অনলাইনে গোপনীয়তা নিয়ে মানুষের সচেতনতা আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। অনেকেই মনে করেন ওয়েব ব্রাউজারের ‘প্রাইভেট মোড’ বা ‘ইনকগনিটো মোড’ ব্যবহার করলে তাদের অনলাইন কার্যকলাপ সম্পূর্ণ গোপন থাকে। কিন্তু প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি একটি ভুল ধারণা। প্রাইভেট মোড কেবল একই ডিভাইসের অন্য ব্যবহারকারীর কাছ থেকে ইতিহাস লুকায়, ইন্টারনেট থেকে নয়।
প্রাইভেট মোড মূলত একটি অস্থায়ী ব্রাউজিং সেশন। এতে ব্রাউজিং হিস্ট্রি, কুকি, ফর্ম ডাটা বা সার্চ হিস্ট্রি ব্রাউজারে সংরক্ষিত থাকে না। ট্যাব বা উইন্ডো বন্ধ করার পর ওই সেশনের ডাটা ব্রাউজার থেকে মুছে যায়। এটি সাধারণত অনেকেই ব্যক্তিগত বা গোপন অনুসন্ধানে ব্যবহার করেন। আবার অনেকেই বিজ্ঞাপন ট্র্যাকিং এড়াতে প্রাইভেট মোড ব্যবহার করেন।
সাম্প্রতিক বছরগুলোয় অনলাইনে ব্যক্তিগত তথ্য চুরি, হ্যাকিং ও লক্ষ্যভিত্তিক বিজ্ঞাপনের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় ব্যবহারকারীরা এখন আরো সতর্ক থাকেন। এ সুযোগে বেশির ভাগ জনপ্রিয় ব্রাউজার যেমন গুগল ক্রোম, অ্যাপলের সাফারি, ফায়ারফক্স, মাইক্রোসফট এজ কিংবা মোজিলার মতো কোম্পানিগুলো গোপনীয়তা সুরক্ষার ফিচারগুলোর প্রচার জোরদার করেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, ক্রোমের ‘ইনকগনিটো’ বা সাফারির ‘প্রাইভেট মোড’-এর মতো ফিচারগুলো সীমিত সুরক্ষা দেয়।
তাদের মতে, প্রাইভেট মোড শুধু ব্রাউজারে লোকাল ডাটা সংরক্ষণ বন্ধ করে। কিন্তু ইন্টারনেট কার্যকলাপ তখনো ওয়েবসাইট অপারেটর, বিজ্ঞাপনদাতা, এমনকি ইন্টারনেট সেবা প্রদানকারীর (আইএসপি) কাছে দৃশ্যমান থাকে।
ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের অনুসরণ বা ট্র্যাকিংয়ের জন্য শুধু কুকি নয়, আরো অনেক পদ্ধতি রয়েছে। এর মধ্যে একটি হলো ‘ব্রাউজার ফিঙ্গারপ্রিন্টিং’ বা ‘ডিজিটাল ফিঙ্গারপ্রিন্ট’। এতে ব্যবহারকারীর ডিভাইসের আইপি অ্যাড্রেস, ব্রাউজারের ধরন, স্ক্রিন রেজল্যুশন, ভাষা সেটিং, অপারেটিং সিস্টেম, আইপি ঠিকানা ইত্যাদি নানা তথ্য বিশ্লেষণ করে একটি অনন্য প্রোফাইল তৈরি করা হয়। এ প্রোফাইল ব্যবহার করে প্রাইভেট মোডে থেকেও ব্যবহারকারীকে শনাক্ত করা সম্ভব।
এছাড়া প্রাইভেট মোড ইন্টারনেট সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান বা যেকোনো নেটওয়ার্ক অ্যাডমিনের নজরদারি থেকে রক্ষা করতে পারে না। কোন ওয়েবসাইট খোলা হচ্ছে তা আইএসপি সহজেই জানতে পারে। আইনি প্রয়োজনে এসব তথ্য তারা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দিতে পারে। অনেক দেশে সরকারও নজরদারির জন্য এ সুযোগ ব্যবহার করে থাকে।
অনলাইনের নিরাপদ থাকতে প্রথমত, ব্রাউজারের অ্যান্টি ফিঙ্গারপ্রিন্টিং ফিচার চালু করা যেতে পারে। মজিলা ফায়ারফক্স ও অ্যাপল সাফারিতে এটি ডিফল্টভাবে থাকে। গুগল ক্রোম ব্যবহারকারীরা চাইলে তৃতীয় পক্ষের এক্সটেনশন ব্যবহার করে এটি সক্রিয় করতে পারেন। তবে এতে কিছু ওয়েবসাইট সঠিকভাবে কাজ নাও করতে পারে। কারণ এসব ফিচার কিছু ডাটা ব্লক করে দেয়।
দ্বিতীয়ত, ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক বা ভিপিএন ব্যবহার করা যেতে পারে। ভিপিএন ব্যবহার করলে ব্যবহারকারীর প্রকৃত আইপি ঠিকানা গোপন রাখা সম্ভব হয়। পাশাপাশি ট্রাফিক এনক্রিপ্ট হয়, ফলে তৃতীয় পক্ষ ট্র্যাক করতে পারে না। তবে সব ভিপিএন বিশ্বাসযোগ্য নয়, বিনামূল্যের ভিপিএন থেকে ব্যক্তিগত ডাটা ফাঁস হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই বিশ্বস্ত ভিপিএন ব্যবহারে বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দেন।
তৃতীয়ত, গোপনীয়তাকেন্দ্রিক ব্রাউজার যেমন ব্রেভ বা ডাকডাকগো ব্যবহার করা যায়। এগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে ট্র্যাকার ও বিজ্ঞাপন ব্লক করে। সবচেয়ে শক্তিশালী বিকল্প হলো টর ব্রাউজার, যা ট্রাফিককে একাধিক সার্ভারের মাধ্যমে ঘুরিয়ে পাঠায়, ফলে শনাক্ত করা কঠিন হয়। তবে টর ধীর এবং অনেক সাইটে প্রবেশ করা সমস্যা হতে পারে। সাংবাদিক, অধিকারকর্মী ও কঠোর নজরদারির দেশগুলোর নাগরিকরা এটি বেশি ব্যবহার করেন।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, অনলাইনে নিরাপদ থাকতে একাধিক টুল একসঙ্গে ব্যবহার করা উচিত। প্রাইভেট মোড ব্যবহার করা যায় স্থানীয় গোপনীয়তার জন্য, ভিপিএন দিয়ে আইপি লুকাতে পারেন আর নিয়মিত ব্যবহারের জন্য বেছে নিতে পারেন গোপনীয়তানির্ভর ব্রাউজার। পাশাপাশি ব্রাউজারের সেটিংস পরীক্ষা করা, সন্দেহজনক ওয়েবসাইট এড়িয়ে চলা ও অনলাইনে ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার না করা জরুরি।
পকেট-লিন্ট অবলম্বনে