এআই ইফেক্ট: হোমওয়ার্কে দুর্দান্ত কিন্তু পরীক্ষার ফলাফলে অবনতি

শিক্ষার্থীরা যখন এআইয়ের সহায়তা ছাড়া মাসিক পরীক্ষায় অংশ নেয়, তখন ছয় মাসের মধ্যে তাদের নম্বর ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। উচ্চঝুঁকির ভর্তি পরীক্ষাতেও ফল খারাপ হয়েছে, যদিও সেখানে প্রভাব পুরোপুরি দৃশ্যমান হতে কিছুটা বেশি সময় লেগেছে

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে শিক্ষার্থীরা হোমওয়ার্কে আগের চেয়ে ভালো করছে, কাজ শেষ করতেও লাগছে কম সময়। কিন্তু পরীক্ষার হলে যখন এআইয়ের সহায়তা থাকছে না, তখন ফল উল্টো খারাপ হচ্ছে। বড় পরিসরের এক গবেষণায় এমনই চিত্র উঠে এসেছে। এতে দেখা গেছে, জেনারেটিভ এআই ব্যবহারের পর শিক্ষার্থীদের হোমওয়ার্কের নম্বর ১৮ শতাংশ বাড়লেও ছয় মাসের মধ্যে এআই ছাড়া নেয়া মাসিক পরীক্ষায় তাদের ফল ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে।

স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভিড স্ট্রমবার্গ এবং হংকং বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিক্টর লেই ও ইয়ানহুই উ চীনের ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী প্রায় ২৭ হাজার শিক্ষার্থীর ওপর ৩০ মাস ধরে গবেষণা চালিয়েছেন। নয়টি বিষয়ের হোমওয়ার্ক, মাসিক ক্লোজড-বুক পরীক্ষা এবং উচ্চঝুঁকির ভর্তি পরীক্ষার তথ্য বিশ্লেষণ করে তারা এ ফল পেয়েছেন।

গবেষণায় দেখা যায়, জেনারেটিভ এআই ব্যবহার শুরু করার পর শিক্ষার্থীরা হোমওয়ার্কে দ্রুত উন্নতি করতে থাকে। তাদের হোমওয়ার্কের নম্বর গড়ে ১৮ শতাংশ বেড়ে যায়। একই সঙ্গে প্রতিটি অ্যাসাইনমেন্ট শেষ করতে সময় প্রায় ৩০ শতাংশ কমে। আগে যেখানে একটি অ্যাসাইনমেন্ট শেষ করতে গড়ে ৬৪ মিনিট লাগত, এআই ব্যবহারের পর তা নেমে আসে ৪৫ মিনিটে।

কিন্তু এ উন্নতি পরীক্ষার হলে ধরে রাখা যায়নি। শিক্ষার্থীরা যখন এআইয়ের সহায়তা ছাড়া মাসিক পরীক্ষায় অংশ নেয়, তখন ছয় মাসের মধ্যে তাদের নম্বর ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। উচ্চঝুঁকির ভর্তি পরীক্ষাতেও ফল খারাপ হয়েছে, যদিও সেখানে প্রভাব পুরোপুরি দৃশ্যমান হতে কিছুটা বেশি সময় লেগেছে।

গবেষকদের মতে, এ ফলাফল স্কুলের কাজ ভালোভাবে সম্পন্ন করা আর প্রকৃতপক্ষে শেখার মধ্যে বড় পার্থক্য তুলে ধরে। এআই কোনো কাজের উত্তর দ্রুত তৈরি করে দিতে পারে, কিন্তু সেই উত্তর তৈরির জন্য যে চিন্তা, অনুশীলন ও সমস্যা সমাধানের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে একজন শিক্ষার্থীর যাওয়ার কথা, তা অনেক ক্ষেত্রে আর ঘটছে না।

অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (ওসিইডি) ‘ডিজিটাল এডুকেশন আউটলুক ২০২৬’-এও একই ধরনের উদ্বেগ উঠে এসেছে। জানুয়ারিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, শিক্ষা দেয়ার জন্য বিশেষভাবে তৈরি নয় এমন জেনারেটিভ এআই যদি কোনো কাঠামো বা শিক্ষকের নির্দেশনা ছাড়া ব্যবহার করা হয়, তাহলে শিক্ষার্থীরা কাজ দ্রুত ও ভালোভাবে শেষ করতে পারে; কিন্তু তাতে প্রকৃত শেখার উন্নতি নাও হতে পারে।

