বাংলাদেশের পুথিচিত্র

১.

পুথিতে বর্ণ থাকে, কখনো কখনো চিত্রও থাকে। সে চিত্র মনোহর, সে চিত্র ইতিহাস বয়ে বেড়ায়। প্রাচীন ও মধ্যযুগের পুথি কেবল কালো অক্ষরে লিখিত ছিল না, পুথির বিষয়কে সুন্দর, দৃষ্টিগ্রাহ্য করার জন্য তাতে চিত্র ও অলঙ্করণ থাকত। পুথিতে চিত্র কখনো বিক্ষিপ্তভাবে অঙ্কিত থাকত অথবা পরিকল্পিত পরিশীলিত চিত্রের আয়োজন থাকত। এ সৌন্দর্যবর্ধক চিত্রই কখনো পুথির প্রধান পরিচয় হয়ে উঠত। এমন চিত্রিত পুথির চিত্রধারাকে পুথিচিত্র বা (Manuscript Painting) বলা হয়। পুথির অলঙ্করণকে পৃথক রূপে দেখা ও বোঝার জন্য একটি বিশেষ শব্দ ইলিউমিনেশন (Illuminutation) ব্যবহার করা হয়। তবে ইলিউমিনেশন শব্দের সাথে পুথি-অলঙ্করণ ধারণাটি বেশি খাপ খায়, যেখানে স্বর্ণ বা রুপার জলে পুথির সৌন্দর্য বৃদ্ধি করা হয়। অনেকে আবার পুথির চিত্রকে মিনিয়েচার বলতে চান। কিন্তু মিনিয়েচারের সাথে বাংলার পুথিচিত্রের সাদৃশ্য রয়েছে, কিন্তু এক বলে সংজ্ঞায়িত করা ঠিক নয়। ‘মিনিয়েচার শব্দটি অষ্টাদশ শতাব্দীর এক ধরনের ক্ষুদ্র চিত্র সম্বন্ধে প্রযুক্ত হয়। সাধারণ মিনিয়েচারে ছবি ধাতু পালক বা হাতির দাঁতের ওপর খোদিত বা অঙ্কিত। সেই ক্ষুদ্র চিত্রগুলো পুথিচিত্র নয়। কিন্তু মিনিয়েচার বা অনুচিত্রণ নামটি পুথিচিত্রণ থেকেই এসেছে। কারণ পুথিতে বাক্যের আদি বর্ণটিকে স্পষ্ট করার জন্য যে লালচে ধরনের রঙ ব্যবহার করা হয়, তাকে বলা হয় মিনিয়াস। পাশ্চাত্যের মধ্যযুগের পুথিতে এ মিনিয়াসের প্রচুর ব্যবহার রয়েছে। পারস্যের ধ্রুপদী পুথি বা পাশ্চাত্যের মধ্যযুগের পুথিতে গ্রন্থিত চিত্রকে মিনিয়েচার বলা হয়। কিন্তু বাংলার পুথিচিত্র হলো পুথির লিপির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে অঙ্কিত চিত্র, স্বতন্ত্র কোনো পাতা পুথিতে গ্রন্থিত নয়। সহজ কথায়, পুথিচিত্র পুথিতে অঙ্কিত চিত্র, যা পুথির ভাষ্যকে মূর্তকরণ ও নান্দনিক করতে সহায়তা করত।

বাংলাদেশের পুথিচিত্রের অসাধারণ প্রধান তিনটি নমুনা হলো অষ্টসাহস্রিকা প্রজ্ঞাপারমিতার চিত্র, পদ্মপুরাণ বা মনসামঙ্গল পুথির চিত্র ও শাহনামা পুথির চিত্র। তিনটি পুথিচিত্রধারা তিন ধর্মীয় সংস্কৃতিকে উপস্থাপন করছে। শৈলীগত বিবেচনায়ও তিনটি পুথি তিনটি ভিন্ন ধরন প্রকাশ করছে।

২. পাল যুগের রীতির অষ্টসাহস্রিকা প্রজ্ঞাপারমিতা পুথিচিত্র

বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালের বড় একটি অংশ মিলে হাজার বছর আগের তান্ত্রিক বৌদ্ধ মতবাদের কেন্দ্রভূমি গঠিত, সামগ্রিকভাবে একে পূর্ব ভারত বলা যায়। ভারত ও তিব্বতি মতবাদের মিশ্রণে এ ধারা গঠিত। বৌদ্ধ চিত্রিত পুথিগুলোর মধ্যে রয়েছে অষ্টসাহস্রিকা প্রজ্ঞাপারমিতা, পঞ্চরক্ষা, রারণী গ্রন্থ, আর্য্যকারণ্ডব্যূহ আরো বহু তান্ত্রিক দেব-দেবী।

বাংলাদেশের চিত্রকলায় প্রজ্ঞাপারমিতা প্রাসঙ্গিক। কারণ এ অঞ্চলেই পাল যুগের স্থাপত্য নিদর্শন অধিক পরিমাণে পাওয়া যায়। সোমপুর বিহার থেকে ময়নামতি বিহার পূর্ববঙ্গে বৌদ্ধ ধর্মের শক্তিশালী ঐতিহ্য প্রকাশ করছে। বরেন্দ্র মিউজিয়ামে রক্ষিত অষ্টসাহস্রিকা প্রজ্ঞাপারমিতার বিষয় ও শৈলী বৃহত্তর হিমালয়ান চিত্রকলার অন্তর্ভুক্ত। বাংলাদেশের মাটিজাত এ পুথি এ কথা শক্ত অনুমানে বলায় যায়। হিমালয়ান চিত্রকলার রীতি বাংলাদেশের উত্তরাংশকে স্পর্শ করেছে, তা নিঃসংশয়ে বলা যায়।

