প্রশান্ত মহাসাগরে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্য হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জে সড়ক নির্মাণ হবে সাগরে ফেলা প্লাস্টিক বর্জ্য ও মাছ ধরার পরিত্যক্ত জাল দিয়ে। এ নিয়ে প্রাথমিক একটি গবেষণায় ইতিবাচক ফলাফলও পাওয়া গেছে। হাওয়াই প্যাসিফিক ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর মেরিন ডেব্রিস রিসার্চের (সিএমডিআর) গবেষক জেরেমি অ্যাক্সওয়ার্থি আমেরিকান কেমিক্যাল সোসাইটির (এসিএস) ২০২৬ সালের বসন্তকালীন সম্মেলনে এ গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করেন।
দ্বীপাঞ্চল হওয়ায় হাওয়াইয়ে প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহার ব্যয়বহুল ও জটিল। প্রতিনিয়তই সেখানকার উপকূলে ভেসে আসে বিপুল পরিমাণ সামুদ্রিক প্লাস্টিক বর্জ্য। ভাসতে দেখা যায় পানিতেও। এ সমস্যার সমাধানে গবেষকেরা নতুন একটি উপায় খুঁজে বের করেছেন। সেটি হলো পরিত্যক্ত মাছ ধরার জাল ও গৃহস্থালি প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবহার করে সড়কের অ্যাসফল্ট তৈরি।
প্রাথমিক ফলাফলে দেখা গেছে, এ পদ্ধতি প্লাস্টিক বর্জ্যকে ল্যান্ডফিলে ফেলা বা সমুদ্রে ছড়িয়ে পড়ার বদলে কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। জেরেমি অ্যাক্সওয়ার্থি বলেন, ‘আমাদের গবেষণার লক্ষ্য ছিল হাওয়াইয়ের সড়কে পুনর্ব্যবহৃত প্লাস্টিক ব্যবহার পরিবেশগতভাবে দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত কিনা, তা যাচাই করা। দ্বীপের প্লাস্টিক বর্জ্য পুনর্ব্যবহার করা গেলে তা যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে নিয়ে যাওয়া, পুড়িয়ে ফেলা বা এরই মধ্যে প্রায় পূর্ণ হয়ে যাওয়া ল্যান্ডফিলগুলোয় ফেলার প্রয়োজনীয়তা কমে যাবে। এতে পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক—উভয় ধরনের ব্যয়ই হ্রাস পাবে।"
হাওয়াইয়ের অধিকাংশ সড়কে পলিমার-মডিফায়েড অ্যাসফল্ট (পিএমএ) ব্যবহার করা হচ্ছে ২০২০ সাল থেকে। এটি সাধারণ অ্যাসফল্টের তুলনায় বেশি শক্তিশালী ও টেকসই। নমনীয় হওয়ায় তা সহজে ফাটে না। দেবে যায় না এবং পানিজনিত ক্ষতিও কম হয়। হাওয়াইয়ের উষ্ণ ও আর্দ্র জলবায়ুর জন্য এটি বিশেষভাবে উপযোগী।
পিএমএ তৈরিতে সাধারণত স্টাইরিন-বুটাডিয়েন-স্টাইরিন (এসবিএস) নামের একধরনের কোপলিমারের দানা গলিয়ে তা পেট্রোলিয়ামজাত অ্যাসফল্ট বাইন্ডারের সঙ্গে মেশানো হয়। পরে সেই বাইন্ডারের সঙ্গে উত্তপ্ত পাথর ও বালু মিশিয়ে সড়কে বিছিয়ে দেয়া হয়। গবেষকদের প্রশ্ন ছিল, এই নতুন পলিমারের একটি অংশ কি পরিত্যক্ত প্লাস্টিক দিয়ে প্রতিস্থাপন করা সম্ভব? একই সঙ্গে তারা জানতে চেয়েছিলেন, রিসাইকেলড বা পুনর্ব্যবহৃত প্লাস্টিকযুক্ত সড়ক দীর্ঘমেয়াদে ভালো থাকবে কিনা এবং সেখান থেকে মাইক্রোপ্লাস্টিক বা ক্ষতিকর রাসায়নিক পরিবেশে ছড়িয়ে পড়বে কিনা।
এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই সিএমডিআরের পরিচালক ও পরিবেশ রসায়নবিদ জেনিফার লিঞ্চের নেতৃত্বাধীন গবেষক দলের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ শুরু করে হাওয়াই ডিপার্টমেন্ট অব ট্রান্সপোর্টেশন (এইচডিওটি)। সংস্থাটির পক্ষ থেকে গবেষকদের দুটি দায়িত্ব দেয়া হয়। প্রথমটি ছিল, প্লাস্টিক অ্যাসফল্ট তৈরিতে হাওয়াইয়ের সাগর থেকে উদ্ধার করা পরিত্যক্ত মাছ ধরার জাল ব্যবহার করা।
এ বিষয়ে গবেষক দলের প্রধান জেনিফার লিঞ্চ বলেন, ‘অন্যস্থান থেকে ভেসে আসা পরিত্যক্ত মাছ ধরার জালই হাওয়াইয়ের সামুদ্রিক প্লাস্টিক দূষণের সবচেয়ে বড় কারণ। সিএমডিআরের বাউন্টি প্রজেক্টের মাধ্যমে লাইসেন্সধারী জেলেদের সামুদ্রিক বর্জ্য সংগ্রহের জন্য আর্থিক প্রণোদনা দেয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে এখন পর্যন্ত প্রশান্ত মহাসাগর থেকে ৮৪ টন পরিত্যক্ত মাছ ধরার সরঞ্জাম অপসারণ করা হয়েছে।’"
