দূর আকাশে কোনো নক্ষত্রকে ঘিরে ঘুরছে একটি গ্রহ। কিন্তু পৃথিবী থেকে সেই গ্রহকে সরাসরি দেখা প্রায় অসম্ভব। কারণ নক্ষত্রটির আলো এতটাই উজ্জ্বল যে তার পাশে থাকা গ্রহের ক্ষীণ আলো প্রায় পুরোপুরি হারিয়ে যায়। এই বাধা কাটাতে নতুন প্রযুক্তি পরীক্ষা করতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার ন্যান্সি গ্রেস রোমান স্পেস টেলিস্কোপ। সফল হলে এত দিন সরাসরি দেখা কঠিন ছিল—এমন বহু ভিনগ্রহকে নতুনভাবে পর্যবেক্ষণের সুযোগ মিলতে পারে।
রোমান স্পেস টেলিস্কোপের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষামূলক যন্ত্রগুলোর একটি হলো ‘করোনাগ্রাফ ইনস্ট্রুমেন্ট’। এটি উজ্জ্বল নক্ষত্রের আলো দমন করে কাছাকাছি থাকা অপেক্ষাকৃত অনুজ্জ্বল গ্রহের আলো আলাদা করার চেষ্টা করবে। এর সঙ্গে থাকবে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে নিয়ন্ত্রিত আয়না, যা টেলিস্কোপের অপটিক্যাল ব্যবস্থার ক্ষুদ্রতম ত্রুটিও সংশোধন করতে পারবে।
জার্মানির ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর অ্যাস্ট্রোনমির গবেষক অলিভার ক্রাউসের ভাষায়, বৈজ্ঞানিক গবেষণায় মহাকাশে ব্যবহৃত অপটিক্যাল পর্যবেক্ষণযন্ত্রগুলোর মধ্যে রোমানের করোনাগ্রাফই সবচেয়ে প্রযুক্তিগতভাবে জটিল।
গত ৩০ আগস্ট স্পেসএক্সের ফ্যালকন হেভি রকেটে করে যুক্তরাষ্ট্রের কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে উৎক্ষেপণ করা হয় রোমান টেলিস্কোপ। প্রায় এক দশক ধরে এটি নির্মাণ করা হয়েছে। বর্তমানে পৃথিবী থেকে প্রায় ১৫ লাখ কিলোমিটার দূরের সূর্য-পৃথিবী এল-২ বিন্দুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে টেলিস্কোপটি। ডিসেম্বরের শুরুতে সেখানে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
প্রাথমিকভাবে পাঁচ বছরের বৈজ্ঞানিক অভিযানের জন্য রোমানকে তৈরি করা হয়েছে। আরো পাঁচ বছর মিশন বাড়ানোর পরিকল্পনাও ছিল। তবে উৎক্ষেপণ ও প্রাথমিক গতিপথ সংশোধন অত্যন্ত নিখুঁত হওয়ায় প্রত্যাশার তুলনায় কম জ্বালানি খরচ হয়েছে। নাসার হিসাবে, এতে টেলিস্কোপটি সম্ভাব্যভাবে অন্তত ২২ বছর বৈজ্ঞানিক কার্যক্রম চালাতে পারবে।
রোমানের প্রধান লক্ষ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে মহাবিশ্বের ইতিহাস, ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জির ভূমিকা অনুসন্ধান। পাশাপাশি এটি বহু নতুন ভিনগ্রহও শনাক্ত করতে পারে। তবে করোনাগ্রাফের কাজ হবে আরো কঠিন, নক্ষত্রের প্রচণ্ড উজ্জ্বলতার মধ্য থেকে তার পাশের গ্রহের ক্ষীণ আলো বের করে আনা।
সাধারণ করোনাগ্রাফে বিশেষ ধরনের মুখোশ ব্যবহার করে নক্ষত্রের আলো ঢেকে দেয়া হয়। কিন্তু তাতেও ছবিতে নানা আলোকীয় বিকৃতি তৈরি হতে পারে। রোমানের ব্যবস্থায় দুটি নমনীয় আয়না থাকবে, যার প্রতিটিতে রয়েছে ১ হাজার ৬০০টির বেশি ক্ষুদ্র নিয়ন্ত্রক। এগুলো আয়নার আকৃতি সামান্য পরিবর্তন করে আলোর বিকৃতি সংশোধন করবে।
ব্যবস্থাটি এমন একটি গ্রহ শনাক্ত করার জন্য তৈরি, যার নক্ষত্র তার চেয়ে একশ কোটি গুণ বেশি উজ্জ্বল। সূর্য ও বৃহস্পতির উজ্জ্বলতার পার্থক্যও প্রায় এমন। বর্তমান প্রযুক্তির তুলনায় এটি প্রায় এক হাজার গুণ উন্নতি আনতে পারে।
শুধু ছবি তোলাই নয়, রোমানের একটি সমন্বিত বর্ণালিমাপক যন্ত্র সম্ভাব্য গ্রহগুলোর বায়ুমণ্ডলের উপাদান বিশ্লেষণেও সাহায্য করবে। একই সঙ্গে কাছের নক্ষত্রগুলোর চারপাশে থাকা ধূলি ও পদার্থের চাকতিও দৃশ্যমান আলোয় পর্যবেক্ষণ করা হবে।
টেলিস্কোপটির যন্ত্রপাতি এখন পরীক্ষা ও সমন্বয়ের পর্যায়ে রয়েছে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে ২০২৭ সালের শুরুতেই রোমান স্পেস টেলিস্কোপের প্রথম বৈজ্ঞানিক ছবি প্রকাশ করবে নাসা। সেই ছবিগুলো হয়তো প্রথমবারের মতো এমন কিছু দূরবর্তী জগতকে মানুষের চোখের সামনে আনবে, যেগুলো এত দিন নক্ষত্রের আলোয় আড়ালেই থেকে গেছে।