অ্যাকুরিয়ামের নিরীহ পোষা গোল্ডফিশকে যদি মিঠাপানির প্রাকৃতিক জলাশয়ে ছেড়ে দেয়া হয়, তাহলে সেটিই হয়ে উঠতে পারে সেখানকার বাস্তুতন্ত্রের ধ্বংসের কারণ। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব টলেডো ও ইউনিভার্সিটি অব মিসৌরির গবেষকদের নতুন এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে।
পিয়ার-রিভিউড এ গবেষণাটি প্রকাশ হয়েছে জার্নাল অব অ্যানিম্যাল ইকোলজিতে। ‘ইনভেসিভ গোল্ডফিশ ট্রিগার আ রেজিম শিফট ইন এক্সপেরিমেন্টাল লেক ইকোসিস্টেমস অব ভ্যারিইং ট্রফিক স্টেট’ শীর্ষক এ গবেষণায় দেখা যায়, দ্রুত বিস্তারে সক্ষম (ইনভেসিভ) গোল্ডফিশ হ্রদের পরিবেশে নাটকীয় পরিবর্তন ঘটাতে সক্ষম। গবেষকদের মতে, অ্যাকুরিয়ামের মৎস্যপ্রেমী, প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপক এবং নীতিনির্ধারকদের জন্য এ গবেষণার ফলাফল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক সতর্কবার্তা।
গবেষণা দলের প্রধান এবং ইউনিভার্সিটি অব টলেডোর পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগ এবং লেক ইরি সেন্টারের অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর ড. উইলিয়াম হিন্টজ বলেন, পোষা প্রাণী যে পরিবেশের জন্য ভয়ানক উপদ্রব এবং জলজ বাস্তুতন্ত্রের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে উঠতে পারে; সে বিষয়টি "জনসাধারণকে জানানো অত্যন্ত জরুরি। একটি গোল্ডফিশকে প্রকৃতিতে ছেড়ে দেয়ার কাজকে হয়তো মহৎ মনে হতে পারে। কিন্তু এ কাজটেই প্রতিবেশের জন্য বড় ধরনের হুমকির কারণ হতে পারে; সে বিষয়টি এ গবেষণা থেকে স্পষ্ট।
গবেষণার জন্য বড় কয়েকটি উন্মুক্ত কৃত্রিম মিঠাপানির জলাধার (মেসোকসম) তৈরি করা হয়। কৃত্রিমভাবেই এগুলোয় নিয়ে আসা হয় প্রাকৃতিক হ্রদের অনুরূপ প্রতিবেশ। পরীক্ষামূলক এসব বাস্তুতন্ত্রে গোল্ডফিশ (Carassius auratus) ছেড়ে পরে বিভিন্ন সময় হ্রদগুলোয় এর প্রভাব পর্যবেক্ষণ করা হয়।
গবেষণায় দুই ধরনের হ্রদের প্রতিবেশ বিশ্লেষণ করে দেখা হয়। একটি হলো মাছের জন্য পুষ্টি-স্বল্প (অলিগোট্রফিক) প্রতিবেশ। অন্যটি পুষ্টিসমৃদ্ধ (ইউট্রফিক)। উভয় ক্ষেত্রেই দেখা যায়, ছেড়ে দেয়া গোল্ডফিশ হ্রদগুলোর প্রতিবেশের উল্লেখযোগ্য মাত্রায় ক্ষতি করেছে।
গবেষকরা দেখতে পান, পানির গুণগত মান দ্রুত খারাপ হয়েছে। পুষ্টিসমৃদ্ধ জলাশয়ে গোল্ডফিশ ছাড়ার পর পানির স্বচ্ছতা দ্রুত কমে গিয়েছে। একই সঙ্গে পানিতে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বেড়েছে ভাসমান কণার পরিমাণ। এর মধ্য দিয়ে বাস্তুতন্ত্রে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের পরিবর্তন।