গবেষকদের জন্য এইচডিওটির পক্ষ থেকে বেধে দেয়া দ্বিতীয় দায়িত্ব ছিল, পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি অ্যাসফল্ট থেকে প্রচলিত অ্যাসফল্টের তুলনায় বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক নির্গত হয় কিনা, তা নির্ধারণ করা।
লিঞ্চ বলেন, "‘আমাদের গবেষণাগারে পরিবেশগত নমুনা থেকে মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত ও তা পরিমাপের জন্য অত্যাধুনিক রাসায়নিক বিশ্লেষণ প্রযুক্তি রয়েছে। সামুদ্রিক বর্জ্য অপসারণ প্রকল্পের সঙ্গে এ সক্ষমতা যুক্ত হওয়ায় আমরা বর্জ্যকে স্থানীয়ভাবে প্রয়োজনীয় দীর্ঘস্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণসামগ্রীতে রূপান্তরের সুযোগ পাচ্ছি।’
উদ্ধার করা প্লাস্টিককে অ্যাসফল্টে ব্যবহারের উপযোগী কাঁচামালে রূপান্তরের জন্য মার্কিন একটি প্রতিষ্ঠানের সহায়তা নেন গবেষকরা। এরপর এইচডিওটি এ দিয়ে পরীক্ষামূলকভাবে সড়ক নির্মাণ করে। স্থানীয় একটি নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় দ্বীপপুঞ্জের একটি দ্বীপের এক আবাসিক এলাকায় সড়কের বিভিন্ন অংশে তিন ধরনের অ্যাসফল্ট ব্যবহার করে নতুন আবরণ দেয়া হয়। এগুলো হলো প্রচলিত পেট্রোলিয়াম-জাত অ্যাসফল্ট, হনলুলুর গৃহস্থালি প্লাস্টিক রিসাইক্লিং কর্মসূচি থেকে পাওয়া পলিইথিলিনযুক্ত অ্যাসফল্ট ও পরিত্যক্ত মাছ ধরার জাল থেকে উদ্ধার করা পলিইথিলিনযুক্ত অ্যাসফল্ট। প্রায় ১১ মাস পর গবেষকেরা প্রতিটি অংশ থেকে সড়কের ধুলা সংগ্রহ করে আশপাশের পরিবেশে মাইক্রোপ্লাস্টিক ছড়িয়ে পড়ার মাত্রা পরীক্ষা করেন।
এজন্য সড়কের ধুলা থেকে বিভিন্ন ধরনের পলিমার আলাদা করা হয়। এর মধ্যে ছিল মাইক্রোপ্লাস্টিক, বড় প্লাস্টিকের টুকরা ও টায়ারের রাবার। পরে পাইরোলাইসিস গ্যাস ক্রোমাটোগ্রাফি-ম্যাস স্পেকট্রোমেট্রি (পাই-জিসি-এমএস) প্রযুক্তি ব্যবহার করে এসব উপাদানের উৎস নির্ধারণ করা হয়।
প্রাথমিক ফলাফলে দেখা গেছে, পুনর্ব্যবহৃত পলিইথিলিনযুক্ত সড়ক প্রচলিত এসবিএস অ্যাসফল্টের তুলনায় বেশি পলিমার নির্গত করেনি। পরীক্ষাগারভিত্তিক কার্যক্ষমতা মূল্যায়ন এবং পরীক্ষামূলক সড়ক থেকে সংগ্রহ করা বৃষ্টির পানির নমুনায়ও একই ধরনের ফল পাওয়া গেছে। যদিও গবেষকেরা মাইক্রোপ্লাস্টিক আকারের কিছু কণা শনাক্ত করেছেন, তবে সেগুলোর খুব অল্প অংশেই পলিইথিলিন ছিল। তাদের ধারণা, প্লাস্টিক অ্যাসফল্ট বাইন্ডারের সঙ্গে এমনভাবে মিশে যায় যে সড়ক ক্ষয় হওয়ার সময় আলাদা প্লাস্টিক নয়, বরং পাথর, অ্যাসফল্ট ও পলিমারের সম্মিলিত কণাই বিচ্ছিন্ন হয়ে বেরিয়ে আসে। গবেষকেরা বর্তমানে সড়ক থেকে নির্গত পলিমারের পরিমাণের সঙ্গে টায়ারের ক্ষয় থেকে উৎপন্ন কণার পরিমাণও তুলনা করছেন।
জেনিফার লিঞ্চ বলেন, বিশ্লেষণে দেখা গেছে, টায়ারের ক্ষয় থেকে উৎপন্ন উপাদানের সংকেত পলিইথিলিনের তুলনায় বহু গুণ বেশি। বিশাল সেই সংকেতের মধ্যে পলিইথিলিনের উপস্থিতি শনাক্ত করতে আমাদের বিশ্লেষণে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে খুঁজতে হয়েছে।"
তবে পুনর্ব্যবহৃত প্লাস্টিকযুক্ত সড়ক দীর্ঘমেয়াদে কতটা টেকসই হবে, তা নিশ্চিত হতে আরো পরীক্ষা প্রয়োজন। তবে গবেষকদের বিশ্বাস, প্রযুক্তিটি সফল হলে হাওয়াইয়ে ল্যান্ডফিলে জমা হওয়া প্লাস্টিক এবং সমুদ্রে ছড়িয়ে থাকা সামুদ্রিক বর্জ্য—উভয়ই উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে।
গবেষণায় অর্থায়ন করেছে হাওয়াই ডিপার্টমেন্ট অব ট্রান্সপোর্টেশন।