আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় মানুষ ইন্টারনেটে এখন কম স্বাধীনভাবে তথ্য দেখতে, প্রকাশ করতে বা যোগাযোগ করতে পারছেন। আজকের ইন্টারনেট আগের থেকে অনেক বেশি নিয়ন্ত্রিত এবং সীমাবদ্ধ বলে জানিয়েছে মানবাধিকার ও গণতন্ত্র পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ফ্রিডম হাউজ। খবর টেকরাডার।
ফ্রিডম অন দ্য নেট ২০২৫ শীর্ষক প্রতিবেদনে সংস্থাটি জানিয়েছে, টানা ১৫ বছর ধরে বিশ্বজুড়ে ‘ইন্টারনেট ফ্রিডম’ বা অনলাইনে মানুষের স্বাধীনতা ক্রমেই কমছে।
ফ্রিডম হাউজ বলছে, অনলাইনে এখন ব্যবহারকারীদের গোপনীয়তা কমে যাওয়া একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। একই সময়ে অনলাইনের তথ্য নিয়ন্ত্রণও ক্রমেই বাড়ছে। এমনকি ‘ফ্রি’ হিসেবে গণ্য হওয়া অর্থাৎ নাগরিক স্বাধীনতা তুলনামূকভাবে বেশি এমন ১৮টি দেশের মধ্যে নয়টি দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারের স্বাধীনতা কমেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পতন দেখা গেছে জর্জিয়া, জার্মানি ও যুক্তরাষ্ট্রে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইন্টারনেট ফ্রিডম বলতে মানুষের অনলাইনে স্বাধীনভাবে তথ্য দেখতে, প্রকাশ করতে, যোগাযোগ করতে এবং মতামত জানাতে পারার ক্ষমতাকে বোঝায়। এক্ষেত্রে তারা সরকার বা অন্য কোনো শক্তির নজরদারি বা বাধার মুখে পড়ে না।
প্রতিবেদনে আরো উঠে এসেছে, ইন্টারনেটে স্বাধীনতা কমার সঙ্গে সঙ্গে চলতি বছর ভিপিএন ও অন্যান্য সেন্সরশিপ এড়ানোর প্রযুক্তির চাহিদা বেড়েছে। জুন ২০২৪ থেকে মে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সময়ে ইন্টারনেটে মানুষের স্বাধীনতা সবচেয়ে বেশি হ্রাস পেয়েছে কেনিয়ায়। এ সময়ে জুনে দেশটির ইতিহাসে প্রথমবার ইন্টারনেট পুরোপুরি বন্ধ করা হয়।
ফ্রিডম হাউজের প্রযুক্তি ও গণতন্ত্রবিষয়ক গবেষণা বিশ্লেষক গ্রান্ট বেকার বলেন, ‘বিশ্বব্যাপী গণতান্ত্রিক অবস্থার পতন ঘটেছে। একই সঙ্গে এর প্রভাব পড়েছে ইন্টারনেট জগতে। ‘ফ্রি’ হিসেবে চিহ্নিত করা ১৮টি দেশের অর্ধেকের ইন্টারনেট স্বাধীনতার স্কোর কমেছে। শুধু দুই দেশের স্কোরের উন্নতি হয়েছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘এ তালিকায় জার্মানির নামও রয়েছে। কারণ ফেব্রুয়ারি থেকে দেশটির রাজনীতিবিদদের নিয়ে মিম তৈরি করা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সরকার আইনি ব্যবস্থা নিতে শুরু করেছে।’
ফ্রিডম হাউজ বলছে, চলতি বছর ‘ফ্রি’ দেশগুলোর মধ্যে জর্জিয়া ও জার্মানির পর ইন্টারনেট স্বাধীনতায় দ্বিতীয় বৃহত্তম পতন ঘটেছে যুক্তরাষ্ট্রে।
গ্রান্ট বেকার বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রে অনলাইন পরিবেশ এখনো বৈচিত্র্যময় এবং তুলনামূলকভাবে স্বাধীন। মূলত মার্কিন সংবিধানের প্রথম সংশোধনীর কারণে এটা সম্ভব হচ্ছে, যা মানুষকে স্বাধীনভাবে মতামত প্রকাশ করার সুরক্ষা দেয়। তবে নানা সীমাবদ্ধতার কারণে অনলাইনে নাগরিকদের স্বাধীন কার্যকলাপ, যেমন প্রতিবাদ বা সক্রিয়তা নিয়ন্ত্রণ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।’
প্রতিবেদন অনুযায়ী বেশির ভাগ দেশেই ইন্টারনেট স্বাধীনতার পতন উদ্বেগজনক, তবে চীন, মিয়ানমার ও রাশিয়া এখনো বিশ্বব্যাপী ইন্টারনেট সেন্সরশিপ এবং তথ্য নিয়ন্ত্রণের শীর্ষে রয়েছে।
বিশ্বে ইন্টারনেট ব্যবহারের স্বাধীনতা কমে গেলেও বাংলাদেশে এর উন্নতি হয়েছে বলে জানিয়েছে ফ্রিডম হাউজ। দেশে ইন্টারনেট স্বাধীনতা সূচক ৫ পয়েন্ট বেড়ে ১০০-এর মধ্যে ৪৫ হয়েছে। গত বছর এ স্কোর ছিল ৪০।
ফ্রিডম হাউজ তিনটি বড় বিষয় দেখে স্কোর নির্ধারণ করে। এক. ইন্টারনেটে প্রবেশের বাধা, দুই. অনলাইনে প্রকাশিত বিষয়বস্তুর ওপর নিয়ন্ত্রণ ও তিন. ব্যবহারকারীর অধিকার লঙ্ঘন।
তিনটি বিভাগে মোট ২১টি সূচক ব্যবহার করে প্রতিটি দেশের অনলাইন স্বাধীনতার মাত্রা নির্ধারণ করা হয়।