নক্ষত্রের উল্টো দিকে ঘুরছে ‘বিদ্রোহী’ গ্রহ

সব গ্রহ কি সত্যিই তাদের নক্ষত্রের সঙ্গে একই চাকতি থেকে একই নিয়মে জন্ম নেয়, নাকি কোনো কোনো গ্রহব্যবস্থার জন্মকাহিনী তার চেয়েও অনেক বেশি বিশৃঙ্খল?

সাধারণত একটি নক্ষত্র যে দিকে ঘোরে, তাকে ঘিরে তৈরি হওয়া গ্রহগুলোও একই দিকে প্রদক্ষিণ করে। কিন্তু পৃথিবী থেকে প্রায় ৭৩ আলোকবর্ষ দূরে এমন একটি গ্রহের সন্ধান পেয়েছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা, যেটি তার নক্ষত্রের ঘূর্ণনের ঠিক বিপরীত দিকে প্রদক্ষিণ করছে। অস্বাভাবিক এ গ্রহের নাম জিজে ৩০৯০ বি। জেনেভা বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক একটি গবেষক দল গ্রহটির কক্ষপথ বিশ্লেষণ করে এ তথ্য পেয়েছে। গবেষণাটি ২১ সেপ্টেম্বর বিজ্ঞান সাময়িকী ‘অ্যাস্ট্রোনমি অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোফিজিকস’-এ প্রকাশিত হয়েছে।

জিজে ৩০৯০ বি যে নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ করছে সেটি একটি লাল বামন নক্ষত্র। অর্থাৎ এটি সূর্যের তুলনায় ছোট ও শীতল। ২০২২ সালে প্রথম গ্রহটির সন্ধান পাওয়া যায়। এর ব্যাসার্ধ পৃথিবীর প্রায় ২ দশমিক ২ গুণ এবং ভর প্রায় ৪ দশমিক ৫ গুণ। এ কারণে এটিকে ‘সাব-নেপচুন’ শ্রেণীর গ্রহ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

গ্রহটির সবচেয়ে বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য অবশ্য এর আকার নয়, কক্ষপথ। সাধারণভাবে নক্ষত্র ও গ্রহ তৈরি হয় একই গ্যাস ও ধূলিকণার চাকতি থেকে। সদ্য জন্ম নেয়া নক্ষত্রের চারপাশে ঘূর্ণায়মান এ চাকতি থেকেই ধীরে ধীরে গ্রহ তৈরি হয়। ফলে নক্ষত্র এবং তার গ্রহগুলোর ঘূর্ণন ও প্রদক্ষিণের দিক সাধারণত একই হওয়ার কথা। কিন্তু জিজে ৩০৯০ বি সেই নিয়ম মানছে না।

গবেষকেরা একটি নক্ষত্রের বিষুবীয় তল এবং গ্রহের কক্ষপথের মধ্যকার কোণকে ‘সাই’ দিয়ে প্রকাশ করেন। পৃথিবীর ক্ষেত্রে এ কোণ প্রায় ৭ ডিগ্রি। কিন্তু জিজে ৩০৯০ বির ক্ষেত্রে সেটি প্রায় ১৩৬ ডিগ্রি। অর্থাৎ এর কক্ষপথ শুধু ব্যাপকভাবে কাতই নয়, গ্রহটি নক্ষত্রের ঘূর্ণনের বিপরীত দিকে চলছে। গবেষণার প্রধান লেখক জেনেভা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইয়ান কার্তেরে বলেন, গ্রহটির কক্ষপথ অত্যন্ত বেখাপ্পা হওয়ার পাশাপাশি এটি নক্ষত্রটির বিপরীত দিকে প্রদক্ষিণ করছে, যা বিস্ময়কর।

চিলির লা সিলা অবজারভেটরিতে স্থাপিত নিয়ার-ইনফ্রারেড স্পেকট্রোগ্রাফ ব্যবহার করে এ অস্বাভাবিক কক্ষপথ পরিমাপ করা হয়েছে। যন্ত্রটির উচ্চ সংবেদনশীলতার কারণেই এত ছোট একটি গ্রহের কক্ষপথ ও নক্ষত্রের ঘূর্ণন তলের মধ্যকার কোণ নির্ণয় করা সম্ভব হয়েছে।

এর আগেও অত্যন্ত কাত হয়ে নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণকারী কয়েকটি গ্রহব্যবস্থার সন্ধান মিলেছে। কিন্তু সেসব ক্ষেত্রে সাধারণত কাছাকাছি কোনো বিশাল গ্রহ, বাদামি বামন বা অন্য একটি নক্ষত্রের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এসব ভারী বস্তুর মহাকর্ষীয় টান সময়ের সঙ্গে গ্রহের কক্ষপথ বদলে দিতে পারে।

জিজে ৩০৯০ ব্যবস্থায় অবশ্য এমন কোনো বিশাল সঙ্গী বস্তু খুঁজে পাননি গবেষকেরা। এ ব্যবস্থায় আরো দুটি গ্রহ শনাক্ত হয়েছে, কিন্তু কোনো বিশাল বাইরের গ্রহ বা দূরের সঙ্গী নক্ষত্রের প্রমাণ মেলেনি, যা জিজে ৩০৯০ বির কক্ষপথকে এতটা উল্টে দিতে পারে।

আর এখানেই রহস্য। গবেষকদের একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হলো, নক্ষত্রটি জন্মের পর ভিন্ন দিক থেকে আসা আরেকটি গ্যাস-ধূলির চাকতি নিজের দিকে টেনে নিয়েছিল। সেই দ্বিতীয় চাকতিটি নক্ষত্রের ঘূর্ণন অক্ষের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না; বরং উল্টো দিকে ঘুরছিল। পরে সেই চাকতির মধ্যেই গ্রহগুলো তৈরি হয়ে থাকতে পারে।

এ ব্যাখ্যা সঠিক হলে গ্রহ তৈরির প্রচলিত ধারণায় নতুন মাত্রা যোগ হতে পারে। কারণ এতদিন গ্রহের অত্যন্ত কাত বা উল্টো কক্ষপথ ব্যাখ্যা করতে মূলত বড় কোনো সঙ্গী বস্তুর মহাকর্ষীয় প্রভাবকেই গুরুত্ব দেয়া হতো। গবেষকেরা বলছেন, জিজে ৩০৯০ বি এখন পর্যন্ত কোনো লাল বামন নক্ষত্রকে বিপরীত দিকে প্রদক্ষিণ করতে দেখা প্রথম গ্রহ। একই সঙ্গে এটি এমন একটি বহু-গ্রহ ব্যবস্থা, যেখানে অত্যন্ত বেখাপ্পা কক্ষপথ থাকার পরও তার পেছনে কোনো বিশাল সঙ্গী বস্তুর প্রভাবের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

ফলে এ ‘বিদ্রোহী’ গ্রহটি জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের সামনে নতুন প্রশ্ন তুলেছে—সব গ্রহ কি সত্যিই তাদের নক্ষত্রের সঙ্গে একই চাকতি থেকে একই নিয়মে জন্ম নেয়, নাকি কোনো কোনো গ্রহব্যবস্থার জন্মকাহিনী তার চেয়েও অনেক বেশি বিশৃঙ্খল?

আরও