অনেকের মনে হতে পারে, বৌদ্ধ পুথি প্রজ্ঞাপারমিতায় তান্ত্রিক দেব-দেবীর প্রাধান্য কেন? এ প্রশ্নের উত্তর কঠিন নয়। আসলে পূর্ব ভারতে মহাস্থান ক্রমে তান্ত্রিকযানে পরিবর্তিত হয়েছিল। এ উত্তর Areheaological Survey of India, 1948: XVIতে রয়েছে : A major school of manuscript illumination flourished in the Buddhist monasteries of eastern India. Bangladesh and Nepal during the reign of the (c. A.D. 800-1200). Who were ardent followers of Mahayana Buddhism. চর্যাপদে তান্ত্রিক সিদ্ধাবর্গ এর বড় প্রমাণ। সাধনায় তান্ত্রিকতা প্রবেশ করার ফলে পুথিতেও তান্ত্রিক চিহ্ন পড়বে, এটাই স্বাভাবিক। এ সম্পর্কে শিল্প সমালোচক অশোক ভট্টাচার্যের মতটি গুরুত্বপূর্ণ। ‘স্বাভাবিকভাবেই সাধকের ধ্যানের দেব-দেবী ক্রমে তন্ত্রযান-বজ যান-কালচক্রবাণীদের যত্নে আসন পেল সেইসব পুথির পাতায় যেগুলির পাঠ, আবৃত্তি ও পূজার্চনা মহাযান পরম্পরায় ছিল সিদ্ধির উপায়।’ এ বৈশিষ্ট্যটি প্রমাণ করে, প্রজ্ঞাপারমিতা পুথিটি উত্তর-পূর্ব ভারতের ঐতিহ্য, অর্থাত্ যেখানে বাংলা কেন্দ্রভূমি। বাংলার যে অংশ বিহার-নেপালের তরাই-ডুয়ার্সের অরণ্য, তারই উত্তরে ব্রহ্মপুত্র বিধৌত অঞ্চলে তিব্বতি সংস্কৃতির প্রভাব পড়েছে— এ তিন অঞ্চল বৌদ্ধ তান্ত্রিক মত ও পুথির কেন্দ্রভূমি হতে পারে। সেই সঙ্গে পূর্ববঙ্গের বৌদ্ধ স্থাপনার অঞ্চলও অন্তর্ভুক্ত হবে।

এ পুথিগুলোর কেন্দ্রে রয়েছে মহাযান-বজ যান ও তন্ত্রযান ধারার দেব-দেবী। প্রশ্ন উঠতে পারে, পুথির বিষয়ের সাথে চিত্রের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে কিনা, নাকি শুধু শোভাবর্ধনের জন্য চিত্রগুলো পুথিতে সংস্থিত করা হয়েছে। পাল যুগের চিত্রকলার বিশেষজ্ঞ সরস্বতীকুমার অবশ্য নিশ্চিত যে, পুথিচিত্রগুলোর সাধনার সহায়ক হিসেবেই অঙ্কিত হয়েছিল। পুথিতে চিত্রের উদ্দেশ্য স্পষ্ট, সাধন পদ্ধতির নির্দেশনা সহজকরণে দৃশ্যায়ন। শিল্প ও ইতিহাসবেত্তা মমতাজুর রহমান তরফদার বিষয়টি স্পষ্ট করে দিয়েছেন: ‘এই চিত্রগুলি একদিকে ছিল তান্ত্রিক সাধকদের ধর্মীয় সাধনার সহায়ক, অন্যদিকে আবার এগুলি ছিল তাঁদের আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার অভিব্যক্তি— তাঁদের আত্মিক ধ্যানধারণারই চিত্রিত রূপ।’ ফলে বলা যায়, পুথিচিত্র ও সাধনা একে অন্যের পরিপূরক বলেই পুথিতে ছবি অঙ্কিত হয়েছিল।

প্রজ্ঞাপারমিতা পুথি যে সময়ে অঙ্কিত হয়েছে সেটি পাল যুগ। বাংলা অঞ্চলের চিত্রকলার ইতিহাস বদলে যায় যখন সরসীকুমার সরস্বতী ‘পালযুগের চিত্রকলা’ শিরোনামে সচিত্র গ্রন্থ প্রকাশ করেন। গ্রন্থটিতে তিনি বৌদ্ধ চিত্রকলার বিশাল সম্ভার তুলে ধরেন। ‘অষ্টসাহস্রিকা প্রজ্ঞাপারমিতা’ পাণ্ডুলিপি বাংলাদেশ, ভারত ও ইউরোপ-আমেরিকার বিভিন্ন সংগ্রহশালায় রয়েছে। গবেষক আবুল মনসুর ও ইভা এলিঙ্গার পাণ্ডুলিপির একটি তালিকা তৈরি করেন। যেসব স্থানে অষ্টসাহস্রিকা প্রজ্ঞাপারমিতা রয়েছে সেগুলো হলো: কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগ্রার, পুথিটির সংগ্রহ নম্বর ১৪৬৪, পুথিটি মধ্য একাদশ শতাব্দীর বলে অনুমিত। ব্রিটিশ মিউজিয়ামে সংরক্ষিত একটি পাণ্ডুলিপি, যার সংগ্রহ নম্বর আর ৬৯০২, পুথিটি গোপাল দেবের রাজত্বের পঞ্চদশ বর্ষে অঙ্কিত বলে লিপিবদ্ধ রয়েছে। রয়্যাল এশিয়াটিক সোসাইটি অব বেঙ্গল দুটি পুথি রয়েছে। প্রথমটির সংগ্রহ নম্বর ৪৭১৩, এ পুথিটি মহীপাল দেবের রাজত্বের ষষ্ঠ বর্ষে অঙ্কিত। এশিয়াটিক সোসাইটি, কলকাতার দ্বিতীয় পুথিটি ১০৭১ সালে লিপিকৃত বলে অনুমান করা হয়। আরো একটি পাণ্ডুলিপি রয়েছে বোস্টন মিউজিয়মে, এ পাণ্ডুলিপিটির নম্বর ২০৫০৯ এবং এ পুথিটি গোপাল দেবের রাজত্বের চতুর্থ বর্ষে অঙ্কিত। অক্সফোর্ডের বদলিয়ান লাইব্রেরিতে একটি অষ্টসাহস্রিকা প্রজ্ঞাপারমিতা রয়েছে। বাংলাদেশে বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়াম, রাজশাহীর পুথিটি হরিবর্মাদেবের রাজত্বের একাদশ বর্ষে অঙ্কিত। এই সবগুলো পুথিই চিত্রিত। তবে ইভা এলিঙ্গার যে প্রজ্ঞাপারমিতা পুথির পাঁচটি সংগ্রহের একটি তালিকা দেন তাঁর প্রবন্ধে।

