বিশ শতকের শুরুতে কালাপাহাড়ের কিংবদন্তি কেন বদলে যাচ্ছিল

কালাপাহাড়ের ইতিহাস-কিংবদন্তি নিয়ে বিশ শতকের শুরু থেকেই নতুন করে নড়াচড়া দেখা যায়। প্রচলিত কিংবদন্তিতে কিছু পরিমার্জনও দেখা যায়। ১৯০৮-০৯ সালে উৎকল সাহিত্যে এমনটা দেখা যায়। বলা হয় কালাপাহাড়ের প্রকৃত নাম কালাচাঁদ রায়। শিশুবেলায় মা তার নাম রেখেছিলেন রাজু। তার পিতা নয়ন চন্দ রয় ছিলেন বীরজোয়ান গ্রামের মানুষ। তিনি গৌড়ের সুলতানের ফৌজদারি বিভাগে কাজ

কালাপাহাড়ের ইতিহাস-কিংবদন্তি নিয়ে বিশ শতকের শুরু থেকেই নতুন করে নড়াচড়া দেখা যায়। প্রচলিত কিংবদন্তিতে কিছু পরিমার্জনও দেখা যায়। ১৯০৮-০৯ সালে উৎকল সাহিত্যে এমনটা দেখা যায়। বলা হয় কালাপাহাড়ের প্রকৃত নাম কালাচাঁদ রায়। শিশুবেলায় মা তার নাম রেখেছিলেন রাজু। তার পিতা নয়ন চন্দ রয় ছিলেন বীরজোয়ান গ্রামের মানুষ। তিনি গৌড়ের সুলতানের ফৌজদারি বিভাগে কাজ করতেন। শিশুকালেই রাজু তার পিতাকে হারান। কিশোর বয়সে তিনি বিয়ে করেন ত্রিপুরার রাধা মোহন লাহিড়ীর দুই মেয়েকে। বিয়ের দুই বছর পর রাজু তৎকালীন গৌড়ের সুলতান সোলায়মান কররানির কাছে কাজ চান। সুলতান তাকে ফৌজদার পদে নিয়োগ করেন। একদিন সুলতানের কন্যা দুলারি বেগম কালাচাঁদকে দেখে মুগ্ধ হন। তিনি তাকে বিয়ে করতে চান। সুলতানও রাজি হন। কিন্তু বেঁকে বসেন কালাচাঁদ। সুলতান তাকে মৃত্যুদণ্ড দিতে যান, দুলারি বেগম তখন রাজুকে রক্ষা করেন। দুলারির রূপে মুগ্ধ কালাচাঁদ এবার রাজি হয়ে যান। তবে বিয়ের পর তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেননি। কিন্তু মুসলিম মেয়ে বিয়ে করার কারণে তিনি হিন্দু সমাজ থেকে বিতাড়িত হন। অনেক চেষ্টা করেও তিনি আর হিন্দু সমাজে জায়গা পাননি। হিন্দু ধর্মে ফিরতে চেয়ে অপমানিত হন। এরপর তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। একই সঙ্গে হিন্দুবিদ্বেষী হয়ে ওঠেন। এতদিন কালাপাহাড় কেবল ব্রাহ্মণ সন্তান ছিলেন—এটুকুই বলা হতো। এবার রাজু ও কালাচাঁদ রায় নামের আবির্ভাব ঘটল। কালাচাঁদ তখন বাঙালি হিন্দু ঘরের জনপ্রিয় নাম। ১৮৯০ সালে কালাচাঁদ নামে একটি উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছিল। আরো প্রকাশিত হয়েছিল শ্রী কালাচাঁদ হিতা নামে কাব্য, যা ছিল চৈতন্যের ভাবদর্শনে প্রভাবিত রচনা। বিশ শতকের শুরুতে এভাবে ইতিহাস রচনায় প্রচলিত ধর্মীয় ঐতিহ্য শক্ত ভূমিকা রাখা শুরু করেছিল। 

কালাপাহাড়ের ইতিহাসকে নিজস্ব প্রয়োজনে ব্যবহার করতে বিশ শতকের শুরুতে হিন্দু পণ্ডিতদের সক্রিয়তা দেখা যায়। কালাপাহাড়ের এমন ইতিহাস প্রচার করে তারা হিন্দু সমাজে এমন বার্তা দিতে চাইছিলেন যে সামাজিক-ধর্মীয় বিষয়ে এত অনড় থাকা যাবে না। না হলে কালাপাহাড়ের মতো অনেককে ফেরত আনা যাবে না বা তাদের হারাতে হবে। এখানে আরো উল্লেখ করা যেতে পারে পুরনো কিংবদন্তিতে তার হিন্দু ধর্মে ফিরতে চাওয়ার কোনো আলাপ ছিল না। শুধু এটুকু ছিল যে তিনি ব্রাহ্মণ সন্তান এবং পরে মুসলিম হয়ে মন্দির আক্রমণ করেছেন। কালাপাহাড় যে পুরীর মন্দিরে গিয়ে প্রায়শ্চিত্ত করতে চেয়েছিলেন এমন কোনো ঘটনার কথা এতকাল শোনা যায়নি। 

