পৃথিবী থেকে ৩০০ কোটিরও বেশি মাইল দূরে বরফে ঢাকা একটি মহাজাগতিক বস্তু ধীরে ধীরে ধূমকেতুতে রূপ নিচ্ছে। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বলছেন, এমন পরিবর্তন সরাসরি পর্যবেক্ষণের সুযোগ খুবই বিরল। এ ঘটনা ধূমকেতু কীভাবে তৈরি হয়, সে সম্পর্কে নতুন ধারণা দিতে পারে।
বস্তুটির নাম ৪৫০পি/এলওএনইওএস। ২০০৪ সালে এটি প্রথম শনাক্ত করা হয়। এটি ‘সেন্টর’ নামে পরিচিত এক ধরনের বরফাচ্ছাদিত মহাজাগতিক বস্তু। সেন্টরগুলো সাধারণত বৃহস্পতি ও নেপচুন গ্রহের মধ্যবর্তী এলাকায় সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে। বিজ্ঞানীদের ধারণা, এগুলো একসময় সৌরজগতের আরো দূরের অঞ্চল থেকে এসেছে।
ইউনিভার্সিটি অব সেন্ট্রাল ফ্লোরিডার বিজ্ঞানী চার্লস শ্যামবোর নেতৃত্বে একটি দল কয়েক বছর ধরে ৪৫০পি পর্যবেক্ষণ করছে। ২০১৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে হাওয়াইয়ের জেমিনি নর্থ টেলিস্কোপ দিয়ে তারা দেখতে পান, বস্তুটির চারপাশে ধীরে ধীরে গ্যাস ও ধুলার মেঘ তৈরি হচ্ছে। সূর্যের কাছে আসার সঙ্গে সঙ্গে এ মেঘ আরো উজ্জ্বল হয়েছে। সাধারণত ধূমকেতুর চারপাশেই এমন গ্যাস ও ধুলার আবরণ দেখা যায়।
বিজ্ঞানীদের ধারণা, ৪৫০পি-এর এ পরিবর্তনের শুরু অনেক আগে। ১৯৯২ সালে এটি শনি গ্রহের খুব কাছ দিয়ে গিয়েছিল। একপর্যায়ে শনি থেকে এর দূরত্ব ছিল মাত্র প্রায় ৪৬ লাখ কিলোমিটার। শনির শক্তিশালী মহাকর্ষের টানে ৪৫০পি-এর চলার পথ বদলে যায়। ফলে এটি আগের তুলনায় সূর্যের আরো কাছে আসতে শুরু করে।
২০২৪ সালের আগস্টে ৪৫০পি তার বর্তমান কক্ষপথে সূর্যের সবচেয়ে কাছাকাছি অবস্থানে পৌঁছায়। সূর্যের কাছে আসায় এটি আগের তুলনায় বেশি তাপ পেতে থাকে। এতে এর ভেতরে জমে থাকা গ্যাস বেরিয়ে আসতে শুরু করে। সেই গ্যাসের সঙ্গে ধুলা ও বরফের ছোট কণাও মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ে। এভাবেই বস্তুটির চারপাশে ধূমকেতুর মতো উজ্জ্বল আবরণ তৈরি হচ্ছে।
জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করে বিজ্ঞানীরা এর চারপাশে কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্যাসের উপস্থিতি পেয়েছেন। তবে পানির বাষ্প পাওয়া যায়নি। গবেষকদের মতে, সূর্য থেকে ৪৫০পি এখনো এতটাই দূরে যে সেখানে পানির বরফ সহজে বাষ্পে পরিণত হওয়ার মতো তাপ নেই। তাই কার্বন ডাই-অক্সাইডই সম্ভবত এর ভেতর থেকে গ্যাস ও ধুলা বের হওয়ার প্রধান কারণ।
তবে এর চারপাশে কঠিন পানির বরফের কিছু চিহ্নও পাওয়া গেছে। বিজ্ঞানীদের ধারণা, সূর্যের তাপে বরফের গঠন বদলে যাচ্ছে। এ পরিবর্তনের সময় বরফের ভেতরে আটকে থাকা গ্যাস বেরিয়ে আসে এবং সঙ্গে ধুলা ও বরফের কণাও নিয়ে আসে।
৪৫০পি এখনো পুরোপুরি সাধারণ ধূমকেতু হয়ে ওঠেনি। এটি বর্তমানে প্রায় ২২ বছরে একবার সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, ভবিষ্যতে বৃহস্পতি বা অন্য কোনো বড় গ্রহের মহাকর্ষ এর কক্ষপথ আবার বদলে দিতে পারে। তখন এটি সূর্যের আরো কাছে চলে এসে পুরোপুরি স্বল্পমেয়াদি ধূমকেতুতে পরিণত হতে পারে।
গবেষক চার্লস শ্যামবো বলেন, ৪৫০পি-এর মতো বস্তু পর্যবেক্ষণ করে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারবেন, সৌরজগতের দূরবর্তী অঞ্চলের বরফাচ্ছাদিত বস্তু কীভাবে ধীরে ধীরে ধূমকেতুতে পরিণত হয়। একই সঙ্গে প্রায় ৪৫০ কোটি বছর আগে সৌরজগত গঠনের সময়কার বরফ ও অন্যান্য পদার্থ সূর্যের তাপে কীভাবে বদলে যায়, সে সম্পর্কেও নতুন তথ্য পাওয়া যাবে।