বর্তমান বিশ্বের প্রযুক্তি ও বাণিজ্যের ময়দানে সবচেয়ে আলোচিত, বিতর্কিত ও প্রভাবশালী নাম ইলোন মাস্ক। মঙ্গল গ্রহে বসতি স্থাপন থেকে শুরু করে পৃথিবীতে বৈদ্যুতিক গাড়ি বিপ্লব কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা— সবখানেই তার আধিপত্য। তবে সাফল্যমণ্ডিত এই ব্যক্তির পেছনের বাস্তব মানুষটি ঠিক কেমন? বাইরে প্রদর্শিত ‘শক্তপোক্ত ইমেজ’ আর গভীর ব্যক্তিগত সংগ্রাম ও অসংখ্য বিপর্যয়ে সমন্বিত এক জীবনশৈলী মূলত তার সত্তাকে ব্যাখ্যা করে। আর এই বায়োগ্রাফিতে তার শৈশব-কষ্ট, যৌবনের বিতর্ক, ব্যবসায়িক উত্থান-পতন, ব্যক্তিগত জীবন ও দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি আলোকপাত করা হয়েছে, যা তাকে আধুনিক বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী ও বিতর্কিত ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে।
তবে তার আকাশচুম্বী এই সাফল্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক যন্ত্রণাকাতর শৈশব, আইনি জটিলতা এবং এক বিশাল ও অদ্ভুতুড়ে পারিবারিক জীবনের গল্প। মূলত নিজের তৈরি করা ইমেজ বা জনমূর্তির বাইরে ইলোন মাস্কের আসল রূপটি কেমন, তা অনুসন্ধান করলে বেরিয়ে আসে এক প্রখর প্রতিভাবান ব্যক্তিত্বের ছবি। একজন মানুষ কীভাবে ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি আর সামাজিক বিচ্ছিন্নতাকে জয় করে আধুনিক ইতিহাসের গতিপথ বদলে দিচ্ছেন, সেই চিত্র উঠে এসেছে ওয়াল্টার আইজ্যাকসনের লেখা ইলোন মাস্কের জীবনী এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মিডিয়ার নানা অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে।
মাস্কের শৈশবের ছবি
ইলোন রিভ মাস্কের জন্ম ১৯৭১ সালের ২৮ জুন দক্ষিণ আফ্রিকার প্রিটোরিয়ায়। সে সময় দেশটিতে বর্ণবাদী শাসন বা বর্ণবৈষম্য চরম পর্যায়ে ছিল। যদিও তিনি এক অবস্থাপন্ন পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, কিন্তু তার অভ্যন্তরীণ জগত ছিল ভয়, একাকীত্ব ও কোথাও পালিয়ে যাবার তীব্র আকাঙ্ক্ষায় ঘেরা। ইলোনের পরিবারে আর্থিক সংকট না থাকলেও মানসিক পরিকাঠামো ছিল ভিন্নধর্মী ও উগ্র। তার বাবার নাম এরল মাস্ক। পেশায় তিনি ছিলেন একজন ইলেক্ট্রোমেকানিক্যাল প্রকৌশলী ও পাইলট।
ইলোন মাস্কের বাবা এরল মাস্ক। পেশায় তিনি একজন ইলেক্ট্রোমেকানিক্যাল প্রকৌশলী ও পাইলট ছিলেন
এরল ছিলেন অত্যন্ত প্রতিভাবান, কিন্তু তার আচরণজনিত বহুমাত্রিক সমস্যার কারণে পরিবারে একটি অস্থির মানসিক পরিবেশ সৃষ্টি করেছিলেন। ইলোন নিজেও পরবর্তীতে তার শৈশবকে ‘দুর্দশার সময়’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। আর এর জন্য নিজের বাবাকেই তিনি দায়ী করেছেন।