অষ্টসাহস্রিকা প্রজ্ঞাপারমিতা এমন একটি প্রাচীন পুথি, যাতে আট হাজার সংস্কৃত শ্লোক রয়েছে। এ শ্লোকগুলোর নিহিত ও বাহ্যিক উভয় অর্থ রয়েছে। প্রজ্ঞাপারমিতার অনুবাদক এডওয়ার্ড কোনজের মতে, খ্রিস্টপূর্ব ১০০ অব্দ ও ১০০ খ্রিস্টাব্দে রচিত হয়েছিল অষ্টসাহস্রিকা (৮০০০ পঙিক্ত)। বৌদ্ধ ধর্মের মহাযানপন্থীরা একে মান্য করেন। অভিধানে ‘প্রজ্ঞা’ মানে পারমার্থিক জ্ঞান ও ‘পারমিতা’ অর্থ পরম হওয়া বা পরিপূর্ণতা। প্রজ্ঞাপারমিতা অর্থ জ্ঞানের পরিপূর্ণতা, জ্ঞানের পরাকাষ্ঠা, (বৌদ্ধমতে) জ্ঞানের দেবী। এ গ্রন্থের শ্লোকগুলো প্রশ্নোত্তর আকারে মানে কথোপকথন হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে। এ কথোপকথনে প্রধান বক্তা বুদ্ধ নিজে ও তাঁর শিষ্য সারিপুত্র ও প্রশ্নকর্তা সুভূতি। এ প্রশ্নোত্তর শ্লোকের মাধ্যমে প্রধানত মহাযানী দার্শনিক তত্ত্ব ব্যাখ্যা করা হয়েছে। অর্থাত্ প্রজ্ঞাপারমিতা মূলত বৌদ্ধ ধর্মের মহাযান শাখার সূত্র-বিষয়ক আকর গ্রন্থ। এ গ্রন্থ সম্পর্কে গবেষক লিনার্ট মল মন্তব্য করেন: ‘the principle concept of the Astasahasrika is, without a doubt, prajnaparamita-a word that refers both to a text according to certain rules and to an aspect ot the highest state of mind... the Astashasrika becomes a text that functions as a teacher।’ অর্থাত্ আত্মিক শিক্ষাদানই প্রজ্ঞাপারমিতার মূল বক্তব্য।

মহাযানে পারমিতা ছয়টি, যথা: দান, শীল, ক্ষান্তি, বীর্য, ধ্যান ও প্রজ্ঞা। হীনযানেও পারমিতা রয়েছে, তবে সংখ্যায় ১০, তার মধ্যে প্রজ্ঞাও রয়েছে। অন্য পারমিতাগুলো হলো: দান, শীল, নৈষ্ক্রম্য, বীর্য, ক্ষান্তি, সত্য, অধিষ্ঠান, মৈত্রী ও উপেক্ষা। মহাযানমতে প্রথম পঞ্চপারমিতা পূর্ণ হলে পুণ্য অর্জিত হয় এবং প্রজ্ঞা দ্বারা সে পুণ পরিশোধ করা হলে জ্ঞান লাভ হয়। এ জ্ঞান দ্বারাই বোধিসত্ত বুদ্ধত্ব লাভে সমর্থ হন। এ প্রক্রিয়ার জন্যই প্রজ্ঞাপারমিতা। অষ্টসাহস্রিকা প্রজ্ঞাপারমিতার মূল বক্তব্য হলো, সংসারে সকল ধর্ম প্রতিবিম্ব মাত্র। এদের কোনো বাস্তব সত্তা নেই। এ গ্রন্থ ৩২টি পরিবর্তে বা অধ্যায়ে বিভক্ত। এতে বুদ্ধের সঙ্গে তাঁর শিষ্য সুভূতি, শারিপুত্র, পূর্ণ মৈত্রায়নীপুত্র শত্রু দেবরাজ পুত্র অথবা কখনো বোধিসত্ত্বের কথোপকথন লিপিবদ্ধ হয়েছে। গ্রন্থটিতে বীরদের মাতা হিসেবে বিমূর্তা প্রজ্ঞাপারমিতার গুণকীর্তন রয়েছে।

বরেন্দ্র জাদুঘরে দুটি অষ্টসাহস্রিকা প্রজ্ঞাপারমিতার পুথি রয়েছে। প্রথমটি লম্বাকৃতির বিরল পুথি। এ প্রজ্ঞাপারমিতা তালপাতার পুথিটিতে ফোলিও রয়েছে ১৯১টি, সম্পূর্ণ অবস্থায় রয়েছে পুথিটি। প্রত্যেক ফোলিওতে সাত লাইন রয়েছে। পুথিটি ২২ ইঞ্চি লম্বা ও প্রস্থে ২.১২৫ ইঞ্চি। এর ভাষা সংস্কৃত ও লিপি নাগরী (Nagara), লিপিকর শীলাদিত্যর (Siladitva) রচনাকাল রাজা হরিবর্মাদেবের সময়ে রচিত ও লিখিত, সে হিসাবে ১১-১২ শতক এর রচনাকাল। ২০১৬ সালের নভেম্বরে পর্যবেক্ষণে শেষে বলা যায়, পুথিটির অবস্থা এখনো ভালো। পূর্বে পুথিটি লম্ব-চতুর্ভুজাকৃতির ছিল। কিন্তু কালক্রমে এর কর্ণ ও প্রান্ত ক্ষয়ে ক্ষয়ে গোলাকৃতি ধারণ করেছে। প্রত্যেকটি ফোলিওর মধ্যে প্রায় এক বর্গইঞ্চি ফাঁকা স্থান রয়েছে। পুথিটি বাঁধার জন্য যে দড়ি ব্যবহূত হয়, সেজন্য এই ফাঁকা স্থান।

&dquote;&dquote;

অষ্টসাহস্রিকা প্রজ্ঞাপারমিতাটিতে৩২টি অধ্যায়ে আট হাজার চরণ রয়েছে। এর মাধ্যে এক-সপ্তমাংশ পদ্যে, বাকিটা গদ্যে লিখিত। এ পুথিটিতে ছয়টি বহুবর্ণিল চিত্র রয়েছে, যে চিত্রগুলো মূলত মহাযান ধারার দেব-দেবীদের মূর্ত করেছে। বরেন্দ্র জাদুঘরের সংস্কৃতি পুথি ক্যাটালগ প্রস্তুতকারী সচীন্দ্র নাথ সিদ্ধান্ত দেব-দেবীদের চিহ্নিত করেন। তার ভাষ্যে 1A ফোলিওতে চিত্রিত আছে অক্ষোভ্য, 2Aতে আছে স্ত্রী পীত প্রজ্ঞাপারমিতা। 90B ফোলিওতে অঙ্কিত আছেন পুরুষ বীরচনা, 91A ফোলিওতে অঙ্কিত আছে স্ত্রী অষ্টভুজা পীত মারিচী; 190B ফোলিওতে আছেন অমিতাভ, 191A ফোলিওতে মঞ্জুবর।