উনিশ শতকের শেষভাগে আর্য সমাজে আন্দোলন শক্তিশালী হচ্ছিল। এমন সব আন্দোলন যে সামাজিক পরিস্থিতি চাইছিল সে দর্শনের ছাপ পড়ে কালাপাহাড়ের কিংবদন্তির পরিমার্জনে। একই সময় ওড়িশায় তথ্য, প্রামাণিক ইতিহাস না খুঁজে কালাপাহাড়কে কল্পনার রঙে রাঙানো শুরু হয়। ১৯২০-এর দশকে দয়ানিধি মিশ্র রচনা করেন প্রদীপ নির্বাণ। ১৯২২ সালে অশ্বিনী কুমার ঘোষ কালাপাহাড়কে নিয়ে নাটকে হাজির করেন জাতীয়তাবাদী ওড়িশাকে। এ সময়ের কালাপাহাড় গাথা কবিতাটি আরো কৌতূহলোদ্দীপক। এখানে কালাপাহাড়কে দেখানো হয় একজন সমাজ সংস্কারক চেহারায়। ওড়িশার হিন্দু সমাজে কিছু সংস্কারকে উৎসাহ দিতেই এমনটা করা হয়েছিল। 

আঠারো শতকে কালাপাহাড়ের কিংবদন্তিকে ব্যবহার করা হয়েছিল হিন্দু সমাজে কেউ যেন ধর্মান্তরিত না হয় সে বিষয়ে সতর্ক করতে। আর বিশ শতকে এসে তা আবার বদলে যায়, এবার ধর্মান্তরিত হিন্দু যেন আবার নিজ সম্প্রদায়ে ফিরতে পারে তেমন সামাজিক পরিস্থিতি তৈরি ছিল লক্ষ্য। জগন্নাথ মন্দিরে হামলা ও জগন্নাথ বিগ্রহের পেছনে কালাপাহাড়ের ধর্মীয় আবেদনের চেয়ে বেশি কাজ করেছিল রাজনৈতিক সংকল্প। তিনি এসেছিলেন ওড়িশায় গজপতি রাজবংশ ও মুকুন্দদেবের শাসনের অবসান ঘটাতে। মুকুন্দদেবের পরাজয়ে তা সম্পন্ন হতে পারেনি। কারণ ত্রয়োদশ শতকে ওড়িশা সাম্রাজের সম্রাট ঘোষণা করা হয় জগন্নাথকে। রাজ ছিলেন তার প্রতিনিধি। তাই জগন্নাথের চিহ্ন ধ্বংস করেই ওড়িশায় গজপতি রাজ্যকে পরাজিত করা যাবে। ষোলো শতকের দলিলে তার এমন রাজনৈতিক সংকল্পের প্রমাণ পাওয়া যায়। কিন্তু তাকে মন্দির ও বিগ্রহ ধ্বংসকারী হিসেবে হাজির করা হয় মূলত আঠারো শতক থেকে। কালাপাহাড়ের ইতিহাস পড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাকে নিয়ে সময়ে সময়ে নতুন কিংবদন্তি তৈরি, পরিমার্জন নিয়ে আরো সতর্ক পাঠের প্রয়োজন রয়েছে। 

এ আলোচনায় আরো একটি কৌতূহলোদ্দীপক সূত্র যুক্ত করা যেতে পারে। বিশ শতকের শুরুতে বাংলা ও ওড়িশায় কালাপাহাড় নিয়ে চর্চা বেশ জোরেশোরে শুরু হয়েছিল। ১৯১০ সালে ঢাকা থেকে প্রকাশিত হয় রসিকচন্দ্র বসুর লেখা উপন্যাস কালাপাহাড়। এ গ্রন্থের ভূমিকা লেখেন সংস্কৃতের একজন অধ্যাপক বিধুভূষণ গোস্বামী। তিনি লেখেন, সমাজে হিন্দু ধর্মকে নিয়ে অনেক ভুল বোঝাবুঝি আছে। কালাপাহাড়ের জীবনেও এমনটা হয়েছিল। কিন্তু তিনি অনেক মন্দির, বিগ্রহ ধ্বংসের পর একজনের কাছে হিন্দুধর্মের দর্শন বুঝতে পেরে সবকিছু ছেড়ে নিজের মুসলমান স্ত্রীকে নিয়ে সন্ন্যাসী হয়ে যান। আঠারো থেকে বিশ শতকের শুরুর ভাগে কালাপাহাড়কে নিয়ে ইতিহাস, সাহিত্য, কিংবদন্তি যা-ই রচিত হয়েছে তা মূলত হিন্দু সমাজের সমসাময়িক নানা সংস্কার, জাগরণ স্রোতের প্রতিফলন। কালাপাহাড়ের ইতিহাসের এ আরেক ইতিহাস।

এসএম রশিদ: লেখক 

আরও