বায়োগ্রাফার ওয়াল্টার আইজ্যাকসন জানিয়েছেন, এরলের আচরণ ছিল অত্যন্ত ভয়ঙ্কর। কখনো তিনি ছিলেন খুব মিশুক, আবার পরক্ষণেই তিনি ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতেন। দিনের পর দিন ইলোনকে তিনি মানসিকভাবে নির্যাতন করতেন। এমনকি তাকে ‘মূল্যহীন’ বা ‘গাধা’ বলেও গালিগালাজ করতেন। এই পরিবেশ ইলোনের মনে এমন এক গভীর ক্ষত তৈরি করে, যা তার পরবর্তী জীবনের কর্মপদ্ধতিতেও ছাপ ফেলেছে।
এছাড়া ইলোনের পারিবারিক সম্পদের উৎস নিয়েও রয়েছে দীর্ঘ বিতর্ক। বিভিন্ন অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, জাম্বিয়ার একটি পান্না খনি থেকে মাস্ক পরিবারের সম্পদের বড় অংশ এসেছিল। যদিও ইলোন নিজের ‘স্বনির্ভর’ ইমেজ ধরে রাখতে এই খনির অস্তিত্ব অস্বীকার করেন। কিন্তু এটি আপাতত স্পষ্ট যে সেই সম্পদই তাকে শৈশবে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার সুযোগ করে দিয়েছিল।
অন্যদিকে, ইলোন মাস্কের শৈশবের মানসিক সংগ্রামকে আরো তিক্ত করে তুলেছিল তার স্কুল জীবনের অভিজ্ঞতাগুলো। স্বভাবগত দিকে তিনি ছিলেন শান্ত, নির্জনতাপ্রিয় ও প্রচণ্ড রকমের বইপড়ুয়া। দক্ষিণ আফ্রিকার উগ্র ও পেশিবহুল সংস্কৃতিতে তার এই ‘বুদ্ধিজীবী’ সুলভ আচরণ সহপাঠীদের কাছে হাসির পাত্র ছিল, যা এক সময় চরম বিরোধিতায় রূপ নেয়। সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনাটি ঘটে ব্রায়ানস্টন হাই স্কুলে। সেখানে একদল সহপাঠী তাকে উঁচু সিঁড়ি থেকে ফেলে দেয় এবং অচেতন না হওয়া পর্যন্ত নৃশংসভাবে মারধর করে। এই আঘাত এতটাই গুরুতর ছিল যে, তাকে এক সপ্তাহ পর্যন্ত হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকতে হয়েছিল এবং পরবর্তীতে তার নাকের হাড়ের বক্রতা সারাতে জটিল অস্ত্রোপচারও করাতে হয়। কিন্তু ট্র্যাজেডি হলো, এতোকিছুর পরও হাসপাতাল থেকে ফেরার পর তার বাবা তাকে সান্ত্বনা দেয়ার বদলে উল্টো এক ঘণ্টা বকাঝকা করেছিলেন।
এই যে একটা নিরাপদ আশ্রয়ের অভাব— এটাই ইলোনের ভেতরে ‘বাস্তবতাকে নিজের মতো করে দেখার’ এক প্রবল শক্তি তৈরি করে দেয়। আর এ অভিজ্ঞতাগুলো তার মধ্যে এক ধরনের স্ব-নির্ভরতা গড়ে তুলেছিল যা পরবর্তীতে তার ভবিষ্যৎ জীবনে দৃঢ় সংকল্পের ভিত তৈরিতে আরো সাহায্য করেছিল।
মাস্কের সঙ্গে তার ভাই কিমবাল এবং বোন টোসকা
ঘরের অশান্তি ও বিদ্যালয়ের কঠোরতা থেকে পালিয়ে তিনি সাহিত্য ও বিজ্ঞানচিন্তা দিয়ে নিজেকে ডুবিয়ে রাখতেন। মাত্র ১০ বছর বয়সেই তিনি দশ ঘণ্টা করে প্রতিদিন বই পড়তেন। এমনকি তিনি একাই কমোডোর ভিআইসি‑২০ কম্পিউটারে প্রোগ্রামিং শিখেছিলেন। আবার ১২ বছরেরও কম বয়সেই তিনি নিজের বানানো ‘ব্লাস্টার’ নামে একটি ভিডিও গেম ৩০০ ডলারে বিক্রি করেছিলেন। এই ছোট ছোট উদ্যোগই তার বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রযুক্তিগত আগ্রহের প্রথম দিকের ইঙ্গিত ছিল।