অষ্টসাহস্রিকা প্রজ্ঞাপারমিতার আরেকটি পুথি রয়েছে বরেন্দ্র জাদুঘরে। এর ফোলিও সংখ্যা ৫১৯। প্রত্যেকটি পাতায় পাঁচটি চরণ রয়েছে। এর মধ্যে বর্তমানে ৪৯টি ফোলিও চিত্রিত। ১২টি পুথির পাতা নেই। ধারণা করা যায়, এগুলো চিত্রিত পাতা। এর পুথির ভাষা সংস্কৃত, যদিও কিছুটা অশুদ্ধ। লিপি নেওয়ারি, লিপিকর জয়ালেখ্যজু (Jayelakaju)। পুথির তারিখ নেপালি সম্বট ৩৯৩ অর্থাত্ ১২৭৩ খ্রিস্টাব্দ। এ পুথির পাতাগুলো হলুদাভ রঙের এবং দুটি ছিদ্র রয়েছে বাঁধাইয়ের দড়ির জন্য।

পুথিটি মহাযান বুদ্ধ মতবাদের সংস্কৃত ভাষায় লিখিত গ্রন্থ। এতে ৩২টি অধ্যায় এবং আট হাজার চরণ রয়েছে। ৪৯টি পাতায় অঙ্কিত চিত্রে মহাযান-বজ যান-তন্ত্রযান ধারার দেব-দেবীদের চিত্র অঙ্কিত হয়েছে। ছবিগুলো পুথির পাতার মাঝখানে অঙ্কিত কিন্তু কোথাও কোনো সূত্র নেই অর্থাত্ দেব-দেবীর নাম প্রত্যক্ষ ও স্পষ্টভাবে নেই। আইকনগ্রাফিক বৈশিষ্ট্যগুলো দেখে দেব-দেবীদের চিহ্নিত করা যায়। আসন ও মুদ্রা দেখে দেব-দেবীদের চিহ্নিত করা যায়।

প্রজ্ঞাপারমিতা পুথি বা পাল আমলের চিত্রকলার একটি সাধারণ রীতি রয়েছে। অধিকাংশই পুথিই তালপাতায় অঙ্কিত। চিত্রাঙ্কনের স্থানটিকে একটি রঙ দিয়ে ভরাট করা হয়, যা ক্যানভাসের কাজ করে। এর পর প্রাথমিক রেখা টানা হয়। এ রেখা অনুসারে বিভিন্ন রঙে রাঙানো হয় এবং রূপ ফুটে ওঠে। শেষে কালো বা লাল সরু তুলিতে বাইরের রেখা টেনে চিত্রটির পূর্ণতা দেয়া হয়। এ পদ্ধতি যেন সমকালীন ভাস্কর্যেরই ক্ষুদ্র রূপ। সমালোচক অশোক ভট্টাচার্য বলেন, ‘পূর্ণায়ত ভাস্কর্যকে যেন সম্পূর্ণ আয়ত্ত করতে চেয়েছেন চিত্রকর’ প্রজ্ঞাপারমিতাসহ সমকালীন প্রায় সব বৌদ্ধ-পুথিচিত্রই একই বৈশিষ্ট্য বহন করছে।

অনেকে মনে করেন, পাল যুগের পুথিচিত্রগুলো মিনিয়েচার। আসলে তা নয়: পাল যুগের চিত্রগুলো বা miniature স্বল্পায়তন চিত্র নয়। এগুলো দেয়ালচিত্রের ক্ষুদ্রায়িত রূপ। চিত্রগুলোর সার্বিক পরিকল্পায়, রেখাশৈলীতে, বর্ণবিন্যাসে ও শৈল্পিক ভাবনায় যে বিস্তৃতি, গভীরতা ও দৈর্ঘ্য লক্ষ করা যায়, তা miniature চিত্রে পাওয়া যায় না। ভাস্কর্যের প্রতিমা বিন্যাসের রীতি চিত্র বিন্যাসের ক্ষেত্রেও অনুসৃত হয়েছে। বিষয়টি পরিষ্কার করেন নীহাররঞ্জন রায়, ইংরাজিতে miniature বলতে আমরা যা বুঝিম এ পাণ্ডুলিপি-চিত্রগুলো সে বস্তু নয়। আয়তন ক্ষুদ্র হওয়া সত্ত্বেও এ পাণ্ডুলিপি-চিত্রগুলোর ভাবনা-কল্পনার আকাশ আরো বিস্তৃত ও গভীর। পরিকল্পনা বৃহত্ রেখার ডৌল ও বিস্তার দীর্ঘায়ত, রঙের বিন্যাস মণ্ডন প্রশস্তায়িত। এ দীর্ঘ, প্রশস্ত ও বৃহত্ বিস্তার একান্তই প্রাচীরচিত্রের। বস্তুত প্রাচীরচিত্রের লক্ষণই পাণ্ডুলিপি চিত্রেরই লক্ষণ।

এ চিত্রগুলোয় অজন্তা দেয়ালচিত্রের প্রভাব থাকতে পারে আবার তিব্বতের বিভিন্ন গুম্ফা, ধর্মালয়ের দেয়ালচিত্রের প্রভাব থাকতে পারে। আমার বিবেচনায় দ্বিতীয় ধারাটিই প্রবল। কারণ তান্ত্রিক বৌদ্ধ মতবাদে পূর্ব ভারতের সঙ্গে তিব্বত, কাশ্মীরের লাদাখ, ভুটান ও নেপালের উঁচু ভূমির সম্পক নিবিড়। তাই এসব অঞ্চলের ধর্মালয়ে সিদ্ধাচার্য ও দেব-দেবীর যে চিত্র, পাল যুগের পুথিচিত্র তারই প্রকাশ।