পাশাপাশি জলাশয়গুলোয় শামুক, অ্যাম্ফিপড ও জুপ্ল্যাঙ্কটনের মতো ছোট প্রাণীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমে গিয়েছে। গোল্ডফিশের শিকারে পরিণত হওয়া ছাড়াও বিচরণস্থল নষ্ট হওয়ায় সুপেয় পানির জলাধারের খাদ্যশৃঙ্খলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এসব প্রাণীর সংখ্যা কমে গিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে হ্রদের স্থানীয় স্বাভাবিক মৎস্যসম্পদও। গোল্ডফিশের সঙ্গে খাদ্য ও সম্পদের প্রতিযোগিতা এগুলোর স্বাস্থ্যে ফেলেছে নেতিবাচক প্রভাব। সব মিলিয়ে পুষ্টি-স্বল্প ও পুষ্টিসমৃদ্ধ জলাশয়ে প্রভাবের ধরন কিছুটা ভিন্ন হলেও দেখা গেছে, উভয় ক্ষেত্রেই প্রতিবেশে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলেছে গোল্ডফিশ।
গবেষকেরা হ্রদে অতিরিক্ত মৎস্যসম্পদ এবং গোল্ডফিশের একক প্রভাব আলাদাভাবে পর্যালোচনার জন্য দুটি ভিন্ন পরীক্ষামূলক পদ্ধতি—অ্যাডিটিভ ও সাবস্টিটিউটিভ ডিজাইন ব্যবহার করেন। তাদের পর্যালোচনা বলছে, জলজ উদ্ভিদের কিছু পরিবর্তন মোট মাছের সংখ্যার সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও এখানে সবচেয়ে গুরুতর প্রতিবেশগত ক্ষতির জন্য সরাসরি দায়ী ছিল গোল্ডফিশের উপস্থিতি।
গবেষণায় আরেকটি বিষয়ে আলোকপাত করা হয়, সেটি হলো বাস্তুতন্ত্রের মৌলিক পরিবর্তন বা রেজিম শিফট। এক্ষেত্রে বাস্তুতন্ত্র পুরোপুরি বদলে গিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন ও অবনতিশীল একটি পর্যায়ে চলে যায়। এ ধরনের পরিবর্তনের ক্ষেত্রে জলাশয়ের প্রতিবেশকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত কঠিন এবং ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে।
গবেষণা পত্রের সহলেখক ইউনিভার্সিটি অব মিসৌরির কলেজ অব ফুড, অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড ন্যাচারাল রিসোর্সেসের প্রফেসর জনি মরিস ইনস্টিটিউট অব ফিশারিজ, ওয়েটসল্যান্ড অ্যান্ড অ্যাকুয়াটিক সিস্টেমসের পরিচালক ড. রিক রেলিয়া বলেন, ‘গোল্ডফিশ প্রকৃতিতে ছাড়া হলে খুব দ্রুত বড় আকার ধারণ করে। এরপর এগুলো হ্রদের তলদেশের পলিকে নাড়িয়ে দেয়। জলাশয়ের বিপুল পরিমাণ ছোট প্রাণী খেয়ে ফেলে আর স্থানীয় মাছের সঙ্গে খাদ্য ও অন্যান্য সম্পদ নিয়ে প্রতিযোগিতা শুরু করে, যার সামগ্রিক প্রভাব পড়ে গোটা জলাশয়ের বাস্তুতন্ত্রে।
গবেষকদের মতে, গোল্ডফিশের ইনভেসিভ আচরণ মোকাবেলায় এটিকে দ্রুত বিস্তারী প্রজাতি হিসেবে বিবেচনা করা দরকার। আর প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত সংস্থাগুলোর উচিত বুনো জলাশয়ের প্রতিবেশে এগুলোর সংখ্যা ব্যাপক মাত্রায় বেড়ে যাওয়ার আগেই প্রতিরোধ, দ্রুত শনাক্তকরণ এবং নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা। একই সঙ্গে অ্যাকুয়ারিয়ামের প্রাণী প্রকৃতিতে ছেড়ে দেয়ার প্রতিবেশগত প্রভাব সম্পর্কে পোষাপ্রাণীর মালিকদের সচেতন করতে আরো জোরালো জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম প্রয়োজন। যারা বাড়িতে আর গোল্ডফিশ রাখতে চান না, তাদের উচিত মাছগুলো পোষাপ্রাণীর দোকানে ফিরিয়ে দেয়া। অথবা অন্য কোনো অ্যাকুয়ারিয়ামপ্রেমীর কাছে হস্তান্তর করা বা স্থানীয় বন্যপ্রাণী কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে পরামর্শ নেয়া।