১৭ বছর বয়সে উচ্চ মাধ্যমিক পাসের পর তিনি দক্ষিণ আফ্রিকা ছেড়ে কানাডার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। মূলত বাধ্যতামূলক সেনাবাহিনীতে অংশগ্রহণ এড়িয়ে যাওয়ার জন্য মায়ের কানাডীয় নাগরিকত্বের সূত্র ধরে তিনি মন্ট্রিয়ালে পৌঁছান। সেখানে মাত্র ১০০ ডলার ও বইয়ের একটি লাগেজ নিয়ে তিনি হাজির হন এবং সেখানের কুইন্স ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হন। কানাডার শুরুর সেই দিনগুলো ছিল তার জন্য খুব কষ্টের। পরে ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় তার প্রথম স্ত্রী জাস্টিন উইলসনের সাথে পরিচয় হয়। পরের দিকে পেনসিলভানিয়া ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করে তিনি পদার্থবিজ্ঞান ও অর্থনীতিতে দ্বৈত ডিগ্রি অর্জন করেন। পেনসিলভানিয়াতে পড়ার সময় টিউশন ফি জোগাড় করতে ইলোন তার সহপাঠী ও সহকর্মীদের সাথে একটি বড় ঘর ভাড়া নিয়ে সেখানকে ‘নাইটক্লাব’ এ রূপান্তর করেছিলেন।
নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে পিএইচডি করতে গিয়ে মাত্র দুই দিনেই তা ছেড়ে দেন ইলোন মাস্ক। উদ্দেশ্য ছিল ব্যবসায়িক জগতে প্রবেশ করা। সে লক্ষ্য থেকেই ১৯৯৫ সালে ইলোন মাস্ক তার ছোট ভাই কিমবাল মাস্ক এর সঙ্গে মিলে ‘জিপ ২’ (Zip2) নামের একটি কোম্পানি শুরু করেন। এছাড়া গ্রেগ কুরি নামে এক ব্যক্তিও এই কোম্পানির সহ-প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে তাদের সঙ্গে কাজ করেছিলেন। কোম্পানিটি ছিল একটি অনলাইন সিটি গাইড বা বিজনেস ডিরেক্টরি, যা সংবাদপত্রের জন্য মানচিত্র ও ব্যবসায়িক তথ্য সরবরাহ করত। সাম্প্রতিক বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, সেই শুরুর দিনগুলোতে মাস্ক ভ্রাতৃদ্বয় মূলত অবৈধ অভিবাসী হিসেবেই যুক্তরাষ্ট্রে কাজ করছিলেন।
Zip2 এর লোগো
১৯৯৯ সালে তৎকালীন টেক জায়ান্ট ‘কমপ্যাক’ ৩০৭ মিলিয়ন ডলারে জিপ ২ কিনে নেয়। এই চুক্তি থেকে ইলোন ব্যক্তিগতভাবে ২২ মিলিয়ন ডলার পান। পাশাপাশি মাত্র ২৭ বছর বয়সেই মাল্টি-মিলিয়নিয়ারের তালিকায় নাম লেখান। জিপ ২ বিক্রির সেই অর্থ দিয়ে তিনি ‘এক্স ডট কম’ (X.com) নামে একটি অনলাইন ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেন, যা পরবর্তীতে বিশ্বখ্যাত পেমেন্ট গেটওয়ে ‘পেপ্যাল’ এ রূপান্তরিত হয়।
