গৌড়ের কালাপাহাড়

বাংলা সাহিত্য ও ইতিহাসের সচেতন পাঠকদের কাছে ‘কালাপাহাড়’ শব্দটি কমবেশি পরিচিত। তবে এটি অনেকের কাছেই পরিষ্কার নয় যে কী অর্থে এ শব্দযুগল ব্যবহার করা হয়ে থাকে। আসলে এটি একজন সেনাপতির নাম যা বাঙালির ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে। কোনো পাহাড় কিংবা পর্বতের নাম নয়, এ গৌড়বঙ্গেরই এক অজেয় বীরের উপাধি ছিল ‘কালাপাহাড়’। তিনি ইতিহাসে এ নামে আজও

বাংলা সাহিত্য ও ইতিহাসের সচেতন পাঠকদের কাছে ‘কালাপাহাড়’ শব্দটি কমবেশি পরিচিত। তবে এটি অনেকের কাছেই পরিষ্কার নয় যে কী অর্থে এ শব্দযুগল ব্যবহার করা হয়ে থাকে। আসলে এটি একজন সেনাপতির নাম যা বাঙালির ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে। কোনো পাহাড় কিংবা পর্বতের নাম নয়, এ গৌড়বঙ্গেরই এক অজেয় বীরের উপাধি ছিল ‘কালাপাহাড়’। তিনি ইতিহাসে এ নামে আজও উজ্জ্বল হয়ে আছেন। 

বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম এ বীরের নাম ঠিকই জেনেছিলেন। তাই বিখ্যাত ‘মানুষ’ কবিতায় তার নাম উচ্চারণ করেছেন সগৌরবে: 

‘কোথা চেঙ্গিস, গজনী-মামুদ, কোথায় কালাপাহাড়; 

ভেঙে ফেল ঐ ভজনালয়ের যত তালা-দেওয়া-দ্বার!’ 

কালাপাহাড় আমাদের ভুলে যাওয়া সেই বাঙালি বীরের এক পরিচয়কে ধারণ করে আছে। কাজী নজরুল ইসলাম তার ‘যৌবনের গান’ প্রবন্ধে লেখেন, ‘তারুণ্য দেখিয়াছি আরবের বেদুইনদের মাঝে, তারুণ্য দেখিয়াছি মহাসমরে সৈনিকের মুখে, কালাপাহাড়ের অসিতে, কামাল-করিম-মুসোলিনি-সানইয়াৎ লেনিনের শক্তিতে।’ 

সত্যজিৎ রায়ের রয়েল বেঙ্গল রহস্য (ফেলুদা) উপন্যাসের একটি সংলাপ: ‘তড়িৎ বাবু কিছু বলার আগেই গুরুগম্ভীর গলায় প্রশ্ন শোনা গেল, ‘তোমরা রাজুকে দেখেছো? রাজু’। দেবতোষবাবু আমাদেরই উদ্দেশে প্রশ্নটা করেছেন। ভদ্রলোক এরই মধ্যে পুব থেকে উত্তরের বারান্দায় চলে এসেছেন। তার লক্ষ্য আমাদেরই দিকে। তড়িৎ বাবু আমাদের হয়ে জবাব দিলেন “‍না, এঁরা দেখেননি”। ...রাজু হলো কালাপাহাড়ের আরেক নাম।’

কালাপাহাড়কে কোনো না কোনোভাবে উদ্ধৃত করেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। উপন্যাস রচনা করেছেন নুরুল হক চৌধুরী, রসিকচন্দ্র বসু, সমরেশ মজুমদার, বিশ্বনাথ ঘোষ, কল্যাণ গুপ্ত ও সুজন ভট্টাচার্য। নাটক লিখেছেন গিরিশচন্দ্র ঘোষ, কবিতা লিখেছেন মোহিতলাল মজুমদার, নকুল কুমার প্রমুখ। এছাড়া ভারতের ওড়িশায় বহুসংখ্যক গল্প, নাটক, কবিতা প্রভৃতি রচিত হয়েছে কালাপাহাড়কে নিয়ে।