বরেন্দ্র জাদুঘরের প্রজ্ঞাপারমিতা পুথি দুটির একটি অনন্যবৈশিষ্ট্য রয়েছে। কিছু জায়গায় পুথির অব্যবহিত ফোলিওর লিপি উল্টো করে লিখিত থাকে। এর কারণ দার্শনিক। পুথিতে অঙ্কিত দেব-দেবীর দুটি চিত্র পর পর দুটি ফোলিওতে থাকবে এমনভাবে যে, ফোলিও দুটি একসঙ্গে মিলিত অবস্থায় থাকলে দেব-দেবী দুজনেই মিলিত অবস্থায় অদ্বয় সত্তা তৈরি করবে। এ বৈশিষ্ট্যটি পৃথিবীর অন্য সব পুথিচিত্র থেকে পাল যুগের মহাযান ও তান্ত্রিক বৌদ্ধ পুথিকে স্বতন্ত্র স্থান দিয়েছে।

In the case of a female deity, the writing of the text is inverted i.e., she is represented upside down. The reason for thus may be explained thus; when the leaf with the representation of a female deity is placed on that which contains the picture of her male counterpart, the result is yab-yum which means that the god is in the embrace of the goddess. An image in yab-yum ha a deep spiritual significance in that the god, who is the embodiment of Sunya is perfect, having attained Karuna and is, therefore, the highest state of Nirvana.

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়ামের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্রিত পুথি ‘কারণ্ডব্যূহ’, যার সংগ্রহ নম্বর ৮৫২। এটিও তালপাতায় ও নেওয়ারি লিপিতে লেখা। লিপিকাল উল্লেখ রয়েছে ২১০ নেপালি সম্বট (১০৯০ খ্রিস্টাব্দ)। ‘এতে অঙ্কিত আছে মহাযান বৌদ্ধধর্মের চার দেবতা ও তিন দেবীর বহুবর্ণময় ক্ষুদ্রাকার চিত্র। প্রজ্ঞাপারমিতায় কেবল বৌদ্ধের জীবন উপদেশদানের চিত্র থাকার কথা থাকলেও বাংলা ও উত্তর ভারতে বিকশিত বৌদ্ধ মহাযান ও তান্ত্রিক মতের প্রাধান্য থাকায় পুথিতে তান্ত্রিক দেব-দেবীর ছবিই বেশি অঙ্কিত হয়েছে।

কেবল অঙ্কনরীতি, আঙ্গিকতা নয়; রঙের ব্যবহারেও তত্ত্ব-দর্শন অনুযায়ী পুথির দেব-দেবী অঙ্কিত হয়েছে। বিশেষ করে প্রজ্ঞাপারমিতার ছবিগুলোয় রঙের মধ্যে বেশি ব্যবহূত হয়েছে হলুদ, সাদা, নীল, লাল, সবুজ ও মিশ্র রঙ। রঙের বিন্যাসে এবং বর্তনা সৃষ্টির কৌশলে অজন্তা শৈলীর অনুসৃতি দেখা যায়। এ অনুসৃতি অনেক ক্ষেত্রে মৃদু ও দুর্বল। এ সম্পর্কে সবচেয়ে আত্মবিশ্বাসী অভিমত প্রদান করেছেন নীহাররঞ্জন রায়: ‘ছবিগুলোতে যেসব রঙ ব্যবহার করা হইয়াছে তাহার মধ্যে হরিতালের হলুদ, খড়িমাটির সাদা, গাঢ় নীল (অজন্তার পাথুরে নীল নয়), প্রদীপের শীষ কালো, সিঁদুর লাল ও সবুজ। এই সবুজ অজন্তা চিত্রে ব্যবহূত ঘন উজ্জ্বল সবুজ নয়; বোধহয় নীল ও হলুদে মিশ্রিত সবুজ। প্রয়োজনানুযায়ী একই রঙের গাঢ়তার তারতম্য আছে। ভিন্ন রঙের ব্যবহারও আছে; সর্বোচ্চ স্তরে সাদা, সর্বনিম্নে কালো। কিন্তু যতই বৈচিত্র্য থাকুক দেব-দেবীর রঙ সর্বত্রই সাধনসূত্রানুযায়ী নিয়মিত ও নির্ধারিত।’

এ রঙগুলো নিঃসন্দেহে প্রাকৃতিক উপাদানে তৈরি এবং হাজার বছর অতিক্রান্তির পর অমলিন থেকে ভারত-তিব্বত ভূমির প্রাচীন জ্ঞান ও বিদ্যার সক্ষমতা প্রকাশ করছে।

৩. পদ্মপুরাণ পুথির চিত্র

পূর্ব ভারতের বিভিন্ন সমাজে হাজার বছর ধরে মনসা পূজিত। পূর্ব ভারতে মাতৃকাদেবীদের যে প্রাধান্য, মনসা তারই প্রতিভূ। মনসামঙ্গল বা পদ্মপুরাণের কাহিনী পূর্ববঙ্গজুড়ে জনপ্রিয়তা পেয়েছে। মঙ্গলকাব্য মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের একটি বিশিষ্ট প্রকরণ। মনসামঙ্গলকাব্যের একটি চিত্রিত পুথির অনুলিপি টাঙ্গাইলের নাগরপুর থানার ভাররা গ্রাম থেকে সংগৃহীত হয়। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুথিশালায় সংরক্ষিত আছে পুথিটি।

১৮০৫ সালে নারায়ণ দেব ও ‘অন্যান্য’ লিখিত পদ্মপুরাণের অনুলিপি এই পুথি। এ পদ্মপুরাণ পুথির ৩৯টি পাতা চিত্রিত। এ পুথিটির গড় আকার ১৩.২৫×৪.২৫ ইঞ্চি। এর লিপিকাল মুদ্রিত রয়েছে ১৯১২ সন (১৮০৫ খ্রি.)। বাংলা চিত্রিত ও অলঙ্কৃত পুথির মধ্যে এ পুথিটি সর্বাধিক চিত্রিত। এ পুথিটির সংবাদ দেন মুহম্মদ শাহজাহানা মিয়া। গবেষক অঞ্জন সেন পুথিটির সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেন তাঁর একটি প্রবন্ধে। পুথি গবেষকরা এর স্বাতন্ত্র্য ও বিরল গুণের শংসা প্রকাশ করেন বিভিন্ন সময়: ‘বাংলা পুঁথির এ ধরনের বর্ণনীয় ব্যাখ্যামূলক ও শোভাবর্ধক চিত্রণ খুবই দুর্লভ।’ এ পুথির আকর্ষণীয় দিক হলো এক পাশে ছবি, একই পাতায় ছবির পাশে কাব্যের চরণ। কোনো কোনো পাতায় সমগ্রজুড়ে ছবি। ছবির নিচে একটা কি দুটো চরণ। পুথিতে রঙের ব্যবহার করা হয়েছে সতর্কতার সাথে। উজ্জ্বল হলুদ, লাল, নীল, সবুজ, কালো রঙ ব্যবহূত হয়েছে।

