মিথ্যাচার, ভুয়া ও প্রতারণামূলক তথ্য ছড়ানোর প্রবণতা সমাজে নতুন নয়, তবে ইন্টারনেটের কারণে আজ এসবের প্রভাব ছোট পরিসর থেকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোও ভুয়া অ্যাকাউন্ট চিহ্নিত করতে নতুন নতুন ব্যবস্থা নিচ্ছে। যেমন এক্স সম্প্রতি একটি নতুন ফিচার চালু করেছে, ‘অ্যাবাউট দিস অ্যাকাউন্ট’। এতে কোনো প্রোফাইলের অবস্থানসহ কয়েকটি সাধারণ তথ্য দেখা যায়, যা ব্যবহারকারীদের বট বা ভুয়া অ্যাকাউন্ট শনাক্ত করতে সাহায্য করবে বলে দাবি প্লাটফর্মটির।
ফিচারটি চালুর পরই দেখা যায়, ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষে প্রচার চালানো বহু অ্যাকাউন্ট, যেমন MAGA NATION, TRUMP_ARMY_ এবং CharlieK_news ইউএসএর পতাকা উড়ালেও আসলে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক নয়। বিশ্লেষক, গবেষক ও পর্যবেক্ষকরা এসব অ্যাকাউন্টকে ‘বট চালিত প্রচার–প্লাটফর্ম’ বলে শনাক্ত করেছেন।
এদিকে অনলাইনে মুক্ত বিশ্বকোষ হিসেবে পরিচিত উইকিপিডিয়ার মতোই সম্প্রতি ‘গ্রোকিপিডিয়া’ চালু করেছে ইলোন মাস্কের এক্সএআই। গ্রোকিপিডিয়া বিশ্বাসযোগ্য কিনা জানতে চেয়ে গ্রোক চ্যাটবটকে প্রশ্ন করা হলে উত্তর আসে, ‘প্লাটফর্মটি নিরপেক্ষ ও সঠিক তথ্যের উৎস নয়।’ অথচ গ্রোক নিজেই এক্সের এআই চ্যাটবট।
সমস্যা শুধু এক্স বা এর সংশ্লিষ্ট সেবায় সীমিত নয়। অনলাইনে এখন বট, এআইচালিত স্প্যাম ও প্রতারণা সর্বত্রই উপস্থিত। তাই পুরোপুরি সত্য উদ্ঘাটন করা সম্ভব না হলেও কিছু কৌশলে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন তথ্য শনাক্ত করা যায়।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ও লেখক স্টিভেন জে ভগান-নিকোলস বলছেন, ‘কোনো তথ্য যদি অত্যন্ত চমকপ্রদ বা অবিশ্বাস্য শোনায়, তবে তা সত্য নয় হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। উদাহরণস্বরূপ, কেউ আপনার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নম্বর দিয়ে মিলিয়ন ডলার দেয়ার কথা জানাল। এসব তথ্য বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ভুয়া হয়।’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অঢেল তথ্যের মধ্যে সত্য-মিথ্যা যাচাই করা এখন কঠিন হয়ে পড়েছে। মানুষ এসব প্লাটফর্মেই বেশি সময় কাটায়, তাই অধিকাংশ সংবাদ ও তথ্য সরাসরি ব্যবহারকারীর কাছে পৌঁছায়। অনেক সময় তারা তথ্য যাচাই করার চেষ্টা করেন না। ফলে কনটেন্ট শেয়ারের মাধ্যমে ব্যাপক হারে ছড়াতে থাকে ভুল তথ্য। পাশাপাশি এআই প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের কারণে অনলাইন কনটেন্টের বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করাও এখন আরো জটিল হয়ে উঠেছে।
স্টিভেন জে বলেন, ‘অনলাইনে কোনো কনটেন্ট চোখে পড়ার সঙ্গে নিজেকে প্রশ্ন করার অভ্যাস গড়তে হবে। তথ্য বিশ্বাস করা বা প্রচারে কার স্বার্থসিদ্ধি হচ্ছে সেটা বোঝা গুরুত্বপূর্ণ। যেমন একটি স্ক্যাম বা প্রতারণার ক্ষেত্রে কেউ অর্থ হাতিয়ে নেয়ার চেষ্টা করবে। অন্যদিকে কেউ আপনাকে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিকে সমর্থনে উৎসাহিত করবে। তাই তথ্যটি প্রকাশ করা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য বুঝতে হবে।’
এরপর দেখতে হবে কোনো বিশ্বাসযোগ্য সূত্র একই তথ্য প্রকাশ করছে কিনা। এক্ষেত্রে সর্বদা তথ্যের মূল উৎস যাচাই করতে হবে। দেখতে হবে তথ্যটি পরিচিত সংবাদমাধ্যম, স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান বা ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্ট ও ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়েছে কিনা। শুধু একজন বন্ধু ও অন্য কারো থেকে পাওয়া কনটেন্ট শেয়ার করা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, যদি না তারা ওই বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হন।
স্টিভেনের মতে, তথ্য যাচাইয়ের সময় আরো খেয়াল রাখতে হবে উৎসের নাম, তারিখ, স্থান ও মূল কনটেন্টের লিংক আছে কিনা। ‘বিশেষজ্ঞরা বলেন’ বা ‘বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছেন’ এমনসব বিবৃতি সবসময় নির্ভরযোগ্য নাও হতে পারে।
দ্য রেজিস্টার অবলম্বনে