কালাপাহাড় ছিলেন কেবলই একজন বাহাদুর সৈনিক। ফলে তার ব্যক্তিগত জীবনচরিত বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য কোথাও সংরক্ষিত নেই। তবে তিনি যে স্বাধীন বাংলার ইতিহাসের অন্যতম নায়ক তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তার অন্যতম পরিচয়ও এটা ছিল যে তিনি কখনো দিল্লির অধীনতা স্বীকার করেননি। আমৃত্যু তিনি স্বাধীন অস্তিত্বের জন্য লড়াই করে গেছেন।

বেশির ভাগ ইতিহাস গ্রন্থ ও ঐতিহাসিক তথ্যে কালাপাহাড়কে বৃহত্তর রাজশাহী তথা বরেন্দ্রভূমির নওগাঁর বীরজোয়ান গ্রামের রাজু বা রাজীব লোচন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কালাপাহাড়ের সমকালে এ নাম বা উপাধিটি এতটাই বিখ্যাত ও প্রখ্যাত হয়ে যায় যে, সে সময় বিভিন্ন গ্রাম, শহর, মন্দির, কামান প্রভৃতির নামকরণ হতে থাকে ‘কালাপাহাড়’। আসামে কালাপাহাড় নামে একটি শিল্পাঞ্চল এবং একটি কলোনি গড়ে উঠেছে। মণিপুরে ‘কালাপাহাড় সিটি’ অবস্থিত। উত্তরাখণ্ড রাজ্যের রামনগরে একটি গ্রামের নাম ‘কালাপাহাড়’। রাজস্থানে কালাপাহাড় মন্দির এবং মহারাষ্ট্রের দৌলতবাদে একটি কামানের নাম ‘কালাপাহাড়ের কামান’। এমনকি বাংলাদেশের নওগাঁ জেলার মান্দা উপজেলায় অবস্থিত কুসুম্বা মসজিদকেও ‘কালাপাহাড় মসজিদ’ বলে পরিচয় দেয়ার কথা জানা যায়। এসব স্থান ও স্থাপনার সঙ্গে আমাদের আলোচ্য কালাপাহাড়ের কোনো যোগসূত্র আছে কিনা তা নিশ্চিতভাবে জানা যায় না। তবে আসামের কামরূপ বিজয় এবং সেখানকার বিখ্যাত কামাখ্যা মন্দিরে হানা দেয়ার জন্য যেহেতু কালাপাহাড় বিশেষভাবে আলোচিত, সেহেতু সেখানকার কোনো স্থান বা স্থাপনার নামকরণ তার নামে হওয়া অসম্ভব নয়। কালাপাহাড়কে বিজয়ী বীরের চেয়ে হিন্দু মন্দির ও প্রতিমা ধ্বংসের জন্য বেশি পরিচিতি দিয়েছেন এক শ্রেণীর লেখক। কিন্তু নিরপেক্ষ লেখকরা তাকে একজন স্বাধীনচেতা সৈনিক, বীরযোদ্ধা ও বিজয়ী সেনা নায়ক হিসেবে চিহ্নিত করতে প্রয়াসী হয়েছেন। মজার ব্যাপার হলো, ইতিহাসে কোনো যুদ্ধে তাকে ‘পলাতক’ দেখা যায় না। কেবল গুরুতর আহত হলে তাকে ময়দান থেকে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। আর জীবনের শেষ যুদ্ধে তিনি ময়দানেই মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছেন।

বাংলার সন্তান কালাপাহাড়

প্রামাণ্য গ্রন্থগুলোর প্রাথমিক তথ্যাদি থেকে জানা যায়, পঞ্চদশ শতকের বাঙালি বীর সেনাপতি স্বাধীনচেতা সৈনিক কালাপাহাড়ের জন্ম গৌড়বঙ্গ তথা বর্তমান বাংলাদেশের বরেন্দ্র অঞ্চলের নওগাঁয়। এ জেলার নিয়ামতপুর উপজেলার পাড়ইল ইউনিয়নের বীরজোয়ান গ্রামে তার জন্ম। কালাপাহাড়ের জন্ম-মৃত্যু ও বংশপরিচয় সম্পর্কে ব্যাপক-বিস্তারিত তথ্য জানা না গেলেও ইতিহাসের বিভিন্ন রেফারেন্স গ্রন্থে তার কোনো না কোনো উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে মোটামুটি বেশির ভাগ উৎস থেকেই সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত যে কালাপাহাড় বাংলাদেশের বর্তমান নওগাঁ জেলায় জন্মগ্রহণ করেন এবং বেড়ে ওঠেন এখানকার আলো-বাতাসে। এরপর কর্মজীবনের প্রায় পুরোটাই নানা যুদ্ধ-বিগ্রহ ও সমরাভিযানে কেটেছে।

