প্রথম ফোল্ডিং আইফোন ‘ডুও’, সর্বোচ্চ মূল্য ৩২০০ ডলার

২০০৭ সালে প্রথম আইফোন বাজারে আসার পর অ্যাপল বড় ধরনের সাফল্য বা সত্যিকারের আকর্ষণীয় উদ্ভাবন আনতে পারেনি—এমন সমালোচনা দীর্ঘদিনের। আইফোনের নকশায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনার মাধ্যমে সেই সমালোচনার কিছুটা জবাব দেয়া সম্ভব হতে পারে

অ্যাপলের প্রধান নির্বাহী হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার দ্বিতীয় সপ্তাহেই ২০ বছরের মধ্যে আইফোনের সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলোর একটি উন্মোচন করেছেন জন টার্নাস। টিম কুকের পদত্যাগের পর অ্যাপলের শীর্ষ পদে আসীন টার্নাস গতকাল কোম্পানির বার্ষিক পণ্য উন্মোচন অনুষ্ঠানে প্রথম ফোল্ডেবল আইফোন ‘ডুও’ বাজারে আনার ঘোষণা দেন। বইয়ের মতো ভাঁজ করা যায় এমন নতুন এই আইফোনের সর্বোচ্চ দাম ৩ হাজার ২০০ ডলার, যা এটিকে শুধু আইফোন নয়, বর্তমানে বাজারে থাকা সবচেয়ে দামি ফোনগুলোর একটি করে তুলেছে। খবর বিবিসি।

আইফোন ডুও এযাবৎকালের সবচেয়ে বড় আইফোন সংস্করণ। যুক্তরাষ্ট্রে এর প্রাথমিক মূল্য ১ হাজার ৯৯৯ ডলার থেকে শুরু। ভাঁজ খোলা অবস্থায় ডুওকে ছোট একটি আইপ্যাডের মতো দেখায়। আর অর্ধেক ভাঁজ করলে এটি চওড়া একটি আইফোনের মতো হয়ে যায়।

টার্নাস বলেছেন, ডুও ‘আইপ্যাড দ্বারা অনুপ্রাণিত’। তবে এর ভাঁজ করার বৈশিষ্ট্যকে তিনি ‘সাবলীল ও সম্পূর্ণ স্বজ্ঞাত’ বলে বর্ণনা করেছেন।

অ্যাপলের ফোল্ডেবল ফোন তৈরির কাজ বেশ কয়েক বছর ধরেই চলছিল। টার্নাস নিজেও ফোল্ডেবল আইফোন তৈরির কাজে সরাসরি যুক্ত ছিলেন। চলতি বছরের শুরুতে কুকের উত্তরসূরি হিসেবে মনোনীত হওয়ার আগে তিনি অনেক বছর অ্যাপলের হার্ডওয়্যার বিভাগের শীর্ষ নির্বাহী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

গতকাল টার্নাস বলেন, অ্যাপল বাজারে থাকা অন্যান্য ফোল্ডেবল স্মার্টফোনগুলোর চেহারা ও অনুভূতি এড়িয়ে যেতে চায়। তার মতে, সেগুলো ‘দুটো ফোন একসঙ্গে জুড়ে দেয়ার মতো মনে হয়’, যার ফলে বড় স্ক্রিনটিকে অনেক ছোট দেখায়।

তিনি বলেন, ডুও হলো ‘ধারাবাহিক কিছু অসাধারণ উদ্ভাবনের ফল’, যা ফোল্ডেবল ফোন ব্যবহারের অভিজ্ঞতাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করবে বলে অ্যাপল বিশ্বাস করে।

প্রযুক্তি গবেষণা সংস্থা এফডিএম সিসিএস ইনসাইটের প্রধান বিশ্লেষক বেন উড বলেন, সম্ভবত টার্নাসের পদোন্নতির সময়টি এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে, যা ‘সম্ভবত বিগত অনেক বছরের মধ্যে অন্যতম বৃহত্তম আইফোন উন্মোচনের সঙ্গে মিলে যায়’।

‘অ্যাপলে কোনো কিছুই আকস্মিকভাবে ঘটে না,’ যোগ করেন উড।

গতকালের ইভেন্টে উপস্থিত ছিলেন ক্রিয়েটিভ স্ট্র্যাটেজিসের বিশ্লেষক ক্যারোলিনা মিলানেসি। তার মতে, টার্নাসের ওপর আলোকপাত দেখে মনে হচ্ছিল যেন তিনিই একটি পণ্য।

২০০৭ সালে প্রথম আইফোন বাজারে আসার পর অ্যাপল বড় ধরনের সাফল্য বা সত্যিকারের আকর্ষণীয় উদ্ভাবন আনতে পারেনি—এমন সমালোচনা দীর্ঘদিনের। আইফোনের নকশায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনার মাধ্যমে সেই সমালোচনার কিছুটা জবাব দেয়া সম্ভব হতে পারে।

তবে ফরেস্টারের বিশ্লেষক দীপঞ্জন চ্যাটার্জি বলেন, ‘ফোল্ডেবল ফোনটি পোর্টফোলিওতে একটি চড়া দামের অলঙ্কারে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে, যা কেবল ব্র্যান্ডের মর্যাদা বাড়ালেও অর্থপূর্ণ প্রবৃদ্ধি নাও আনতে পারে।’

