নেচার কমিউনিকেশন্সে প্রকাশিত গবেষণা

দীর্ঘায়ুর রহস্য উন্মোচনে পথ দেখাবে প্রজাপতি?

হেলিকোনিয়াস প্রজাপতির দীর্ঘায়ুর কথা বিজ্ঞানীরা বহুদিন ধরেই জানতেন। তবে এর কারণ এতদিন স্পষ্ট ছিল না। সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যাগুলোর একটি হলো পূর্ণবয়স্ক অবস্থায় পরাগরেণু খাওয়ার বিরল সক্ষমতা। অধিকাংশ প্রজাপতি মূলত ফুলের মধু খেয়ে বেঁচে থাকে। কিন্তু হেলিকোনিয়াস প্রজাপতি পরাগরেণুও খেতে পারে, যা প্রজাপতিদের মধ্যে অত্যন্ত বিরল বৈশিষ্ট্য। এ ধারণাকে যাচাই করতে গবেষকেরা পরাগরেণুভোজী Heliconius hecale এবং পরাগরেণু না-খাওয়া এর নিকটাত্মীয় Dryas iulia-এর মধ্যে তুলনা করেন।

শতাব্দির পর শতাব্দি ধরে দীর্ঘায়ুর রহস্য ভেদের প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে মানুষ। বিজ্ঞানীদের ধারনা, অবশেষে তারা সে রহস্যভেদের কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন। আর এ রহস্যের সমাধানে তাদের পথ দেখাতে পারে প্রজাপতির কয়েকটি প্রজাতির এক গোত্র হেলিকোনিয়াস (Heliconius)। এটি মানুষের বার্ধক্য ও দীর্ঘায়ু নিয়ে গবেষণার জন্য নতুন একটি আদর্শ জৈবমডেলে পরিণত হতে পারে বলে মনে করছেন তারা।

হেলিকোনিয়াস গোত্রভুক্ত প্রজাতিগুলো প্রজাপতির মধ্যে অন্যতম দীর্ঘজীবী হিসেবে পরিচিত। এগুলোকে দেখা যায় দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকার ক্রান্তীয় রেইনফরেস্টে। এ গোত্রভুক্ত প্রজাপতিগুলো বার্ধক্যের গতি ধীর করে দীর্ঘ সময় সুস্থ থাকার কৌশল অর্জন করেছে বলে নতুন এক গবেষণায় উঠে এসেছে। যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব ব্রিস্টলের বিশেষজ্ঞদের নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণাটি কয়েক দিন আগে নেচার কমিউনিকেশনস সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে।

সাধারণভাবে অধিকাংশ প্রজাপতি পূর্ণবয়স্ক অবস্থায় মাত্র কয়েক সপ্তাহ বেঁচে থাকে। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু হেলিকোনিয়াস প্রজাতি তাদের নিকটাত্মীয় প্রজাতিগুলোর তুলনায় গড়ে প্রায় তিন গুণ বেশি সময় বাঁচে। এমনকি এগুলোর প্রায় এক বছর পর্যন্ত জীবিত থাকারও নজির রয়েছে

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ Heliconius hewitsoni। গবেষকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এ প্রজাতির একটি প্রজাপতি সর্বোচ্চ ৩৪৮ দিন বেঁচেছিল। অন্যদিকে এর নিকটাত্মীয় Dione juno-এর সর্বোচ্চ আয়ু ছিল মাত্র ১৪ দিন। অর্থাৎ সর্বোচ্চ আয়ুর ক্ষেত্রে দুই প্রজাতির মধ্যে পার্থক্য পাওয়া গেছে প্রায় ২৫ গুণ।

গবেষকদের মতে, হেলিকোনিয়াস প্রজাপতি এমন একটি বিশেষ জীবনধারা অর্জন করেছে, যা আয়ু বাড়ানোর পাশাপাশি বার্ধক্যের গতি ধীর করার কৌশল সম্পর্কে নতুন ধারণা দিতে পারে।

