উদীচী-নানানেক-নরপতি-পাভৃতীকৃতাপ্রমেয় হয়বাহিনী-খরখুরোত্খাত-ধূলিধূসরিত দিগন্তরাল
প্রাচীন বাংলায় পাল রাজাদের তাম্রশাসনে তাদের সেনাবাহিনীর সামরিক আগ্রাসনের বর্ণনায় ওপরের শ্লোকটির বহুল ব্যবহার লক্ষণীয়। সৈন্যবাহিনী সম্পর্কে এমন বক্তব্য প্রশস্তি বাক্য হলেও তা সামরিক দক্ষতাসম্পন্ন একটি শক্তিশালী সৈন্যবাহিনীর বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য প্রদায়ক। কেননা ভারত বা বিশ্বের অন্যান্য প্রাচীন বা মধ্যযুগের অন্যান্য যেকোনো জায়গার মতো বাংলায়ও ক্ষমতার কেন্দ্রে পৌঁছানোর জন্য অন্যতম প্রধান উপাদান ছিল সামরিক বাহিনী। আলোচ্য প্রবন্ধে তাম্রলেখগুলোর আলোকে বাংলায় প্রায় ৪০০ বছর ধরে শাসন করা শাসক বংশ পালদের সৈন্যবাহিনী সম্পর্কে ইতিহাসবিদদের জ্ঞানকে পাঠকের সামনে তুলে ধরাই আমার উদ্দেশ্য। ইতিহাস রচনার পদ্ধতিগত দিক থেকে প্রবন্ধটি প্রাথমিক উৎস হিসেবে পাল আমলের ভূমিদানপট্টলী এবং এর ওপর ভিত্তি করে রচিত বিভিন্ন দ্বৈতয়িক উৎসের সমন্বয়ে লিখিত। পরবর্তী অংশে পাল শাসনামলে সেনাবাহিনীর গঠন, প্রকৃতি ও পদবিন্যাস প্রভৃতি বিষয়ে আলোকপাত করা হবে।
মাত্স্যন্যায়ের যুগ পেরিয়ে বাংলায় পাল শাসন প্রতিষ্ঠা করেন গোপাল। তার পূর্বপুরুষ হিসেবে বপ্যট ও দয়িতবিষ্ণুর নাম পাওয়া যায়, কিন্তু তারা কোনো রাজবংশের ছিলেন বলে তথ্য পাওয়া যায় না। ইতিহাসবিদ আবদুল মমিন চৌধুরী মনে করেন পালরা বা পাল বংশের প্রতিষ্ঠাতা গোপাল
প্রাকৃতজনের (Plabian)
অন্তর্ভুক্ত ছিলেন এবং গোপালের বাবা ছিলেন একজন সামরিক ব্যক্তি। গোপাল যে অরাজকতার অবসান ঘটিয়ে একটি স্থিতিশীল রাজ্য প্রতিষ্ঠা এবং বিশাল সেনাবাহিনী গড়ে তুলেছিলেন তার উল্লেখ পাওয়া যায় দেবপালের মুঙ্গের তাম্রলেখতে। এই তাম্রশাসনের ৩ নং শ্লোকে বলা হয় গোপাল ‘সমুদ্র পর্যন্ত পৃথিবী জয় করেছিলেন’। ‘যখন তার বিশাল সেনাবাহিনী চলাচল করে তখন আকাশে ধূলিকণার এমন স্তর সৃষ্টি হয় যার ওপর দিয়ে পাখিরা হাঁটতে পারে’। এ বক্তব্যে অবশ্যই অতিরঞ্জন রয়েছে, কিন্তু তার পরও গোপালের শক্তিশালী সেনাবাহিনীর অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়।
গোপালের পুত্র ধর্মপাল বংশের অন্যতম সফল সামরিক বিজেতা ছিলেন। খালিমপুর তাম্রশাসনের আটটি শ্লোকে ধর্মপালের বিজয়গাথা বর্ণনা করা হয়েছে। এই বিজয়গাথা প্রশস্তি বাক্য হলেও ১২ নং শ্লোকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক তথ্যের দিকে নির্দেশ করে। কিলহর্ণ ১২ নং শ্লোকটি অনুবাদ করেছেন এভাবে—
With a sign of his gracefully moved eyebrows he
installed the illustrious king of Kanyakubja, who readily was accepted by the
Bhoja, Matsya, Madra, Kuru, Yadu, Yavana, Avanti, Gandharaand Kira kings bowing
down respectfully with their diedems trembling, and for whom his own golden
coronation jar was lifted up by the delighted elders of Pancala.
বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ রমেশচন্দ্র মজুমদার লিখেছেন, ‘এই শ্লোকে যে সকল রাজ্যের উল্লেখ আছে, তাহাদের সকলেই কান্যকুব্জে আসিয়াছিলেন এবং যখন পঞ্চাল দেশের বয়োবৃদ্ধগণ ধর্মপালের মস্তকে স্বর্ণকলস হইতে পবিত্র জল ঢালিয়া তাঁহাকে কান্যকুব্জের রাজপদে অভিষেক করিতেছিলেন, সকলেই তখন নতশিরে “সাধু সাধু” বলিয়া এই কার্য অনুমোদন করিয়াছিলেন”। (বাংলা দেশের ইতিহাস, প্রাচীন যুগ, রমেশচন্দ্র মজুমদার)।
ধর্মপালের পর দেবপালের সময়ও পাল বংশের বিজয়াভিযান চলমান থাকে। দেবপাল সম্পর্কে মুঙ্গের তাম্রশাসনে ৩ নং শ্লোকে বলা হয় ‘তিনি সমুদ্র পর্য্যন্ত ধরণীমণ্ডল জয় করিবার পর, আর [যুদ্ধোদ্যমের] প্রয়োজন নাই বলিয়া মদমত্ত রণকুঞ্জরগণকে বন্ধন হইতে মুক্তিদান’ করেন। দেব পালের পর পাল রাজবংশের ক্ষমতা, শৌর্যবীর্য কমতে থাকে। দশম শতাব্দীর শেষভাগে মহীপাল শত্রুদের পরাজিত করে পিতৃরাজ্য পুনরুদ্ধার করার বর্ণনা পাওয়া যায় বাণগড় তাম্রশাসনে, কিন্তু তার সময়ে আভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ দেখা দেয়। রামপাল আভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ দমন করে জনকভূ বরেন্দ্র পুনরুদ্ধার করেন। তার পিতৃভূমি উদ্ধারের জন্য বিশাল সৈন্যবাহিনী নিয়ে যুদ্ধযাত্রার বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায় সন্ধ্যাকর নন্দীর রামচরিত কাব্যে। এবার আমাদের মূল আলোচনায় ফেরা যাক।
পাল সেনাবাহিনীতে পদাতিক, অশ্বারোহী ও হস্তীবাহিনী এই তিন ধরনের সৈন্য থাকত। এছাড়া নদীমাতৃক এলাকায় যুদ্ধবিগ্রহের জন্য রণতরী ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। খালিমপুর তাম্রশাসন থেকে প্রায় প্রতিটি তাম্রশাসনে পালদের রণতরীর নিয়মিত বর্ণনা পাওয়া যায়। খালিমপুর তাম্রশাসনের ১৩ নং শ্লোকে বলা হয়, “যেখানে ভাগীরথী-প্রবাহ প্রবর্ত্তমান নানাবিধ রণতরণী সেতুবন্ধ নিহিত শৈল শিখর শ্রেণীরূপে বিভ্রমের উৎপাদন করে থাকে”। পাল শাসনামলে সামরিক বাহিনীর এক অপরিহার্য উপাদান ছিল অশ্বারোহী বাহিনী। ধর্মপাল থেকে মদনপালের তাম্রশাসন পর্যন্ত প্রায় সবগুলো তাম্রশাসন থেকেই দেখা যায় অধীনস্থ শাসকরা পাল রাজাদের অশ্ব উপহার দিতেন এবং এই অশ্বের জোগান আসত উদীচী দেশ বা উত্তরাপথ থেকে। রণবীর চক্রবর্তী অলংকারিক প্রশস্তির আড়াল থেকে ঐতিহাসিক তথ্য হিসেবে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে পাল রাষ্ট্রের অশ্ববাহিনী মূলত উপমহাদেশের উত্তর-পশ্চিম অংশ থেকে আসা যুদ্ধাশ্বের ওপর নির্ভরশীল ছিল। (বাংলাদেশের ইতিহাস, আবদুল মমিন চৌধুরী সম্পাদিত)
