্য ১৯৭১ সালে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে গৃহীত ডেভিড ডেনিস টেলরের পিএইচডি অভিসন্দর্ভ ‘ইন্ডিয়ান পলিটিকস অ্যান্ড দি ইলেকশনস অব নাইন্টিন থার্টি সেভেন’ একটি স্মরণীয় পাঠ হতে পারে। অভিসন্দর্ভটির পিডিএফ সংস্করণ ইন্টারনেটে পাওয়া যায়।

১৯৩৭-এর নির্বাচনের কথা লিখতে হলে এর উৎস ১৯৩৬ সালের ভারত শাসন আইন উঠে আসবেই। ১৯৩৬ সালে ভারত শাসন আইন ভারতের ইতিহাসে অন্যতম একটি মাইলফলক। এ আইন বাস্তবায়নের একটি প্রধান উদ্যোগ ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে সাধারণ নির্বাচন। বিভিন্ন কারণে বাংলার নির্বাচন ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে।

প্রেক্ষাপট

ভারতের বিংশ শতাব্দীর ইতিহাস হিন্দু-মুসলমান ঐক্যের ও সম্প্রীতির সাক্ষ্য কমই দেয়। লক্ষ্ণৌ প্যাক্ট সম্প্রীতির কিছু তত্ত্ব দিলেও বাস্তবতা ফুটে ওঠে কাজী নজরুল ইসলামের কবিতায়:

 

বদনা-গাড়ুতে গলাগলি করে নব-প্যাক্টের আশনাই,

মুসলমানের হাতে নাই ছুরি, হিন্দুর হাতে বাঁশ নাই।

 

এই হচ্ছে প্যাক্টের সামনের ছবি। কিন্তু পেছনেরটার ধরন ভিন্ন, সেখানে সম্প্রীতির লেশমাত্র নেই।

 

বাবু কন, ‘গরু কোরবানী করা ছেড়ে দাও যদি মিঞা ভাই,

তোরে সিনান করায়ে সিঁদুর পরায়ে মা’র মন্দিরে নিয়া যাই।’

মিঞা কন, ‘যদি আল্লা-মিঞার ঘরে নাহি লও হরিনাম,

বলদের সাথে ছাড়িব তোমারে, যাহা হয় হবে পরিণাম।’

‘সারা-রারা-রারা’ সহসা অদূরে উঠিল হোরির হররা!

শম্বু ছুটিল বম্বু তুলিয়া, ছকু মিয়া নিল ছোররা!

লাগিল হেঁচকা হেঁইয়ো হেঁইয়ো, টিকি দাড়ি ওড়ে শূন্যে-

ধর্মে ধর্মে করে কোলাকুলি নব-প্যাক্টেরই পুণ্যে।

 

যত প্যাক্টই হোক বাস্তবতা হচ্ছে হিন্দু-মুসলমানের প্রকৃত মিলন হয়নি। হয়নি যে তার বড় প্রমাণ ১৯৪৭-পূর্ব এবং পরবর্তী সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনের উৎসগুলো:

*   সায়মন কমিশন রিপোর্ট।

*   গোলটেবিল বৈঠকের সুপারিশনামা।

*   ১৯৩৩ সালে প্রকাশিত ব্রিটিশ সরকারের তৃতীয় গোলটেবিল বৈঠকভিত্তিক শ্বেতপত্র।

*   জয়েন্ট সিলেক্ট কমিটির প্রতিবেদন

১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনের বৈশিষ্ট্যগুলো জানা দরকার। প্রদেশগুলো নিয়ে অল ইন্ডিয়া ফেডারেশন গঠিত হবে, প্রদেশগুলো স্বায়ত্তশাসন ভোগ করবে, কেন্দ্রীয় সরকার ও প্রাদেশিক সরকারের ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব আইনের তফসিলভুক্ত তালিকা অনুযায়ী পরিচালিত হবে, কেন্দ্রে দ্বৈত শাসন ব্যবস্থা বিলুপ্ত হবে, সাধারণ নির্বাচন হবে, জনসংখ্যাভিত্তিক আসন গঠিত হবে, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট পার্লামেন্ট সৃষ্টি হবে, সম্প্রদায়গত রোয়েদাদ সংরক্ষিত থাকবে, প্রদেশগুলো পুনর্গঠিত হবে, প্রত্যক্ষ ভোটের নিশ্চয়তা দেয়া হবে, ভোটাধিকার বণ্টিত হবে। আইনটি মুসলমান ও তফসিলভুক্ত হিন্দু সম্প্রদায়ের আসনসংখ্যা বৃদ্ধি করে। তবে তা যথেষ্ট সমালোচিতও হয়। জওহরলাল নেহরু মনে করেন, এটি বহুসংখ্যক ব্রেকযুক্ত একটি ইঞ্জিনবিহীন গাড়ি। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ গভর্নর জেনারেল ও গভর্নরের অপ্রতিহত ক্ষমতার প্রশ্নে মনে করেন, এটা অগ্রহণযোগ্য। কংগ্রেস একে বলে দাসত্ব সংবিধান যা ভারতের অর্থনৈতিক বন্দিদশা আরো বাড়িয়ে তুলবে। মুসলমান ও নিম্নবর্ণ হিন্দুর প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধির সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় বর্ণ হিন্দু সম্প্রদায় একে ব্যর্থ বলে অভিহিত করে।

১৯৩৫-এ ভারত শাসন আইনের অধীনে ১৯২১-৩৬ পর্যন্ত গভর্নরের অধীনে চারটি মন্ত্রিসভা দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিল। এ সময়ের চারজন গভর্নর হচ্ছেন আর্ল অব রোনাল্ডশে (১৯১৭-২২), আর্ল অব লিটন (১৯২২-২৭), স্যার ফ্রান্সিস স্ট্যানলি জ্যাকসচ (১৯২৭-৩২) ও স্যার জন অ্যান্ডারসন (১৯৩২-৩৭)।

প্রথম মন্ত্রিসভার (১৯২২-২৪) সদস্য ছিলেন সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি, পিসি মিত্র ও সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী।

দ্বিতীয় মন্ত্রিসভা (১৯২৪-২৭) কয়েকবার পরিবর্ধিত হয়। দুটি সভায় এ কে ফজলুল হক মন্ত্রী ছিলেন। অন্যরা হচ্ছেন এসএন মল্লিক এবং এ কে গজনবী ও রাজা মন্মথ রায় চৌধুরী।

তৃতীয় মন্ত্রিসভার (১৯২৭-১৯২৯) সদস্য ছিলেন স্যার আবদুর রহিম, বি চক্রবর্তী, একে গজনবী, পিসি মিত্র, নওয়াব মুশাররফ হোসেন ও রাজা ভূপেন্দ্র নারায়ণ সিংহ বাহাদুর।

চতুর্থ মন্ত্রিসভায় (১৯২৯-৩৬) ছিলেন কুমার শিব শেখরেশ্বর রায়, কেজিএম ফারুকী, খাজা নাজিমুদ্দিন, বিজয় প্রসাদ সিং ও খান বাহাদুর আজিজুল হক।

এতদিন নাম ছিল বেঙ্গল লেজিসলেটিভ কাউন্সিল, ১৯৩৭ থেকে বেঙ্গল লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলি।

১৯৩৭-এর নির্বাচন

ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে ১৮ জানুয়ারি থেকে ২০ ফেব্রুয়ারির মধ্যে নির্বচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেয়া হলো। বাংলায় নির্বাচনের তারিখ ১৮ থেকে ২৬ জানুয়ারি, আসামে ১৮ জানুয়ারি থেকে ৮ ফেব্রুয়ারি, বিহারে ২১ থেকে ২৮ জানুয়ারি ও উড়িষ্যায় ২০ থেকে ২৭ জানুয়ারি।

১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনে বাংলার জন্য বরাদ্দকৃত ২৫০ আসনের বণ্টন নিম্নরূপ:

সাধারণ আসন: ৭৬

মুসলমান আসন: ১১৭ (শহুরে ৬, গ্রামীণ ১১১)

অ্যাংলো ইন্ডিয়ান: ৩

ইউরোপিয়ান: ১১

ভারতীয় খ্রিস্টান: ২

বাণিজ্য, শিল্প, প্লান্টার্স প্রমুখ প্রতিনিধি: ১৯

জমিদার: ৫

শ্রমিক প্রতিনিধি: ৮

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান: ২ (কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ১, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ১)