স্মিথসোনিয়ান ট্রপিক্যাল রিসার্চ ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীদের সহযোগিতায় আরেকটি বিস্ময়কর তথ্য খুঁজে বের করেছেন গবেষকরা। হেলিকোনিয়াসের একটি প্রজাতি, Heliconius hecale-এর মধ্যে বয়স বাড়লেও এগুলোর মধ্যে চোখে পড়ার মতো শারীরিক অবক্ষয়ের লক্ষণ দেখা যায়নি।

প্রজাপতিগুলোর শারীরিক সক্ষমতা মূল্যায়নে গবেষকেরা গ্রিপ স্ট্রেন্থ বা আঁকড়ে ধরার শক্তির পরীক্ষা ব্যবহার করেন। এতে দেখা যায়, বয়স্ক H. hecale প্রজাপতির শক্তি তরুণ প্রজাপতির মতোই। এগুলোর কর্মক্ষমতায়ও বয়সজনিত কোনো স্পষ্ট অবনতি দেখা যায়নি।

অন্যদিকে তুলনামূলকভাবে স্বল্পায়ু নিকটাত্মীয় Dryas iulia-এর ক্ষেত্রে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শারীরিক সক্ষমতা স্পষ্টভাবে কমতে দেখা গেছে।

বিশেষজ্ঞদের ভাষ্যমতে, অধিকাংশ প্রাণীর ক্ষেত্রে বয়সজনিত যে শারীরিক অবক্ষয় দেখা যায়, হেলিকোনিয়াস গোত্রভুক্ত প্রজাপতি তা থেকে অনেকটাই মুক্ত বলে গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

এ সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে গবেষকেরা প্রজাপতি উদ্যানের তথ্য, এগুলো চিহ্নিত করে অবমুক্ত ও পুনরায় ধরা (mark-release-recapture), পর্যবেক্ষণ এবং নিয়ন্ত্রিত কীটপালনাগারে পরিচালিত পরীক্ষার ফলাফল একত্রে বিশ্লেষণ করেন। এর মাধ্যমে তারা হেলিকোনিয়িনি গোত্রের বিভিন্ন প্রজাতির আয়ু ও বার্ধক্যের ধরণ তুলনা করতে সক্ষম হন।

বিশ্লেষণে দেখা যায়, পরাগরেণু খাওয়া হেলিকোনিয়াস প্রজাপতির গড় ও সর্বোচ্চ আয়ু উভয়ই বেশি। পাশাপাশি তাদের প্রাথমিক মৃত্যুহার কম এবং বার্ধক্যের গতিও পরাগরেণু না-খাওয়া নিকটাত্মীয় প্রজাতিগুলোর তুলনায় ধীর।

হেলিকোনিয়াস প্রজাপতির দীর্ঘায়ুর কথা বিজ্ঞানীরা বহুদিন ধরেই জানতেন। তবে এর কারণ এতদিন স্পষ্ট ছিল না। সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যাগুলোর একটি হলো পূর্ণবয়স্ক অবস্থায় পরাগরেণু খাওয়ার বিরল সক্ষমতা। অধিকাংশ প্রজাপতি মূলত ফুলের মধু খেয়ে বেঁচে থাকে। কিন্তু হেলিকোনিয়াস প্রজাপতি পরাগরেণুও খেতে পারে, যা প্রজাপতিদের মধ্যে অত্যন্ত বিরল বৈশিষ্ট্য। এ ধারণাকে যাচাই করতে গবেষকেরা পরাগরেণুভোজী Heliconius hecale এবং পরাগরেণু না-খাওয়া এর নিকটাত্মীয় Dryas iulia-এর মধ্যে তুলনা করেন।

ফলাফলে দেখা যায়, H. hecale দীর্ঘ সময় ধরে দেহের ওজন ও পেশির কর্মক্ষমতা ধরে রাখতে পারে এবং D. iulia-এর মতো বয়সজনিত শারীরিক অবক্ষয়ের শিকার হয় না।