এ ধরনের প্রবণতাকে গবেষকেরা ‘মেটাকগনিটিভ লেজিনেস’ হিসেবে বর্ণনা করছেন। অর্থাৎ কোনো বিষয় নিজে বোঝা, ভুল করা, আবার চেষ্টা করা, নিজের চিন্তা যাচাই করা এবং সমস্যা সমাধানের মতো শেখার জন্য প্রয়োজনীয় মানসিক পরিশ্রম কমে যেতে পারে।

তবে গবেষণাগুলো এও বলছে, এআই ব্যবহার করাই মূল সমস্যা নয়; বরং শিক্ষার্থীরা কীভাবে এআই ব্যবহার করছে, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

ভোডাফোন ফাউন্ডেশনের জন্য ইপসোস ইউরোপের সাতটি দেশের ১২ থেকে ১৭ বছর বয়সী ৭ হাজার শিক্ষার্থীর ওপর জরিপ চালায়। এতে দেখা গেছে, ৫৬ শতাংশ শিক্ষার্থী পড়াশোনার তথ্য সংগ্রহে এআই ব্যবহার করে। ৪৫ শতাংশ কঠিন শব্দ ও ধারণার ব্যাখ্যা পেতে এআইয়ের সহায়তা নেয়।

তবে ৩১ শতাংশ শিক্ষার্থী জানিয়েছে, তারা পুরো কাজ বা অ্যাসাইনমেন্টের সম্পূর্ণ সমাধান পেতে এআই ব্যবহার করে। বিপরীতে স্বাধীনভাবে শেখাকে সহায়তা করতে পারে—এমন ব্যবহার তুলনামূলকভাবে কম। ২৯ শতাংশ শিক্ষার্থী ইন্টার‌্যাক্টিভ বা অভিযোজিত কনটেন্টের মাধ্যমে শেখার দিকনির্দেশনা নেয় এবং মাত্র ২০ শতাংশ ব্যক্তিগত শিক্ষাপরিকল্পনা তৈরি ও অগ্রগতি পর্যবেক্ষণে এআই ব্যবহার করে।

অর্থাৎ একদল শিক্ষার্থী এআইকে ‘টিউটর’ হিসেবে ব্যবহার করছে, আরেক দল ব্যবহার করছে ‘উত্তরদাতা’ হিসেবে। গবেষণাগুলো বলছে, এই দুই ধরনের ব্যবহারের শিক্ষাগত ফল এক নয়।

এআইয়ের প্রভাব এখন শুধু হোমওয়ার্ক বা পরীক্ষায়ও সীমাবদ্ধ নেই। যুক্তরাজ্যের ১ হাজার ৫৪ জন পূর্ণকালীন স্নাতক শিক্ষার্থীর ওপর করা ‘এইচইপিআই/করটেক্সট স্টুডেন্ট জেনারেটিভ এআই সার্ভে ২০২৬’-তে ৪৯ শতাংশ বলেছে, এআই তাদের শিক্ষাজীবনের অভিজ্ঞতা উন্নত করেছে। তারা সময় সাশ্রয়, বিষয় ভালোভাবে বোঝা এবং তাৎক্ষণিক ব্যক্তিগত সহায়তাকে এর সুবিধা হিসেবে উল্লেখ করেছে।

জরিপে শিক্ষার্থীদের একাকিত্বের ওপর এআইয়ের প্রভাবও জানতে চাওয়া হয়। ৫৯ শতাংশ বলেছে, এআই তাদের একাকিত্বের অনুভূতিতে কোনো পরিবর্তন আনেনি। ২১ শতাংশ জানিয়েছে, এআইয়ের কারণে তারা কম একাকী অনুভব করেছে। বিপরীতে ২০ শতাংশ বলেছে, এআই তাদের আরো একাকী করে তুলেছে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এর মধ্যেই শিক্ষায় এআই ব্যবহারের দিকে দ্রুত এগোচ্ছে। চীনে বছরে অন্তত আট ঘণ্টা এআই শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও কাতারও শিক্ষাক্রমে এআই অন্তর্ভুক্ত করতে শুরু করেছে।

ফলে শিক্ষাবিদদের সামনে এখন মূল প্রশ্ন হচ্ছে—এআই শিক্ষার্থীর শেখাকে সহায়তা করছে, নাকি তার হয়ে কাজটি করে দিচ্ছে। গবেষণার বর্তমান ফল বলছে, দ্বিতীয়টি বেশি হলে হোমওয়ার্কে নম্বর বাড়তে পারে, সময়ও বাঁচতে পারে; কিন্তু পরীক্ষার হলে শিক্ষার্থীর নিজের শেখার ঘাটতি স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে। আল জাজিরা

আরও