তৃণমূল থেকে তথ্য সংগ্রহকারী ইতিহাস লেখক কে এম মিছের কালাপাহাড়ের উত্থান পর্বের পটভূমিও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘বাঙলা দেশে হোসেন শাহী যুগে শ্রীচৈতন্য দেবের (১৪৮৬-১৫৩৩ খ্রি.) আবির্ভাব। চৈতন্য দেবের আবির্ভাবে উত্তরবঙ্গে বৈষ্ণব প্রতিক্রিয়া দেখা দিলে ইসলাম ধর্মে বিশেষত নবদীক্ষিত মুসলমানদের মধ্যে বহু মুসলমান বৈষ্ণব ভাবাপন্ন হইয়া পড়িয়াছিল। আবার সুফীদের পাল্টা অভিযানে বহু বৈষ্ণব এবং হিন্দু মুসলমান হইয়াছিল। ইসলামের সুমহান শক্তি দিকে দিকে বিস্তৃত হইলে এতদঞ্চলের বৈষ্ণব প্রচার কেন্দ্র চিরতরে নিভিয়া যায়। গৌড় দেশে ইসলাম বিস্তারের প্রতিক্রিয়া রূপে বৈষ্ণব ধর্মের উদ্ভব হইয়াছিল তাহা ঐতিহাসিক সত্য। গৌড়ের কেন্দ্র্র রামকেলীর প্রচারকগণ যথা- নিত্যানন্দ, অদ্বৈতাচার্য, নরহারি সরকার প্রভৃতি ভক্তবৃন্দ এবং পরবর্তীকালে রাজশাহীর খেতুরী গ্রামে (পদ্মা তীরস্থ প্রেমতলীর সন্নিকট) নরোত্তম দাস দত্ত প্রমুখের (১৫৩১-১৬১১ খ্রি.) আর্বিভাব। তাহাদের দ্বারা উত্তরবঙ্গে বৈষ্ণব মতের ক্রমোন্নতি হইতে থাকিলে মুসলমানদের মধ্যে তাহার প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। বলা বাহুল্য, এই যুগে রাজশাহী নিবাসী পরম বৈষ্ণব কালাপাহাড়ের ইসলাম ধর্ম গ্রহণ ও তাহার প্রতিক্রিয়ায় তাবৎ হিন্দু দেবদেবীর মূর্তি চূর্ণবিচূর্ণ হইয়াছিল। বৈষ্ণব ভক্ত ও ব্রাহ্মণগণ নানাভাবে নির্যাতিত ও উৎখাত হইয়াছিল। ধর্মভীরু মুসলমানগণ অনেক সময় বৈষ্ণব সাধুদের তাড়া করিয়া গা ছাড়া করিয়াছিলেন। তাহারা তাদের প্রতিমা, ভাগবৎ, তুলসী ও সাধুগণকে কোনক্রমেই আমল দিতেন না। সমসাময়িক বিভিন্ন সাহিত্যে তাহার বহু প্রমাণ রহিয়াছে।’১

নাম বিতর্ক

‘কালাপাহাড়’ শব্দের আভিধানিক অর্থ বাংলা একাডেমির অভিধানে নিম্নরূপ উল্লেখ করা হয়েছে—১. বিরাটকায় ও ভয়ংকর প্রকৃতির লোক। ২. চলতি সংস্কার বা রীতিনীতির ধ্বংসকারী বিদ্রোহী; iconoclast। ৩. তুর্কি আমলের একজন সেনাপতি যিনি প্রথমে হিন্দু ব্রাহ্মণ ছিলেন এবং পরে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে হিন্দুদের বহু দেবমন্দির ও দেবমূর্তি ধ্বংস করেন।২