তবে গবেষণায় আরো দেখা গেছে, খাদ্যতালিকা থেকে পরাগরেণু বাদ দিলেও H. hecale-এর দীর্ঘায়ুর সুবিধা পুরোপুরি হারিয়ে যায় না। পরাগরেণু ছাড়াও এটি তার নিকটাত্মীয় প্রজাতির তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি দিন বেঁচে থাকে।

এ থেকে গবেষকদের ধারণা, শুধু খাদ্য নয়; দীর্ঘ বিবর্তনীয় অভিযোজনও এদের দীর্ঘায়ুর পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

গবেষকদের মতে, প্রাণিজগতের দীর্ঘজীবী প্রজাতিগুলো সুস্থ বার্ধক্যের জৈবিক প্রক্রিয়া বোঝার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নতুন গবেষণাটি ইঙ্গিত দিচ্ছে, হেলিকোনিয়াস প্রজাপতি গবেষণার জন্য এমন একটি মডেল হতে পারে, যার মাধ্যমে পরাগরেণু খাওয়া দীর্ঘায়ুতে কেমন ভূমিকা রাখে সে বিষয়ে বিস্তারিতভাবে অনুসন্ধান করা সম্ভব হবে।

গবেষণা পত্রের প্রধান লেখক ইউনিভার্সিটি অব ব্রিস্টলের জীববিজ্ঞান স্কুলের ড. জেসিকা ফোলি বলেন, ‘প্রাণিজগতের সবচেয়ে বেশি প্রজাতিসমৃদ্ধ শ্রেণি হলো কীটপতঙ্গ। এদের দেহগঠন, জীবনধারা এবং পরিবেশগত অভিযোজনের বৈচিত্র্য অসাধারণ। একই সঙ্গে এদের আয়ুতেও চরম বৈচিত্র্য দেখা যায়। পূর্ণবয়স্ক মেফ্লাই মাত্র কয়েক দিন বাঁচে। অথচ কিছু প্রজাতির পিঁপড়া ও উইপোকার প্রজননক্ষম সদস্য কয়েক দশক পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে। অর্থাৎ একই শ্রেণির মধ্যে আয়ুর পার্থক্য প্রায় পাঁচ হাজার গুণ। সে তুলনায় স্তন্যপায়ী প্রাণীদের ক্ষেত্রে এ পার্থক্য প্রায় ১০০ গুণ।’

তিনি বলেন, ‘হেলিকোনিয়াস সবচেয়ে দীর্ঘজীবী প্রজাপতিগুলোর একটি। তবে শুধু দীর্ঘায়ু নয়, ধীরগতির বার্ধক্যও তাদের সবচেয়ে বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য। ফলে তুলনামূলক সাম্প্রতিক সময়ে বিবর্তনের মাধ্যমে আলাদা হওয়া নিকটাত্মীয় প্রজাতিগুলোর চেয়ে তারা অনেক বেশি সময় বেঁচে থাকতে পারে।’

ড. ফোলি বলেন, ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি আমাদের এমন সব জৈবিক প্রক্রিয়া শনাক্ত করার সুযোগ দিচ্ছে, যা আয়ু বাড়ানোয় ভূমিকা রাখে। দীর্ঘজীবী হেলিকোনিয়াস প্রজাপতি এবং স্বল্পায়ু নিকটাত্মীয় প্রজাতিগুলোর তুলনামূলক বিশ্লেষণ প্রকৃতির মধ্যে এক ধরনের পরীক্ষার সুযোগ তৈরি করেছে। এর মাধ্যমে বার্ধক্য ও দীর্ঘায়ুর জৈবিক ভিত্তি সম্পর্কে নতুন তথ্য পাওয়া যেতে পারে।’

সায়েন্স ডেইলি অবলম্বনে

আরও