ঠিক এই সময়েই ইলোনের পেশাগত জীবনের সাফল্যের সমান্তরালে ব্যক্তিগত জীবনেও বড় পরিবর্তন আসে। তিনি তার প্রথম স্ত্রী জাস্টিন উইলসনকে বিয়ে করেন। ২০০০ সালের শেষের দিকে এই নবদম্পতি যখন দীর্ঘ প্রতীক্ষিত হানিমুনের উদ্দেশ্যে সিডনিগামী বিমানে ওঠেন, তখনই ইলোনের ব্যবসায়িক জীবনে এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঝড় নেমে আসে।
ইলোন মাস্ক যখন সিডনি যাওয়ার জন্য বিমানে ছিলেন, তখন তার অনুপস্থিতিতে কোম্পানির বোর্ড অব ডিরেক্টরস বা পরিচালনা পর্ষদ একটি জরুরি সভা ডাকে। ইলোনের কঠোর ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি ও কিছু প্রযুক্তিগত সিদ্ধান্তের বিষয়ে বোর্ডের সদস্যদের সঙ্গে আগে থেকেই তার বিরোধ চলছিল। তিনি ছুটিতে থাকা অবস্থায় বোর্ড তাকে সিইও পদ থেকে সরিয়ে তার জায়গায় পিটার থিয়েলকে নিয়োগ দেয়।
পিটার থিয়েল ও ইলোন মাস্ক
বিমানের চাকা মাটিতে ছোঁয়া মাত্রই ইলোন এই দুঃসংবাদ পান। তাৎক্ষণিকভাবে তিনি হানিমুন বাতিল করে ক্যালিফোর্নিয়ায় ফিরে আসেন। বোর্ডকে বুঝিয়ে পুনরায় পদ ফিরে পাওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করেও তিনি ব্যর্থ হন। নিজের প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি থেকে এভাবে সিইও পদ হারানোটা ছিল তার জন্য বড় ধরনের অপমান বা অপদস্থ হওয়ার ঘটনা।
তবে সিইও পদ হারালেও কোম্পানির একজন বড় শেয়ারহোল্ডার হিসেবে থেকে যান ইলোন। এর দুই বছর পর, ২০০২ সালে বিশ্বখ্যাত ই-কমার্স সাইট ‘ই-বে’ (eBay) ১.৫ বিলিয়ন ডলারে পেপ্যাল কিনে নেয়। তখন ইলোন তার শেয়ারের বিনিময়ে নগদ ১৬৫ মিলিয়ন ডলার পান। আর এই অর্থই ছিল পরবর্তীতে ইলোন মাস্কের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ‘স্পেসএক্স’ এবং বৈদ্যুতিক গাড়ির বিপ্লব ‘টেসলা’ গড়ে তোলার মূল পুঁজি।
মাস্কের প্রেমিকা ও প্রথম স্ত্রী জাস্টিন উইলসন
২০০৮ সাল ছিল তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়। স্পেসএক্সের প্রথম তিনটি রকেট উৎক্ষেপণই ব্যর্থ হয়। আর এ সময় টেসলাও ছিল দেউলিয়া হওয়ার পথে। একই সময়েই প্রথম স্ত্রী জাস্টিনের সাথে তার বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে। প্রায় নিঃস্ব হয়ে যাওয়া ইলোন তার শেষ ৪০ মিলিয়ন ডলার টেসলায় ঢেলে দেন। শেষ পর্যন্ত বড় দিনের আগের রাতে টেসলা বিনিয়োগ পায় এবং নাসা স্পেসএক্সকে ১.৬ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি দেয়।
ব্যবসায়িক সাফল্যের সঙ্গে ইলোনের ব্যক্তিগত জীবনও ক্রমেই জটিল হতে থাকে। ২০২৬ সাল নাগাদ ইলোন মাস্ক ১৪ সন্তানের জনক হয়েছেন, যাদের মায়েরা চারজন ভিন্ন নারী। তার প্রথম স্ত্রী জাস্টিনের ঘরে ছয় সন্তান জন্মায়। এদের মধ্যে প্রথম সন্তান নেভাদা আলেকজান্ডার এসআইডিএস এ আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। এরপর আইভিএফ পদ্ধতির মাধ্যমে তাদের যমজ এবং ট্রিপলেট সন্তান হয়।
