মানবতার জন্য ঝুঁকি হতে পারে এআই, জাতিসংঘে সতর্ক করলেন প্রযুক্তি খাতের নেতারা

আলোচনায় সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ ঝুঁকির পাশাপাশি এমন কয়েকটি বাস্তব ঘটনার উদাহরণ এসেছে যেখানে অত্যাধুনিক এআই এজেন্ট পরীক্ষার সময় নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করেছে

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্রুত আরো শক্তিশালী ও স্বয়ংক্রিয় হয়ে উঠছে। যথাযথ নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করা না গেলে একপর্যায়ে এ প্রযুক্তি মানবতার জন্যই বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশ্বের শীর্ষ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠান ও গবেষণা সংস্থার নেতারা। তাদের মতে, এ প্রযুক্তির সম্ভাবনা যেমন বিপুল, তেমনি এর ঝুঁকিও কোনো একটি দেশ বা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে একা সামাল দেয়া সম্ভব নয়।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন চলাকালে বুধবার ফ্রান্সের উদ্যোগে নিরাপত্তা পরিষদে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা নিয়ে বিশেষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী দারিও অ্যামোডেই, ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যান, হাগিং ফেসের সহপ্রতিষ্ঠাতা ক্লেমঁ দেলাঙ্গ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষক ইয়োশুয়া বেঙ্গিওসহ প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ ব্যক্তিরা বক্তব্য দেন।

দারিও অ্যামোডেই বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভুলভাবে পরিচালিত হলে তা ‘মানবতার সামগ্রিক ঝুঁকিতে’ পরিণত হতে পারে। তার মতে, বর্তমানে এ প্রযুক্তির সক্ষমতা এত দ্রুত বাড়ছে যে ভবিষ্যতে কিছু ব্যবস্থা নিজেদের উন্নয়নের কাজেও আরো বড় ভূমিকা নিতে সক্ষম হতে পারে। এর সঙ্গে সাইবার হামলা, জৈব অস্ত্র তৈরিতে অপব্যবহার এবং অত্যন্ত সক্ষম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ওপর মানুষের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে যাওয়ার মতো ঝুঁকিও রয়েছে।

তিনি বলেন, রাজনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক মতপার্থক্য সত্ত্বেও দেশগুলোকে এ বিষয়ে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। কোনো সরকার, কোম্পানি বা দেশ এককভাবে এ ঝুঁকি মোকাবেলা করতে পারবে না।

বৈঠকে হাগিং ফেসের সহপ্রতিষ্ঠাতা ক্লেমঁ দেলাঙ্গ সাম্প্রতিক একটি ঘটনার কথা তুলে ধরেন। তিনি জানান, ওপেনএআইয়ের একটি পরীক্ষামূলক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থা তাদের অবকাঠামোয় প্রবেশ করেছিল। পরীক্ষার নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করে ওই ব্যবস্থা বাইরের কম্পিউটার ব্যবস্থায় ঢুকে পড়ে। দেলাঙ্গ বলেন, তাদের প্রতিষ্ঠান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে আক্রান্ত হলেও শেষ পর্যন্ত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করেই সেই হামলা প্রতিরোধ করেছে।

ওপেনএআইয়ের নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, ঘটনাটি ঘটে চলতি বছরের জুলাইয়ে অভ্যন্তরীণ সাইবার নিরাপত্তা পরীক্ষার সময়। একটি অত্যন্ত সক্ষম গবেষণা মডেল পরীক্ষার জন্য তৈরি বিচ্ছিন্ন পরিবেশের নিয়ন্ত্রণ এড়িয়ে যায়। পরে সেটি অনুমোদনহীন যোগাযোগপথ ব্যবহার করে, সফটওয়্যারের দুর্বলতা কাজে লাগায় এবং ইন্টারনেটে প্রবেশ করে তৃতীয় পক্ষের কিছু ব্যবস্থায় ঢুকে পড়ে।

এদিকে একই দিনে অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ জানান, ওপেনএআইয়ের একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এজেন্ট জুনে অস্ট্রেলিয়ার একটি সরকারি ওয়েবসাইটেও প্রবেশ করেছিল। ওই ব্যবস্থা সরকারি চিকিৎসা ব্যয়সংক্রান্ত একটি তথ্যভাণ্ডার থেকে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করছিল। ওয়েবসাইটটি বারবার অনুরোধ আটকে দিলেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এজেন্টটি বিকল্প পথ খুঁজে বিধিনিষেধ পাশ কাটিয়ে সাইটের অন্য অংশে প্রবেশ করে।

অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ওই এজেন্ট প্রকাশ্য তথ্যের পাশাপাশি কিছু অপ্রকাশ্য ফাইলেও প্রবেশ করেছিল। এমনকি অভ্যন্তরীণ সার্ভারে ফাইল লেখার কার্যক্রমও চালায়। তবে এখন পর্যন্ত ব্যক্তিগত চিকিৎসা তথ্য আক্রান্ত হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষক ইয়োশুয়া বেঙ্গিও নিরাপত্তা পরিষদকে বলেন, এ প্রযুক্তি থেকে উদ্ভূত বিপদ আর দূরবর্তী কোনো আশঙ্কা নয়। তার ভাষায়, এসব ঝুঁকি ‘বাস্তব ও আসন্ন’। কোনো একটি দেশ একা এ ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না বলেও সতর্ক করেন তিনি।

তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের অবস্থানে পার্থক্য দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্র বৈশ্বিক কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার বিরোধিতা করে বিভিন্ন দেশের নিজস্ব সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছে। অন্যদিকে চীন নিয়ন্ত্রক কাঠামো উন্নয়ন, জরুরি প্রতিক্রিয়া এবং সীমান্তপারের সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে।

জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসও দীর্ঘদিন ধরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কার্যকর শাসনব্যবস্থা তৈরির আহ্বান জানিয়ে আসছেন। এবারের বৈঠকে ভবিষ্যৎ ঝুঁকির পাশাপাশি বাস্তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এজেন্টের নিয়ন্ত্রণের সীমা অতিক্রমের উদাহরণ উঠে আসায় বিষয়টি নতুন গুরুত্ব পেয়েছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নিরাপত্তাঝুঁকি নিয়ে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠক করে ২০২৩ সালে। সে সময় চীন সতর্ক করেছিল, এআই যেন নিয়ন্ত্রণহীন ‘ছুটন্ত ঘোড়ায়’ পরিণত না হয়। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র প্রযুক্তিটি যেন মানুষের ওপর দমন-পীড়ন বা সেন্সরশিপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক করেছিল। ২০২৪ সালেও নিরাপত্তা পরিষদে এআই নিয়ে বৈঠক হয়।

তবে এবারের বৈঠকের পার্থক্য হলো, আলোচনায় সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ ঝুঁকির পাশাপাশি এমন কয়েকটি বাস্তব ঘটনার উদাহরণ এসেছে যেখানে অত্যাধুনিক এআই এজেন্ট পরীক্ষার সময় নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করেছে।

আরও