নারী আসন: ৫ (সাধারণ ২, মুসলমান ২, অ্যাংলো ইন্ডিয়ান ১)

সাধারণ বিশ্লেষণে আসন বণ্টন এ ইঙ্গিত দেয়, মুসলমানরা যে দলের অনুসারীই হোক না কেন রাজনীতিতে ধর্মীয় ঐক্য ধরে রাখতে পারলে বাংলার শাসনক্ষমতা তাদের হাতেই থাকবে। এ আসন বরাদ্দ কলকাতাভিত্তিক হিন্দু রাজনীতিক নেতৃত্বের অখণ্ড বাংলা শাসনের স্বপ্ন ভেঙে দেয়।

১৯৩৭-এর নির্বাচনে বাংলায় অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলগুলো হচ্ছে কংগ্রেস, মুসলিম লীগ ও কৃষক প্রজা পার্টি। এছাড়া স্বতন্ত্র মুসলমান, স্বতন্ত্র হিন্দু, স্বতন্ত্র তফসিলি সম্প্রদায়, ইউরোপীয় ও অ্যাংলো ইন্ডিয়ান প্রার্থী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে।

নির্বাচন ধর্মীয় সম্প্রদায়কে সামনে নিয়ে আসে। তখনকার মুসলমানবিরোধী একটি কাব্য প্রচারণা জয়া চ্যাটার্জি বেঙ্গল ডিভাইডেড গ্রন্থে তুলে ধরেছেন:

 

দুঃখের কথা বলব কারে প্রাণে ধৈর্য্য মানে নারে,

         অপূর্ব্ব এক ঘটনা হয়েছেরে ভাই।

ময়মনসিংহ জেলার অধীনে কিশোরগঞ্জ এলাকাধীন

         ষাইট খানা গ্রাম লুটে নিয়েছেরে ভাই\

মুসলমানের অত্যাচারে বাড়ি ছেড়ে বনান্তরে

         কত লোক যে অনাহারে মরেছেরে ভাই।

মুসলমান দলে আসিয়া হিন্দুকে বলে,

       দলিলপত্র যাহা আছে দেও নিয়ে যাই\

বড়লোকের দালান-বাড়ী, গরিবের ভাতের হাঁড়ি

         চক্ষের সামনে যাহা পড়ে ছেড়ে কথা নাই।

                    (গানের বহি, লুটের গান)

 

এ কে ফজলুল হকের বিবৃতির অংশ: ‘যখন মনে করি বাংলার মোট মুসলমান জনসাধারণের নব্বইজনের অধিক দুস্থ মুসলমান চাষী এবং তাদের আর্থিক স্বার্থ আমাদের সর্বপ্রকার কার্যক্রমের প্রধান বিষয়বস্তু হওয়া কর্তব্য, তখন রাজনৈতিক অভিসন্ধিমূলক মুসলমান সংহতি মুসলিম একতার কলরব অসার অবাস্তব বলিয়া প্রতীয়মান হয়।’

নির্বাচনী ঘোষণায় তিনি বললেন, ‘আজ হতে জমিদার ও কৃষকদের মধ্যে একটি সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু হলো। ইনশাল্লাহ আমি অল্প সময়ের মধ্যে জমিদারি প্রথা বাতিল করব। বাংলার চার কোটি কৃষক মাথা উঁচু করে তাদের পায়ের ওপর শক্তভাবে দাঁড়াতে পারবে এবং তাদের সকল দাবিদাওয়া আদায় করবে। খোদা আমাদের সাথে আছেন এবং আমাদের জয় অনিবার্য। কিন্তু খোদা না করুন আমি যদি পরাজিত হই তাহলে এ পরাজয় নেপোলিয়ান বোনাপার্টের ওয়াটারলুর পরাজয়ের চেয়েও মহীয়ান হবে।’

মুসলিম লীগ সভাপতি মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে কড়া ভাষায় প্রত্যাখ্যান করে নির্বাচনের আগে ‘কৃষক প্রজা পার্টি’ গঠন করলেন। ১৯৩৭-এর নির্বাচনে তৃতীয় অবস্থানে থেকেও তার নেতৃত্বে সরকার গঠিত হলো, তিনি হলেন অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী। কংগ্রেস একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েও সরকার গঠন করার মতো পর্যাপ্ত আসনের সমর্থন প্রমাণ করতে পারেনি।