২০১০ সালে স্কটল্যান্ডের একটি ঐতিহাসিক দুর্গে ইলোন মাস্ক জাঁকজমকপূর্ণভাবে অভিনেত্রী তালুলাহ রাইলিকে বিয়ে করেন
পেপ্যাল বিক্রির পর ইলোন যখন মহাকাশ গবেষণা ও বৈদ্যুতিক গাড়ি নিয়ে ব্যস্ত, তখনই লন্ডনের একটি নাইটক্লাবে তালুলাহ রাইলির সঙ্গে তার পরিচয় হয়। ২০১০ সালে স্কটল্যান্ডের একটি ঐতিহাসিক দুর্গে তারা জাঁকজমকপূর্ণভাবে বিয়ে করেন। তবে ইলোনের কর্মব্যস্ততা ও কঠোর স্বভাবের কারণে দুই বছরের মাথায় তাদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়। ২০১২ সালে তারা পারস্পরিক সম্মতিতে প্রথমবার বিবাহবিচ্ছেদ করেন। সে সময় ইলোন টুইট করেছিলেন, ‘এটি একটি চমৎকার দুই বছর ছিল। আমি তোমাকে সবসময় ভালোবাসব। তুমি কাউকে একদিন খুব সুখী করবে।’
তালুলাহ রাইলি ও ইলোন মাস্ক
প্রথম বিচ্ছেদের মাত্র এক বছরের মাথায় তারা বুঝতে পারেন যে তারা একে অপরকে ছাড়া থাকতে পারছেন না। ২০১৩ সালে পারস্পরিক সম্মতিতে তারা আবারো বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু দ্বিতীয়বার সংসার শুরু করলেও সম্পর্কের টানাপোড়েন কমেনি। ২০১৪ সালের শেষদিকে ইলোন বিচ্ছেদের আবেদন করে আবার তা প্রত্যাহার করে নেন। শেষ পর্যন্ত ২০১৬ সালে তালুলাহ রাইলি নিজেই বিচ্ছেদের আবেদন করেন এবং তাদের দ্বিতীয় দফার বৈবাহিক সম্পর্কেরও আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, দুইবার বিবাহবিচ্ছেদ হলেও তাদের মধ্যে কোনো তিক্ততা নেই। এখনো তারা একে অপরের ভালো বন্ধু হিসেবে পরিচিত। তালুলাহ রাইলি পরবর্তীতে জানিয়েছিলেন, ইলোনের মতো একজন মানুষের সঙ্গে সংসার করা কঠিন হলেও তার প্রতি রাইলির সম্মানবোধ সবসময়ই অটুট ছিল। এমনকি ইলোন মাস্কের জীবনীলেখক ওয়াল্টার আইজ্যাকসনকেও রাইলি ইলোনের ব্যক্তিত্ব বুঝতে অনেক তথ্য দিয়ে সাহায্য করেছেন।
ইলোন মাস্ক ও কানাডীয় সঙ্গীতশিল্পী গ্রাইমস
২০১৮ সালে কানাডীয় সঙ্গীতশিল্পী গ্রাইমসের সাথে তার পরিচয় হয়। তাদের তিন সন্তানের নাম রাখা হয়েছে অত্যন্ত অদ্ভুত— এক্স, একসা এবং টেকনো। বর্তমানে তারা ‘সেমি সেপারেট’ অবস্থায় থাকলেও সন্তানদের একসঙ্গেই বড় করছেন।
ছেলে এক্স এর সঙ্গে ইলোন মাস্ক
এদিকে ২০২১ সালে জানা যায়, ইলোনের কোম্পানি নিউরালিংকের নির্বাহী শিবন জিলিসের গর্ভেও তার যমজ সন্তান রয়েছে। পরবর্তীতে আরো দুই সন্তান জন্মায় তাদের। এমনকি ২০২৫ সালে প্রভাবশালী অ্যাশলে সেন্ট ক্লেয়ার দাবি করেন, ইলোন তারও এক সন্তানের বাবা।
নিউরালিংকের নির্বাহী শিভন জিলিস ইলোন মাস্কের জমজ সন্তান জন্ম দেন