পাল সৈন্যবাহিনীর অন্যতম উপাদান অংশ ছিল হস্তীবাহিনী, যাকে তাম্রশাসনে হয়বাহিনী বা গজবাহিনী আখ্যা দেয়া হয়েছে। দেবপালের মুঙ্গের তাম্রশাসনে ১৩ নং শ্লোকে বলা হয় “দিগ্বিজয়ের পরিক্রমায় এই রাজার হস্তীবাহিনী ভ্রমণ করতে করতে বিন্ধ্য পর্বতে উপস্থিত হয়ে পুনরায় তাদের বন্ধুদের দর্শন পেয়েছিল”। বাণগড় লিপিতেও হস্তীবাহিনীর কথা জানা যায়। মহীপাল যুদ্ধে তার সব বিপক্ষকে পরাজিত করে পিতৃরাজ্যের উদ্ধার সাধন করেছিলেন এবং এ যুদ্ধে তার হস্তীবাহিনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
পাল সেনাবাহিনীর শক্তি ও ক্ষমতার জানান দিতে প্রশস্তিকাররা বিভিন্ন ধরনের উপমার আশ্রয় গ্রহণ করেছেন। যেমন “সেনাভারাক্রান্ত বিচলিত পর্ব্বতমালা বক্রভাবপ্রাপ্ত হয়”, “সমুদ্রপর্যন্ত ধরণী মন্ডল জয় করেছেন”, “সেনাপদাঘাতোত্থিতধূলিপটলে ব্যাপ্ত হইয়া গগণমণ্ডলে দীর্ঘকালের জন্য বিহঙ্গমগণের পদচারণক্ষম হইত”, “রণকুঞ্জরগণ যখন গতিশীল পর্ব্বতমালার ন্যায় প্রচলিত হইত, তখন তদ্বারা আক্রান্ত হইয়া ধরণী যেন ধূলিরূপ ধারণ করিয়া নিরুপদ্রব আকাশ মণ্ডলের শরণাপন্ন হইতো”, “রণযাত্রা কালে, আকাশতল ধূলিপটলে যজ্ঞস্থলের অবস্থা প্রাপ্ত হইলে সূর্য্যাশ্বগণের পদবিন্যাস-শ্রম উপস্থিত হইত”। এই উপমাগুলো অবশ্যই প্রশস্তিকারদের দ্বারা অতিরঞ্জিত, কিন্তু এই অতিরঞ্জন বাদ দিলেও পালদের সুবিশাল সুবিন্যস্ত সৈন্যবাহিনীই পাল রাজবংশকে বিভিন্ন উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে বাংলায় ৪০০ বছর ধরে টিকিয়ে রেখেছিল।
পাল তাম্রশাসনগুলোয় শাসকদের বিজয় অভিযানগুলোর বর্ণনার পাশাপাশি সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের পরিচয়ও পাওয়া যায়। যেমন: সেনাপতি, দণ্ডশক্তি, দণ্ডপাশিক, দৈঃসাধনিক, হস্ত্যশ্বগেমাহিষ্যাজবিকাধ্যক্ষ, বলাধ্যক্ষ, সান্ধিবিগ্রহিক/মহাসান্ধিবিগ্রহিক ইত্যাদি। সান্ধিবিগ্রহিকের কাজ ছিল যুদ্ধ ও শান্তি সম্পর্কিত বিষয়গুলোর তত্ত্বাবধান করা, কিন্তু বিভিন্ন লেখমালায় সান্ধিবিগ্রহিক দানগ্রহীতার কাছে দূত হিসেবে আদেশনামা পৌঁছে দেয়ার দায়িত্বপালন করতে দেখা যায়। সমকালীন লেখমালা এবং সাহিত্যে যুদ্ধের যে বিশদ ও অলংকারিক বর্ণনা পাওয়া যায় তার সঙ্গে সামরিক বিভাগের এই পদাধিকারীদের তালিকাটি সংগতিপূর্ণ।
পাল শাসনামলের ভূমিদানগুলো মূলত রাজার সভাকবিদের দ্বারা লিখিত, ফলে এগুলোয় অতিমাত্রায় অতিশয়োক্তির প্রয়োগ দেখা যায়। এছাড়া সমসাময়িক অন্যান্য লিখিত সূত্রের অভাবে এসব বক্তব্য যাচাই করার সুযোগও একেবারেই সীমিত। ইতিহাস চর্চার ক্ষেত্রে প্রশস্তি কাব্যের সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় সামরিক বাহিনীর পরিচয়ে অতিশয়োক্তি স্বাভাবিক।
কাওছারা বেগম: সাবেক শিক্ষার্থী, ইতিহাস বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়