বেস এডিটিং প্রযুক্তি: দুরারোগ্য ব্লাড ক্যানসার নিরাময়ে যুগান্তকারী সাফল্য

শ্বেত রক্তকণিকার ডিএনএতে নির্ভুলভাবে পরিবর্তন ঘটিয়ে সেগুলোকে ক্যানসারের সঙ্গে লড়তে ‘জীবন্ত ঔষধে’ রূপান্তরিত করা হয়।

এই প্রযুক্তির মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা সুস্থ টি- সেল ব্যবহার করে সেগুলোকে এমনভাবে ইঞ্জিনিয়ারিং করেন যাতে তারা কেবলমাত্র ক্যানসারে আক্রান্ত টি-সেল বা টি-কোষগুলোকে খুঁজে বের করে ধ্বংস করে। টি-সেল রোগ সৃষ্টিকারী কোষ ধ্বংস করে থাকে।

অত্যাধুনিক ডিএনএ এডিটিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে আগ্রাসী ও আগে থেকে অনিরাময়যোগ্য বলে মনে করা এক ধরনের ব্লাড ক্যানসার নিয়ন্ত্রণে নজিরবিহীন সাফল্য পেয়েছেন যুক্তরাজ্যের বিজ্ঞানীরা। এই ব্লাড ক্যানসার হচ্ছে টি-সেল অ্যাকিউট লিম্ফোব্লাস্টিক লিউকেমিয়া। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, শ্বেত রক্তকণিকার ডিএনএতে নির্ভুলভাবে পরিবর্তন ঘটিয়ে সেগুলোকে ক্যানসারের সঙ্গে লড়তে ‘জীবন্ত ঔষধে’ রূপান্তরিত করা হয়। খবর বিবিসি।

গ্রেট অরমন্ড স্ট্রিট হাসপাতাল ও ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের (ইউসিএল) চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, পরীক্ষামূলক এ থেরাপিতে অন্তর্ভুক্ত প্রথম ১১ জন রোগীর মধ্যে ৯ জনের ক্যানসার সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণে এসেছে। তারা এখন বোন ম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট করাতে পারবেন। এছাড়া, তিন মাস থেকে তিন বছর চিকিৎসা নেয়ার পর রোগমুক্ত হয়েছেন ৭ জন।

এই বৈপ্লবিক চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়েছে বেস এডিটিং নামক প্রযুক্তি। বেস হলো জীবনের ভাষা—অ্যাডিনিন (এ), সাইটোসিন (সি), গুয়ানিন (জি), ও থাইমিন (টি) আমাদের জেনেটিক কোডের মূল ভিত্তি। বেস এডিটিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা জেনেটিক কোডের একটি নির্দিষ্ট অংশে জুম করে শুধুমাত্র একটি বেসের আণবিক কাঠামো পরিবর্তন করতে পারেন। এতে কার্যত শরীরের ‘নির্দেশিকা ম্যানুয়াল’ নতুন করে লেখা সম্ভব হয়।

এই প্রযুক্তির মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা সুস্থ টি- সেল ব্যবহার করে সেগুলোকে এমনভাবে ইঞ্জিনিয়ারিং করেন যাতে তারা কেবলমাত্র ক্যানসারে আক্রান্ত টি-সেল বা টি-কোষগুলোকে খুঁজে বের করে ধ্বংস করে। টি-সেল রোগ সৃষ্টিকারী কোষ ধ্বংস করে থাকে।

ক্যানসার সৃষ্টিকারী টি-সেলগুলোকে ধ্বংস করার জন্য সুস্থ দাতার টি-সেলগুলোর ওপর মোট চারটি জেনেটিক পরিবর্তন করা হয়। প্রথমে টি-সেলগুলোর নিজস্ব টার্গেটিং মেকানিজম নিষ্ক্রিয় করা হয়, যাতে তারা রোগীর শরীরের সুস্থ কোষগুলোকে আক্রমণ না করে। দ্বিতীয় ধাপে, টি-সেলের ওপর থাকা সিডি৭ নামক একটি রাসায়নিক চিহ্ন অপসারণ করা হয়। এটি অপরিহার্য কারণ এই চিহ্ন থাকলে থেরাপিটি নিজেদেরই ধ্বংস করে দিত।

তৃতীয় ধাপে টি-সেলগুলোয় একটি ‘অদৃশ্য চাদর’ যুক্ত করা হয়, যা সেগুলোকে কেমোথেরাপির ওষুধ দ্বারা ধ্বংস হওয়া থেকে রক্ষা করে। শেষ ধাপে টি-সেলগুলোকে নির্দেশনা দেয়া হয় যে, তারা যেন সিডি৭ চিহ্নযুক্ত যেকোনো কোষকে খুঁজে বের করে ধ্বংস করে। যেহেতু সুস্থ দাতার টি-সেল থেকে সিডি৭ চিহ্নটি আগেই সরিয়ে দেয়া হয়েছে, তাই তারা নিজেদের মধ্যে আক্রমণ করে না। কিন্তু ক্যানসারে আক্রান্ত সব টি-সেলকে ধ্বংস করে দেয়।

অ্যালিসা টিপলি। ছবি- বিবিসি

এই থেরাপির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য রোগী লেস্টারের ১৬ বছর বয়সী অ্যালিসা ট্যাপলি। প্রচলিত কেমোথেরাপি ও বোন ম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট ব্যর্থ হওয়ার পর তাকে ২০২২ সালে এ চিকিৎসা দেয়া হয়। দীর্ঘদিন হাসপাতালে থাকার পর বর্তমানে তার শরীরে ক্যানসারের কোনো চিহ্ন নেই, এবং তিনি এখন সম্পূর্ণ স্বাভাবিক জীবনযাপন করছেন।

চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, থেরাপির সময়ে রোগীর পুরো প্রতিরোধ ব্যবস্থা সাময়িকভাবে নিস্ক্রিয় হওয়ায় সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে। তবে অত্যন্ত আগ্রাসী এই ক্যানসারের ক্ষেত্রে পরীক্ষামূলক চিকিৎসার ফলাফল ‘অতুলনীয়ভাবে আশাব্যঞ্জক’।

গ্রেট অরমন্ড স্ট্রিট হাসপাতালের অধ্যাপক ওয়াসিম কাসিম বলেন, ‘কয়েক বছর আগেও এ ধরনের চিকিৎসা কল্পবিজ্ঞান মনে হতো। এখন এটি বাস্তব।‘

যুক্তরাজ্যের স্টেম সেল চ্যারিটি অ্যান্থনি নোলানের মেডিকেল অফিসার ড. তানিয়া ডেক্সটার বলেছেন, ‘এই রোগীদের প্রায় কোনো আশা ছিল না। ফলাফল প্রমাণ করে, এমন থেরাপি ভবিষ্যতে আরো অনেক মানুষের জীবন বাঁচাতে পারে।‘

আরও