কালাপাহাড় সংক্রান্ত আলোচনাকালে তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বেশকিছু নামের উল্লেখ পাওয়া যায়। যেমন কালাপাহাড়, কালাচাঁদ, কালাচাঁদ পাঁড়ে, রাজু, রাজু ভট্টাচার্য, রাজু ভাদুড়ি, রাজচন্দ্র, রাজেন্দ্র, রাজীব লোচন রায়, মহম্মদ ফরমুলি, ফরম আলী, হাসান ইত্যাদি। এসব নামের কোনটি কালাপাহাড়ের প্রকৃত নাম কিংবা ধর্মান্তরের পূর্বাপর নাম তা নিয়ে বিভেদ দেখা যায়। তবে এ নিয়ে পরস্পর বিতর্ক দেখা যায় না। লেখকরা যে যার মতো করে এসব নাম জুড়ে দিয়েছেন কালাপাহাড়ের নামের সঙ্গে। বলা হচ্ছে, কালাপাহাড় একটি উপাধি বা পরিচয়মূলক নাম। তার প্রকৃত মুসলিম নাম ছিল কালাচাঁদ। পূর্ববর্তী নাম রাজচন্দ্র ওরফে রাজু ভট্টাচার্য ওরফে রাজু ভাদুড়ি।

মন্দির ভাঙার অভিযোগ প্রসঙ্গে

কালাপাহাড় কর্তৃক মন্দির ভাঙা নিয়ে বেশ বিভ্রান্তিকর তথ্য লক্ষ করা যায়। এ সম্পর্কে নিরপেক্ষ লেখকদের অভিমত শুধু এটুকুই যে ওই যুগে মন্দিরগুলো ধনভাণ্ডার হয়ে থাকত এবং সেজন্যই সেগুলো বারবার আক্রমণের শিকার হয়েছে। বর্তমান যুগের মন্দিরগুলোর মতো সেগুলো শুধু ধর্মীয় আচারকেন্দ্রিক হলে আক্রমণের ব্যাপার থাকত না। বিভিন্ন এলাকায় যে আক্রমণগুলো রাজা বা সুলতানরা পরিচালনা করতেন তা প্রধানত রাজনৈতিক কারণেই করতেন।

তদানীন্তন সময়ে ভারতের ধনসম্পদ, এমনকি অনেকের মতে জলদস্যুরাও তাদের লুণ্ঠিত সম্পদ বিভিন্ন মন্দিরে গচ্ছিত রাখত। এসব কারণে মন্দিরগুলো রাজনৈতিক কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। তাই মন্দির আক্রমণে সুলতান মাহমুদ বা কালাপাহাড় ধর্মীয় নীতিতে প্রভাবিত হননি। সুলতান মাহমুদের সোমনাথ মন্দির ধ্বংস সম্পর্কে এ বক্তব্যের সমর্থন পাওয়া যায় ড. ঈশ্বরী প্রসাদের লেখায়, ‘The temples of India which Mahmud raided were store-houses of enormous and untold wealth and also some of these were political centers.’৩

মন্দির ধ্বংস ও লুণ্ঠনের জন্য যে সব অভিযোগকারী সুলতান মাহমুদকে (এবং কালাপাহাড়কেও) লুণ্ঠনপ্রিয় ও হিন্দুবিদ্বেষী বলে প্রচার করতেন বা আজও করেন তাদের ভুলে যাওয়া উচিত নয় যে এ সবই যুদ্ধের ন্যায় স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে হয়েছিল এবং তার পূর্ববর্তী ও তদানীন্তন যুগে আদৌ অসংগত ছিল না। মধ্যযুগে প্রচলিত যুদ্ধনীতি অনুসারে বিজিত জাতির লুণ্ঠিত ধন-সম্পত্তিতে বিজয়ী সৈন্যদের ন্যায্য অধিকার স্বীকার করা হতো।৪

‘প্রতিমা ভঙ্গকারী (বুতশিকান) হিসেবে সমকালীন হিন্দু সমাজে নিন্দিত হলেও পরবর্তীকালে বাঙালি হিন্দু লেখকরা কালাপাহাড়ের অসম সাহসিকতা, দেশপ্রেম ও শেষ জীবনে স্বধর্ম ত্যাগের জন্য অনুশোচনা ও গঙ্গাজলে দেহ বিসর্জনের বিষয়ে বহু কল্পকাহিনী রচনা করে তাকে নন্দিত করেন।’৫