গবেষক অনিমা মুখোপাধ্যায় মনে করেছেন, এ পুথির রীতিতে মুঘল চিত্রকলার প্রভাব রয়েছে। অঞ্জন সেন অবশ্য ভিন্নমত পোষণ করে এ চিত্ররীতির স্বাতন্ত্র্যের পক্ষে জোর দিয়েছেন। গবেষক অঞ্জন সেন ‘চিত্রিত পদ্মপুরানের পুথি’ শিরোনামে এ পুথি নিয়ে একদিন নব পত্রিকায় পূর্ণাঙ্গ সচিত্র প্রবন্ধ রচনা করেন। এ প্রবন্ধে তিনি পুথির চিত্ররীতির প্রধান বৈশিষ্ট্য চমত্কারভাবে লিপিবদ্ধ করেছেন: ‘অঙ্কনশৈলী লোকায়ত, রাজস্থানি বা উড়িষ্যা শৈলীর সঙ্গে মিল নেই। ছবিগুলো দেশে নকশিকাঁথার অবয়ব ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইল অঞ্চলের সরায় আঁকা ছবি এমনকি টাঙ্গাইল শাড়ির নকশার কথা মনে করিয়ে দেয়। কোথাও যেন মধুবনির সঙ্গে একটা সাদৃশ্য রয়েছে।’ এ শিল্প সমালোচকের সঙ্গে আমরাও একমত যে, বিষ্ণুপুর, পারস্য, মুঘল চিত্র, এমনকি পাশ্চাত্য ইউরোপীয় রীতির সঙ্গেও এই পুথির চিত্ররীতির মিল নেই। এ রীতি টাঙ্গাইলে নিজস্ব লোকজ রীতির। মধুবনির সঙ্গে যে মিল পাওয়া যায়, তা উজ্জ্বল রঙের ব্যবহার ও চরিত্রগুলোর পোশাক ও অলঙ্কারের নকশায় বিশেষ করে বিন্দু বিন্দু ছোপ ও ছোট বাঁকানো রেখার সমন্বয়ে যে অলঙ্করণ, তা কমই মধুবনির সঙ্গে মেলে, এ চিত্ররীতি বিরাগ ও স্বতন্ত্র, যা পূর্ববঙ্গের সামগ্রিক বিবেচনায় বলা যায়, চিত্রকলার স্বাতন্ত্র্যের পক্ষে শক্তিশালী নমুনা।

এ চিত্ররীতির আরেকটি প্রধান বৈশিষ্ট্য দ্বিমাত্রিকতা। চরিত্রগুলোর এক চোখই কেবল দৃশ্যমান অর্থাত্ (one sided view) দৃষ্টিকোণ এখানে কার্যকর। এটি প্রাচ্য শিল্পকলার গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা।

পুথিচিত্রে মনসামঙ্গলের সব উল্লেখযোগ্য চরিত্র অঙ্কিত হয়েছে। ছবির পাশে ‘চাঁদ সদাগর’ ‘বিষহরি’, ‘পদ্ম’, ‘নেতা’ প্রভৃতি চরিত্রের নাম লেখা রয়েছে লিপিকরের হস্তাক্ষরে। মুহম্মদ শাহজাহান মিয়া তাঁর গ্রন্থে প্রথম কয়েকটি চিহ্নিত প্রশ্ন করেন। সেখানে ‘কদ্রুদেবী ও বাসুকীর কথোপকথন, মনসা ও চণ্ডীর ঝগড়া, নেতা ও বিষহরির পরামর্শ, ঝুলি-কাঁথা নিয়ে শিবের গৃহত্যাগ, কার্তিকের সঙ্গে অসুরের যুদ্ধের দৃশ্য, বেহুলা কর্তৃক বিষহরির কাছে লখিন্দরের পুনর্জীবন ভিক্ষা, শিষ্যসহ চাঁদ সদাগর প্রভৃতি।