ইলোন বিশ্বাস করেন যে, মানব সভ্যতাকে টিকিয়ে রাখতে হলে বুদ্ধিমান মানুষের সংখ্যা বাড়ানো জরুরি। যদিও তার সন্তানদের সাথে সম্পর্ক খুব একটা ভালো নয়। বিশেষ করে ইলোন মাস্ক ও তার ট্রান্সজেন্ডার মেয়ে ভিভিয়ান জেনা উইলসনের মধ্যকার তিক্ত সম্পর্কের বিষয়টি ২০২২ সালে প্রকাশ্যে আসে, যখন ভিভিয়ান ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার পরপরই আদালতের মাধ্যমে নিজের নাম ও লিঙ্গ পরিবর্তনের আবেদন করেন। এই আইনি প্রক্রিয়ায় ভিভিয়ান তার বাবার উপাধি ‘মাস্ক’ পুরোপুরি বর্জন করে মায়ের উপাধি গ্রহণ করেন। এ সময় আদালতে দেয়া জবানবন্দিতে তিনি স্পষ্টভাবে বলেছিলেন, ‘আমি আর আমার জৈবিক বাবার সঙ্গে কোনোভাবেই, কোনো উপায়ে বা কোনো রূপে কোনো ধরনের সম্পর্ক রাখতে চাই না।’
ভিভিয়ান উইলসন
বাবা ও সন্তানের এমন তিক্ততার মূলে ছিল নিজেদের মতাদর্শগত সংঘাত। মাস্ক ট্রান্সজেন্ডার অধিকারকে ‘ওক মাইন্ড ভাইরাস’ বলে সমালোচনা করেন। অন্যদিকে ভিভিয়ান মাস্ককে একজন ‘নিষ্ঠুর ও অনুপস্থিত’ বাবা হিসেবে অভিযুক্ত করেছেন।
মাস্কের দাবি, প্রতারণা করে তাকে সন্তানের লিঙ্গ পরিবর্তনের চিকিৎসায় রাজি করানো হয়েছিল। এর ফলে তিনি তার ছেলেকে হারিয়েছেন।
২০২৫-২৬ সালের এই সময়ে ইলোন মাস্ক শুধু একজন প্রযুক্তিবিদ নন, বরং একজন বৈশ্বিক রাজনৈতিক খেলোয়াড় হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। এক্স (সাবেক টুইটার) কিনে নেয়াসহ পপুলিস্ট আন্দোলনের প্রতি সমর্থন ও রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে তিনি প্রচলিত নিয়ম-কানুনের ঊর্ধ্বে যেতে চান। ওয়াল্টার আইজ্যাকসন মাস্কের এই নেতৃত্বকে ‘ডেমন মোড’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। যখন তিনি এই মেজাজে থাকেন, তখন তিনি খুব কঠোর হয়ে ওঠেন, চোখের পলকে প্রতিষ্ঠানের কর্মী ছাঁটাই করেন এবং সবার কাছ থেকে অবিশ্বাস্য পরিশ্রম আদায় করে নেন। এই আচরণ অনেকটা তার বাবার আচরণের মতোই— যেখানে তার তীক্ষ্ণ অহঙ্কার ও নিষ্ঠুর সংকল্প লক্ষ্য করা যায়।
ইলোন মাস্ক এক বিশাল বৈপরীত্যের নাম। একদিকে তিনি যখন মানবতাকে বাঁচাতে রকেট বানাচ্ছেন, অন্যদিকে আবার তখন নিজের সন্তানদের সঙ্গেই তার নড়বড়ে সম্পর্ক। তিনি একাধারে মহাবীর আবার অন্যদিকে এক হাইপার-ক্যাপিটালিস্ট খলনায়ক। কিন্তু ২০২৬ সালের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে এটি অস্বীকার করার উপায় নেই যে, ইলোন মাস্ক আধুনিক ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেয়ার এক অনন্য কারিগর। তার প্রতিটি সিদ্ধান্ত ছিল ঝুঁকিপূর্ণ। যখন কেউই বেসরকারি ভাবে মহাকাশ গবেষণায় বিনিয়োগের কথা ভাবেনি, তিনি তখন রকেট তৈরির স্বপ্ন দেখেছিলেন। আবার যখন ইলেকট্রিক গাড়িকে কেবল খেলনা মনে করা হতো, তিনি তখন টেসলার মাধ্যমে গাড়ি শিল্পের মোড়ই ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন।
