আমাদের ছায়াপথ মিল্কিওয়ের কেন্দ্রের বিশাল কৃষ্ণগহ্বরকে ঘিরে অবিশ্বাস্য গতিতে ছুটছে একটি নক্ষত্র। ‘এস৩০১’ নামের নক্ষত্রটি সেকেন্ডে প্রায় ২৫ হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত গতিতে চলতে পারে। এখন পর্যন্ত মিল্কিওয়েতে শনাক্ত হওয়া নক্ষত্রগুলোর মধ্যে এটিই সবচেয়ে দ্রুতগতির। বিজ্ঞানীদের কাছে নক্ষত্রটি আরো গুরুত্বপূর্ণ একটি কারণে। এটি মিল্কিওয়ের কেন্দ্রের অতিবৃহৎ কৃষ্ণগহ্বর ‘স্যাজিটারিয়াস এ’-এর এত কাছ দিয়ে যায় যে এর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে প্রথমবারের মতো কৃষ্ণগহ্বরটির ঘূর্ণনের গতি সরাসরি মাপা সম্ভব হতে পারে।
ইউরোপিয়ান সাউদার্ন অবজারভেটরির ভেরি লার্জ টেলিস্কোপ ইন্টারফেরোমিটার বা ভিএলটিআই ব্যবহার করে এস৩০১ শনাক্ত করেছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। স্যাজিটারিয়াস এ-এর ভর সূর্যের প্রায় ৪০ লাখ গুণ।
এস৩০১ মাত্র ৮ দশমিক ৭ বছরে কৃষ্ণগহ্বরটিকে একবার প্রদক্ষিণ করে। সবচেয়ে কাছে আসার সময় নক্ষত্রটি কৃষ্ণগহ্বর থেকে পৃথিবী ও সূর্যের দূরত্বের প্রায় ১২ গুণ দূরে অবস্থান করে। জ্যোতির্বিজ্ঞানের হিসাবে এটি অত্যন্ত কাছের দূরত্ব।
এ সময় নক্ষত্রটির গতি সেকেন্ডে প্রায় ২৫ হাজার কিলোমিটারে পৌঁছে যায়। এটি আলোর গতির ৮ শতাংশেরও বেশি। একটি বাণিজ্যিক যাত্রীবাহী উড়োজাহাজের গতির তুলনায় এস৩০১ প্রায় এক লাখ গুণ দ্রুত চলতে পারে।
গবেষণাটি গত ১৯ আগস্ট বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী ‘নেচার’-এ প্রকাশিত হয়েছে।
গবেষণার লেখক ও জার্মানির ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর এক্সট্রাটেরেস্ট্রিয়াল ফিজিকসের পিএইচডি গবেষক ফেলিক্স মাং বলেন, এস৩০১-এর কক্ষপথ অত্যন্ত ছোট। এত কাছ দিয়ে কোনো নক্ষত্রকে আগে স্যাজিটারিয়াস এ প্রদক্ষিণ করতে দেখা যায়নি।
আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব অনুযায়ী, কোনো কৃষ্ণগহ্বর ঘুরতে থাকলে তার চারপাশের স্থান ও সময়ের কাঠামোর ওপরও এর প্রভাব পড়ে। একে অনেকটা নিজের সঙ্গে চারপাশের স্থান-কালকে টেনে ঘোরানোর মতো ঘটনা হিসেবে দেখা যায়। এর প্রভাবে কৃষ্ণগহ্বরের খুব কাছে থাকা নক্ষত্রের কক্ষপথে সামান্য পরিবর্তন হওয়ার কথা।
এস৩০১ এত কাছে দিয়ে ঘোরে যে বিজ্ঞানীরা সেই পরিবর্তন শনাক্ত করার আশা করছেন। তাদের ধারণা, আগামী ১০ বছরের পর্যবেক্ষণ থেকে স্যাজিটারিয়াস এ কত দ্রুত ঘুরছে তা সরাসরি নির্ণয় করা সম্ভব হতে পারে। এতে আইনস্টাইনের তত্ত্বও নতুনভাবে পরীক্ষা করার সুযোগ পাওয়া যাবে।
এত ক্ষীণ একটি নক্ষত্র শনাক্ত করাও সহজ ছিল না। আকাশে পরিচিত উজ্জ্বল নক্ষত্র বিটেলজিউসের তুলনায় এস৩০১ প্রায় ২০০ কোটি গুণ ম্লান। তাই চিলির পারানাল অবজারভেটরিতে থাকা চারটি আট মিটার টেলিস্কোপের আলো একসঙ্গে ব্যবহার করেছেন গবেষকরা। এতে কার্যত একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ভার্চুয়াল টেলিস্কোপ তৈরি হয়।
গবেষকরা ২০২৩ সালের প্রথম দিকে প্রথম এস৩০১-এর উপস্থিতি স্পষ্টভাবে শনাক্ত করেন। আগের তথ্য বিশ্লেষণ করে তারা ২০১৭ সাল পর্যন্ত নক্ষত্রটির কক্ষপথ পুনর্গঠন করতে পেরেছেন। দেখা গেছে, ২০২৩ সালের শুরুর দিকে এটি সর্বশেষ স্যাজিটারিয়াস এ-এর সবচেয়ে কাছ দিয়ে অতিক্রম করে।
বিজ্ঞানীদের ধারণা, এস৩০১ এত কাছে জন্ম নেয়নি। এটি সম্ভবত একসময় দুটি নক্ষত্রের একটি যুগল ব্যবস্থার অংশ ছিল। স্যাজিটারিয়াস এ-এর প্রচণ্ড মহাকর্ষীয় শক্তি সেই যুগলকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। এস৩০১ কৃষ্ণগহ্বরের টানে আটকে যায় এবং অন্য নক্ষত্রটি প্রচণ্ড গতিতে ছিটকে যায়। সেটি হয়তো মিল্কিওয়ে থেকেও বেরিয়ে গেছে।
এস৩০১ আবার ২০৩১ সালে কৃষ্ণগহ্বরটির সবচেয়ে কাছাকাছি পৌঁছাবে। আগামী এক দশক ধরে নক্ষত্রটির অন্তত দুটি পূর্ণ কক্ষপথ পর্যবেক্ষণ করতে চান বিজ্ঞানীরা। তাদের আশা, সেই তথ্যই প্রথমবারের মতো মিল্কিওয়ের কেন্দ্রের কৃষ্ণগহ্বরের ঘূর্ণন সরাসরি মাপার সুযোগ করে দেবে।