ব্ল্যাকবেরি

স্মার্টফোনের পথ দেখিয়ে হারিয়ে যাওয়া এক ব্র্যান্ড

একসময় স্মার্টফোন মানেই ছিল ব্ল্যাকবেরি। ব্যবসায়ী, করপোরেট কর্মকর্তা থেকে শুরু করে বিশ্বের অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তির হাতে দেখা যেত ফোনটি।

দ্রুত ই-মেইল আদান-প্রদান, নিরাপত্তা ও নির্ভরযোগ্যতার জন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছেও এটি ছিল পছন্দের ডিভাইস। একসময় বিশ্বজুড়ে ব্ল্যাকবেরির গ্রাহক সংখ্যা রেকর্ড ৪ কোটি ১০ লাখ ছাড়িয়ে যায়।

কিন্তু প্রযুক্তি বাজারে জনপ্রিয়তার পাশাপাশি পরিবর্তনও খুব দ্রুত আসে। ২০০৭ সালে অ্যাপল আইফোন বাজারে আনার পর সে পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি ব্ল্যাকবেরি। টাচস্ক্রিন ফোনের নতুন যুগে পিছিয়ে পড়ে প্রতিষ্ঠানটি। পরে গুগলের অ্যান্ড্রয়েড অপারেটিং সিস্টেমও বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করে। ফলে ধীরে ধীরে স্মার্টফোন ব্যবসা থেকে হারিয়ে যায় একসময়ের শীর্ষস্থানীয় ব্র্যান্ডটি।

আজকের স্মার্টফোনের মূল ধারণা ও ফিচারের পথপ্রদর্শক বা উদ্ভাবক হিসেবে প্রথমেই নাম আসে ব্ল্যাকবেরির। কোম্পানিটি যাত্রা করে মূলত ব্যবসায়িক যোগাযোগের প্রয়োজনকে কেন্দ্র করে। তখন প্রতিষ্ঠানটির নাম ছিল ‘রিসার্চ ইন মোশন’ বা আরআইএম। ১৯৯৮ সালে কোম্পানিটি বাজারে আনে ইন্টারঅ্যাক্টিভ পেজার ৯৫০। ছোট পর্দা, বোতামযুক্ত কিবোর্ড ছিল এর উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য।

পরের বছর বাজারে আসে ৮৫০ পেজার। এতে মাইক্রোসফট এক্সচেঞ্জ সার্ভারের মাধ্যমে ‘পুশ ই-মেইল’ সুবিধা ছিল। এরপর ২০০০ সালে আরআইএম বাজারে আনে ব্ল্যাকবেরি ৯৫৭। এরপর দ্রুত বাড়তে থাকে প্রতিষ্ঠানটির আয়। বিশেষ করে ব্যবসা ও সরকারি প্রতিষ্ঠানে ব্ল্যাকবেরির ব্যবহার বাড়ায় ১৯৯৯-২০০১ সালের মধ্যে কোম্পানিটির আয় আকাশচুম্বী হয়।

২০০১-০৭ সাল ছিল ব্ল্যাকবেরির সোনালি সময়। তখন বিশ্বের বিভিন্ন বাজারে সম্প্রসারণের পাশাপাশি নতুন পণ্য আনে প্রতিষ্ঠানটি। প্রথমে ব্যবসায়িক বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করলেও পরে সাধারণ গ্রাহকদের জন্যও ফোন তৈরি শুরু করে ব্ল্যাকবেরি। ব্ল্যাকবেরি পার্ল, কার্ভ ও বোল্ড সিরিজ বেশ জনপ্রিয় হয়।

একপর্যায়ে ব্ল্যাকবেরি নামটি শুধু ফোনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। এটি হয়ে ওঠে একটি সামাজিক পরিচয়ের অংশ। অনেকের কাছে ফোনটি ছিল ‘স্ট্যাটাস সিম্বল’।