প্রখ্যাত গবেষক আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া ‘কালাপাহাড়-কিংবদন্তি ও ইতিহাস’ শীর্ষক একটি প্রবন্ধে উল্লেখ করেন, কালাপাহাড় সম্বন্ধে উপমহাদেশের পঞ্চদশ-ষোড়শ শতাব্দীর ইতিহাসে এবং পরবর্তীকালে রচিত বিভিন্ন ইতিহাস গ্রন্থে উল্লেখ দেখা যায়। কিন্তু ইতিহাসের বাইরে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে ইতিহাসকে উপেক্ষা করে কালাপাহাড় সম্বন্ধে এমন সব কিংবদন্তি গড়ে উঠেছে যে সেখানে কোনটা প্রকৃত ইতিহাস এবং কোনটা নয়, তা নিরূপণ করা অনেক সময় কঠিন হয়ে দাঁড়ায় এবং এতে এক বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তার সম্বন্ধে প্রচলিত কিংবদন্তি মতে তিনি ছিলেন একজন বাঙালি ব্রাহ্মণ এবং তখন তার নাম ছিল রাজু। স্বধর্ম পরিত্যাগ করে তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং পরিত্যক্ত ব্রাহ্মণ্য ধর্মের প্রতি তার বিদ্বেষ এমন প্রবল রূপ ধারণ করে যে তিনি হিন্দু দেবদেবীর মূর্তি ও মন্দির অবলীলাক্রমে ধ্বংস করেন এবং এ কারণে তার নাম হয় কালাপাহাড়। এ ধরনের একটি স্থানীয় কিংবদন্তি সূত্রে জানা যায় যে রাজশাহী জেলার মান্দা উপজেলার অন্তর্গত নিমদিঘি নামক স্থানে তার আদি নিবাস ছিল। এ স্থানে বেশ কয়েকটি প্রাচীন জলাশয় আছে, আর কাছে বেশ কয়েকটি প্রাচীন ইমারতের ধ্বংসাবশেষ। সেগুলোর মধ্যে একটিকে জনপ্রবাদ মতে কালাপাহাড় ওরফে রাজুর আদি বসতবাড়ি বলে চিহ্নিত করা হয়। জনপ্রবাদ মতে এ দেশের আরো অনেক স্থান এ সম্মান লাভ করে থাকে। 

নির্বিচারে হিন্দু মন্দির ও দেবদেবীর মূর্তি ধ্বংসকারী বলে কথিত এ তথাকথিত ধর্মান্তরিত মুসলমান কালাপাহাড়ের কুখ্যাতি প্রায় ৪০০ বছর ধরে এমন প্রবলভাবে চলে আসছে যে এ দেশে অন্য ধর্মের প্রতি অত্যাচারকারী অথবা এসব ব্যাপারে যেকোনো বড় ধরনের অন্যায়কারীকে আজও নির্দ্বিধায় কালাপাহাড়ের সঙ্গে তুলনা করা হয়। কালাপাহাড়ের নাম আজও ভীতিসঞ্চারক জনপ্রবাদে পরিণত হয়েছে।৬ 

অন্যদিকে গবেষক মাহবুব সিদ্দিকী উল্লেখ করেন, আসলে কালাপাহাড়ের বিরুদ্ধে এ দেশের ঐতিহাসিকদের একপেশে ঢালাও অভিযোগ তাকে দাঁড় করিয়েছে একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে। ইতিহাসবিদরা কালাপাহাড়কে চিত্রিত করেছেন হিন্দু মন্দির-দেবালয় ধ্বংসকারী রূপে। এ রকম একপেশে অভিযোগের ফলে ইতিহাসের অকুতোভয় বিক্রমশালী এ রাজপুত্রের বিশাল চারিত্রিক গুণাবলি ঢেকে রয়েছে অন্ধকারের আস্তরণে। আসলে কালাপাহাড়ের প্রকৃত পরিচয় হচ্ছে তিনি একজন দেশপ্রেমিক। পাশাপাশি ষোড়শ শতাব্দীর পঞ্চাশের দশক থেকে আশির দশকের প্রারম্ভকাল অবধি (মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত) তৎকালীন ভারতবর্ষের হাতে গোনা সাহসী যোদ্ধাদের মধ্যে নিঃসন্দেহে কালাপাহাড়ের অবস্থান ছিল একেবারে শীর্ষস্থানে। জাতীয় কবি এ বীরের পরিচয় জানতেন বলেই তার বিখ্যাত ‘মানুষ’ কবিতায় বললেন—‘কোথা চেঙ্গিস, গজনী-মামুদ, কোথায় কালাপাহাড়, ভেঙ্গে ফেল ঐ ভজনালয়ের যত তালা-দেওয়া দ্বার।’ কবি এখানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কালাপাহাড়কে সামনে এনেছেন প্রতিবাদের রূপক বা প্রতীক হিসেবে। 

