সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব

আদালতে কঠিন জেরার মুখে জাকারবার্গ

তাদের দাবি, মেটা জানত যে তাদের প্ল্যাটফর্ম তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে, কিন্তু তারা সুরক্ষার চেয়ে মুনাফাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে।

জাকারবার্গের দাবি, অনেক শিশু তাদের বয়স লুকিয়ে ইনস্টাগ্রামে যোগ দেয় এবং শনাক্ত হওয়া মাত্রই তাদের সরিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু বাদীপক্ষের আইনজীবীরা এই যুক্তির পর পাল্টা জিজ্ঞেস করেন, ‘আপনি কি আশা করেন যে একটি ৯ বছরের শিশু সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের শর্তাবলির সমস্ত ছোট অক্ষর পড়ে দেখবে?'

কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আসক্তি নিয়ে দায়ের করা এক ঐতিহাসিক মামলায় বুধবার আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন মেটা সিইও মার্ক জাকারবার্গ। লস অ্যাঞ্জেলেসের একটি আদালতে বাদীপক্ষের আইনজীবীরা জাকারবার্গকে একের পর এক তীক্ষ্ণ প্রশ্নে জর্জরিত করেন। বিশেষ করে, ১৩ বছরের কম বয়সী শিশুদের প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে মেটা ব্যর্থ হয়েছে কি না, তা নিয়েই ছিল মূল বিতর্ক। খবর দ্য গার্ডিয়ান।

আদালতে জাকারবার্গ দাবি করেন যে, মেটা অপ্রাপ্তবয়স্ক ব্যবহারকারীদের শনাক্ত করার পদ্ধতিতে উন্নতি করেছে। তবে তিনি স্বীকার করেন, ‘আমি সবসময়ই চেয়েছি আমরা যদি আরো আগে এই পর্যায়ে পৌঁছাতে পারতাম!‘

জাকারবার্গের দাবি, অনেক শিশু তাদের বয়স লুকিয়ে ইনস্টাগ্রামে যোগ দেয় এবং শনাক্ত হওয়া মাত্রই তাদের সরিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু বাদীপক্ষের আইনজীবীরা এই যুক্তির পর পাল্টা জিজ্ঞেস করেন, ‘আপনি কি আশা করেন যে একটি ৯ বছরের শিশু সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের শর্তাবলির সমস্ত ছোট অক্ষর পড়ে দেখবে? এর ওপর ভিত্তি করেই কি আপনি শপথ করে বলছেন যে ১৩ বছরের কম বয়সীদের অনুমতি নেই?’ জাকারবার্গ কিছুটা বিরক্তি প্রকাশ করে বলেন, ‘আমি বুঝি না এটি কেন এত জটিল মনে হচ্ছে।‘

এই মামলার অন্যতম মূল বিষয় হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নকশা এমনভাবে করা হয়েছে কি না যা ব্যবহারকারীদের আসক্ত করে তোলে। এর আগে ইনস্টাগ্রাম সিইও অ্যাডাম মোসেরি সাক্ষ্য দিতে গিয়ে 'ক্লিনিক্যাল আসক্তি'র বিষয়টি অস্বীকার করেন। তিনি একে ‘সমস্যামূলক ব্যবহার’ হিসেবে অভিহিত করেন, যা অনেকটা ‘প্রয়োজনের চেয়ে বেশি সময় টিভি দেখার মতো।‘ তবে গবেষক ও মনোবিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে কিশোর-কিশোরীদের ওপর এর ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছেন।

বর্তমান বিচারপ্রক্রিয়াটি মূলত ২০ বছর বয়সী এক তরুণীর (ছদ্মনাম কেজিএম) করা অভিযোগকে কেন্দ্র করে চলছে। তার দাবি, ইউটিউব ও ইনস্টাগ্রামের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার তার বিষণ্ণতা এবং আত্মহত্যার প্রবণতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল। এটি মূলত একটি 'বেলওয়েদার' বা পরীক্ষামূলক মামলা, যার রায়ের ওপর ভিত্তি করে পরবর্তী শত শত মামলার গতিপথ নির্ধারিত হবে।

বাদীপক্ষের আইনজীবীরা মেটার বেশ কিছু অভ্যন্তরীণ নথিপত্র জনসমক্ষে এনেছেন। তাদের দাবি, মেটা জানত যে তাদের প্ল্যাটফর্ম তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে, কিন্তু তারা সুরক্ষার চেয়ে মুনাফাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। মেটার সাবেক কর্মী কেলি স্টোনলেক অভিযোগ করেছেন যে, শিশুদের ডেটা সংগ্রহ এবং তাদের হয়রানির পরিবেশের মধ্যে ঠেলে দেয়ার বিষয়ে সতর্ক করায় তাকে হেনস্থার শিকার হতে হয়েছিল।

আদালতে জাকারবার্গ যখন প্রবেশ করেন, তখন তাকে ঘিরে ছিল মেটা রে-ব্যান এআই চশমা পরা সহকারীরা। বিচারক স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন যে, এই ডিভাইস ব্যবহার করে কোনো রেকর্ডিং করা হলে তা আদালত অবমাননা হিসেবে গণ্য হবে। এমনকি মেটাল ডিটেক্টরে তল্লাশির সময় জাকারবার্গকে তার সোনার চেইন নিয়েও প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়।

২০২৪ সালের শুরুতে জাকারবার্গ মার্কিন সিনেটে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর কাছে ক্ষমা চেয়েছিলেন। কিন্তু অনেক পরিবারই সেই ক্ষমা প্রার্থনাকে ‘অন্তঃসারশূন্য’ বলে মনে করেন। তাদের মতে, লোকদেখানো ক্ষমা নয়, বরং তারা আদালতের মাধ্যমে মেটার নকশায় স্থায়ী পরিবর্তন এবং উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ চান তারা।

আরও