৪. মুসলিম চিত্ররীতির শাহনামা ও ইস্কান্দারনামা পুথির চিত্র

মুসলমান-পূর্ব সময় থেকেই বাংলাদেশ ভূখণ্ডে চিত্রিত পুথির জনপ্রিয়তা ছিল। তুলোট কাগজ ছাড়াও তালপাতায় ছবি আঁকার প্রচলন ছিল এ অঞ্চলে। মুসলমান শাসন বাংলা অঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার বৃহত্তর সাংস্কৃতিক সামাজিক জীবনে প্রভাব পড়ে। মানুষের বিশ্বাস ও কর্মে পরিবর্তন আসে মুসলিম রাজশক্তি ক্ষমতায় আসার ফলে। যে ভূমি পালরাজাদের কেন্দ্র ছিল, সে অঞ্চলে বৌদ্ধ সংস্কৃতির স্পষ্টত বিলোপ ঘটে। ফলে পাল আমলের চিত্রকলার উত্তরাধিকার অবিকৃত অবস্থায় পাওয়া সম্ভব হয়নি। নতুন শাসন ও সংস্কৃতি ব্যবস্থার প্রভাবে এ অঞ্চলে মুসলমানি ধারার অনুচিত্রের প্রবেশ ঘটে। ভাষা-লিপির মতো পুথির চিত্ররীতিতেও মুসলমান প্রভাবিত রীতির চর্চা শুরু হয়। এ সময় সম্পর্কে গবেষক এনামুল হক বলেন, ‘the features and vocabulary of Islamic art in Bangladesh, at once multinational and multiregional characteristics...In its making saints, soldiers and sailors from abroad were as much participants as were the indigenous scribes, painters, masons, potters, craftsmen and not the least, the hoards of immigrants and recent converts and their descendants, throughout the centuries. এ ইসলামী চিত্রকলার বাংলাকরণ একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। একদিকে কোরআনের নির্দেশ অনুযায়ী মূর্তকলাকে উত্সাহিত করা যায় না, অন্যদিকে চিরায়ত পুতুল-সরার ভূমিতে শিল্পচর্চায় প্রাণীর ছবি একটি সাধারণ উপকরণ বা ঘটনা। ফলে বাংলায় মুসলমানরা একটি মধ্যপন্থা অবলম্বন করেছে, কখনো পারসিক-মধ্য এশিয়া চিত্রধারাকে ইসলামী চিত্রকলা ভেবে নিয়ে চর্চা করেছে। ফলে বাংলার ইসলাম অনুসারীদের চিত্রধারাকে ইসলামী চিত্রধারা বলা ঠিক নয়; মুসলিম চিত্রকলা বলাই সঙ্গত। ভারত-বাংলায় মুসলিম আগমন নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, কিন্তু এ কথা সত্য যে, মুসলিম অধিকার এ অঞ্চলের চিত্রকলায় বিষয় ও রীতিতে নতুনত্ব আনয়ন করেছিল। যদিও ১৯৪৭ সালে দেশভাগ-পরবর্তীকালে একদল একে আপন ভেবেছে, অন্যরা এড়িয়ে গেছে সচেতনভাবে। দেশ বিভাগ ও পাকিস্তান আন্দোলন বাংলাদেশের চিত্রশিল্পের জন্য একটি সংকট হয়ে দেখা গিয়েছিল। এ সম্পর্কে সমালোচক আবুল মনসুর মনে করেন, ‘কলকাতায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মুসলিম চিত্রশিল্পীদের জন্য সংকটটি দেশ বিভাজনের আগেই নির্মিত হয়েছিল।’ পাঠ-সমাপ্ত করার পর তাঁদের সমানে সমসাময়িক রীতি হিসেবে ছিল প্রধানত ‘বেঙ্গল স্কুল’ প্রভাবিত কাব্যিক ভাবালুতা বা রোমান্টিকতায় মোড়ানো বাস্তবানুগ চিত্রাঙ্কন অথবা স্বাদেশিক চেতনার পরিপূরক হিন্দু ধর্মীয় বা পৌরাণিক উপাখ্যান কিংবা ইতিহাস বা সাহিত্যের কোনো মহীয়ান ও আবেগঘন বিষয়। বাঙালি মুসলমানের বড় অংশ দেশ বিভাগ-পরবর্তীকালে নতুন অসাম্প্রদায়িক চেতনায় এ চিত্রনীতিকে বর্জন করলেও এ কথা বলা যায়, ৮০০ বছরের মুসলিম শাসন বাংলার সংস্কৃতিতে যে রেখাপাত সৃষ্টি করেছে, তা বাঙালির নন্দনে প্রচ্ছন্ন হলেও রয়েছে। বিশেষ করে মুসলিম স্থাপত্যের এর বড় প্রয়োগ ঘটেছে। ফলে বাংলার মুসলিম চিত্ররীতি খারিজ করার নয়।

আদি মধ্যযুগেই এ রীতি বাংলার সংস্কৃতির সঙ্গে মিশ্রিত হতে থাকে। এ সময়ে বাংলা সাহিত্যে যেমন রোমান্সধর্মী প্রণয়মূলক আখ্যানগুলো জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, চর্যাপদ বা শ্রীকৃষ্ণকীর্তনকে পরিগ্রহ করে, তেমনি চিত্রকলায় আরব্য-পারস্য প্রভাবিত প্রেমময় কাব্যপটে অঙ্কিত চিত্রের প্রচলন ঘটে। এ ধারাবাহিকতায় পারস্যের মহাকাব্য ফেরদৌসী রচিত শাহনামা (রাজকাহিনী) দরবারি সাহিত্য হিসেবে কদর পেতে থাকে। এ শাহনামা পুথিতে অনুচিত্র বা অলঙ্করণ বেশ আড়ম্বর করে অঙ্কিত থাকত। নিজমি রচিত্র খামসা বা পঞ্চক, গত শতাব্দী পর্যন্ত সবচেয়ে অলঙ্কারময় অনুচিত্র হিসেবে স্বীকৃত ছিল। এ পুথিচিত্র যা একই সঙ্গে অনুচিত্র তা জুড়ে আছে রাজা, সৈন্য, প্রাণী বিশেষ করে ঘোড়া, পাখি, লতা-পাখি-উদ্ভিদ, প্রেমরত নারী-পুরুষ, দুর্গ, বাগান, নৌকা প্রভৃতি।

এমন চিত্ররীতির চর্চার নমুনা বা প্রমাণ বাংলাদেশে ছিল না। কিন্তু বিশ শতকের মধ্যপর্বে ঢাকায় আলোয় আসে ইস্কান্দারনামা পুথিটি, যা বাংলাদেশে মুসলিম চিত্রকলার নবদিগন্ত উন্মোচন করে। এ পুথিটি রাজকীয় অনুলিপি, যা ৯৩৮ হিজরি সনে সুলতান নুসরত শাহের জন্য অঙ্কিত হয়েছিল। এটি স্পষ্টতই পঞ্চদশ শতকের পারস্য চিত্রকলার বৈশিষ্ট্য বহন করছে। এ পুথিটিতে নয়টি চিত্র রয়েছে। পুথির সম্মুখভাগসহ উভয় পৃষ্ঠা স্বর্ণখচিত ও রঙিন কারুকাজসমৃদ্ধ। কবিতার চরণগুলো নকশ (Naksh) লিপিতে লিখিত, চার সারিতে। ওপরে-নিচে চার সারি করে কবিতা, তার মাঝখানে ছবির ব্যাপ্তি। পুথির শেষ পৃষ্ঠা আরবেস্ক অলঙ্করণে সজ্জিত। শেষ পৃষ্ঠায় লিপিকর হামিদ খান, পৃষ্ঠপোষক সুলতানের নাম ও লিপিবদ্ধকরণের সন উল্লেখ আছে।