কালাপাহাড়ের সামগ্রিক জীবন ও কর্ম বিষয়ে আবুল ফজলের বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আইন-ই-আকবরি’ কিংবা ‘আকবরনামা’, ‘মখজান-ই-আফগানি’ প্রভৃতি আকরগ্রন্থগুলোয় বিচ্ছিন্নভাবে লেখা রয়েছে। সুনির্দিষ্টভাবে তার বিষয়ে বিস্তারিত কিংবা জীবনচরিত রচনার মতো প্রয়োজনীয় তথ্যের অভাব রয়েছে যথেষ্ট। ফলে তার সম্পর্কে কিংবদন্তির ভিত্তি হয়েছে দৃঢ়। 

কালাপাহাড় ছিলেন প্রথম বাঙালি বীর যার নেতৃত্বে কামরূপ এবং ওড়িশা বিজিত হয়েছিল। কালাপাহাড়কে নিয়ে  যেটুকু তথ্য আমরা পাই তা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে তিনি তার সমগ্র সৈনিক জীবনের প্রথম থেকে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত মোগলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে গেছেন। তার জীবনের প্রধান দুটি সাফল্য হলো, তার নেতৃত্বে কামরূপ ও ওড়িশা অভিযান পরিচালিত হয়েছে এবং উভয় যুদ্ধেই তিনি বিজয় লাভ করেছেন। উল্লিখিত দুটি সমরাভিযানে কালাপাহাড়ের সামরিক বাহিনীর সদস্যদের দ্বারা ওড়িশার পুরীর মন্দির, জগন্নাথ মন্দির এবং গুয়াহাটির কামাখ্যা মন্দিরের ক্ষতি হয়েছিল। এ তথ্যগুলো ইতিহাসনির্ভর। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, রাজু ওরফে কালাপাহাড় একজন ধর্মান্তরিত মুসলিম হিসেবে উগ্র সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গির দ্বারা প্রভাবিত হয়ে মন্দির ও দেবালয়গুলোর ক্ষতি সাধন করেছিলেন অথবা শুধু ধনসম্পদ লুণ্ঠনের উদ্দেশ্যে এ কাজগুলো করেছিলেন—এ বিষয়গুলো সঠিকভাবে ব্যাখ্যার প্রয়োজন রয়েছে। ওড়িশার মন্দির এবং কামাখ্যা মন্দির ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার চিত্র যদি আমরা ইতিহাস থেকে সংগ্রহ করি তবে দেখব, এ মন্দিরগুলোর মূল কাঠামোগত কোনো ক্ষতিসাধন কালাপাহাড়ের আক্রমণে ঘটেনি। এ দেবালয়গুলোয় রক্ষিত কয়েকটি মূর্তির ক্ষতি সাধন করে সেখানে রক্ষিত ধনরত্ন ইত্যাদি কালাপাহাড়ের বাহিনী লুণ্ঠন করেছিল। আমরা সাধারণভাবে লক্ষ করি যে প্রাচীন যুগ, মধ্যযুগ কিংবা আধুনিক যুগেও একটি বিজয়ী বাহিনী যখন বিজয় লাভ করে কোনো শহর বা নগরে প্রবেশ করে তখন সেই বিজয়ী বাহিনীর সদস্যরা নগর লুণ্ঠন করে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে আগুন জ্বালিয়ে নগরটির ধ্বংস সাধন করে। ভারতবর্ষের ইতিহাসে সেই কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ থেকে শুরু করে অশোকের কলিঙ্গ জয়, পালদের উত্তর ভারত, কামরূপ ও ওড়িশা বিজয়, সেনদের কামরূপ বিজয়, বখতিয়ারের বরেন্দ্র বিজয়, মোগলদের বাংলা ও আসাম বিজয়—এমনতর ইতিহাস পর্যালোচনা করলে নগর ও জনপদ ধ্বংসের চিত্র এবং প্রকৃত তথ্য সহজেই পাওয়া যাবে। কোনো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বা পবিত্র স্থানকে বিবেচনার মধ্যে এনে এগুলো বাদ দিয়ে কোনো বিজয়ী বাহিনী নগর লুণ্ঠন করেছে এমন উদাহরণ খুব একটা নেই।৭ 

