বরিশালের ভাষা

মনের ভাব প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম ভাষা। একমাত্র মানুষই সীমিতসংখ্যক অর্থবোধক শব্দ দিয়ে অসীম বাক্য নির্মাণের মাধ্যমে মনের ভাব প্রকাশ করতে সক্ষম। শব্দের সুষম বিন্যাসে বাক্য ও অর্থবোধক বাক্যের সমন্বয়ে ভাষার সৃষ্টি হয়। কিন্তু তা হলেও মনের ভাব প্রকাশে সব মানুষ একই ভাষায় নির্ভর নয়।

মনের ভাব প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম ভাষা। একমাত্র মানুষই সীমিতসংখ্যক অর্থবোধক শব্দ দিয়ে অসীম বাক্য নির্মাণের মাধ্যমে মনের ভাব প্রকাশ করতে সক্ষম। শব্দের সুষম বিন্যাসে বাক্য ও অর্থবোধক বাক্যের সমন্বয়ে ভাষার সৃষ্টি হয়। কিন্তু তা হলেও মনের ভাব প্রকাশে সব মানুষ একই ভাষায় নির্ভর নয়।

জাতি ও অঞ্চলভেদ ভাষার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। সে কারণে পৃথিবীর বিভিন্ন জাতিগুলোয় এবং দেশে ভিন্ন ভিন্ন ভাষা প্রচলিত। লোকভাষার সংজ্ঞা নির্ণয়ে বিভিন্ন বিতর্কের অবতারণা করা হয়েছে। এসব যুক্তিতর্ক পরিহার করে অতিসহজভাবে কোনো আঞ্চলিক ভাষার চলিত রূপকে সেই স্থানের লোকভাষা বলা যেতে পারে।

বৃহত্তর বরিশালের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রচলিত লোকভাষা, নানা বৈচিত্র্য আর বৈশিষ্ট্যসমৃদ্ধ।

এ এলাকার ভোলা অঞ্চল ছাড়া অন্যান্য এলাকায় ব্যবহূত চলিত অর্থাৎ লোকভাষার শব্দ ও উচ্চারণে সামান্য তারতম্য থাকলেও মূল কথ্যভাষায় সাযুজ্য পরিলক্ষিত। এখানকার লোকভাষার প্রধান প্রধান বৈশিষ্ট্য নিম্নে উল্লেখ করা হলো।

উচ্চারণ: এক. শব্দের আদিতে শ, ষ, ও স ধ্বনি হ রূপে উচ্চারিত হয়। যেমন শিয়াল > হিয়াল, শাক > হাক, শাপলা > হাপলা, শামুক > হামুক, সকল > হগল ইত্যাদি।

দুই. শব্দের আদিতে ক, ত এবং ফ ধ্বনি কখনো কখনো হ ধ্বনি রূপে উচ্চারিত হয়। যেমন কর কি > হর কি, তা কেন > হ্যা ক্যা, ফেলে দাও > হালাইয়া দ্যাও ইত্যাদি। কখনো কখনো শব্দের মধ্যবর্তী ক বর্ণও হ ধ্বনি রূপে উচ্চারিত হয়। যেমন আকাল > আহাল ইত্যাদি।

তিন. দুই বর্ণবিশিষ্ট শব্দের শেষে ট বা ঠ বর্ণ থাকলে তা ড ধ্বনি রূপে উচ্চারিত হয়। যেমন মিঠা > মিডা, পিঠা > পিডা, বেটা > ব্যাডা, সেটা > হেডা ইত্যাদি।

চার. শব্দের আদিতে হ বর্ণ থাকলে কখনো কখনো তা লোপ পায়। যেমন হাল > আল, হলো > অইল ইত্যাদি।

পাঁচ. বিশেষ্যের শেষে গো ধ্বনি যোগ করে বহুবচন গঠিত হয়। যেমন আমাদের > আমাগো, তোমাদের > তোমাগো, তাহাদের > হ্যাগো ইত্যাদি।

ছয়. কোনো কোনো ক্রিয়া না বোধক অর্থে ব্যবহূত হলে ক্রিয়ার অন্তে বুজি বা বোচন অনুসর্গ যুক্ত হয়। যেমন খেওনা > খাও বুজি বা খাও বোচন ইত্যাদি।

সাত. কখনো মূল ক্রিয়ার শেষে আনে অনুসর্গ ব্যবহূত হয়। যেমন করবো > করমু আনে, যাবো > যামু আনে, বলবো > বলমু আনে ইত্যাদি।

আট. কখনো কখনো মহাপ্রাণ ধ্বনি খ, ঘ, ছ এবং ঝ ইত্যাদি অঘোষ ধ্বনিতে পরিণত হয়। যেমন ঘর > গর, ভাত > বাত, ধান > দান ইত্যাদি।

নয়. কর্তৃকারক ভিন্ন অপরাপর কারক ও সম্বন্ধপদের বহুবচনে স্বরান্তিক শব্দে গো এবং ব্যঞ্জনান্তিক শব্দে এগা ব্যবহূত হয়। যেমন মোগো, পোলাগো, সায়েবেগো।

দশ. দ্বিতীয় বিভক্তি হিসেবে কে-এর পরিবর্তে সাধারণত রে ব্যবহূত হয়। যেমন সাধুকে > সাধুরে।

এগারো. ক্রিয়ারূপ সংক্ষিপ্ত হয়। যেমন বলিয়াছে > বলছে।

বারো. অসমাপিকা ক্রিয়ার ইয়া প্রত্যয় ধাতুর সঙ্গে যুক্ত না হয়ে স্বতন্ত্র সিলেবল রূপে উচ্চারিত হয়। যেমন মারিয়া > মার-ইয়া, করিয়া > কর-ইয়া।

তের. উত্তম পুরুষের ভবিষ্যৎ কালে ক্রিয়ার শেষে ব, ইব স্থলে মু হয়। যেমন যাইব > যামু, করব > করমু।

নিম্নে বরিশাল অঞ্চলের লোকভাষার ব্যবহূত কতিপয় শব্দের উল্লেখ করা হলো। বিভিন্ন বাক্যে ব্যবহূত এসব শব্দ, বৃহত্তর বরিশালের লোকভাষাকে চিহ্নিত করতে বিশেষ সহায়ক হবে।



আরও