ইলোন মাস্কের এই দীর্ঘ পথচলায় দক্ষিণ আফ্রিকার প্রিটোরিয়া থেকে সিলিকন ভ্যালির শীর্ষস্থান দখল করার গল্পটি যতটা না মেধার, তার চেয়ে বেশি ছিল জেদ ও সাহসিকতার। তার এই জেদি মানসিকতার পেছনে যেমন শৈশবের যন্ত্রণার প্রভাব রয়েছে, তেমনি রয়েছে বিশ্বকে বদলে দেয়ার এক তীব্র হাহাকার। ভবিষ্যতে ইলোন মাস্কের নাম কীভাবে লেখা হবে তা সময়ই বলে দেবে। কিন্তু বর্তমানে তিনি এমন এক অবস্থানে রয়েছেন যেখানে মাস্ক সম্পর্কিত প্রতিটি টুইট বা প্রতিটি নতুন প্রজেক্ট বিশ্ব অর্থনীতিকে প্রভাবিত করে। মঙ্গল গ্রহে মানুষের পা রাখার যে স্বপ্ন তিনি দেখছেন, তা সফল হলে তিনি হয়ে উঠবেন সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্বপ্নদ্রষ্টা। আর যদি তার এই দর্শন কোনো বিপর্যয় নিয়ে আসে, তবে তিনি হবেন এক বড় সতর্কবার্তা। তবে আপাতত ইলোন মাস্ক তার নিজস্ব কক্ষপথে ছুটে চলছেন, যেখানে বাধা বলতে কেবল তার নিজের তৈরি করা নতুন কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষা।
ইলোন মাস্কের জীবন নিয়ে লেখা আইজ্যাকসনের জীবনীতে দেখা যায়, তিনি অত্যন্ত একা একজন মানুষ। তার এই একাকীত্বই হয়তো তাকে ক্রমাগত নতুন নতুন কাজের দিকে ঠেলে দেয়। সোশ্যাল মিডিয়াতে তার সক্রিয়তা বা বিতর্কিত মন্তব্য অনেক সময় তার মূল কাজকে আড়াল করে দেয়। কিন্তু দিনশেষে তিনি একজন প্রখর প্রকৌশলী। প্রতিটি ইঞ্জিনের কাজ বা প্রতিটি কোডিংয়ের সূক্ষ্ম দিক তিনি নিজে তদারকি করেন। তার এই গভীর কৌতূহলই তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে। পারিবারিক জীবনের এই বিশাল ব্যাপ্তি আর শিশুদের প্রতি তার জনসংখ্যা তত্ত্বের প্রয়োগ তাকে একজন প্রথাগত বাবার চেয়ে একজন বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনাকারীর মতো উপস্থাপন করে। তার সন্তানদের অদ্ভুত নামগুলো যেন তারই প্রমাণ। তিনি বিশ্বাস করেন যে, পৃথিবী থেকে মানুষ হারিয়ে যাওয়ার চেয়ে বড় বিপদ আর নেই। এই চিন্তা থেকেই তিনি একদিকে মহাকাশে মানুষের আবাস খুঁজছেন, অন্যদিকে পৃথিবীতে মানুষের সংখ্যা বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছেন।
