ইউরোপার গোপন মহাসাগরে থাকতে পারে প্রাণের চিহ্ন

ইউরোপার বাসযোগ্যতা যাচাই করতে বর্তমানে বৃহস্পতির পথে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার ‘ইউরোপা ক্লিপার’। মহাকাশযানটি প্রায় ১৮০ কোটি মাইল পথ পাড়ি দিয়ে ২০৩০ সালের এপ্রিলে বৃহস্পতিতে পৌঁছবে

বৃহস্পতির বরফে ঢাকা উপগ্রহ ইউরোপার ভূগর্ভস্থ মহাসাগরে প্রাণের উপযোগী পরিবেশ কিংবা প্রাণের চিহ্ন থাকতে পারে বলে দীর্ঘদিন ধরে ধারণা করছেন বিজ্ঞানীরা। তবে সেই মহাসাগরের পানি বরফের স্তর ভেদ করে পৃষ্ঠের কাছাকাছি উঠে আসে—এমন প্রচলিত ধারণা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে নতুন এক গবেষণা। গবেষকদের মতে, ইউরোপার পুরু বরফের আবরণ আগের অনুমানের চেয়েও শক্তিশালী প্রতিবন্ধক। গভীর মহাসাগরের পানি ফাটল দিয়ে ওপরে ওঠার চেষ্টা করলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই জমে গিয়ে পথ বন্ধ করে দিতে পারে।

ইউরোপার বাসযোগ্যতা যাচাই করতে বর্তমানে বৃহস্পতির পথে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার ‘ইউরোপা ক্লিপার’। মহাকাশযানটি প্রায় ১৮০ কোটি মাইল পথ পাড়ি দিয়ে ২০৩০ সালের এপ্রিলে বৃহস্পতিতে পৌঁছবে। এরপর ইউরোপার কাছ দিয়ে ৪৯ বার উড়ে যাওয়ার কথা রয়েছে এটির। এসব অভিযানে উপগ্রহটির পৃষ্ঠ থেকে নির্গত পানির বিশাল বাষ্পস্তম্ভ বা উষ্ণ অঞ্চল শনাক্ত করার আশা করছেন বিজ্ঞানীরা। এগুলোর সঙ্গে সরাসরি ভূগর্ভস্থ মহাসাগরের সংযোগ থাকলে কক্ষপথ থেকেই পানির রাসায়নিক গঠন বিশ্লেষণ করা সম্ভব হতে পারে।

ভয়েজার ও গ্যালিলিও মহাকাশ অভিযানের তথ্য থেকে বিজ্ঞানীরা জানতে পেরেছেন, ইউরোপার হিমায়িত ভূত্বকের নিচে রয়েছে একটি বৈশ্বিক মহাসাগর। এতে পৃথিবীর সব মহাসাগরের সম্মিলিত পরিমাণের দ্বিগুণেরও বেশি পানি থাকতে পারে। এ কারণে সৌরজগতের বাইরে নয়, বরং পৃথিবীর কাছাকাছি কোথাও প্রাণ অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে ইউরোপাকে অন্যতম সম্ভাবনাময় স্থান হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের রাটগার্স ইউনিভার্সিটির গ্রহবিজ্ঞানী লুজেন্দ্র ওঝার নেতৃত্বে পরিচালিত নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, গভীর মহাসাগরের পানি পৃষ্ঠের কাছাকাছি পৌঁছানো অত্যন্ত কঠিন। ইউরোপার বরফস্তরের ফাটল দিয়ে পানি কীভাবে চলাচল করতে পারে, তা জানতে কম্পিউটার সিমুলেশন তৈরি করেন গবেষকরা।

আগের মডেলগুলোতে ধরে নেয়া হয়েছিল, ফাটলের মধ্য দিয়ে পানি তুলনামূলক মসৃণভাবে প্রবাহিত হবে। নতুন গবেষণায় বাস্তবসম্মত পদার্থবিদ্যা প্রয়োগ করে দেখা যায়, ওপরে ওঠার সময় পানি বরং অস্থির ও ঘূর্ণায়মানভাবে প্রবাহিত হয়। অত্যন্ত ঠাণ্ডা ফাটলের দেয়ালের সঙ্গে সংঘর্ষে এটি দ্রুত তাপ হারায়। ফলে পৃষ্ঠের কাছাকাছি পৌঁছানোর অনেক আগেই পানি জমে যায় এবং ফাটল বন্ধ হয়ে পড়ে।

ওঝা বলেন, ‘পানি ডানে-বাঁয়ে, ওপর-নিচে যাবে এবং এর মধ্যে ঘূর্ণন তৈরি হবে। এমনটি ঘটলে পৃষ্ঠের দিকে এগোনোর সময় তরল পানি খুব দ্রুত শীতল হয়ে পড়বে।’

দ্রুত তাপমাত্রা কমলেও পানি সঙ্গে সঙ্গে পুরোপুরি কঠিন বরফে পরিণত হয় না। ‘সুপারকুলিং’ নামে পরিচিত প্রক্রিয়ায় পানি স্বাভাবিক হিমাঙ্কের নিচেও কিছু সময় তরল অবস্থায় থাকতে পারে। এরপর এতে ‘ফ্রাজিল আইস’ নামে ক্ষুদ্র ও নরম বরফকণা তৈরি হয়। এসব কণা দ্রুত জমা হয়ে ফাটলের পথ বন্ধ করে দেয়। চওড়া ফাটল দিয়ে তাত্ত্বিকভাবে বেশি পানি প্রবাহিত হতে পারলেও তা সম্পূর্ণ জমে যাওয়া ঠেকাতে ফাটলগুলোকে অবাস্তব রকম দীর্ঘ হতে হবে অথবা বিপুলসংখ্যক ফাটল একসঙ্গে সক্রিয় থাকতে হবে।

গবেষণার ফল নাসার ইউরোপা ক্লিপার ও ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার জুপিটার আইসি মুনস এক্সপ্লোরার বা ‘জুস’ অভিযানের তথ্য বিশ্লেষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। জুস ২০৩১ সালের জুলাইয়ে বৃহস্পতিতে পৌঁছে ইউরোপা, গ্যানিমিড ও ক্যালিস্টোসহ মহাসাগরসমৃদ্ধ তিন উপগ্রহ পর্যবেক্ষণ করবে।

গবেষকদের মতে, মহাকাশযান দুটি ইউরোপার পৃষ্ঠের কাছাকাছি তরল পানির আধার শনাক্ত করলেও সেটিকে সরাসরি গভীর মহাসাগরের অংশ হিসেবে ধরে নেয়া ঠিক হবে না। বরং বরফের আবরণের কোনো অংশ স্থানীয়ভাবে গলে এসব অগভীর জলাধার তৈরি হয়ে থাকতে পারে।

লুজেন্দ্র ওঝা বলেন, ‘এই গবেষণা ভবিষ্যৎ অভিযানে পাওয়া তথ্য ব্যাখ্যা করতে এবং বাসযোগ্যতার চিহ্ন কোথায় অনুসন্ধান করা উচিত, তা আরো ভালোভাবে বুঝতে সাহায্য করবে।’

আরও