বাংলাদেশের জাতীয় জাদুঘরে মুঘল আমলের কয়েকটি মুসলিম ঐতিহ্যের চিত্রিত পুথি রয়েছে। শাহনামা পুথিটির দৈর্ঘ্য ৬.২৫ ইঞ্চি ও প্রস্থ ৫.১২৫ ইঞ্চি, যা ১৫৯৯ সালে অনুলিপিকৃত। এ পুথিতে ১৯টি চিত্র রয়েছে। শাহনামার আরেকটি পুথি রয়েছে জাতীয় জাদুঘরে, যার দৈর্ঘ্য ১২ ইঞ্চি ও প্রস্থে ৭.৪ ইঞ্চির কিছু বেশি। এ পুথিতে কয়েকজন সম্রাট ও রাজমর্যাদার ব্যক্তির প্রতিকৃতি পাওয়া যায়, যার মধ্যে মুঘল সম্রাট মুহম্মদ শাহের (১৭১৯-৪৮) প্রতিকৃতি রয়েছে। এ রীতি আঠারো শতকের শেষ দিকের ক্ষয়িষ্ণু ঐতিহ্যিক চিত্রকলার স্বাক্ষর বহন করে।

বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে রক্ষিত সবচেয়ে আকর্ষণীয় চিত্রটির শিরোনাম হেরেমের দৃশ্য, তা আঁকা হয়েছে ১৮ শতাব্দীতে ভুক্তি নম্বর ০২১৯৭। শাহনামা  পুথিটির আকার ৩৪×২২ সেন্টিমিটার, কিন্তু লিপিকারের নাম পাওয়া যায়নি। এর ভুক্তি নম্বর ০১.০১.০০৫.১৯৭৭. ০০৮২৪। পুথিটি দান করেছেন ইজতে বাউর রহমান খান। নিজামী রচিত একটি চিত্রিত পুথি মাঘয়ান উল আঘরার, এর ভুক্তি ০১.০১.০০৫.০০৪৫৬। এর লিপিকর মুহম্মদ আলী ও আকৃতি ৩৯×৩৯ সেন্টিমিটার, লিপিকর ঘি ১৫১৩/৯১৯ হিজরি, পুথিটি জাদুঘরকে দিয়েছেন এবিএম হাবিবুল্লাহ। সবচেয়ে মূল্যবান ও আকর্ষণীয় চিত্রিত শাহনামা, যা ১৬৭৭ খ্রি. কোল নিবাসী আবদুর রশীদ চিশতির কাছে রক্ষিত ছিল। অঙ্কনরীতি দেখে বলা যায়, এটি পারস্যের সাফাভি-পরবর্তী যুগের শিল্পকর্ম এগুলো।

৫.

এ পুথিচিত্রগুলো বাংলাদেশের ঐতিহ্যিক শিল্পকর্মের প্রতিনিধিত্ব করছে। বাংলাদেশে এমন আরো অসংখ্য পুথি জলবায়ুর গ্রাসে ও সংরক্ষণের অভাবে নষ্ট হয়ে গেছে। লিপিকর-চিত্রকরের এমন বিক্ষিপ্ত নমুনা এখনো বিভিন্ন সংগ্রহশালায় রয়েছে। এগুলো বিভিন্ন ধর্মসূত্র থেকে চর্চিত হতে পারে কিংবা দরবারি চিত্রের অনুকরণে অঙ্কিত হতে পারে, কিন্তু প্রাপ্তিস্থান-চর্চাস্থান-অঙ্কনের স্থানীয় বৈশিষ্ট্যের কারণে বাংলাদেশেরই গৌরব। বাংলাদেশের সামগ্রিক নন্দনভাবনায় এরা রেখাপাত করার মতোই শক্তিশালী, চিত্রশিল্পের উত্সসন্ধানী নমুনা হিসেবেও এ পুথিচিত্রে শৈলী অনুসরণযোগ্য।

 

রচনাপঞ্জি

অঞ্জন সেন (২০১০), চিত্রিত পদ্মপুরাণের পুথি, একদিন নবপত্রিকা, ১৯ ডিসেম্বর, কলকাতা

অণিমা মুখোপাধ্যায় (২০০১), পুথিপাঠ ও সম্পাদনারীতি, পুনশ্চ, কলকাতা

অশোক ভট্টাচার্য (১৯৯৪), বাংলার চিত্রকলা, পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি, কলকাতা

আবুল মনসুর (১৩৯৩,), শিল্পী দর্শক সমালোচক, মুক্তধারা, ঢাকা

আহমদ শরীফ (১৯৯৯), বাঙালি ও বাঙলা সাহিত্য, নিউ এজ পাবলিকেশন্স, ঢাকা

ত্রিপুরা বসু (২০০৩), বাংলা পাণ্ডুলিপি পরিক্রমা, পুস্তক বিপণি, কলকাতা

নীহাররঞ্জন রায় (১৪০২) বাঙ্গালীর ইতিহাস আদি পর্ব, দে’জ পাবলিশিং, কলিকতা

বাসুদেব রায় (২০০৪), মনসামঙ্গল কাব্যে দেব-দেবীর স্বরূপ, পাঠক বন্ধু লাইব্রেরী, ঢাকা

মুহম্মদ শাহজাহান মিয়া (১৯৮৪), বাংলা পাণ্ডুলিপি পাঠসমীক্ষা, বাংলা একাডেমি, ঢাকা

স্বাতী দাস সরকার (১৯৯৮), বাংলা পুথি বাংলার সংস্কৃতি, সাহিত্যলোক, কলকাতা

Archeaological Survey of India (1948), EXHIBITION OF INDIAN ART CATALOGUE, DEPARTMENT OF ARCHAEOLOGY, Ministry Of Education, NEW DELHI

Benoyytosh Bhattacharyya (1968), The Indian Buddhist Iconography, Calcutta

Eva Allinger (2008), Vienna Journal of South Asian Studies, Bd. LI/2007-2008, 77-121, 2008 by Österreichische Akademie der Wissenschaften, Wien.

Enamul Haque (1983), Islamic Art Heritage of Bangladesh, Bangladesh National Museum, Dhaka

Enamul Haque (1978), Islamic Art in Bangladesh Catalogue, Bangladesh National Museum, Dhaka

Linnart Mall (2005), Studies in the Astasahasrika Prajnapar amita and other Essays, Motilal Banarasidass Publishers Private Limited, Delhi

Sachindra Nath Siddhanta (1979), A Descriptive Catalogue of Sanskrit Manuscripts In The Varendra Research Museum Library, Vol 1, Varendra Research Museum, Rajshahi

আরও