নির্বাচনের পর স্বতন্ত্র সদস্যদের দুটি দলে যোগ দেয়ায় মুসলিম লীগের আসন বেড়ে দাঁড়ায় ৬০ আর কৃষক প্রজা পার্টির ৫৮। অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব অনেকটা নিয়ন্ত্রণে এনে মন্ত্রিসভা গঠনের জন্য ফজলুল হক মুসলিম লীগের সঙ্গে আঁতাত করলেন এবং প্রকাশ্যেই ঘোষণা করলেন, ‘বাংলাকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে বাংলার মুসলমানকে আগে বাঁচাতে হবে। বাংলার মুসলমানকে বাঁচাবার জন্য মুসলিম লীগ ও কৃষক প্রজা সমিতি দুটোকে বাঁচাতে হবে। আমাকেই দুটোর সভাপতি থাকতে হবে।...মুসলিম লীগকে আমি খাজা-গজা-নবাব-সুবার হাতে ছেড়ে দিতে পারিনি। ঠিক তেমনি কৃষক প্রজা সমিতিকে আমি কংগ্রেসের হাতে তুলে দিতে পারি না।’

এ কে ফজলুল হকের মন্ত্রিপরিষদ:

এ কে ফজলুল হক, কৃষক প্রজা সমিতি, প্রধানমন্ত্রী

খাজা নাজিমউদ্দিন, মুসলিম লীগ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মুসলিম লীগ, বাণিজ্যমন্ত্রী

নবাব হাবিবুল্লাহ, মুসলিম লীগ, কৃষি ও শিল্পমন্ত্রী

সৈয়দ নওশের আলী, কৃষক প্রজা সমিতি, স্বাস্থ্য ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী

নবাব কাজী মোশাররফ হোসেন, কৃষক প্রজা সমিতি, বিচার ও আইনমন্ত্রী

নলিনীরঞ্জন সরকার, বর্ণ হিন্দু, অর্থমন্ত্রী

মহারাজা শিরীষ নন্দী, পূর্তমন্ত্রী

মুকুন্দবিহারী মল্লিক, তফসিলি, সমবায় ও কৃষিঋণ মন্ত্রী

প্রসন্ন দেব রায়, তফসিলি, বন ও আবগারি মন্ত্রী।

অনাস্থা: অনেক প্রগতিশীল কর্মসূচি গ্রহণ করার পরও তার নিজ দলেরই ২৮ জন সদস্য তার বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনেন। কংগ্রেস সমর্থন করে তবে তার ভোটাধিক্যের (১৩০-১১১) কারণে প্রস্তাবটি পাস হয়নি। তবে প্রতিকূলতা তিনি কাটিয়ে উঠতে পারেননি। বিশেষ করে জিন্নাহর সঙ্গে তার বিরোধ তুঙ্গে উঠলে তাকে মুসলিম লীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়। জিন্নাহর অনুসারীরা তার বিপক্ষে চলে যায়। তার নেতৃত্বাধীন প্রথম মন্ত্রিসভার পতন ঘটে। দুর্যোগ কাটিয়ে উঠে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির সঙ্গে হাত মিলিয়ে মাত্র ১১ দিনের মাথায় তিনি দ্বিতীয়বার বাংলার প্রধানমন্ত্রী হলেন। প্রথমবার প্রধানমন্ত্রিত্বের মেয়াদ ১ এপ্রিল ১৯৩৭ থেকে ১ ডিসেম্বর ১৯৪১ (৪ বছর ২৪৪ দিন), দ্বিতীয়বার ১২ ডিসেম্বর ১৯৪১ থেকে ২৯ মার্চ ১৯৪৩। দ্বিতীয়বার তাকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। ফলে মন্ত্রিসভাও ভেঙে যায়।

প্রধানমন্ত্রীর বিদায়

আবুল কাশেম ফজলুল হক ১ এপ্রিল ১৯৩৭ থেকে ২৯ মার্চ ১৯৪৩ পর্যন্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। ১৯৪৩-এর ৫ জুলাই বেঙ্গল লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলিতে ‘প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে কেন পদত্যাগ করলাম’ শীর্ষক একটি দীর্ঘ ভাষণ দেন। তার টুকরো টুকরো অংশ কোলাজের মতো উপস্থাপন করছি। ফজলুল হকের ভাষান্তরিত ভাষণ সিরাজ উদ্দীন আহমেদের শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃত হয়েছে। উল্লেখ্য, Bengal Today নামে ১৯৪৪ সালে প্রকাশিত ফজলুল হকের ভাষণ সংকলন থেকে এগুলো গ্রহণ করা হয়েছে।