এর আগে নতুনতম আইফোনের সর্বোচ্চ প্রারম্ভিক মূল্য ছিল ৯০০ ডলার। বুধবার অ্যাপল নতুন আইফোন ১৮ প্রো ও ১৮ প্রো ম্যাক্সও উন্মোচন করেছে। যুক্তরাষ্ট্রে এগুলোর দাম যথাক্রমে ১ হাজার ১৯৯ ডলার এবং ১ হাজার ২৯৯ ডলার থেকে শুরু।

চ্যাটার্জি বলেন, ফোল্ডেবল আইফোনের পরিণতি অ্যাপলের ভিশন প্রো হেডসেটের মতোও হতে পারে। ভিশন প্রোর দাম কোম্পানি ৩ হাজার ৬৯৯ ডলার নির্ধারণ করেছিল, কিন্তু এটি ক্রেতাদের মধ্যে তেমন জনপ্রিয়তা পায়নি। আবার এটি কোম্পানির পরবর্তী অ্যাপল ওয়াচও হতে পারে—আইফোনের মতো জনপ্রিয় না হলেও প্রতি বছর যেটি লক্ষ লক্ষ মানুষ কেনেন।

আইফোনের সঙ্গে মানুষ যেভাবে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে, সেটিও অ্যাপলের নতুন ডিজাইনের ব্যাপক বিক্রির পথে সম্ভাব্য একটি বাধা।

মিলানেসি বলেন, ‘ফোল্ডেবল ফোনগুলো আকর্ষণীয় ডিভাইস। অনেকেই এর প্রতি আগ্রহী, কিন্তু একটি প্রচলিত ফোন থেকে ফোল্ডেবল ফোনে স্থানান্তরিত হওয়ার ক্ষেত্রে সফটওয়্যার এবং শেখার প্রক্রিয়াটি বেশ কঠিন।’

বেন উড উল্লেখ করেন, স্যামসাং ও হুয়াওয়ের মতো কোম্পানির ফোল্ডেবল স্মার্টফোন বর্তমানে স্মার্টফোন বিক্রির মাত্র ২ শতাংশ।

ডাটা ও অ্যানালিটিক্স ফার্ম এফডিএম সিসিএম ইনসাইটের মতে, অ্যাপলের ফোল্ডেবল ফোন আগ্রহ ও চাহিদা বাড়ালেও আগামী দশকে এর বিক্রি মোট বাজারের মাত্র ৪ শতাংশে পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

আইফোন অ্যাপলের সর্বাধিক বিক্রিত পণ্য এবং প্রতি বছর কোম্পানিটির মোট বিক্রয়ের অর্ধেকের বেশি আসে এই পণ্য থেকে।

সাম্প্রতিক প্রান্তিকগুলোয় কোম্পানিটি বলেছে, আইফোনের চাহিদা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। ডিভাইসটির সর্বশেষ সংস্করণও তাদের সবচেয়ে সফল পণ্য হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে বলে দাবি করেছে অ্যাপল।

এদিকে অডিও ও চ্যাট অ্যাসিস্ট্যান্ট সিরির আসন্ন পুনঃপ্রবর্তন নিয়েও আরো তথ্য প্রকাশ করেছে অ্যাপল। এখন এর নাম দেওয়া হয়েছে ‘সিরি এআই’।

আইফোন ১৮ থেকে শুরু করে সিরি এখন ব্যবহারকারীর ফোনের মেসেজ ও ইমেলের মতো তথ্য ঘেঁটে প্রয়োজনীয় তথ্য খুঁজে বের করতে, প্রশ্নের উত্তর দিতে এবং ব্যবহারকারীর পক্ষ থেকে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিতে সক্ষম হবে।

নতুন অ্যাপল ওয়াচেও সিরি এআইয়ের কিছু ফিচার পাওয়া যাবে। এর মধ্যে রয়েছে কথোপকথনের নোট নেয়া এবং তা লিখে ফেলার ক্ষমতা।

টার্নাস আইফোনের নতুন এআই-সক্ষম বৈশিষ্ট্যগুলোকে একটি ‘বুদ্ধিমান ব্যক্তিগত কেন্দ্র’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। একইসঙ্গে তিনি স্বীকার করেছেন, অ্যাপল ‘আপনার দৈনন্দিন জীবনের সবচেয়ে ব্যক্তিগত বিবরণ’ ব্যবহার করবে।

তবে তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, এসব তথ্য গোপন থাকবে এবং এআই ফিচারগুলো প্রায়ই ‘ডিভাইসে’ চলবে, অর্থাৎ কোনো তৃতীয় পক্ষের কোম্পানির মাধ্যমে নয়। আর কোনো কাজের জন্য তৃতীয় পক্ষের প্রয়োজন হলে সেটি রিমোট সার্ভার বা ক্লাউডে গোপন থাকবে বলে জানান টার্নাস।

‘অন্যরা সেই ডাটাকে সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করার বস্তু হিসেবে দেখে,’ বলেন টার্নাস। ‘কিন্তু এখানে, এমনকি অ্যাপলও আপনার ব্যক্তিগত তথ্যে প্রবেশ করতে পারে না।’

আরও