এর পরই আসে বড় পরিবর্তন। ২০০৭ সালে আইফোন বাজারে আনে অ্যাপল। শুরুতে ব্ল্যাকবেরি আইফোনকে খুব একটা ‘গুরুত্ব’ দেয়নি। প্রতিষ্ঠানটির ধারণা ছিল, এটি মূলত তরুণদের জন্য তৈরি একটি উন্নত মোবাইল ফোন। কিন্তু সে ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়।

আইফোন দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। শুধু সাধারণ গ্রাহক নয়, ব্যবসায়ী ও করপোরেট কর্মকর্তারাও আইফোন ব্যবহার শুরু করেন। অর্থাৎ ব্ল্যাকবেরির মূল বাজারেও ঢুকে পড়ে অ্যাপলের নতুন ফোন। একই সময় বাজারে আসতে থাকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ই-মেইল সুবিধাসম্পন্ন স্মার্টফোন।

ব্ল্যাকবেরি অবশ্য কিছু সময় পর্যন্ত নিজের অবস্থান ধরে রাখে। প্রতিষ্ঠানটি তখনো ব্যবসায়িক ই-মেইলের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত ছিল। অনেক ব্যবহারকারী ব্যবসার কাজে ব্ল্যাকবেরি ও ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য অন্য ফোন বহন করতেন।

আইফোনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে ২০০৮ সালে ব্ল্যাকবেরি বাজারে আনে ‘স্টোর্ম’। এটি ছিল কোম্পানিটির প্রথম টাচস্ক্রিন ফোন। শুরুতে বিক্রি ভালো হলেও পরে ফোনটি নিয়ে গ্রাহকদের অভিযোগ বাড়তে থাকে। এ সময় থেকেই বিনিয়োগকারী, বিশ্লেষক ও গণমাধ্যমের মধ্যে ব্ল্যাকবেরির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে শুরু করে।

অথচ এর মাত্র কিছুদিন আগেও ফোনের বাজারে কোম্পানিটির অবস্থান ছিল বেশ শক্ত। ২০০৯ সালে ফরচুনের দ্রুততম বর্ধনশীল ১০০ কোম্পানির তালিকায় প্রথম স্থান পায় আরআইএম। ২০১০ সালের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের স্মার্টফোন বাজারে কোম্পানিটির হিস্যা ছিল ৪৩ শতাংশ। তখন বিশ্বজুড়ে ব্ল্যাকবেরির গ্রাহকসংখ্যা ৪ কোটি ১০ লাখের বেশি।

এর পরই শুরু হয় পতন। বাজারে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠতে থাকে অ্যান্ড্রয়েড ও আইওএস। ২০১২ সালের নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের স্মার্টফোন বাজারে ব্ল্যাকবেরির হিস্যা নেমে আসে ৭ দশমিক ৩ শতাংশে। একই সময় অ্যান্ড্রয়েডের হিস্যা ছিল ৫৩ দশমিক ৭ শতাংশ ও অ্যাপলের আইওএসের ৩৫ শতাংশ।

শুধু বাজার হারানো নয়, এর প্রভাব পড়ে কোম্পানিটির শেয়ারদরেও। ২০০৮ সালের মাঝামাঝি ব্ল্যাকবেরির শেয়ার সর্বোচ্চ ১৪৭ ডলারে উঠেছিল। কিন্তু ২০১১ সালে শেয়ারদর প্রায় ৮০ শতাংশ কমে যায়। ২০১৪ সালের প্রথম প্রান্তিকে ৮ কোটি ৪০ লাখ ডলার লোকসানের খবর প্রকাশের পর একদিনেই শেয়ারদরে প্রায় ৩০ শতাংশ পতন ঘটে।

ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য বেশ কয়েকটি চেষ্টা চালায় ব্ল্যাকবেরি। কিন্তু কোনোটি সফল হয়নি।

ফলস্বরূপ একসময় যে প্রতিষ্ঠানটি স্মার্টফোনের বাজারে পথ দেখিয়েছিল, এখন সেটি আর স্মার্টফোন ব্যবসায় নেই।

—খবর ও ছবি ইনভেস্টোপেডিয়া

আরও