কালাপাহাড়ের জীবনাবসান

কালাপাহাড়ের মৃত্যু সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায় না। বলা বাহুল্য, কোনো কোনো হিন্দু লেখকের কলমে তার মৃত্যু অভিসম্পাতে হওয়ার কথা বলা হয়। কিন্তু ইতিহাসের প্রামাণ্য গ্রন্থে মোগল বাহিনীর সঙ্গে মরণপণ লড়াইয়ে তিনি আহত হয়ে গৌরবের মৃত্যুবরণ করেন—এ কথা পরিষ্কার জানা যায়।

গ্রন্থকার রজনীকান্ত চক্রবর্তী ‘হোসেন কুলি খাঁ খান্জেহান্ (১৫৭৬-১৫৭৯ খ্রি.)’ শিরোনামে সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিয়ে জানিয়েছেন, ‘দায়ুদের পতনের পরও বহুদিন বাঙ্গালার পাঠানেরা মোগল সম্রাটের বশ্যতা স্বীকার করে নাই। মোগলদিগকে বাঙ্গালা হইতে তাড়াইয়া দেওয়ার পুনঃপুনঃ চেষ্টা করিয়াছিল। আমরা সেই সমস্ত চেষ্টার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস বর্ণনা করিতেছি। মোগলদের সময়ে প্রথমে বাঙ্গালা ও বিহার, স্বতন্ত্র শাসনকর্ত্তাদের দ্বারা শাসিত হইতে লাগিল। বেহারের শাসনকর্ত্তারাই প্রায়শ বাঙ্গালার শাসনকর্ত্তা হইতেন। আগমহল (রাজমহল) যুদ্ধের পর হোসেন কুলি খাঁ, দায়ুদের সমস্ত সম্পত্তি ও হস্তীযূথ হস্তগত করিয়া সম্রাটসমীপে প্রেরণ করিলেন। পাঠানেরা অনেকে বিহারের পার্বত্য অঞ্চলে আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছিল। তাহাদিগকে তাড়াইয়া রোটাস দুর্গ অধিকারের জন্য সম্রাট মজঃফর খাঁকে প্রেরণ করিলেন। মজঃফর খাঁ ত্রিবহুতবাসী ছিলেন। মজঃফর খাঁ, আফগান সেনানায়ক হোসেন খাঁ আফগানিকে আক্রমণ করিবার জন্য মোহাম্মদ মাসুম খাঁকে প্রেরণ করিলেন। দুর্গটি অধিকৃত হইল। কালাপাহাড় ৮০০ সেনা লইয়া মাসুম খাঁকে দুর্গে অবরোধ করিলেন। এই যুদ্ধে মোগল সৈন্যের তীরনিক্ষেপে কালাপাহাড়ের হাতীর মাহুত মারা পড়ে। হাতী প্রমত্তভাবে আফগান সৈন্য মধ্যে প্রবিষ্ট হইয়া বহু লোকের প্রাণনাশ করে। কালাপাহাড় ও অন্যান্য আফগান সেনানায়কগণ এই যুদ্ধে নিহত হইলেন। হোসেন কুলী খাঁ দায়ুদের সম্পত্তি ও পরিবার হস্তগত করার জন্য ওড়িশার সেনা প্রেরণ করিলেন, সম্পত্তি হস্তগত হইল।’৮

