সতেরো শতকটি ভারতবর্ষের ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয়—এ শতকে দর্শন, চিন্তা, প্রতীচ্যের সঙ্গে চিন্তার যোগাযোগের ক্ষেত্রে তুমুল আলোড়ন দেখা গিয়েছিল। মুসলিম, জৈন, হিন্দু পণ্ডিতরা চিন্তার দুনিয়াকে প্রসারিত করছিলেন। তাদের হাতে লিখিত হয়েছিল গুরুত্বপূর্ণ সব দার্শনিক রচনা। এসব লেখা দক্ষিণ এশিয়া থেকে পারস্য ও আরব হয়ে ছড়িয়ে পড়েছিল ইউরোপ পর্যন্ত। আধুনিককালে মুক্ত ও উদার সমাজের যে ধারণা ভারতীয় উপমহাদেশে আলোচিত হয়, তার ভিত্তি এ শতকেই রচিত হয়েছিল বলে মনে করেন নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শনের অধ্যাপক জনার্দন গানেরি (এ বছর তিনি টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ে বিমল মতিলাল ডিস্টিংগুইশড প্রফেসরশিপের দায়িত্ব নেবেন)।
অধ্যাপক জনার্দন সতেরো শতকের একটি বিশেষ বছরের প্রতি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন—পলাশীর যুদ্ধের ১০১ বছর আগে—১৬৫৬ সাল। ইবন আল-আরাবির ওয়াহদাতুল ওয়াজুদ বা ‘অস্তিত্বের ঐক্য’ ধারণাকে কেন্দ্র করে মোগল সম্রাট আকবরের আমলে ধর্মীয় সমতা প্রতিষ্ঠার যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, তা পূর্ণতা পায় শাহজাদা দারা শুকোর সবচেয়ে বড় প্রকল্প, ৫২টি উপনিষদ ফার্সি ভাষায় অনুবাদের মাধ্যমে। এ প্রকল্প বাস্তবায়নে দারা শুকো বেনারসের অনেক দ্বিভাষী পণ্ডিতকে নিয়োগ করেছিলেন এবং এ অনুবাদ সম্পন্ন হয়েছিল আলোচিত ১৬৫৬ সালে। দারা শুকো এ অনুবাদের শিরোনাম দিয়েছিলেন সিরর-ই-আকবর (নিগূঢ় রহস্য বা গোপন মর্মবাণী)। দারা শুকো রচিত কয়েকটি গ্রন্থ মজমা-উল-বাহরায়েন, সাফিনাত উল-আউলিয়া, সকিনাৎ উল-আউলিয়া, রিসালা-ই-হকনামা, তরিকত-উল-হাকিকত, হাসানাত-উল-আরিফিন, ইকসির-ই-আজম। কবিতার প্রতি দারার ভালোবাসা ছিল, কবিতা লিখেছেনও। দারা তার লেখায় বিভিন্ন সময় মওলানা জালালউদ্দীন রুমি, জামি, সানাই, নিজামি, ফরিদ-উদ-দিন আত্তার, আমির খসরু, গাজ্জালি, আল-আরাবি, শামস-ই-তাবরেজী, হাফিজ, সাদির কবিতা কিংবা রচনা থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছেন। দারার জীবনীকার বিক্রম জিৎ হাসরাতের মতে, রুমি, জামি ও সানাই ছিলেন দারা শুকোর সবচেয়ে প্রিয় কবি। দারা কবিদের পৃষ্ঠপোষকতাও করেছেন। কবি মির্জা রাদি দানিশের (মৃত্যু ১৬৬৫ খ্রি.) একটি গজল শুনে দারা তাকে এক লাখ রুপি উপহার দিয়েছিলেন।