১. ১৯৪৩ সালের ২৩ মার্চ আমরা শেষবার বেঙ্গল লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলিতে মিলিত হয়েছিলাম এবং সে নিয়তিনির্দিষ্ট সকালে এক নাটকীয় অবস্থায় আমাদের বিদায় নিতে হয়েছিল। এ তিন মাস এক সপ্তাহের বিরতিকালে যে ঘটনা ঘটেছে তা শাসনতন্ত্রের মূল ভিত্তিতে আঘাত করেছে এবং প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের মিথ্যা অভিনয়ের মুখোশ খুলে দিয়েছে।

২.         স্যার জন হার্বার্ট (গভর্নর) অথবা শাসনতান্ত্রিক নাটকে তার সাথি অভিনেতারা, যাদের রহস্যময় ঘটনাবলি আমি আজ উন্মোচন করতে যাচ্ছি, তারা আমার কাছে কোনো রকম ক্ষমা পেতে পারেন না। ভারত যদি একটি স্বাধীন দেশ হতো এবং এ আইনসভা প্রকৃতপক্ষে সার্বভৌম সংসদ হতো তাহলে বহু আগে স্যার জন হার্বার্টকে শান্ত ভূখণ্ডে ফেরত নেয়া হতো। ভারতের একটি প্রধান প্রদেশের গভর্নর থাকার চেয়ে সেখানে তিনি তার প্রতিভা ভণ্ডামিপূর্ণ পেশায় ব্যয় করতে পারবেন।

৩.        আর মাত্র একদিন বাকি, ২৯ মার্চ আমরা বাজেটের ওপর ভোট দেব।

     ২৮ মার্চ সন্ধ্যা ৭টা ৩০ মিনিট, গভর্নরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য হঠাৎ তার কাছ থেকে পত্র পাই। গভর্নর হাউজে যখন যাই, তখন আমি খুব উত্ফুল্ল ছিলাম। কারণ আমি দেখলাম, আমার সহকারী ও সমর্থকরা আমাদের অপরাজেয় অবস্থা সম্পর্কে বিশ্বাসী। আমি যখন ৭টা ৩০ মিনিটে গভর্নরের সঙ্গে দেখা করি, আমি তাকে তার সচিবের সঙ্গে বসা অবস্থায় দেখলাম। যখন আলোচনা শুরু করি কক্ষে আমরা মাত্র তিনজন ছিলাম। কয়েক মিনিট আলোচনার পর গভর্নর আমার পদত্যাগপত্র দাবি করেন। আমি এ কাহিনী এতবার বলেছি, আমি মনে করি ঘটনার পুনরুল্লেখ করলে আইনসভায় বিরক্তি সৃষ্টি করবে। কিন্তু বর্ণনার ধারাবাহিকতার জন্য আমি সে চমকপ্রদ গল্পের পুনরুল্লেখ না করে পারি না।

     আমি বিনয়ের সঙ্গে ভীষণভাবে প্রতিবাদ করতাম; কিন্তু গভর্নর আমার পদত্যাগপত্র দাবি করে বসেন। কারণ আমি সর্বদলীয় সরকার গঠনের সুবিধার জন্য পদত্যাগ করতে প্রস্তুত, এ মর্মে আইনসভায় ভাষণ দিয়েছি। আমি বলেছিলাম এখনো সে অবস্থানে কঠোর আছি। কিন্তু সেটা কারণ হতে পারে না। সর্বদলীয় মন্ত্রিসভা গঠনের পরিবেশ সৃষ্টি হলে আমার পদত্যাগ করার কোনো কারণ নেই। কিন্তু তত্ক্ষণাৎ আমাকে পদত্যাগ করার জন্য তিনি অনমনীয় হয়ে ওঠেন এবং বিষয়টি সম্পন্ন করার জন্য গভর্নর পদত্যাগের একটি টাইপ করা পত্র উপস্থিত করেন।