কালাপাহাড়ের সমাধি

রাজমহলের যুদ্ধে নিহত কালাপাহাড়ের সমাধি বা কবর নিয়ে ইতিহাসে সুস্পষ্ট তথ্য নেই। বিচ্ছিন্ন কিছু বিবরণীতে দেখা যায়, কেউ কেউ তাকে দেবতার অভিশাপে মৃত্যু হতে এবং কেউ যুদ্ধের ময়দানে কামানের গোলার আঘাতে নিহত হওয়ার কথা বলেন। ভারতকোষের মতে, মোগলদের সঙ্গে যুদ্ধে কালাপাহাড়ের মৃত্যুর পর তাকে ওড়িশার সম্বলপুরে মহানদীর তীরে সমাধিস্থ করা হয়। সম্বলেশ্বর কলেজ বিল্ডিংয়ের গায়ে অসংখ্য সমাধি দেখে অনুমান করা হয় এগুলো কালাপাহাড়ের সহযোদ্ধাদের।

উপসংহার

বেশির ভাগ ইতিহাসবিদ ও বিশ্লেষক কালাপাহাড়কে বাংলা, ওড়িশা, আসাম প্রভৃতি অঞ্চলে অভিযানকারী বিখ্যাত সেনাপতি হিসেবে চিহ্নিত করতে প্রয়াস পেয়েছেন। আমাদের মতেও বাংলাদেশের সেই স্বাধীনচেতা অপরাজেয় বাঙালি বীর কালাপাহাড়ই ইতিহাসে উজ্জ্বল হয়ে আছেন।

ইতিহাসের বিশ্লেষকরা বলছেন, মূর্তি বা মন্দির ভাঙার অভিযোগগুলো ব্যাপকভাবে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ সে সময় মুসলিম শাসক এবং তাদের প্রশাসন ও সেনাবাহিনীতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক হিন্দু গুরুত্বপূর্ণ পদ-পদবিতে নিয়োজিত থাকতেন। সুলতান সিকান্দরের প্রধানমন্ত্রী ও সেনাপ্রধান ছিলেন হিন্দু। সুলতান শিহাবুদ্দীনের প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রী ছিলেন উদয়শ্রী। এছাড়া চন্দ্রভামর, লৌল ডামর প্রমুখ ছিলেন ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তা। সুলতান দাউদ কররানির উজির ও সেনানায়ক ছিলেন শ্রীহরি, বসন্ত রায়, শিবানন্দ প্রমুখ হিন্দু ব্যক্তিরা। এদের কর্তৃত্বকালে এভাবে মূর্তি বা মন্দির ভাঙার ঘটনা একটা অবিশ্বাস্য ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়।

বস্তুত কালাপাহাড় একজন ‘সৈনিক’ পরিচয় ছাপিয়ে হয়ে ওঠেন বাংলার স্বাধীনতাকামী একজন যোদ্ধা হিসেবে। তার জীবনের পুরো চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি দিল্লির শাসকদের প্রতি কখনই নতজানু হননি বা আপস করেননি। শেষ অবধি যুদ্ধের ময়দানেই মৃত্যুকে কবুল করে নিয়েছেন তিনি।৯

তথ্যসূত্র

১. কে এম মিছের, রাজশাহীর ইতিহাস দ্বিতীয় খণ্ড, ১৯৬৫ খ্রি.।

২. বাংলা একাডেমি ব্যবহারিক অভিধান (পরিমার্জিত সংস্করণ), মার্চ ২০০৫।

৩. Dr. Iswary Prosad, History of Medieval India.

৪. মোহাম্মদ বায়াজীদ খান পন্নীর ওয়েবসাইট।

৫. http://www.khoborerkhobor.com/news/1753.html.

৬. আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া, কালাপাহাড় কিংবদন্তি ও ইতিহাস, মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান সম্পাদিত মুহম্মদ এনামুল হক স্মারকগ্রন্থ, এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ, ১৬ ডিসেম্বর ১৯৮৫। 

৭. মাহবুব সিদ্দিকী, বরেন্দ্র কৈবর্ত বিদ্রোহ ও রামাবতী নগরী, হেরিটেজ রাজশাহী, আগস্ট ২০২০।

৮. রজনীকান্ত চক্রবর্তী, গৌড়ের ইতিহাস (প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড), দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা, ২০০৯ খ্রি.।

৯. কালাপাহাড় সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পড়ুন সরদার আবদুর রহমান রচিত ‘উড়িশা-কামরূপ বিজয়ী বাঙালি বীর কালাপাহাড়’, দিব্যপ্রকাশ, ঢাকা, ২০২০ খ্রি.।


সরদার আবদুর রহমান: সাংবাদিক ও লেখক

আরও