মহাবিশ্বের অন্যতম বড় রহস্য ডার্ক ম্যাটার বা অদৃশ্য পদার্থের গঠন ও বিস্তার বোঝার ক্ষেত্রে নতুন সূত্র পেয়েছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। হাবল স্পেস টেলিস্কোপের পুরোনো পর্যবেক্ষণ-তথ্যে একটি দূরবর্তী গ্যালাক্সির ভেতর অত্যন্ত ক্ষীণ তারার দীর্ঘ সরু রেখা শনাক্ত করেছেন তারা। এটি মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির বাইরে পাওয়া প্রথম ‘গ্লোবুলার ক্লাস্টার স্টেলার স্ট্রিম’ বা গোলাকার তারাগুচ্ছ থেকে ছড়িয়ে পড়া তারার স্রোত।
পৃথিবী থেকে প্রায় ১১ কোটি ৫০ লাখ আলোকবর্ষ দূরের ইউজিসি ৯০৫০-ডিডব্লিউ১ নামের একটি গ্যালাক্সিতে এ তারার স্রোতটির সন্ধান পাওয়া গেছে। গ্যালাক্সিটির মহাকর্ষীয় টানে একটি ঘন গোলাকার তারাগুচ্ছ ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ছে। এ সময় গুচ্ছ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া তারাগুলো গ্যালাক্সির ভেতর দীর্ঘ ও সরু পথ তৈরি করেছে। গবেষণাটির ফল বুধবার বিজ্ঞান সাময়িকী নেচার-এ প্রকাশিত হয়েছে।
মিল্কিওয়ের ভেতরে এর আগে কয়েক ডজন স্টেলার স্ট্রিম শনাক্ত হয়েছে। তবে সেগুলো এতটাই ম্লান যে পর্যবেক্ষণ করা কঠিন। ফলে মহাকাশে এমন আরও বহু তারার স্রোত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা। অন্য গ্যালাক্সিতেও এ ধরনের কাঠামোর উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়ায় গ্যালাক্সির জন্ম, বিকাশ ও ভরবণ্টন বোঝার নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে।
গবেষকরা তারার এই সরু স্রোতের আকার ও সম্ভাব্য গতিপথ মডেলিং করে ইউজিসি ৯০৫০-ডিডব্লিউ১-এর মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের একটি মানচিত্র তৈরি করেছেন। কোনো গ্যালাক্সির মহাকর্ষ তারার স্রোতের বাঁক, বিস্তার ও গতিকে প্রভাবিত করে। সেই প্রভাব বিশ্লেষণ করেই গবেষক দলটি গ্যালাক্সিটির মোট ভর, দৃশ্যমান বস্তু—যেমন তারার—অংশ এবং অদৃশ্য ডার্ক ম্যাটারের সম্ভাব্য পরিমাণ নির্ণয়ের চেষ্টা করেছে।
গবেষণাটির সহপ্রধান লেখক ও ডেনমার্কের কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের নিলস বোর ইনস্টিটিউটের গবেষক জুলি কিল হোম বলেন, মিল্কিওয়ের বাইরে এমন একটি স্টেলার স্ট্রিম পাওয়ার বিষয়টি তাদের জন্য অত্যন্ত রোমাঞ্চকর ছিল। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ডার্ক ম্যাটার দেখা যায় না, কিন্তু তার মহাকর্ষীয় প্রভাব নক্ষত্র ও গ্যালাক্সির গতিতে স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে।
বিজ্ঞানীদের ধারণা, মহাবিশ্বের মোট পদার্থের প্রায় ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশই ডার্ক ম্যাটার। কিন্তু এটি আসলে কী—একটি কণা, নানা ধরনের কণার সমষ্টি, নাকি সম্পূর্ণ ভিন্ন কোনো বিষয়—তা এখনো অজানা। মিল্কিওয়ের ভেতরে ডার্ক ম্যাটারের বিস্তার বোঝার জন্য স্টেলার স্ট্রিম আগে থেকেই ব্যবহৃত হচ্ছে। নতুন আবিষ্কারটি সেই পদ্ধতি অন্য গ্যালাক্সিতেও প্রয়োগের সম্ভাবনা তৈরি করল।
ইউজিসি ৯০৫০-ডিডব্লিউ১ একটি অতিবিক্ষিপ্ত বা আলট্রা-ডিফিউজ গ্যালাক্সি। এ ধরনের গ্যালাক্সিতে তারার ঘনত্ব ও উজ্জ্বলতা খুব কম হওয়ায় পটভূমি তুলনামূলক ফাঁকা থাকে; ফলে ক্ষীণ তারার স্রোতটি শনাক্ত করা সহজ হয়েছে বলে গবেষকদের ধারণা। আবার এ গ্যালাক্সির মহাকর্ষীয় টান যথেষ্ট শক্তিশালী হওয়ায় মূল তারাগুচ্ছ থেকে তারাগুলো বেরিয়ে আসতে পেরেছে।
ভবিষ্যতে নাসার ন্যান্সি গ্রেস রোমান স্পেস টেলিস্কোপের মতো বৃহৎ পর্যবেক্ষণক্ষমতার যন্ত্র চালু হলে এ ধরনের আরও বহু স্টেলার স্ট্রিম শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে। তারার স্রোতে ফাঁক বা গুচ্ছাকৃতি দেখা গেলে সেটি ছোট ডার্ক ম্যাটার ঘনত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত কি না, তাও যাচাই করা যাবে। ফলে দূরবর্তী গ্যালাক্সিগুলোর অদৃশ্য ভর ও মহাজাগতিক বিবর্তনের ইতিহাস পড়ার নতুন পথ খুলে দিতে পারে এ আবিষ্কার।