     আমি তাকে ব্যাখ্যা করলাম, এ মুহূর্তে আমি পদত্যাগ করলে বাজেট মঞ্জুরি অসমাপ্ত থাকবে এবং অর্থ বিলের প্রতি চরম আঘাত হানা হবে; অধিকন্তু আমি সহকর্মী ও দলের সঙ্গে আলোচনার সময় চাইলাম। কিন্তু গভর্নর ছিলেন একগুঁয়ে এবং আমার অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেন। সেখানে এবং তখনই আমার পদত্যাগের জন্য তিনি অটল ছিলেন। আমি তবু বাধা দিচ্ছিলাম।

     তখন গভর্নর তার কৌশল কিছুটা পরিবর্তন করেন এবং নিশ্চয়তা দেন, তত্ক্ষণাৎ পদত্যাগ কার্যকর হবে না এবং এটা তিনি তার কাছে রেখে দেবেন। যদি সর্বদলীয় মন্ত্রিসভা গঠনের সম্ভাবনা দেখা দেয় তাহলে তিনি দলনেতাদের দেখাবেন। সর্বদলীয় মন্ত্রিসভা গঠন করা প্রয়োজন না হলে পদত্যাগপত্র কার্যকর হবে না—গভর্নর এ নিশ্চয়তা দিলে আমি পদত্যাপত্রে স্বাক্ষর করে তা গভর্নরকে প্রদান করি। আমি পুনরায় তাকে স্মরণ করিয়ে দিলাম, এ পত্রকে যেন পদত্যাগ হিসেবে গ্রহণ না করা হয় এবং কার্যকর করা হবে না যদি না সে রকম অবস্থার সৃষ্টি হয়। এ নিশ্চয়তা পেয়ে আমি পূর্বের খসড়া পত্রে স্বাক্ষর করি। কিন্তু আমি তা এখন গুরুত্বপূর্ণ মনে করি। আমি যেই মাত্র গভর্নরকে পদত্যাগপত্র দিলাম তখন তিনি তার সচিবের দিকে তাকালেন এবং ইউরোপীয় দলকে ফোনে কিছু বলার নির্দেশ দেন।

৪.         আমার স্বাক্ষর করার সঙ্গে সঙ্গে ইউরোপীয় দলের কাছে টেলিফোনে সংবাদ গেল। আমি বাসায় ফেরার দুই ঘণ্টার মধ্যে সেদিন আমার পদত্যাগপত্র গ্রহণের খবর প্রকাশ করা হলো।

৫.         ২৯ মার্চ ১৯৪৩ ফজলুল হক গভর্নর স্যার জন হার্বার্টকে লেখেন:

প্রিয় স্যার জন...

     আমি খুব ভোর থেকে সব ধরনের গুজব শুনছি। আমি গত রাতে আপনার সঙ্গে দেখা করেছি এবং সবাই মনে হয় জানেন, আমি পদত্যাগ করেছি এবং তা গৃহীত হয়েছে। যে মুহূর্তে আজ সকালে আমি আইনসভায় প্রবেশ করেছি আমাকে নির্দিষ্ট প্রশ্ন করা হলো—এ কথা সত্য কিনা, আমি পদত্যাগ করেছি ও তা গৃহীত হয়েছে। আপনি নিজেই চিন্তা করতে পারেন, আমি মিথ্যা বলতে পারি না এবং আইনসভায় আমাকে বলতে হয়েছে, পূর্বের খসড়া করা পদত্যাগপত্রে আমাকে স্বাক্ষর করতে হয়েছে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পদত্যাগপত্র গৃহীত হওয়ার পত্রও পাই।

৬.        চিঠিতে তিনি গভর্নরকে আরো লেখেন: দলীয় সভা চলছে এবং সর্বস্তর থেকে আমাকে প্রশ্ন করা হয়েছে আমি কেন পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করেছি এবং আমার দল ও সহকর্মীদের হেয়প্রতিপন্ন করার জন্য আমাকে দারুণভাবে কৈফিয়ত দিতে হচ্ছে। জোরালো বক্তৃতা দেয়া হয়েছে—আমি কেন দল ও সহকর্মীদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছি।

এমএ মোমেন: সাবেক সরকারি কর্মকর্তা

আরও