ইলোন মাস্কের কর্মজীবনে আরেকটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হলো ‘দ্য বোরিং কোম্পানি’ এবং ‘নিউরালিংক’। যেখানে টেসলা আর স্পেসএক্স বর্তমান আর ভবিষ্যৎকে দেখছে, সেখানে এই দুটি প্রতিষ্ঠান যথাক্রমে যোগাযোগ ব্যবস্থা আর মানব মস্তিষ্ককে উন্নত করার কাজ করছে। বোরিং কোম্পানির মাধ্যমে তিনি যানজট নিরসনে মাটির নিচে টানেল তৈরির পরিকল্পনা করেছেন। অন্যদিকে নিউরালিংকের লক্ষ্য হলো মানুষের মস্তিষ্কে চিপ স্থাপন করে প্যারালাইসিস বা অন্ধত্বের মতো রোগের চিকিৎসা করা এবং পাশাপাশি মানুষকে এআইয়ের সঙ্গে পাল্লা দেয়ার ক্ষমতা তৈরি করে দেয়া। তার প্রতিটি স্বপ্নই হলিউডের সায়েন্স ফিকশন মুভির মতো শোনালেও, তিনি সেগুলোকে বাস্তবে রূপ দিতে সক্ষম।
তার এই অদম্য যাত্রা পথে অসংখ্য বাধা এসেছে। হাজার বার তার রকেট বিধ্বস্ত হয়েছে, টেসলার স্টক মার্কেটে পতন হয়েছে, কিন্তু মাস্ক কখনোই হার মানেননি। তার মতে, ‘যদি ব্যর্থতা না থাকে, তার মানে আপনি যথেষ্ট উদ্ভাবন করছেন না।’ এই নীতিটিই তাকে বারবার বড় বড় সংকটে ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করেছে। তার চারপাশের মানুষরা তার মেজাজ নিয়ে ভীত থাকলেও তারা স্বীকার করেন যে মাস্ক ছাড়া এই অসম্ভব কাজগুলো কখনোই সম্ভব হতো না।
২০২৫ সালের শেষে এসে দেখা যাচ্ছে ইলোন মাস্ক কেবল টেক জায়ান্ট হিসেবেই থেমে নেই, বরং তিনি মার্কিন প্রশাসনের একজন অন্যতম উপদেষ্টা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তার ‘ডিপার্টমেন্ট অফ গভর্নমেন্ট এফিসিয়েন্সি’ (DOGE) প্রজেক্টটি সরাসরি সরকারি ব্যয় কমানোর লক্ষ্যে কাজ করছে। এটি দেখায়, ইলোন মাস্ক এখন কেবল বেসরকারি খাতেই সীমাবদ্ধ নন, বরং রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণেও তার প্রবল প্রভাব রয়েছে। তার এই রাজনৈতিক প্রভাব অনেক সময় সমালোচনার জন্ম দেয়, বিশেষ করে যখন তিনি সার্বভৌম কোনো দেশের নীতির বিরুদ্ধে কথা বলেন।
ইলোন মাস্কের পুরো জীবনটাকে যদি একটি সিনেমার পর্দার সাথে তুলনা করা যায়, তবে দেখা যাবে সেখানে যেমন হাড়কাঁপানো ট্র্যাজেডি আছে, তেমনি আছে অবিশ্বাস্য সব মোড়। সব মিলিয়ে বলতে গেলে, ইলোন মাস্ক এমন এক মানুষ যাকে কোনো নির্দিষ্ট ছাঁচে ফেলা অসম্ভব। তার জীবনটা যেন অনেকটা সেই রকেটের মতোই, যা মাঝেমধ্যে আকাশেই ধসে পড়ে, আবার কখনো ঠিকই মাধ্যাকর্ষণ ছাড়িয়ে পৌঁছে যায় অজানায়। দক্ষিণ আফ্রিকার সেই ছোট্ট ছেলেটি, যে একসময় ভয়ে সিঁড়ির নিচে লুকিয়ে থাকত কিংবা সহপাঠীদের হাতে মার খেয়ে হাসপাতালে পড়ে থাকত, আজ সে পুরো পৃথিবীর ভাগ্যবিধাতা হয়ে বসে আছে। তার মেজাজ খিটখিটে হতে পারে, সন্তানদের সঙ্গে তার দূরত্ব থাকতে পারে, এমনকি তার রাজনৈতিক মতাদর্শ নিয়েও হাজারো বিতর্ক থাকতে পারে। কিন্তু দিনশেষে এই মানুষটিই আমাদের মঙ্গল গ্রহে যাওয়ার স্বপ্ন দেখাচ্ছেন। তিনি হয়তো আমাদের সবার জন্য একজন ‘পারফেক্ট’ মানুষ নন, কিন্তু তিনি এমন এক কারিগর যিনি পৃথিবীকে গতানুগতিকতার গণ্ডি থেকে বের করে সামনের দিকে ঠেলে দিতে জানেন।